সামাজিক বনায়নে সচ্ছল

চকরিয়ার হারবাংয়ে সামাজিক বনায়ন পাল্টে দিয়েছে দরিদ্র এই মানুষগুলোর জীবন  প্রথম আলো
চকরিয়ার হারবাংয়ে সামাজিক বনায়ন পাল্টে দিয়েছে দরিদ্র এই মানুষগুলোর জীবন প্রথম আলো

দিগন্ত জোড়া বনপথে সবুজের ছড়াছড়ি। বনের বুক চিরে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। সড়কের পাশে বনপথের একটি জায়গায় এসে যে কারও চোখ কিছুক্ষণের জন্য হলেও আটকে যাবে। জায়গাটির নাম আলীপুর। নানা জাতের গাছের সুশোভন দৃশ্য দেখলেই ইচ্ছে করে ওই জায়গায় একটুখানি দাঁড়াতে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের চুনতি রেঞ্জের হারবাং বনবিটের অধীনে ওই বনভূমিতে সামাজিক বনায়ন করে ৯০ জন গরিব মানুষ এখন লাখপতি হওয়ার পথে। তাঁদের কেউ ভূমিহীন, কেউ হতদরিদ্র বিধবা, আবার কেউ অসচ্ছল কৃষক। ১০ বছর আগে সবারই ছিল নুন আনতে পানতা ফুরোয় অবস্থা। বন বিভাগ ২০০২-২০০৩ সালে তাঁদের প্রত্যেককে সচ্ছল করে তোলার লক্ষ্যে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের আলীপুরে ৯০ হেক্টর বনভূমি বরাদ্দ দেয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এখানকার প্রাকৃতিক বা সরকারি সংরক্ষিত বন অনেক আগেই উজাড় হয়ে গিয়েছিল। এখন বনভূমিতে যে বিস্তৃত সবুজ বন দেখা যাচ্ছে তার সবটুকুই বরাদ্দপ্রাপ্তদের সৃষ্ট সামাজিক বনায়ন। এই বনভূমিতে সামাজিক বনায়নের অংশীদার হয়েছেন এক সময়ের ভূমিহীন
গত ২৪ নভেম্বর সরেজমিন কথা হয় উপকারভোগী রোকেয়া বেগম ও সাজেদা বেগমের সঙ্গে। তাঁদের মতে, এই বনায়ন তাঁদের নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছে। জুগিয়েছে প্রতিদিনের অন্নও।

রোকেয়া বেগম ও সাজেদা বেগমের মতো আরও ৮৮ জন হতদরিদ্র মানুষ রাতদিন কষ্ট করে নিজের সন্তানের মতো পরিচর্যার মাধ্যমে সামাজিক বনায়নটি বাস্তবায়ন করছে। কিছুদিন পরই কাটা হবে বনের গাছগুলো। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশা, গাছগুলো বিক্রির পর তাঁদের একেকজন অন্তত চার-পাঁচ লাখ টাকার মালিক হবেন। রাতের আঁধার কাটিয়ে তাঁদের আঙিনায় দেখা দেবে ভোরের সোনালি আলো।
হারবাং ইউনিয়নের মছন সিকদারপাড়ার দিদারুল ইসলাম (৩০) মনে করেন, এই বন সংরক্ষণ করে এলাকাটিতে পিকনিক স্পট বা পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা যায়।
উপকারভোগী রোকেয়া বেগম (৫০) বললেন, ‘আমার চাল-চুলো কিছুই ছিল না। এই সামাজিক বনায়নের অংশীদার হতে পেরে আমি নতুন করে বাঁচার সাহস পেয়েছি।’

তিনি জানান, আগে তিনি সন্তানদের নিয়ে দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে হারবাংয়ের মছন সিকদার পাড়ায় থাকতেন। সামাজিক বনায়নের অংশীদার হওয়ার পর এই বনসংলগ্ন কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে খাস জায়গায় ঘর নির্মাণ করে বসবাস করছেন। রাতদিন বাগান পাহারা দিয়েছেন। আর এই বাগান থেকে কুড়ানো পাতা বিক্রি করে ১০ বছর ধরে সংসারের খরচ মিটিয়েছেন।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, চার-পাঁচ টাকায় প্রতিটি চারাগাছ কিনে প্রতি হেক্টর বনভূমিতে দুই হাজার ৭০০-৮০০টি চারাগাছ লাগানো হয়েছিল। এর মধ্যে কিছু গাছ নষ্ট হলেও হেক্টরে দুই হাজারের মতো গাছ এখনো রয়েছে। এখন একেকটি গাছ দুই-আড়াই হাজার টাকায় বিক্রির উপযোগী হয়েছে। আগামী এপ্রিল মাসে নিলামে বিক্রির মাধ্যমে গাছগুলো কাটা হবে। বিক্রির টাকা থেকে ৪৫ ভাগ উপকারভোগীদের এবং ৪৫ ভাগ বন বিভাগের তহবিলে দেওয়া হবে। বাকি ১০ ভাগ রাখা হবে পরবর্তী বাগান করার জন্য।

হারবাং বন বিটের কর্মকর্তা আবুল বশর বলেন, স্বল্পমেয়াদি এই বাগানে একাশিয়া হাইব্রিড, ভাদি, বকাইন, বহেরা, হরীতকী, আমলকী, অর্জুন ও কদমসহ নানা প্রজাতির গাছ রয়েছে। বনায়নের গাছগুলো এখন চিহ্নিত করা হচ্ছে। গাছগুলো বিক্রির টাকা থেকে বন বিভাগের প্রাপ্য অংশ বাদ দিয়ে উপকারভোগীরা একেকজন কয়েক লাখ টাকা করে পাবেন। তাঁর মতে, বাগানটি সামাজিক বনায়নের ক্ষেত্রে একটি মডেল।