স্বপ্ন দিলাম ছড়িয়ে
জীবন গড়ার স্বপ্ন

জামিলুর রেজা চৌধুরী
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তরুণ শিক্ষার্থীরা তাঁদের স্বপ্ন নিয়ে যে লেখাগুলো পাঠিয়েছেন, তাতে আমি অদূর ভবিষ্যতে সমৃদ্ধ ও আলোকিত বাংলাদেশের প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি। তরুণ প্রজন্ম যে দেশের বিদ্যমান সমস্যাগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে আর নিজেদের উদ্ভাবনী শক্তির ব্যবহার করে এই সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজার চেষ্টা করে, তা আমাকে অভিভূত করেছে। গতানুগতিক ধারার প্রকৌশলী বা চিকিৎসক হয়ে সরকারি চাকরির গণ্ডির মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে অনেকে সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষায় ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরাসরি কাজ করার স্বপ্ন দেখছেন। অনেকে হতে চেয়েছেন সংগীতশিল্পী বা আলোকচিত্রী। এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ই-কমার্স ও ই-শিক্ষা নিয়ে কাজ করতে চেয়েছেন। এ ছাড়া শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন অনেকে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই তরুণ প্রজন্মই আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার মূল কারিগরের ভূমিকা পালন করবে। তরুণদের স্বপ্ন দেখতে উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য প্রথম আলোকে জানাই অভিনন্দন।
উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক
সত্য ও সুন্দরের পক্ষে

সুপ্ত প্রতিভার কথা অনেকের কাছেই শুনেছি। কিন্তু আমার সুপ্ত প্রতিভা কী, তা কখনোই খুঁজে পাইনি। এ বিষয়ে অনেক চিন্তা করেছি, অনেক ভেবেছি। কিন্তু কূলকিনারা পাইনি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আসার আগ পর্যন্ত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়তে এসে আমার স্বপ্ন ও বাস্তবতার মাঝে মিল খুঁজে পেয়েছি, পেয়েছি আমার সুপ্ত প্রতিভার সন্ধান। আমার চিন্তাভাবনার মূল বিষয় হলো নিজের কাজের মাধ্যমে অন্যকে স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করা। তাই স্বপ্ন দেখি লেখালেখির মাধ্যমে আমার সত্য ও সুন্দরের পক্ষের চিন্তাভাবনাকে অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে। আমি জানি, একা সমাজ ও দেশের আমূল পরিবর্তন আনতে পারব না। কিন্তু আর দশজনের চিন্তাভাবনার উৎকর্ষ সাধন করে সেই দশজনকে দিয়ে সমাজ ও দেশের পরিবর্তন সাধন করতে পারব। আর ওই দশজন থেকে আরও এক শ-জন। এভাবেই বাড়তে থাকবে।
মারিফুল হাসান
প্রথম বর্ষ, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
গবেষক হতে চাই

মানুষ কত কিছুতেই না আনন্দ খোঁজে। আমি আনন্দ খুঁজি গবেষণার কাজে। এই গবেষণা মানে রীতিমতো ল্যাবরেটরিতে বসে গবেষণা করা নয়। নতুন নতুন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করাতেই আমার আনন্দ। তাই আমি প্রতিদিন কোনো না কোনো নতুন বিষয় সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। আর যে কাজে আনন্দ পাই, স্বপ্ন দেখি সেই কাজই সারা জীবন করে যেতে। আমি স্বপ্ন দেখি জেগে জেগে। এটা শিখেছি বিশিষ্ট পরমাণুবিজ্ঞানী আবদুল কালামের কাছে। তিনি বলেছেন, ‘ঘুমের মধ্যে যে স্বপ্ন দেখা হয়, সেটা প্রকৃত স্বপ্ন নয়; বরং যে স্বপ্নটা ঘুমাতে দেয় না, সেটাই প্রকৃত স্বপ্ন।’ আমাকে এখন যে স্বপ্নটা ঘুমাতে দেয় না, সেটা হচ্ছে গবেষক হওয়ার স্বপ্ন। বাংলাদেশের তরুণেরা এভারেস্ট জয় করেন, ক্রিকেট-দুনিয়ায় বিশ্ব রেকর্ড করেন, বাংলাদেশের বিজ্ঞানী পাটের জিন রহস্য আবিষ্কার করেন...কত ক্ষেত্রে দেশের সাফল্য। স্বপ্ন দেখি, আমিও একদিন এই সফলদের কাতারে নিজের নাম লেখাব।
আনিকা ইশরার তাহমিন
একাদশ শ্রেণি, বিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া
হতে চাই উন্নয়নকর্মী

ছোটবেলায় কখনো স্বপ্ন দেখতাম আকাশে ওড়ার, সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্নের ডানায় ভর দিয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে এলাম, আর বিষয় হিসেবে যখন পেলাম অর্থনীতি, তখন স্বপ্নের একটা নির্দিষ্ট কাঠামো দাঁড় করালাম। প্রতিনিয়ত অভাব, সম্পদ, চাহিদা জোগান সম্পর্কে পড়তে পড়তে মনের মধ্যে উন্নয়নকর্মী হওয়ার স্বপ্নটা স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয়। তাই পড়ালেখা শেষ করে হতে চাই একজন উন্নয়নকর্মী। কেননা, এর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছাকাছি থেকে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করা সম্ভব। কারণ, চাহিদা জোগানের হিসাবটা বইয়ের পাতা থেকে মানুষের কাছে পৌঁছানোটা জরুরি।
ইমরান হোসেন
বিএসএস (সম্মান), চতুর্থ বর্ষ, অর্থনীতি বিভাগ, নোয়াখালী সরকারি কলেজ
হাসিখুশি থাকবে সবাই

সবাইকে হাসিখুশি রাখার মাঝে আনন্দ আছে। তাই স্বপ্ন দেখি, সবাই যাতে সব সময় মানসিক প্রশান্তিতে থাকে, সে বিষয় নিয়ে কাজ করার।
সুযোগ পেলেই আমি চারপাশের মানুষজনের জীবনযাপনপদ্ধতি খেয়াল করার চেষ্টা করতাম অনেক আগ থেকেই। প্রকৃতির রূপ বোঝার চেষ্টা করি, আশপাশে কত বর্ণিলের মাঝে মলিনতা আছে, তা বোঝার চেষ্টা করি। আমি চাই আমার আশপাশের সবাই মানসিকভাবে প্রশান্তিতে থাকুক। আমাদের সমাজে সব ক্ষেত্রের শিশুরা মানসিকভাবে নিগৃহীত হয়। তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নে বর্তমানে ক্ষুদ্র পর্যায়ে কাজ করছি। স্বপ্ন দেখি, আমার কাজ ভবিষ্যতে আরও ডালপালা মেলবে। আমার চারপাশের ছেলে-বুড়ো সবাই মানসিকভাবে সুস্থ থাকবেন।
নিশাত নুজহাত ইসলাম
প্রথম বর্ষ, ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
গানে মোর প্রাণ

মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। আমার ক্ষেত্রে সেই স্বপ্নের পরিধিটা আরও বড়। ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকি, গান ও সৃজনশীল কাজের প্রতি আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। সেই ভালো লাগা থেকে ভবিষ্যৎ জীবনে হতে চাই কণ্ঠশিল্পী। ছোটবেলা থেকেই মা-বাবার প্রেরণায় আমার গানের হাতেখড়ি। অসম্ভব ভালো লাগা ও ভালোবাসা থেকে গান নিয়ে আমার সেই পথচলা এখনো চলছে। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার জন্য আমাদের সুমধুর বাংলা গানের কোনো বিকল্প নেই। তাই স্বপ্ন দেখি, গান দিয়েই আমি আমার বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেব। পরিচয় করিয়ে দেব গানপাগল বাঙালির সঙ্গে।
অনন্যা জয়িতা সাহা
একাদশ শ্রেণি, বিজ্ঞান বিভাগ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ
শিক্ষক হতে চাই

পাইলট, প্রকৌশলী কিংবা চিকিৎসকের মতো বড় কিছু হওয়ার ইচ্ছা সেই ছোটবেলা থেকেই ছিল না। তখন থেকেই অন্তরে একটা তাগিদ অনুভব করতাম শিক্ষক হওয়ার। শিক্ষক হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের মনে ভাস্বর হয়ে থাকার ইচ্ছাটা সেদিন থেকেই জেগে ছিল, যেদিন আমার প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফরিদ আহমেদ স্যারের সঙ্গে পরিচয় হলো। এরপর হাইস্কুলে গণেশ স্যার, অসিত স্যারের মতো অন্তঃপ্রাণ শিক্ষক। তাঁরা আমাকে আরও বেশি প্রেরণা জোগালেন।
ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যকার সম্পর্ক কেমন স্বর্গীয় হতে পারে, তা কখনোই বুঝতাম না, যদি-না চয়ন স্যার কিংবা সেকান্দর আলী স্যারের আদর আর ভালোবাসা না পেতাম। আরেকজনের কথা না বললেই নয়, তিনি অধ্যাপক রামচন্দ্র রায়, গুরুদয়াল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ। তাঁর সরল জীবনযাপনের দৃষ্টান্ত আমার মতো শিক্ষক হওয়ার স্বাপ্নিকদের আরও বেশি প্রলুব্ধ করে।
জমাতুল ইসলাম
দ্বিতীয় বর্ষ, ইংরেজি বিভাগ, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ
ই–দুনিয়ার জন্য তৈরি হচ্ছি

৮ হাজার ৩৯৫ ঘণ্টা। ক্যালেন্ডারের হিসাবে জীবনে ২৩ বছরের বেশি সময় পড়াশোনা আর নিজেকে গড়তে পার করে দিয়েছি। সামনের সময়টুকু নিজেকে ভিত্তি করে দেশ, সমাজ আর ভবিষ্যতের জন্য কিছু কাজে নিজেকে যুক্ত করতে চাই। নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে এমন একটা রেস্টুরেন্ট করতে চাই, যেখানে শুধু নারীদের কর্মসংস্থান হবে। রেস্টুরেন্ট ব্যবসার জন্য আমি উন্নত দেশে প্রশিক্ষণ নিতে চাই। অনলাইনেও বড় চেইন রেস্টুরেন্ট নিয়েও কাজ করার স্বপ্ন আছে আমার। ২০২০ দশক নাকি ই-কমার্সের দশক হবে, চিরায়ত ব্যবসা বদলে ই-দুনিয়ার ব্যবসারীতি চালু হবে। সেই সময়টায় বাংলাদেশের ব্যবসা খাতে আমি দারুণভাবে কিছু করতে চাই। আমি উদ্যোক্তা ধারণায় বিশ্বাসী নই, ব্যবসায়ী হয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে চাই।
আনিকা আলম
চতুর্থ বর্ষ, ফিন্যান্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আলোকচিত্রী হতে চাই

আমার স্বপ্ন বিখ্যাত আলোকচিত্রী হওয়া। আমি আমার তোলা ছবির মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের মাঝে তুলে ধরতে চাই। প্রতিদিন স্বপ্ন দেখি, বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা ঘুরে অনেক অনেক ছবি তুলব এবং সেখান থেকে বাছাই করা সেরা ১০০টা ছবি নিয়ে বিশ্বভ্রমণ করব। আর প্রতিটা দেশে সেই ছবিগুলোর কমপক্ষে একটি করে প্রদর্শনীর আয়োজন করব। সেই ছবিগুলো দেখলে যেকোনো মানুষ জানতে পারবে বাংলাদেশের সৌন্দর্য, সংস্কৃতি তথা একটি সম্পূর্ণ বাংলাদেশকে। আমার স্বপ্নপূরণের জন্য ইতিমধ্যে অনেকগুলো জেলা ভ্রমণ করেছি। প্রতিবার যখন স্বপ্নপূরণে বাধা আসে, তখনই কানে বাজে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সেই উক্তি: ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়।’ আমার স্বপ্নপূরণের জন্য সবার শুভকামনা আশা করছি।
সাব্বির আহমাদ
দ্বাদশ শ্রেণি, সরকারি বিজ্ঞান কলেজ, ঢাকা