স্বাভাবিক ঘুমের সহজ দাওয়াই

‘ঘুমাতে যাওয়ার সময় জীবন সম্পর্কে ইতিবাচক চিন্তা করুন’। প্রতীকী ছবিটি কুইনি লিয়াও ডটকম থেকে নেওয়া। নিজের ছেলের ঘুমের জগৎ​ নিয়ে ‘ভেনগেন ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ নামে একটা আলোকচিত্র সিরিজ করেন আলোকচিত্রী কুইনি লিয়াও।
‘ঘুমাতে যাওয়ার সময় জীবন সম্পর্কে ইতিবাচক চিন্তা করুন’। প্রতীকী ছবিটি কুইনি লিয়াও ডটকম থেকে নেওয়া। নিজের ছেলের ঘুমের জগৎ​ নিয়ে ‘ভেনগেন ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ নামে একটা আলোকচিত্র সিরিজ করেন আলোকচিত্রী কুইনি লিয়াও।

ঘুম হচ্ছে না কেন তা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই ঘুমের বারোটা! কিন্তু দিন আর রাতের ২৪ ঘণ্টার পালাবদলকে তো থামিয়ে রাখার কোনো উপায় নেই। স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে হলে স্বাভাবিকভাবে ঘুমাতেই হবে। কী করলে ঘুম হবে তা নিয়ে আগেই মাথা ঘামাবেন না। আগে ভালো করে বুঝে নিন ঠিকঠাক ঘুমের উপকারিতা। জেনে নিন ঘুম ঠিকঠাক না থাকার বিপদগুলো।

ঘুম হওয়া না-হওয়ার লাভ-ক্ষতি
সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতি রাতে অন্তত ছয় থেকে সাত ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন স্বাস্থ্য-বিশেষজ্ঞরা। তবে, যাঁরা খাবারদাবার থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক কাজকর্মে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এ রুটিন কিছুটা ভিন্নও হতে পারে। ঘুম ভালো হলে দেহ-মন সবই ভালো থাকে। ভালো ঘুম না হলে আটপৌরে জীবনের স্বাভাবিকতাই নষ্ট হয়ে যায় বলে সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে থাকে। জীবনের শান্তি নষ্ট হয়ে যায়। ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু লাভ-ক্ষতির কথা জেনে নেওয়া যাক।

১. সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য
ভালো ঘুমে দেহ-মন ভালো থাকে বলে লেখাপড়া থেকে শুরু করে কাজকর্মে মনোযোগও ভালো থাকে। ফলে জীবনে স্বাভাবিক গতি বজায় থাকে, জীবন আনন্দময় হয়। অন্যদিকে, দিনের পর দিন ইনসমনিয়া বা অনিদ্রায় ভুগতে থাকলে বিষণ্নতা পেয়ে বসে, আত্মঘাতী প্রবণতা বাড়ে। এমনকি অনিদ্রা থেকেই মাদকাসক্তিও পেয়ে বসতে পারে।

২. রোগ প্রতিরোধ
পর্যাপ্ত ঘুমের ঘাটতি দেখা দিলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সহজেই নানা অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সর্দি-কাশি এবং নানা ভাইরাল রোগে দ্রুতই কাবু হয়ে যেতে পারেন অনিদ্রার রোগীরা। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে অন্যান্য জটিল রোগের আশঙ্কাও বেড়ে যায়। অনিদ্রা স্থায়ী হয়ে গেলে বুড়ো বয়সে টাইপ-টু ডায়াবেটিস দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। ঘুম ঠিক না থাকলে খাবারদাবারে অনিয়ম বাড়তে থাকে। এ থেকে মুটিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও বাড়ে। ওজন ঠিক রেখে মেদহীন ঝরঝরে শরীরের জন্য নিয়মিত স্বাভাবিক ঘুমের কোনো বিকল্প নেই।

৩. চিন্তা আর বয়সের ছাপ
একরাত ঠিকমতো ঘুম না হলেই আমাদের মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটে। পড়ালেখাই হোক কিংবা অফিসের কাজকর্ম—ঘুমহীন রাতের পরের দিনটার কথা একবার মনে করে দেখুন। এই অনিদ্রা স্থায়ী হতে থাকলে মনোযোগের ঘাটতি থেকে ধীরে ধীরে তা চিন্তাশক্তির ওপরও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। পাশাপাশি শরীরের ওপর এই নিয়মিত অনিদ্রার ধকলে অল্পতেই বয়সের ছাপ পড়তে শুরু করে। মনোযোগ হারিয়ে জীবনে দুশ্চিন্তা বাড়ানো আর চোখেমুখে বয়সের ছাপ ফেলা কারও জন্যই সুখকর হওয়ার কথা না।

স্বাভাবিকভাবে ঘুমানোর উপায়
সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের মস্তিষ্কের ‘সারকাডিয়ান ক্লক’ দেহঘড়ি কাজ করতে থাকে। আলোর সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি সম্পর্কিত এই দেহঘড়ি। তাই প্রাকৃতিক আলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারাটাই সবচেয়ে ভালো। আর তা না পারলেও ঘুমের কোনো ওষুধ বা কৃত্রিম কোনো কিছুর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়াটাও ঠিক না। চলুন, স্বাভাবিকভাবে ঘুমানোর কিছু দাওয়াই জেনে নিই।

১. শোবার ঘর
ঘুমানোর জন্য শোবার ঘরের আয়োজন যথাযথ হওয়া খুবই জরুরি। শোবার ঘরে চাই নীরবতা, শান্তি আর অন্ধকার। খেয়াল রাখতে হবে যাতে বাইরের আলো না আসে এবং ঘরের সব আলো নিভিয়ে রাখা যায়। আলো ও শব্দের পাশাপাশি শোবার ঘরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাটাও খুব জরুরি। বিছানা-বালিশ আর ঘুমাতে যাওয়ার পোশাক-আশাক যতটা সম্ভব পরিচ্ছন্ন ও আরামদায়ক হওয়া চাই।

২. ঘুমের রুটিন
আসলে ঘুমের রুটিন ঠিক করতে হলে পুরো দিনের রুটিনটাই ঠিকঠাক মেনে চলতে হবে। তার পরও দিন যেভাবেই কাটুক না কেন প্রতি রাতে একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস করাটা খুবই জরুরি। পাশাপাশি প্রতি রাতেই ঘুমাতে যাওয়ার আগে পড়া, হালকা গান শোনা বা এমন নির্দিষ্ট অভ্যাস তৈরি করতে পারলে আরও ভালো। ঘুমানোর এই প্রস্তুতিগুলো মস্তিষ্ককে ঘুমানোর সংকেত পাঠাতে থাকে।

৩. আসক্তি ছাড়ুন, ঠান্ডা থাকুন
ঘুমাতে যাওয়ার জন্য শরীরকে প্রস্তুত করতে হলে অ্যালকোহল এমনকি ক্যাফেইনের মতো উত্তেজনা সৃষ্টিকারী বিষয়গুলোকে এড়িয়ে চলতে হবে। কেননা এগুলোর প্রভাব না কাটিয়ে ঘুমানো যায় না। আর ঘুমানোর জন্য ঘরের তাপমাত্রার মতোই শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটা জরুরি। একটু ঠান্ডা ঠান্ডা ঘরে ঘুম ভালো হয়। আর শরীর ঠান্ডা রাখতে রাতে কম ক্যালরিযুক্ত খাবারদাবার খাওয়া ভালো।

৪. ব্যায়াম ও গোসল
প্রতিদিন হালকা ব্যায়ামের অভ্যাস করতে পারা মানসিক চাপ কমায় এবং শরীরে প্রশান্তি আনে। এটা ঘুমের জন্য ভালো। তবে, ব্যায়ামে যেহেতু শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায় তাই রাতের বদলে দিনে ব্যায়ামের অভ্যাসটাই ভালো। আর রাতে ঘুমাতে যাওয়ার তিন-চার ঘণ্টা আগে হালকা গরম পানিতে গোসল করতে পারলে খুবই ভালো। এতে যদিও প্রথমে শরীরের তাপ একটু বাড়ে কিন্তু ধীরে ধীরে তাপ কমে এলে শরীরে প্রশান্তি আসে এবং তা ঘুমাতে সাহায্য করে।

নিয়মিত এসব অভ্যাস মেনে চলার পাশাপাশি নিজেকে নিজের দেহ-মন সম্পর্কে আরও জানার চেষ্টা করুন। কিছু যোগাসন, মেডিটেশন বা ধ্যান এবং গভীরভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার অভ্যাস রপ্ত করতে পারেন। প্রয়োজনে আলো থেকে রেহাই পেতে চোখ ঢেকে রাখার কাপড়ের আইশেড, বাড়তি শব্দ থেকে রেহাই পেতে কানে ইয়ারপ্লাগ ব্যবহারের মতো টোটকার আশ্রয় নিন। আর সবচেয়ে জরুরি হলো ঘুমাতে যাওয়ার সময় জীবন সম্পর্কে ইতিবাচক চিন্তা করা। সুখ আর আনন্দের স্মৃতি রোমন্থন করা। সুন্দরভাবে সকাল শুরু করে একটা ভালো দিন কাটানোর জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা।