স্বাস্থ্যসেবায় নারীর সংখ্যা বাড়ছে, তবে উচ্চ পদে পুরুষই
সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় নারী জনবল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে উচ্চ ও নীতিনির্ধারণী পদগুলোতে নারীর সংখ্যা এখনো খুব কম। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দাবি করছে, জনবল-কাঠামোতে নারী ও পুরুষের বৈষম্য দূর করার চেষ্টা চলছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে অধিদপ্তরের অধীনে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা ৯৬ হাজার ১০৩ জন। এর মধ্যে নারী ৩৮ হাজার ৩৩১ জন। অর্থাৎ মোট জনবলের ৪০ শতাংশ নারী। ২০০৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশের স্বাস্থ্য জনবলবিষয়ক এক নিবন্ধে জনবলের ২০ শতাংশ নারী থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।
বারডেম হাসপাতালের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুন নাহার প্রথম আলোকে বলেন, স্বাস্থ্যসেবা দানকারীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা বাড়ছে এটা সত্য। কিন্তু উচ্চ পদে, নীতিনির্ধারণী পদে কেন নারীর সংখ্যা কম, সেটাই আজকের দিনে বড় প্রশ্ন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক মহাপরিচালক ও দুই অতিরিক্ত মহাপরিচালক পদে কোনো নারী নেই। ৫২টি পরিচালকের পদের ৫০টি পুরুষের দখলে। কোনো সরকারি মেডিকেল কলেজে অধ্যক্ষের পদে নারী নেই। সারা দেশে সিভিল সার্জনের পদ আছে ৬৫টি, এর মধ্যে চারটিতে নারীরা আছেন।
নাজমুন নাহার বলেন, যুক্তি দেখানো হয় যে যোগ্য নারী নেই। কিন্তু নারীকে যোগ্য করে তোলার জন্য যে পদক্ষেপ বা উদ্যোগ নেওয়া দরকার অথবা যে নীতি গ্রহণ করা দরকার, তা নেওয়া হচ্ছে না।
তবে পরিসংখ্যান বলছে, নারী চিকিৎসকের সংখ্যা ও অনুপাত বাড়ছে। পেশাজীবী চিকিৎসকদের নিবন্ধনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) হিসাব বলছে, ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত নারী চিকিৎসকের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৬৫৭ জন। ওই সময় পুরুষ চিকিৎসক ছিলেন ৩৩ হাজার ৮১৩ জন। প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রার এ জেড এম বাসুনিয়া প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে দেশে চিকিৎসক ৭৪ হাজার ১১৭ জন। নারী-পুরুষের সঠিক সংখ্যা আপাতত বলা সম্ভব না হলেও পার্থক্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। তিনি জানান, দেশের সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ৬০ শতাংশ ছাত্রী। খুব অল্প দিনে নারী চিকিৎসকের সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি হবে।
স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি নারী কাজ করেন নার্সিং পেশায়। এখানে ১১ হাজার ৬১৯ জন কাজ করছেন। এর মধ্যে সুপারভাইজার পদে ৫১৪ জন (পুরুষ ৩৪) এবং স্টাফ নার্স ও জ্যেষ্ঠ স্টাফ নার্স পদে ১১ হাজার ১০৫ জন (পুরুষ ৮৬৯ জন) নারী কাজ করছেন। এরপরে বেশি নারী কাজ করছেন স্বাস্থ্য সহকারীর পদে—৭ হাজার ৮৬ জন। আর এই পদে পুরুষের সংখ্যা ৯ হাজার ৬২৮ জন। এঁরা ইউনিয়ন পর্যায়ে কাজ করেন। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করার সময় বলেছিল, নতুন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার পদে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এই পদে নিয়োগ পেয়েছেন ৫ হাজার ৯৩৩ জন নারী, আর পুরুষ আছেন ৫ হাজার ৭২৮ জন।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় ‘স্বাস্থ্য জনবল কৌশলপত্র’ তৈরি করছে। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সাজেদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, কৌশলপত্রে নারী-পুরুষের সমতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমান ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, শুধু স্বাস্থ্য নয়, সবখানেই একই অবস্থা। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ৬৪ জেলায় জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মাত্র তিনজন নারী।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক বিধিনিষেধ ও সাংস্কৃতিক কারণে অনেকে পুরুষ স্বাস্থ্যকর্মীর সেবা নিতে চান না। গর্ভধারণ সম্পর্কিত সেবা নারী স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে পেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন নারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সরকারি চিকিৎসক প্রথম আলোকে বলেন, যেকোনো অস্ত্রোপচারে নারী রোগী নারী চিকিৎসককে বেশি গুরুত্ব দেয়।