'আমার ছবিতে লাইক দিলা না!'

ফেসবুকের ছবিতে কে লাইক দিচ্ছে অার কে দিচ্ছে না, বন্ধুত্বে এখন এ হিসাবও চলে। মডেল: রুশি, ছবি: অধুন​া
ফেসবুকের ছবিতে কে লাইক দিচ্ছে অার কে দিচ্ছে না, বন্ধুত্বে এখন এ হিসাবও চলে। মডেল: রুশি, ছবি: অধুন​া

বন্ধু চিনতে চান? ফেসবুকের লাইক অপশনে চোখ বোলান। ফেসবুকপ্রিয় তরুণদের অনেকের কাছেই লাইক-কমেন্টস হয়ে যাচ্ছে বন্ধু বাছাইয়ের মাপকাঠি। কাছের বন্ধু, ভালো সম্পর্ক, নিয়মিত ফলোয়ার—এসবই প্রকাশ পাচ্ছে ফেসবুক লাইকে। বাইরে খাওয়া, ঘোরাঘুরি, আড্ডা বা আলসেমিঘেরা অবসর—সবখানেই ছবি তোলা চাই। এরপর সেটা ফেসবুকে দিয়ে অপেক্ষা লাইক আর কমেন্টসের জন্য। টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারিহা তারান্নুম বলেন, ‘ফেসবুকে ছবি দিয়ে দুই মিনিট পরপর মুঠোফোনে অ্যাকাউন্ট দেখি। কে আগে লাইক দিল, আধঘণ্টায় মোট কয়টা লাইক পড়ল, এসব হিসাব করি। এসব দেখে আগের ছবির সঙ্গে বর্তমান ছবিটার সহজেই একটা তুলনা করা যায়। এ ছাড়া কোন কোন বন্ধু লাইক দিচ্ছে, সেটাও পরিষ্কার হয়ে যায়। বন্ধুরা লাইক দিলেই ছবিটাকে সার্থক মনে হয়।’
‘লাইক’ দেওয়া মানেই কি কাছের বন্ধু? ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী কাজী রোবায়েত হাসান প্রশ্নটার উত্তর দিলেন নিজের মতো করেই, ‘কাছের বন্ধুর যেকোনো বিষয়ই আমার কাছে সেরা মনে হয়। তাই ফেসবুকে সে যে ছবিই দিক না কেন, সেখানে লাইক দেবই। আবার যার সঙ্গে আমার সম্পর্ক খারাপ, তার ভালো জিনিসও অনেক সময় আমার কাছে ভালো মনে হয় না। কোনো কারণে হয়তো তাকে বন্ধুতালিকা থেকে বাদ দিতে পারছি না, তখন প্রতিশোধ নিই ছবিতে লাইক না দিয়ে। এটাকে অনেকটা “শীতল যুদ্ধ” বলা চলে।’
পছন্দের মানুষের বা বন্ধুর যেকোনো বিষয় দেখলেই লাইক দিয়ে অনেক সময় বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে পারেন। কোনো বন্ধু হয়তো একটা দুঃখের স্ট্যাটাস দিয়েছেন বা মন খারাপ করার মতো একটা বিষয় ফেসবুকে শেয়ার করলেন, সেখানে না পড়েই লাইক দিয়ে বসলেন। বিষয়টা হিতে বিপরীত হয়ে উঠতে পারে। কাছের বন্ধুটাও ভুল বুঝে দূরে চলে যেতে পারেন অভিমানে। এ ছাড়া কমেন্টস অপশনে হয়তো অন্যরা আপনাকে তুলাধোনা করে ছাড়লেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খায়রুল বাশার বললেন, ‘ফেসবুকে এমনটা অনেক সময়ই ঘটে। তবে আমার মনে হয় লাইকের সংজ্ঞা স্থানভেদে পাল্টে নেওয়া উচিত। হয়তো কারও বাবা অসুস্থ, সে তা ফেসবুকে জানাল। তখন সেখানে লাইক দেওয়া মানে আসলে তার বাবার জন্য দোয়া করা। আবার আমি যে বিষয়টা দেখলাম, সেটারও প্রমাণ বহন করে এই লাইক। তাই অনেকে এসব বিষয়ে লাইক দেয়। তবে সময় থাকলে এমন কোনো বিষয়ে কমেন্টস করেই নিজের অভিব্যক্তি জানানো ভালো।’ অনেকেই ফেসবুকে নিয়মিত নন, আবার এমনও আছেন, যাঁর ঘণ্টায় একবার ফেসবুকে ঢুঁ না মারলে চলেই না। দুই দিকেরই ভালো-মন্দ আছে। ব্যবহারকারীদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে একটা বিষয় পরিষ্কার হওয়া গেল, তা হলো, যাঁরা ফেসবুকে নিয়মিত বসেন না, তাঁরা অনেকেই বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি দেখা হওয়ার পর অভিমান দেখতে হয়। হয়তো বন্ধুটি বললেন, ‘তুই তো আমার একটা ছবিতেও লাইক দিস না।’
আবার যাঁরা নিয়মিত ফেসবুকে বসেন, তাঁরা কোনো বন্ধুর ছবিতে লাইক না দিলে বিষয়টা গুরুতর অন্যায় বলে ধরে নেওয়া হয়। অনেকে আবার নিজের ছবির লাইকের কথা ভেবেই অন্যদের ছবিতে দিনের পর দিন লাইক দিয়ে যান। কেউ কেউ আবার তালিকায় থাকা বন্ধুদের সক্রিয় করতে মাঝেমধ্যেই হুঁশিয়ারি স্ট্যাটাস দেন। আর বন্ধুতালিকা থেকে বাদ পড়ার ভয়েই অনেকে লাইক দিতে শুরু করেন। তবে তরুণদের এই লাইক-প্রবণতার আলোচনা শেষ করা যায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌসের কথা দিয়েই, তাঁর বক্তব্যটা এমন, ‘ফেসবুকে ছবিতে একটা লাইক পাওয়ার পর ছবি তোলার উৎসাহ যেমন বেড়ে যায়, ছবির বিষয়বস্তু সম্পর্কেও অনেকটা সচেতনতা কাজ করে। ভালো-মন্দ বিষয়ক একটা বিবেচনাবোধও তৈরি হয়। তাই অন্তর্জালের এই সামাজিক পরিবেশে অবিবেচকের মতো ছবি পেলেই যেমন লাইক দেওয়া ঠিক নয়, তেমনি কাউকে অপছন্দ করার কারণে একটা ভালো ছবিতে লাইক না দেওয়া মানে ছোট মনের পরিচয়। কাউকে খুশি করতে একটা লাইক তো দেওয়াই যায়।’