নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির ছেলে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকি হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জ। খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে গতকাল সকাল-সন্ধ্যা স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালন করেছে সেখানকার মানুষ।এ ঘটনায় তানভীরের বাবা হত্যা মামলা করেছেন। এজাহারে তিনি কারও নাম উল্লেখ করেননি। পুলিশ অপরাধীদের ধরতেও পারেনি।তদন্তের ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, অপরাধী শনাক্ত করার মতো কোনো সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। যেখানে লাশ ফেলা হয়েছে, সেখানকার যোগাযোগব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত চালানো হচ্ছে। পুলিশ সুপার বলেন, তানভীরের বাবা রফিউর রাব্বি আগে থেকেই বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে গণজাগরণ মঞ্চের একজন উদ্যোক্তাও তিনি। এসব বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত চলছে।তানভীর নিখোঁজ হয় গত বুধবার বিকেলে। শুক্রবার বেলা পৌনে ১১টায় শহরের চারারগোপ এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীসংলগ্ন খাল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মেধাবী কিশোর তানভীর ‘এ’ লেভেল পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। পুলিশ হত্যাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে না পারায় নারায়ণগঞ্জের মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেন, একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, শহরময় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।হরতাল: তানভীর খুনের প্রতিবাদে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের ডাকে কাল সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়েছে। হরতালে সমর্থন জানায় সিপিবি, বাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাপ, সাম্যবাদী দলসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ব্যবসায়ী মহল। সাংস্কৃতিক জোটের কর্মীরা ভোর থেকেই শহরের প্রধান সড়ক চাষাঢ়া থেকে নিতাইগঞ্জ পর্যন্ত রাস্তায় খণ্ড খণ্ড বিক্ষোভ মিছিল করেন। সর্বস্তরের মানুষ মিছিলে যোগ দেন। তাঁদের মুখে স্লোগান ছিল, ‘আমার ভাই মরল কেন—প্রশাসন জবাব চাই।’ ‘গডফাদারদের আস্তানা—জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও।’ ‘গডফাদারদের আস্তানা—নারায়ণগঞ্জে রাখব না।’ তবে বিকেএমইএর সভাপতি সেলিম ওসমান আয়োজিত সমাবেশে তাঁর অনুগত লোকজন ‘একটা-দুইটা জামায়াত ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর’ বলে স্লোগান দেন।হরতাল-সমর্থকেরা সকাল থেকে শহরের ১০ থেকে ১২টি স্থানে টায়ারে অগ্নিসংযোগ করেন। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেললাইনের চাষাঢ়া এলাকায় অবরোধ করায় ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এমনকি খাবারের দোকানও বন্ধ ছিল। কোনো যান চলেনি, রিকশাও না।হরতালের পর আজ রোববার বিকেল চারটায় চাষাঢ়ায় বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর আগে চাষাঢ়া গোলচত্বর, ২ নম্বর রেলগেট এলাকা ও মণ্ডলপাড়া এলাকায় আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য দেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।বিকেলে খেলাঘর জেলা শাখার সভাপতি রথীন চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে এক সমাবেশে বক্তব্য দেন সিপিবির জেলা সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, বাসদের নেতা মাহবুব ইসমাইল, ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন, জেলা উদীচীর সভাপতি জাহিদুল হক ভূঁইয়া, সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি ভবানী রায় প্রমুখ।চেম্বারের সভাপতির দেখে নেওয়ার হুমকি: তানভীর খুনের প্রতিবাদে বিকেলে চাষাঢ়ায় বিজয়স্তম্ভের সামনের রাস্তায় মঞ্চ বানিয়ে নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের ব্যানারে সমাবেশ করেন সেলিম ওসমান। সমাবেশে স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী নেতা উপস্থিত থাকলেও তাঁরা বক্তব্য দেননি। নারায়ণগঞ্জ চেম্বার ও বিকেএমইএর সভাপতি সেলিম ওসমান সমাবেশে বলেন, আজকের পর নারায়ণগঞ্জে আর কাউকে হরতাল করতে দেওয়া হবে না। যারা এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে, ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে নেমেছে, তাদের দেখে নেওয়া হবে। অপপ্রচারকারীদের আর সহ্য করা হবে না। তিনি প্রশাসনকে ২২ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে বলেন, এর মধ্যে তানভীর হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা না হলে আগামী ১ এপ্রিল ব্যবসায়ীরা পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।বিএনপির সমাবেশ: বিকেলে শহরের ডিআইটি বাণিজ্যিক এলাকায় দলীয় কার্যালয়ের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ করে বিএনপি। জেলা বিএনপির সভাপতি তৈমুর আলম খন্দকার বলেন, বিএনপির নেতা-কর্মীদের বাসায় হানা না দিয়ে পুলিশ তানভীরকে উদ্ধারে সময় দিলে তাকে হয়তো নৃশংসভাবে খুন হতে হতো না।