চাঁদাবাজি ও বাড়িতে অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ আদালতের বাইরে আপস-মীমাংসা করার সুযোগ আইনে থাকা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিচারক, আইনজীবী ও পুলিশ কর্মকর্তারা। গতকাল শনিবার ফৌজদারি কার্যবিধির সংশোধনী নিয়ে এক কর্মশালায় দলভিত্তিক আলোচনায় তাঁরা এই অভিমত ব্যক্ত করেন।কর্মশালায় একজন বিচারক বলেন, চাঁদাবাজির মামলায় সমঝোতার সুযোগ থাকলে চাঁদাবাজেরা চাঁদাবাজিও করবে, আবার সমঝোতাও করবে। পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, ফৌজদারি মামলা তদন্তের জন্য ১৫০ দিন সময় বেঁধে দিলে তদন্তকারী কর্মকর্তা তাঁর দায় এড়াতে যেনতেন করে তদন্ত শেষ করবেন। কোনো তদন্তই সুষ্ঠু হবে না।১৮৯৮ সালে প্রণীত ফৌজদারি কার্যবিধির মৌলিক সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ-সংক্রান্ত বিলের খসড়ার ব্যাপারে মতামত নিতে গতকাল শনিবার রাজধানীর রূপসী বাংলা হোটেলে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ কর্মশালার আয়োজন করে। কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ শহিদুল হক। এতে আইন প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা, বিচারক, আইনজীবী, চিকিৎসক, বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি ও পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।কর্মশালায় আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, ‘যে কারণে বিচারে বিলম্ব হচ্ছে, তা পরিবর্তনের জন্য ফৌজদারি কার্যবিধিতে সংশোধনী আনা হচ্ছে। সামান্য বিষয় নিয়ে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যেসব মামলা হয়, তা নথিভুক্ত না করে বাদী-বিবাদীকে ডেকে এনে পুলিশই পারে তাদের মীমাংসা করে দিতে। অনেক দেশে প্রাক্-বিচার বৈঠক (প্রি-ট্রায়াল কনফারেন্স) করে বিচারক উভয় পক্ষের আইনজীবীকে ডেকে একটা দিনপঞ্জি করে দেন, যাতে কবে মামলার সাক্ষী আসবে, শুনানি কবে হবে—এসব বিষয় নিশ্চিত করেন। যদি আমাদের দেশেও এ বিধান চালু করা হয়, তাহলে মামলা মুলতবি করার দরকার হবে না।’আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায়ও মীমাংসার বিধান রাখা হচ্ছে। দেখা গেছে, যৌতুক ও নারী নির্যাতনের ৯০ শতাংশ মামলাই মিথ্যা। মিথ্যা অভিযোগে দায়ের করা মামলা বন্ধ না হলে আইন সংশোধন করে কোনো লাভ হবে না। ইউএনডিপির এদেশীয় পরিচালক পলিন ট্যামেসিস বলেন, মাত্র ৬০ শতাংশ মামলা দায়েরের পর পাঁচ বছরের মধ্যে নিষ্পত্তি হচ্ছে। বাকি মামলা নিষ্পত্তি হতে ১০ বছরের বেশি সময় লাগছে।আইনসচিব এ এস এস এম জহিরুল হক বলেন, মামলা যত নিষ্পত্তি হচ্ছে তার তিন গুণ বাড়ছে। এভাবে দিনে দিনে মামলার পাহাড় জমছে। এ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ভারপ্রাপ্ত আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক বলেন, আইন সংস্কার নিয়ে কোনো কমিটি করা হলে সেখানে যেন পুলিশ সদস্যদের রাখা হয়। কারণ, পুলিশই এসব আইন প্রয়োগ করেন। তিনি এ নিয়ে মতামত দেওয়ার জন্য ১৫ দিন সময় চান।কর্মশালার প্রথম পর্বের এ আলোচনায় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও বক্তব্য দেন।প্রথম পর্বের আলোচনার পর শুরু হয় দলভিত্তিক আলোচনা ও মতামত প্রদান। এতে মহানগর দায়রা জজ জহুরুল হক বলেন, মামলার দীর্ঘসূত্রতার প্রধান কারণ সময় বাড়ানোর আবেদন। এটা বন্ধ করা হলে কম সময়ে মামলা শেষ হবে। মিথ্যা অভিযোগে দায়ের করা মামলার ব্যাপারে তিনি বলেন, রায়েই মধ্যেই যেন বিচারক মিথ্যা মামলা দায়েরকারীর সাজা দিতে পারেন, তার বিধান থাকা উচিত।মুখ্য মহানগর হাকিম বিকাশ কুমার সাহা বলেন, বর্তমান আইনে তল্লাশি পরোয়ারা জারির ক্ষমতা আছে বিচারিক হাকিমের। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের এ ক্ষমতা থাকা উচিত। তিনি বলেন, ডাকাতির মামলার তদন্তের সময় বেঁধে দিলে তদন্তকারী কর্মকর্তা যেনতেন করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন। তিনি বলেন, আইনে সমঝোতার বিধান থাকতে পারে, তবে সেটা যেন পুলিশ প্রতিবেদন দেওয়ার পর করা হয়। তাহলে অপরাধীও ভয়ে থাকবে। মহানগর হাকিম এম এ সালাম বলেন, থানায় দায়ের করা মামলার সমঝোতা কোনোভাবেই পুলিশ প্রতিবেদন পাওয়ার আগে করতে দেওয়া উচিত নয়। পুলিশের উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) আনিসুর রহমান বলেন, সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হলে পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে খসড়ায়। এটা সংশোধন করা উচিত। আইনজীবী মোশাররফ হোসেন বলেন, সমঝোতার ক্ষেত্রে এমন বিধান থাকা উচিত যে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি যেন আর্থিক ক্ষতিপূরণ পায়। তাহলে এটা কার্যকর হবে। কুমিল্লা বারের আইনজীবী কাজী নাজমুস সাত্তার বলেন, মামলা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত না হলে বা মিথ্যা অভিযোগে মামলা দায়ের করা হলে শুধু পুলিশই নয়, প্রসিকিউটর, চিকিৎসক, আইনজীবী—সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান থাকা উচিত। তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কিছু ধারায় আপস করার বিধান থাকা উচিত। দেখা যায়, মেয়ে প্রেম করে ঘর ছেড়েছে কিন্তু অপহরণের মামলা হয়েছে। ঢাকা বারের আইনজীবী আবু আহমেদ জোয়ার্দার বলেন, খসড়ায় বলা হয়েছে, কাউকে গ্রেপ্তার করার পর তার পছন্দের লোককে গ্রেপ্তারের খবর জানাতে হবে। এভাবে বিধান করা হলে জটিলতা দেখা দেবে। দেখা যাবে, ডাকাত তার সহযোগীকে জানিয়ে দিচ্ছে। তাহলে আর কোনো আসামি ধরা যাবে না।কর্মশালায় সিদ্ধান্ত হয়, ১৫ দিন পর এ খসড়া চূড়ান্ত করতে আবার বৈঠক হবে। ওই সময় সবাই লিখিতভাবে তাঁদের মতামত জানাবেন।