শিকড়ের সন্ধানে শিল্পযাত্রা

বাংলাদেশের চিত্রকলায় পরম্পরা কখনোই কেবল অতীতের পুনরাবৃত্তি নয়; বরং স্মৃতি, স্থান ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বর্তমানকে নতুন করে দেখার এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। রাজধানীর ধানমন্ডিতে গ্যালারি চিত্রকে চলমান ‘পরম্পরার খোঁজে বরেন্দ্র ভ্রমণ’ শীর্ষক প্রদর্শনী সেই প্রক্রিয়ারই এক আন্তরিক ও অর্থবহ অন্বেষণ। এখানে বরেন্দ্রভূমি কোনো নিছক ভৌগোলিক পরিসর নয়—এটি স্মৃতির ভূমি, শিকড়ের ভূমি এবং প্রথিতযশা শিল্পী রফিকুন নবীর আদিতম পাঠশালা।

১ / ৬
‘দেয়ালে লেখা কবিতা’, শিল্পী রেজাউন নবী
লেখকের সৌজন্যে

রফিকুন নবীর শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত চাঁপাইনবাবগঞ্জ—ঢোড়বোনা, ছত্রাজিতপুর, গোবরাতলা—এই জনপদগুলো ঘিরেই গড়ে উঠেছে প্রদর্শনীর মূল যাত্রাপথ। প্রদর্শনীর ছবিগুলো তৈরি হয়েছে ভ্রমণকে অনুষঙ্গ করে। দেশবরেণ্য শিল্পী রফিকুন নবী তাঁর স্নেহধন্য কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে গোবরাতলাকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি নিজের শৈশবের মাটি, নদী, হাট, আমবাগান, সাঁওতালপল্লি ও মহানন্দা–পদ্মার তীরভূমিতে ঘুরে এসেছেন। এই ভ্রমণ কেবল একটি শিক্ষাসফর ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল স্মৃতিচারণা, বর্ণনা ও দর্শনের এক যৌথ অভিজ্ঞতা। শৈশবের নদী, ট্রেনযাত্রার প্ল্যাটফর্ম, নৌকা, গ্রামজীবনের অবয়ব কিংবা সাঁওতাল সমাজের নিত্যদিন—সবকিছুই নতুন করে ধরা দেয় শিল্প ও জীবনের সংলাপে।

২ / ৬
‘বরেন্দ্র–১’, শিল্পী রফিকুন নবী
লেখকের সৌজন্যে

কারও ছবিতে বরেন্দ্রর লাল মাটি, কারও কাজে সাঁওতালজীবনের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত, কোথাও নৌকা বা নদীর নীরব গতি, কোথাও আবার রেলস্টেশন বা আমবাগানের স্মৃতিময় বিস্তার। গুরু–শিষ্যের এই সহযাত্রায় স্মৃতি এখানে একক নয়; বরং বহুমাত্রিক ও বহুস্বরিক। ‘পরম্পরার খোঁজে বরেন্দ্র ভ্রমণ’ তাই কেবল একটি দলগত চিত্র প্রদর্শনী নয়—এটি শিকড়ের সন্ধানে ফিরে যাওয়ার এক সৃজনশীল প্রয়াস, যেখানে ইতিহাস, ব্যক্তিগত স্মৃতি ও সমকালীন শিল্পচর্চা মিলেমিশে নতুন অর্থ নির্মাণ করে।

৩ / ৬
‘বরেন্দ্র’, শিল্পী মনিরুজ্জামান
লেখকের সৌজন্যে

বরেন্দ্রর ভূপ্রকৃতি ও জনজীবনের সৌন্দর্য যেন অভিন্ন বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। এ দেশের ভূপ্রকৃতি অঙ্কনে পারদর্শী শিল্পী আহমেদ শামসুদ্দোহা নদী, নৌকা, ধু-ধু মাঠে গরু ও রাখালের দৃশ্য-সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন বাস্তবতার আনুষঙ্গে। শিল্পী মনিরুজ্জামানের মহিষ চরানোর দৃশ্যে ফুটে উঠেছে বরেন্দ্রর কৃষিকাব্যগাথা।

৪ / ৬
‘আম ব্যবসায়ী’, শিল্পী নিসার হোসেন
লেখকের সৌজন্যে

শিল্পী শেখ আফজালের আঁকা মহানন্দা নদীর তীরে হেঁটে চলা শিল্পীদের একজনের হাতে ছাগল বাঁধা রশি এবং অনেকটা কার্টুনধর্মী ভঙ্গিতে সহযাত্রীদের অবয়ব ভ্রমণবৃত্তান্তের গল্পগাথা তৈরি করেছে। ‘আম ব্যবসায়ী’ শিরোনামের শিল্পী নিসার হোসেনের কাজটিও রফিকুন নবীর জমিয়ে গল্প বলার আসরের স্মৃতিকে পুনর্ব্যক্ত করে।

৫ / ৬
’মহানন্দা নদী’, শিল্পী শেখ আফজাল
লেখকের সৌজন্যে

শুধু ভূপ্রকৃতি বা গল্প–আড্ডার দলিল নয়, সাঁওতালদের চিত্রকলা ও সংস্কৃতির বয়ান উঠে এসেছে শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য্যের চিত্রে। ললিত রেখায় বরেন্দ্রর মাটির ঘরের দেয়ালজুড়ে আলপনা আর ঝুলিয়ে রাখা ধানের শিষ আমাদের ঐতিহ্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। শামসুল আলম ইন্নানের সাঁওতালপল্লির চিত্রে মাটির দেয়াল ঘেঁষে শিশুদের সমকালীন শৈশব উদ্যাপন ধরা পড়ে। ভ্রমণের টুকরা টুকরা গল্প ভাবনার গভীরে দোলা দেয় শিল্পী রেজাউন নবীর জলরঙে।

৬ / ৬
‘শিরোনামহীন’, শিল্পী আহমেদ শামসুদ্দোহা
লেখকের সৌজন্যে

প্রদর্শনীতে শিল্পী রফিকুন নবীর একাধিক চিত্রকর্ম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যেখানে বরেন্দ্রর স্মৃতি এবং তাঁর চিত্রভাষার বিষয়বস্তুর মূল উপাদানগুলোর সূত্র পাওয়া যায়। স্পষ্ট বোঝা যায়, বরেন্দ্র ও শৈশবের স্মৃতি তাঁর কাজে এখনো বহমান। অর্থাৎ শিল্পী রফিকুন নবীর চিত্রসূত্রের ‘ডিএনএ’ নিহিত রয়েছে বরেন্দ্রভূমিতেই। প্রদর্শনীটি ৩০ জানুয়ারি শুরু হয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে।