দুই বিশ্বযুদ্ধের বিরতিতে ১৯৩২ সালে মুর্তজা বশীরের জন্ম রমনা এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে তিনি দেখেছিলেন ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ। লিখেছেন, ‘একদিকে অনাহারী মানুষের ভিড়, অন্যদিকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন ট্রাকে করে আমেরিকার নিগ্রো, সাদা সৈনিকদের উল্লাস ঢাকার রাজপথে।’ দেশভাগের আগে বিকশিত হতে থাকা ঢাকা শহরে বিচরণ করেছেন তিনি। ঢাকা শহরের অলিগলি থেকে মাঠে-প্রান্তরে পাশে তিনি দেখেছেন ঐক্য। মানুষের সঙ্গে পরিবেশের—জীবনের সঙ্গে যাপনের উপাদান পাঠ করে আর বিদ্যা ও অনুভূতি থেকে তৈরি হয়েছে তাঁর উপলব্ধি। এটা এমন এক কাল, যখন এই এলাকায় তৈরি হচ্ছে আধুনিকতার ধারণার পরিসর।
ব্রিটিশ শাসনের মাঝামাঝি সময়ে পশ্চিমা আধুনিকতার ছাপ রাখা শুরু হয়েছিল এই উপমহাদেশে। পশ্চিমা আধুনিকতার পথ ধরে শুরু হয় বৈশ্বিক আধুনিকতা। একসময় যা এই অঞ্চলে রূপ নেয় স্থানীয় আধুনিকতায়। ক্রমেই এই ধারণা অপর সব আধুনিকতা থেকে আলাদা হতে থাকে। ব্রিটিশ শাসন শেষে শুরু হয় অবিভক্ত পাকিস্তান পর্ব। শুরু হলো স্থানীয় আধুনিকতার আরেকটি পর্যায়।
এই পর্বে পূর্ব বাংলার ওই সময়ের শিল্পীরা শিল্প ঐতিহ্যের অনুসারী হয়ে বলতে শুরু করলেন নিজ ভাষায় নিজেদের কথা। স্থানীয় আধুনিকতার ধারণা বেজে উঠতে শুরু করে আপন সুরে। মুর্তজা বশীরের সৃজন জগতে অবদান স্থানীয় আধুনিকতার ধারণাই বিস্তার। তাঁর জীবন—তাঁর যাপন—তাঁর অর্জন থেকে সৃষ্টি করেছেন স্থানীয় সময়—স্থানীয় ইতিহাস—স্থানীয় ঐতিহ্য—চিরকালের বিশ্বাস নিয়ে।
মুর্তজা বশীর ঢাকা পর্বে শিল্পী শিক্ষার্থী হিসেবে ১৯৫৪ সালে আঁকলেন ‘উত্সর্গ’। খাওয়ার উদ্দেশ্যে জবাই করে ছুরিসহ মাটিতে ফেলে রাখা দুই মৃত মুরগি এই চিত্রকর্মের প্রতিপাদ্য। মানুষের নিত্যজীবনে থাকা এমন দৃশ্য ধরা দিল চিত্রকর্মটির শিরোনামের মাধ্যমে। ‘উত্সর্গ’ মুখোমুখি করল এক পরম বাস্তাবতার দিকে। মানবজীবনের এমন ঘটনা আঁকার ফলে বদলে গেল দৃশ্য দেখার অভিজ্ঞতা—দৃশ্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতাও। চিত্রকর্মটির শিরোনাম সুযোগ করে দিল—স্বাভাবিক চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে আরেক উপলব্ধিতে সমর্পিত হতে।
বিদ্যা অর্জনের পরিসরে গড়ে উঠেছে তার শৈশব। এর সঙ্গে যে জীবন তিনি দেখেছেন, জীবন থেকে যা শিখেছেন, প্রাত্যহিক জীবন তাঁকে যা জানিয়েছে—এসবই তাঁর সৃজনজগতের ভিত। সবার মতোই যাপিত জীবন থেকে শেখা স্বভাব-নিয়মে মুর্তজা বশীরের কাছে উন্মোচিত হয়েছে এক ভবিষ্যৎবাদী অনন্ত দিগন্ত।
পিতা বহুভাষাবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও মাতা মরগুবা খাতুনের কনিষ্ঠ সন্তান মুর্তজা বশীরের কাছে সময় মানে নতুন কিছুর জন্ম দেওয়া—একজন অগ্রসর মানুষ হিসেবে সবকিছু নতুন করে গড়া। তবে গত শতকের আশির দশকে জাপান ভ্রমণে তাকে ফিরতে হলে পেছনের দিকে—এই বঙ্গের ইতিহাসের কাছে। ইতিহাস-সংস্কৃতি-জীবন আর খোঁজ করলেন পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া দৃষ্টান্ত। এর মধ্য দিয়ে তাঁকে আমরা আরেকভাবে পেলাম। তবে এর আগের মুর্তজা বশীরের বিভিন্ন পর্বের সঙ্গে এই পর্বের পার্থক্য স্বাভাবিক কিন্তু ভিন্ন নয়। বরং স্থানীয় আধুনিকতার পাটাতনে আপন পরিচয়ে সবার কাছে পরিচিত হওয়াই মুর্তজা বশীরের সৃজনযাত্রার মূল শক্তি।
এই শক্তির সঙ্গে জুড়ে গেল মুর্তজা বশীরের পারিবারিক আর অপরাপর নানা দুনিয়ার অবদানের আবহ—হলেন অনুপ্রাণিত। বিংশ শতকের শুরু থেকে সাম্যবাদ—সমাজতন্ত্র—কমিউনিজম—বিপ্লব এক নতুন স্বপ্নের ঢেউকে থামিয়ে দেননি—বিলীন করে দিতে চাননি তিনি। চাইলেন সাম্যবাদের ঢেউয়ে ভেসে ভেসে আপন শক্তিতে শাণিত হতে। এক নতুন সময় সৃষ্টি করার আহ্বান জানালেন সবাইকে। মুক্তি পাওয়ার স্বপ্নের জমিন যে তৈরি করতে হবে তাঁর—এটাই যে নিয়তি। কীভাবে এসব জানলেন তিনি?
ছবি আঁকাকে তিনি মেনে নিয়েছিলেন ‘বিপ্লবের হাতিয়ার’ হিসেবে। তাঁর অটোগ্রাফের খাতায় কমিউনিস্ট নেতা ভবানী সেন লিখলেন, ‘আর্টিস্টের কাজ হলো শোষিত জনগণের ভাব ও দুঃখ-দুর্দশাকে চিত্রের ভেতর দিয়ে এমনভাবে ফুটিয়ে তোলা, যাতে সমাজে সে আর্ট নব জীবন সৃষ্টি করতে পারে।’ এরপর থেকেই বদলে যাওয়া শুরু করল মুর্তজা বশীরের জীবন। সময়-ব্যক্তি মানুষ-সমাজ-রাষ্ট্র পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকায় আর্ট কলেজে।
তিনি শিখেছেন তাঁর রাজনৈতিক দীক্ষা থেকে যে সাধারণ মানুষের জীবনই তাঁর কাছে অমূল্য। ঢাকা পর্বে ১৯৫৪ সালে সেতার হাতে চিত্রশিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী কিংবা ফ্লোরেন্স পর্বের শেষ পর্যায়ে ১৯৫৮ সালে আঁকা ‘একর্ডিয়ান নিয়ে মানুষ’— এটা সেই সাধারণ মানুষের সাধারণ জীবনকে মূর্ত করারই ধারাবাহিকতা। ঢাকা থেকে ফ্লোরেন্স—সাধারণ মানুষদের নতুন করে বাঁচিয়ে রাখলেন মুর্তজা বশীর।
শিল্পী হতে চাওয়া বা না চাওয়া মুর্তজা বশীর ফ্লোরেন্স পর্ব শেষে প্রকাশিত হওয়ার অধিকারকে করলেন প্রতিষ্ঠিত। কীভাবে এটি তিনি সম্ভব করলেন? ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীরা যেভাবে দেখেছেন সময়ের মুহূর্ত—আলোর মুহূর্ত—দৃশ্যের মুহূর্ত। এর বিপরীতে মুর্তজা বশীর গত শতকের পঞ্চাশ-ষাটের দশকে দেখতে শুরু করলেন জীবনের মুহূর্ত।
কবিতায়-কল্পনায়-দৃশ্যে—চিত্রপটের পরতের পর পরতে দৃশ্য ও অনুভূতিকে দেখার দৃশ্যায়ন করলেন তিনি। ঢাকা-করাচি এই পর্বের প্রকৃত উদাহরণ ‘দুই প্রেমিকার জন্য সংগীত’। তরুণ শিল্পী মুর্তজা বশীর একর্ডিয়ান হাতে নিজেকে আঁকলেন এই চিত্রপটে। নৈতিকতার নিক্তি নয়—প্রেমের প্রাচুর্যেই যে জীবনের নিয়তি—এটাই এই সৃষ্টির হয়তো সারকথা। সুরে আর নীল রং নানা রূপে জীবনকে খুঁজে পাওয়ার আর্তিই এই চিত্রকর্মের প্রাণ।
মুর্তজা বশীর এই পর্বেও থিতু না হয়েও ফিরলেন জীবনের কাছে আরেকভাবে। দৃশ্য দেখতে যেমন সুন্দর, তেমন নয়— একজন ‘আধুনিক’ মানুষের ব্যক্তির চেপে রাখা তীব্র অনুভূতিকে প্রকাশ করতে তিনি অনেক বেশি অটল। চেনা-অচেনা তরুণীর মুখের সঙ্গে আঁকলেন পাখি ১৯৬১ সালে। একই বছর আঁকলেন ‘রমণী ও তক্ষক’। জ্যামিতিক সম্পর্ক, জ্যামিতির উপাদানে তক্ষক হাতে নারী চরিত্রের ভিন্ন রূপ উপস্থাপিত হলো এই চিত্রপটে। এই পর্বে মুর্তজা বশীর চিহ্ন বা প্রতীক এঁকে জীবন সম্পর্কে ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানকে প্রকাশ করলেন স্পষ্টভাবে।
এর পরের পর্বে সোনালি-রুপালি রঙের জ্যামিতিক বন্ধন—শিল্পী অনেক বেশি আনুষ্ঠানিক—নিয়মনিষ্ঠ। তবে সময় যে এক জায়গায় একই রূপে একইভাবে থাকে না—এ কথায় আস্থা ছিল মুর্তজা বশীরের। সময়ের সঙ্গে সময়ের প্রয়োজনে আবার জীবন দেখলেন—দেয়ালের সামনে দাঁড়ালেন। যেখানে ছিলেন তিনি—চারপাশে দেয়াল আর দেয়াল। এই দেয়াল তাঁর কাছে যেমন বাহ্যিক রূপের বিষয়, একই সঙ্গে জীবনকে প্রশ্ন করার উপায়।
নিরাসক্ত দেয়াল শিল্পীর সঙ্গে কথা বলে—একা মানুষের সঙ্গে সংলাপ তৈরি করে। প্রশ্ন করে—হয়তো চরম সত্য জানিয়ে দেয়। এক ভঙ্গুর, ক্ষয়ে যাওয়া, ক্ষত তৈরি হওয়া সময়ের কথা বলে—হয়তো জীবনও তেমনই। শিল্পীর ‘দেয়াল’ পর্ব থেকে ‘বিমূর্ত বাস্তবতা’র সূত্রপাত। যদিও ‘বিমূর্ত বাস্তবতা’ শব্দবন্ধটি অনেক পরে শনাক্ত করেছেন শিল্পী। যদিও দেয়াল এমন এক ধারণা—এমন এক বিভ্রম, যা জীবনের সুপ্ত অনুভূতিকে প্রশ্ন করে—জাগিয়ে তোলে।
দেয়াল পর্বের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশের জন্ম নেওয়ার সংগ্রামে জড়িয়ে গেলেন প্রবলভাবে। জীবনকে ভালোবাসেন বলে চলে গেলেন প্যারিসে। নুড়ি পাথরে দেখলেন মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দেওয়া মানুষের আত্মত্যাগের মহিমা। প্রাণহীন পাথরে সঞ্চার হলো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। নাম জানা না–জানা মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে আঁকলেন ‘শহীদ শিরোনাম’। প্রতীক বা চিহ্ন যে সবার—সবার সঙ্গে সংলাপ করতে পারে—যোগাযোগ তৈরি করতে পারে—‘শহীদ শিরোনাম’ এমন ধারণার অমর নির্দশন। সময় থেকে এগিয়ে থাকতে শিল্পী মুর্তজা বশীরের এ যেন সীমাহীন যাত্রা।
শিল্পী মুর্তজা বশীরের বন্ধু শিল্পী আমিনুল ইসলাম লিখেছেন,...ষাটের দশক ছিল একধরনের শিল্পেরই স্বাধীনতার আন্দোলন, তার সহযাত্রী ছিল দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা চেতনারও সূচনা পর্ব। মুর্তজা বশীর এই শিল্পের স্বাধীনতার আন্দোলনের অন্যতম প্রতিভূ। একই সঙ্গে তিনি উদ্যাপন করেছেন শিল্পের স্বাধীনতা আর রাজনৈতিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতি দায়বদ্ধতা।
পাথরে রাখলেন এই স্বাধীনতার অঙ্গীকার। স্থানীয় আধুনিকতার অবদানকে বৈশ্বিক আধুনিকতার ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করলেন মুর্তজা বশীর। সময়কে অবিনশ্বর করলেন তাঁর সৃষ্টিতে—জীবন পেল ভবিষ্যতের পথে যাওয়া উপায়। অতীত পেল আগামীর প্রেরণা। শিল্পের অবদান সবার—সব সময়ের—এভাবেই মুর্তজা বশীরের লিখলেন শিল্পের ইতিহাস।