স্ক্রিনসভ্যতায় শিল্পবাজারের রূপান্তর

ভার্চুয়াল মাধ্যম ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম রিলস, ইউটিউব কিংবা ডিজিটাল আর্কাইভ আজ আমাদের চোখের সামনে খুলে দিয়েছে এক বৈশ্বিক শিল্পভূমি। এখন আর শিল্প দেখা পুথি, দুর্লভ ক্যাটালগ কিংবা নির্দিষ্ট গ্যালারির দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়। মুহূর্তের মধ্যেই জানা যায় পৃথিবীর কোন প্রান্তে কোন শিল্পী কী কাজ করছেন, কোন মাধ্যম নিয়ে পরীক্ষা চলছে; কিংবা কোন ভাবনার পুনরাবৃত্তি বা সংকর আমাদের মনস্তত্ত্বে নীরবে প্রভাব ফেলছে। এই দেখতে পাওয়র মধ্য দিয়েই ঘটছে বিনিময়, শিক্ষা এবং দ্রুত বিস্তার—যা সমকালীন শিল্পচর্চার এক অনিবার্য বাস্তবতা।

‘পাখি’, শিল্পী আবদুস শাকুর শাহ্
লেখকের সৌজন্যে

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ভার্চুয়াল বিস্তার আরও তাৎপর্যপূর্ণ। করোনাকালে চিত্রকলা গ্যালারি নামের অনলাইন উদ্যোগ আমাদের শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে কার্যত অতিক্রম করার পথ দেখিয়েছিল। প্রদর্শনী যে কেবল ইট-পাথরের স্থাপত্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দর্শক ও শিল্পীর মধ্যকার সংযোগই এর মূল—সে বোধ সে সময় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে শিল্পীরা তাঁদের ব্যক্তিগত ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম আইডিতেই নিয়মিত কাজ শেয়ার করছেন; শিল্পরসিকেরা আনন্দের সঙ্গে তা অনুসরণ করছেন, সংগ্রহের খবর রাখছেন, এমনকি সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে শিল্পকর্ম সংগ্রহও করছেন। এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে শিল্পের এক নতুন বাজারব্যবস্থা। সাধ আছে, সাধ্য নেই—এই চিরচেনা দ্বন্দ্বকে আংশিক হলেও লাঘব করতে অনলাইন ক্যাটালগ, ডিজিটাল প্রদর্শনী ও সরাসরি বিক্রির উদ্যোগ শিল্পকে পৌঁছে দিচ্ছে আরও বিস্তৃত পরিসরে। পছন্দের ছবি খুঁজে নেওয়া, তুলনা করা, বাজেট অনুযায়ী সংগ্রহ, সবই এখন অনেক সহজ ও গণমুখী।

‘পাখির সাথে নারী’, শিল্পী চন্দ্রশেখর দে
লেখকের সৌজন্যে

এই পটভূমিতে গ্যালারি কায়ার অনলাইনে চলমান উৎসবে ‘সাশ্রয়ী মূল্যে শিল্পকর্ম’ শীর্ষক প্রদর্শনীটিকে স্ক্রিনসভ্যতার সুফল বলা যেতে পারে। প্রদর্শনীতে উভয় বাংলার খ্যাতিমান ৭৯ শিল্পীর বিভিন্ন মাধ্যমের ৩৫৫টি শিল্পকর্ম দেখা ও সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। এই ডিসকাউন্ট প্রদর্শনী একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। এখানে প্রদর্শনী আর কেবল নান্দনিক উপভোগের ক্ষেত্র নয়; বরং শিল্পরসিকদের জন্য একটি বাস্তব অফার—যেখানে সংগ্রহের আকাঙ্ক্ষা ও সামর্থ্যের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ তৈরি হয়। এটি এক অর্থে শিল্পকে বিলাসী দূরত্ব থেকে নামিয়ে এনে দৈনন্দিন জীবনের কাছাকাছি নিয়ে আসার প্রচেষ্টা।

‘শিরোনামহীন’, শিল্পী আবদুল্লাহ আল বশির
লেখকের সৌজন্যে

নিশ্চয়ই প্রশ্ন থাকে—ডিসকাউন্ট কি শিল্পের মূল্য কমিয়ে দেয়? নাকি এটি দর্শক ও সংগ্রাহকের পরিসর বাড়িয়ে শিল্পের সামাজিক বিস্তার ঘটায়? সমকালীন বাস্তবতায় বলা যায়, ভার্চুয়াল প্রদর্শনী ও মূল্যছাড়ি শিল্পের নান্দনিক মানকে নির্ধারণ করে না; বরং এটি শিল্পের প্রবেশাধিকারকে সম্প্রসারিত করে। শিল্প তখন আর কেবল নির্বাচিত গণ্ডির সম্পত্তি নয়; বরং আগ্রহী বহু মানুষের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।

‘পাখির সাথে নারী’, শিল্পী চন্দ্রশেখর দে
লেখকের সৌজন্যে

গ্যালারি কায়ার এই অনলাইন প্রদর্শনী সেই যুগহাওয়ার সঙ্গেই চলেছে—যেখানে প্রযুক্তি, বাজার ও শিল্পচেতনা একে অপরের সঙ্গে কথোপকথনে লিপ্ত। এটি আমাদের সময়ের শিল্পবাস্তবতার একটি দলিল, যেখানে দেখার অভিজ্ঞতা, সংগ্রহের সুযোগ এবং শিল্পের সামাজিক উপস্থিতি একই সঙ্গে নতুন ভাষা খুঁজে নিচ্ছে।

‘পাখি’, শিল্পী কাজী রকীব
লেখকের সৌজন্যে

প্রদর্শনীতে শিল্পী কে জি সুব্রামনিয়াম, মকবুল ফিদা হুসেন, যোগেন চৌধুরী, লালুপ্রসাদ সাউ, সুনীল দাস, সমরজিৎ রায়চৌধুরী, রফিকুন নবী, হামিদুজ্জামান খান, আবদুস শাকুর শাহ্, চন্দ্রশেখর দে, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, আহমেদ শামসুদ্দোহা, জামাল আহমেদের মতো শিল্পীদের কাজ ছাড়াও এ সময়ের প্রতিভাবান তরুণ শিল্পীদের কাজ রয়েছে। ভার্চুয়াল মাধ্যমের এই প্রদর্শনী ১০ জানুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে।