প্লেটোর শিল্পতত্ত্বে শিল্পকর্মকে বলা হয়েছে ‘নকলের নকল’। প্রকৃতির যে বাস্তব জগৎ আমরা দেখি, শিল্পী প্রথমে সেটি নিজের চেতনা ও অভিজ্ঞতার ভেতর ধারণ করেন; তারপর সেই ধারণাকে রং, রেখা, আকার কিংবা ভাস্কর্যের ভাষায় পুনর্নির্মাণ করেন। ফলে শিল্প হয়ে ওঠে বাস্তবতার সরল প্রতিলিপি নয়; বরং শিল্পীর মনোজাগতিক রূপান্তরের ফল। এই রূপান্তরের মধ্যেই নিহিত থাকে শিল্পের সৃজনশীলতা ও সৌন্দর্য।
বাংলাদেশের সমসাময়িক শিল্পচর্চায় আজ একদিকে রয়েছে বাস্তবানুগ বা ফটোগ্রাফিক দক্ষতার প্রতি প্রবল আকর্ষণ, অন্যদিকে রয়েছে প্রকৃতি ও বাস্তবতাকে আত্মস্থ করে সেটিকে নতুন নন্দনভাষায় রূপ দেওয়ার প্রবণতা। রাজধানীর গ্যালারি কায়ার ২২তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ দলগত প্রদর্শনীটি দ্বিতীয় প্রবণতার এক বিস্তৃত ও তাৎপর্যপূর্ণ মানচিত্র হাজির করেছে।
প্রদর্শনীতে ৪৫ জন আধুনিক ও সমসাময়িক শিল্পীর ৭৩টি নির্বাচিত শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। ১৯৫৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় সাত দশকের শিল্পযাত্রাকে একত্র করেছে এই আয়োজন।
তেলরং, অ্যাক্রিলিক, জলরং, চারকোল, মিশ্রমাধ্যম, এচিং, ইন্টাগ্লিও, লিনোকাট, লিথোগ্রাফ, সেরিগ্রাফ, উডকাট, উড এনগ্রেভিং থেকে শুরু করে দেশীয় রঞ্জকে নির্মিত শিল্পকর্ম ও ভাস্কর্য—বিভিন্ন মাধ্যমের এই সমাবেশ প্রদর্শনীকে দিয়েছে এক অনন্য বহুস্বরিকতা। এটি কেবল শিল্পকর্মের প্রদর্শন নয়; বরং বাংলাদেশের শিল্প-ঐতিহ্য, স্মৃতি ও সমকালীন সৃজনধারার এক প্রাণবন্ত সংলাপ।
গ্যালারি কায়া দীর্ঘদিন ধরেই প্রবীণ ও তরুণ, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ—দুই বাংলার শিল্পীদের মধ্যে এক সৃজনশীল সেতুবন্ধ তৈরি করে আসছে। এবারের প্রদর্শনীতেও সেই ধারাবাহিকতা স্পষ্ট।
এখানে যেমন আছেন রামকিঙ্কর বেইজ, মকবুল ফিদা হুসেন, কে জি সুব্রহ্মণ্যন ও যোগেন চৌধুরীর মতো ভারতীয় শিল্প-ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নাম; তেমনি আছেন মনিরুল ইসলাম, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, হাশেম খান, রফিকুন নবী, হামিদুজ্জামান খান এবং বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের শিল্পীরাও।
প্রদর্শনীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অধিকাংশ শিল্পী বাস্তবতার সরাসরি অনুকরণে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং তাকে নিজস্ব ভাষা, অভিজ্ঞতা ও কল্পনার ভেতর দিয়ে পুনর্নির্মাণ করেছেন। ফলে শিল্পকর্মগুলোতে যেমন বয়ান সৃষ্টির ক্ষমতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে শৈলীগত স্বাতন্ত্র্য ও সৃষ্টির অন্তর্গত আনন্দ।
বাস্তবতার প্রত্যক্ষ রূপায়ণের ক্ষেত্রে আহমেদ শামসুদ্দোহার ‘সরিষাক্ষেত’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিস্তীর্ণ হলুদখেত, কৃষকের ঘর এবং দিগন্তজোড়া মেঘমালা নিয়ে নির্মিত এ চিত্রকর্ম বাংলার কৃষিজীবনের এক মনোরম দৃশ্য হাজির করে। তবে এর শক্তি কেবল দৃশ্যবর্ণনায় নয়; হলুদ জমিন ও শুভ্র আকাশের সূক্ষ্ম রং-সম্পর্ক ছবিটিকে নান্দনিক ভারসাম্যের এক উচ্চতর স্তরে উন্নীত করেছে।
তরুণ শিল্পীদের মধ্যেও প্রকৃতি ও ভূদৃশ্য নতুন সংবেদন নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। সোহাগ পারভেজের ‘টেকনাফ হ্রদ’, শাহানুর মামুনের ‘পুরান ঢাকা’ এবং সহিদ কাজীর ‘সূর্যমুখী’—প্রতিটি কাজেই দেখা যায় স্থান, স্মৃতি ও প্রকৃতিকে ব্যক্তিগত অনুভূতির মধ্য দিয়ে রূপান্তরের চেষ্টা।
তাঁদের সাফল্য বিষয় নির্বাচনের চেয়ে বেশি নিহিত রয়েছে সেই বিষয়কে নতুনভাবে দেখার সক্ষমতায়।
প্রকৃতি ও বাস্তবতাকে আরও বিমূর্ত ও সাংকেতিক ভাষায় রূপ দিয়েছেন আব্দুস সাত্তার তৌফিক। তাঁর ‘কৃষকের গর্ব’ সিরিজে কৃষকের শরীর, শ্রম ও জীবনসংগ্রাম ধীরে ধীরে দৃশ্যমান ফর্ম ভেঙে এক সংগীতধর্মী বিমূর্ততায় পরিণত হয়েছে। রং, গতি ও বিন্যাসের পারস্পরিক সম্পর্ক সেখানে বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে এক অন্তর্লৌকিক আবহ সৃষ্টি করে। একইভাবে আবু তাহেরের ‘বন্যাদুর্গত পরিবার’ আধা বিমূর্ত রঙের স্তরে দুর্যোগ ও মানবিক বেদনার স্মৃতি ধারণ করেছে।
এখানে কোনো সরাসরি বর্ণনা নেই; বরং আবছা রঙের প্রলেপ ও গঠনের ভাঙা–গড়া দর্শককে অনুভবের স্তরে পৌঁছে দেয়।
লোকজ জীবন, স্মৃতি ও কল্পনার মিশ্রণে নির্মিত আব্দুস শাকুর শাহের শিরোনামহীন কাজটিও বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। নারীমুখ, পাখি এবং অলংকরণধর্মী বিন্যাসের সমন্বয়ে তিনি এমন এক স্বপ্নময় দৃশ্যভাষা নির্মাণ করেছেন, যেখানে বাস্তবতা ও কল্পনা পরস্পরের ভেতর বিলীন হয়ে যায়। কাজী রকিবের পাখি সিরিজও বাস্তবতাকে নতুন অর্থে রূপান্তরিত করে।
তাঁর পাখিগুলো প্রকৃতির প্রাণী হয়েও কেবল প্রাণিজগতের প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং স্বাধীনতা, ভালোবাসা ও কল্পনার এক নন্দনচিহ্নে পরিণত হয়। অন্যদিকে গৌতম চক্রবর্তীর হাতি সিরিজে প্রাণীটি রং, স্মৃতি ও ছন্দের এক শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল প্রতীকে রূপ নিয়েছে।
নগরবাসী বর্মনের ‘নদীকেন্দ্রিক কাহিনি’ প্রদর্শনীর অন্যতম স্মরণীয় কাজ। কুপি, হুক্কা, মাছ ধরার উপকরণ এবং নদীঘেঁষা জীবনের নানা অনুষঙ্গকে তিনি এমন এক স্বপ্নময় চিত্রভাষায় রূপ দিয়েছেন, যা হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ স্মৃতিকে নতুন আলোয় পুনর্জাগরিত করে।
মনিরুল ইসলামের কাজগুলোতে দেশ, প্রকৃতি ও স্মৃতি আরও অন্তর্মুখী এক বিমূর্ততার ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। ‘বৃষ্টি ও অশ্রুর দেশ’ কিংবা ‘আমার জানালা দিয়ে’—এই শিরোনামগুলোই যেন ব্যক্তিগত স্মৃতি ও জাতীয় অভিজ্ঞতার এক সংবেদনশীল মিলনভূমি। তাঁর কাজে দৃশ্যমান জগৎ ধীরে ধীরে অনুভূতির ভূদৃশ্যে রূপান্তরিত হয়।
প্রতীকী ও ধারণাভিত্তিক শিল্পভাষার ক্ষেত্রে আশরাফুল হাসানের ‘লাল ফিতা’ উল্লেখযোগ্য। এখানে একটি সাধারণ লাল ফিতা কেবল বস্তু হিসেবে উপস্থিত নয়; বরং নিয়ন্ত্রণ, জটিলতা, আমলাতন্ত্র এবং অদৃশ্য সামাজিক বন্ধনের রূপক হিসেবে কাজ করে।
দেবদাস চক্রবর্তীর ১৯৯২ সালে কলম ও প্যাস্টেলে আঁকা নারীমুখগুলো বিস্ময়কর সংযমে নির্মিত। অল্প কয়েকটি রেখা ও মৃদু রঙের প্রয়োগে তিনি যে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা সৃষ্টি করেছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও প্রাণবন্ত। নিতুন কুন্ডুর দেশীয় রঞ্জকে নির্মিত কাজটি দেখায়, কীভাবে ফর্ম ও নকশা ধীরে ধীরে ক্যালিগ্রাফিক সৌন্দর্যে পরিণত হতে পারে। সংযম, ছন্দ ও নান্দনিক সরলতাই এ কাজের প্রধান শক্তি।
প্রদর্শনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে হামিদুজ্জামান খানের বৃহৎ ক্যানভাস, যা পাহাড়চূড়ার প্রতীকী মহিমাকে ধারণ করেছে।
একই সঙ্গে মার্বেল ও ব্রোঞ্জে নির্মিত ভাস্কর্যগুলো শিল্পীর দীর্ঘ সৃজনযাত্রার সাক্ষ্য বহন করে। সম্প্রতি প্রয়াত এই শিল্পীর কাজ প্রদর্শনীতে এক বিশেষ আবেগঘন আবহও সৃষ্টি করেছে।
প্রদর্শনীর একটি বড় অর্জন হলো সময়কে একসঙ্গে দৃশ্যমান করা। ১৯৫৭ সালের আমিনুল ইসলামের প্যাস্টেল থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের নবীন শিল্পীদের কাজ—সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসের এক ক্ষুদ্র অথচ তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।
শেষ পর্যন্ত গ্যালারি কায়ার ২২তম বার্ষিকীর এই প্রদর্শনী মনে করিয়ে দেয়, শিল্প কখনোই কেবল বাস্তবতার অনুলিপি নয়।
প্রকৃতি, মানুষ, স্মৃতি কিংবা সমাজ—সবকিছুই শিল্পীর ভেতর দিয়ে নতুন অর্থ লাভ করে। এই প্রদর্শনীর শক্তি ঠিক সেখানেই; এখানে বাস্তবতা আছে; কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে শিল্পীর ব্যক্তিগত দর্শন, অনুভূতি ও কল্পনার পুনর্নির্মাণ। আর সেই পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়েই শিল্প হয়ে ওঠে জীবনের আরেকটি সম্ভাব্য সত্য।
রাজধানীর উত্তরায় কায়া গ্যালারিতে ১২ জুন শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি আগামীকাল ২৬ জুন পর্যন্ত দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে।