নীরবতার আধুনিকতা

এটিকে যদি সমাপ্ত শিল্পকর্মের প্রদর্শনী হিসেবে দেখা হয়, তবে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি অধরাই থেকে যাবে। কারণ, এখানে যা প্রদর্শিত হচ্ছে, তা কোনো ঘোষণা নয়; এটি একজন পরিণত, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শিল্পীর নীরব আত্মসংলাপ। শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়ার ১৯৮০ থেকে ২০০৬ সময়পর্বের ৮৪টি কাজ নিয়ে আয়োজিত এই প্রদর্শনী মূলত একটি ‘মুডবোর্ড প্রদর্শনী’, যেখানে শিল্পী প্রকাশের চেয়ে সঞ্চয়ে, বক্তব্যের চেয়ে প্রস্তুতিতে মনোযোগী।

মোহাম্মদ কিবরিয়ার জীবনের পটভূমি এই পাঠের জন্য অপরিহার্য। ১৯৪৭–এর দেশভাগ তাঁকে অনিচ্ছাকৃতভাবে অভিবাসীতে পরিণত করেছিল। এই বাস্তুচ্যুতি তাঁর শিল্পে কখনো সরাসরি বিষয় হয়ে ওঠেনি, কিন্তু তার অভিঘাত ছড়িয়ে আছে ভাঙা ফর্ম, স্তরবিন্যাস, নীরবতা ও অসম্পূর্ণতার ভাষায়। প্রাথমিক কিউবিস্ট পর্বে সেই ভাঙন ছিল দৃশ্যমান ও কাঠামোগত; জাপানে উচ্চশিক্ষার পর তা ধীরে ধীরে রূপ নেয় ভাষাহীন, ধ্যানী বিমূর্ততায়।

১ / ৬
১৯৮৮; কোলাজ, মিশ্র মাধ্যম। শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া
কলাকেন্দ্রের সৌজন্যে

এই প্রদর্শনীর সময়পর্বটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি কোনো শিক্ষানবিশ বা পরীক্ষামূলক পর্ব নয়। এ সময়েই কিবরিয়া আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী, বিয়েনালে ও সম্মাননায় প্রতিষ্ঠিত। ফলে এখানে যে বিপুল স্বাক্ষরহীন কাজ, অসম্পূর্ণ কোলাজ কিংবা প্রায় নিঃসঙ্গ অঙ্গভঙ্গি দেখা যায়, তা কোনো দ্বিধা বা অক্ষমতার চিহ্ন নয়; বরং একজন প্রাজ্ঞ শিল্পীর সচেতন পছন্দ। খ্যাতির শীর্ষে দাঁড়িয়ে নীরবতায় ফিরে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস শিল্পীর পরিণত সত্তারই পরিচয়।

২ / ৬
২০০৬; জলরঙে কালি ও কলম। শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া
কলাকেন্দ্রের সৌজন্যে

মাধ্যমগতভাবে প্রদর্শনীতে রয়েছে ৬০টির বেশি কোলাজ, ১৫–১৮টি মিশ্র মাধ্যম ড্রয়িং ও ইংক ওয়ার্ক, সীমিত কিছু ছাপাই বা এচিং এবং শেষ পর্যায়ে অয়েল প্যাস্টেল ও কাগজে তেলরঙের কাজ। সবই কাগজে, এই ছোট পরিসর ও মাধ্যম ইঙ্গিত করে—এগুলো গ্যালারির দেয়ালে ঝোলানোর জন্য তৈরি উচ্চারণ নয়; এগুলো স্টুডিওর ভেতরের চিন্তার জায়গা।

৩ / ৬
১৯৮০; কলম–পেন্সিল–জলরঙে মিশ্র মাধ্যম। শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া
কলাকেন্দ্রের সৌজন্যে

যুদ্ধোত্তর বিশ্ব শিল্পের বাস্তবতা এই প্রদর্শনীর নীরব পটভূমি। নিউইয়র্ক স্কুলের শিল্পীরা রংকে আবহে রূপ দেওয়ার যে ভাষা তৈরি করেছিলেন, তার প্রতিধ্বনি কিবরিয়ার বড় ক্যানভাসে পাওয়া যায়; কিন্তু এখানে সেই নাটকীয় আবেগ নেই। ইউরোপীয় আধুনিকতায় সারফেস, ক্ষয় ও সময়ের চিহ্ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও কিবরিয়ার কাজে তা রুক্ষ নয়, বরং সংযত। ছোট স্কেলে ভাবনার নোটেশন হিসেবে কাজ করার প্রবণতায় তাঁর সঙ্গে পল ক্লির আত্মীয়তা স্পষ্ট। তবু এই প্রদর্শনী দেখিয়ে দেয় যে কিবরিয়া কারও অনুসারী নন; তিনি গ্রহণ করেন, রূপান্তরিত করেন।

এই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দু জাপানি জেন (Zen)। গুতাই (Gutai) আন্দোলনের চরম, শরীরী অভিব্যক্তি এখানে গুরুত্বপূর্ণ তাদের অনুপস্থিতির কারণে। জেন এখানে কোনো মোটিফ নয়; এটি কম্পোজিশনের নৈতিকতা (এথিকস)।

৪ / ৬
১৯৮৭; কোলাজ, মিশ্র মাধ্যম। শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া
কলাকেন্দ্রের সৌজন্যে

চিত্র ১–এ ফাঁকা জায়গা বা মা (Ma) কম্পোজিশনের ভার বহন করে—জেনের শূন্যতা এখানে অনুপস্থিতি নয়, সক্রিয় উপস্থিতি।

চিত্র ৬–এর সংযত রেখা প্রকাশ করে ইচিগো–ইচিয়ে (Ichigo-Ichie)—এক মুহূর্ত, এক সিদ্ধান্ত; প্রতিটি স্ট্রোক অপরিবর্তনীয়।

চিত্র ৯–এর কাটা, অসম প্রান্ত আমাদের নিয়ে যায় ওয়াবি–সাবির (Wabi-Sabi) কাছে—অসম্পূর্ণতা ও ক্ষয়ের সৌন্দর্য।

চিত্র ১৮–এ কেন্দ্র ফাঁকা রেখে প্রান্তকে গুরুত্ব দেওয়া জেন–এর নন-হায়ারারকিক্যাল স্পেসের চাক্ষুষ রূপ।

চিত্র ৩২–এর আধা–দেখা স্তর প্রকাশ করে ইউগেন—ইঙ্গিতের ভাষা, যা সম্পূর্ণ প্রকাশ নয়।

আর চিত্র ৭৯–এর প্রায় নির্জন অঙ্গভঙ্গি যেন মুশিন—মনহীনতা, যেখানে শিল্পী আর নিজেকে দেখান না, কেবল উপস্থিত থাকেন।

৫ / ৬
১৯৮৭; কোলাজ, মিশ্র মাধ্যম। শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া
কলাকেন্দ্রের সৌজন্যে

এই প্রদর্শনীর আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো কোথাও কেবল একটি সাদাকালো ম্যাগাজিনের ছবি কেটে লাগানো হয়েছে, কোনো রং বা হস্তক্ষেপ নেই। এটি শিল্প দেখানোর প্রয়াস নয়; এটি দেখে নোট রাখার প্রয়াস। একজন অভিবাসী মানুষের মতোই শিল্পী এখানে স্মৃতি, ইমেজ ও আবহ জমা করেন—পূর্ণ ভাষা নির্মাণের আগেই।

৬ / ৬
শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া
স্যুভেনির থেকে

এখানেই মোহাম্মদ কিবরিয়া বিশ্ব শিল্পে অনন্য। তিনি আধুনিকতার কোনো কেন্দ্রীয় ক্যাননকে অনুকরণ করেননি। জেন–কে তিনি ব্যবহার করেননি সাংস্কৃতিক অলংকার হিসেবে; গ্রহণ করেছেন পদ্ধতি (মেথড) ও নৈতিকতা হিসেবে। নিউইয়র্ক, ইউরোপ ও জাপানের অভিজ্ঞতা তিনি একত্র করেছেন একজন দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীর স্মৃতিবোধে। তাঁর আধুনিকতা তাই উচ্চকিত নয়, আক্রমণাত্মক নয়—বরং নীরব, সংযত ও মানবিক।

এই প্রদর্শনী আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আধুনিক শিল্প সব সময় ঘোষণা দেয় না। কখনো কখনো তার সবচেয়ে গভীর সত্যটি প্রকাশ পায় চুপ করে থাকার মধ্যেই।

রাজধানীর লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্রে ‘মোহাম্মদ কিবরিয়ার স্বনির্বাচিত ৮৪টি অপ্রদর্শিত মৌলিক শিল্পকর্ম (১৯৮০-২০০৬)’ শিরোনামে প্রদর্শনীটি শুরু হয়েছে ১ জানুয়ারি, চলবে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত। দর্শকের জন্য খোলা থাকবে বেলা তিনটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত।