রেখায় পরাবাস্তব জগৎ

বেঙ্গলে ‘আনব্রোকেন লাইন’ শিরোনামে এ প্রদর্শনী চলবে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত।

প্রদর্শনীর একটি কয়েকটি চিত্রকর্ম অবলম্বনেগ্রাফিকস প্রথম আলো

রেখার দ্রুত ও অবিরাম ছুটে চলা। দৃশ্যের বাইরে এক অদ্ভুত জগৎ। প্রতিটি রেখাই আলাদা, কিন্তু যেন একই সুতায় গাঁথা। যৌথ কবিতার মতো এক চিন্তার খেলাঘরে পৌঁছে দেয় সম্প্রতি শুরু হওয়া ‘আনব্রোকেন লাইন’ শীর্ষক দলীয় প্রদর্শনীটি। রেখাগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ আর মৌলিক। জটিল সব অনুভূতি ও অবচেতন মনের কল্পনায় এক পরাবাস্তব আবহাওয়া তৈরি করেছেন ৪২ শিল্পী তাঁদের আঁকিবুঁকিতে।

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রদর্শনীটি শুরু হয়েছিল ৯ অক্টোবর। কামরুল হাসান প্রদর্শনী কক্ষে আয়োজিত এ আয়োজনে দেশের আধুনিক চারুশিল্পের পথিকৃৎ জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, সফিউদ্দীন আহমেদের কাজের পাশাপাশি রয়েছে প্রবীণ, মধ্য প্রজন্ম ও উদীয়মান শিল্পীদের নানা কর্ম। এসব কাজের মধ্য দিয়ে রেখাচিত্রের বিষয়, আঙ্গিক ও প্রকাশভঙ্গির বৈচিত্র্য প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাচ্ছেন দর্শকেরা।

রংহীন রেখারা এক স্বপ্নের ঘোর তৈরি করে, অবচেতন মনে এক অযৌক্তিক সংযোগ স্থাপন করে। কোনো কাজে দেখা যায়, একজন মানুষ যেন নিজেকেই উলের সুতা দিয়ে বুনে চলেছে। কোথাও শরীরের ওপর স্থাপিত দুটি কাঁচি পরস্পরকে কাটছে। আবার কলার খোসা ছাড়ানোর সাধারণ দৃশ্য মুহূর্তেই রূপান্তরিত হচ্ছে উড়োজাহাজের অবয়বে; সেই উড়োজাহাজের সূত্র ধরে কল্পনা পৌঁছে যাচ্ছে আদিম সভ্যতার ইতিহাসে। এমন দৃশ্যকল্পে বাস্তবতা ও কল্পনার সীমারেখা ক্রমাগত বদলে যায়। একটি রেখার সূত্র ধরে অন্য রেখা, একটি অবয়ব থেকে আরেক অবয়বের জন্ম—এভাবেই দর্শকের চিন্তা প্রবেশ করে এক অদ্ভুত মানসিক অনুশীলনের পরিসরে। শিল্পীদের আঁকিবুঁকি তখন আর নিছক রেখার সমাবেশ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে তাঁদের মস্তিষ্কে চলমান বিচিত্র চিন্তা, অনুভূতি ও কল্পনার দৃশ্যমান রূপ। রেখার বৈচিত্র্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ড্রইংয়ের শক্তি কেবল নিখুঁত অবয়ব নির্মাণে নয়, বরং অল্প কিছু চিহ্নের মাধ্যমে অনুভূতি ও চিন্তার প্রকাশ।

কালিদাস কর্মকার

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রদর্শনীটি শুরু হয়েছিল ৯ অক্টোবর। কামরুল হাসান প্রদর্শনী কক্ষে আয়োজিত এ আয়োজনে দেশের আধুনিক চারুশিল্পের পথিকৃৎ জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, সফিউদ্দীন আহমেদের কাজের পাশাপাশি রয়েছে প্রবীণ, মধ্য প্রজন্ম ও উদীয়মান শিল্পীদের নানা কর্ম। এসব কাজের মধ্য দিয়ে রেখাচিত্রের বিষয়, আঙ্গিক ও প্রকাশভঙ্গির বৈচিত্র্য প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাচ্ছেন দর্শক।

প্রদর্শনীকক্ষের দেয়ালে পাশাপাশি ও বিভিন্ন উচ্চতায় সাজানো শিল্পকর্মগুলো রেখার বহুমাত্রিক প্রয়োগকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। কোনো কাজে গাঢ় রেখার তীব্রতা ও অনিয়মিত টানের আধিক্য, কোথাও আবার অল্প কয়েকটি সংযত আঁচড়ের সঙ্গে ফাঁকা জায়গার তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবহার লক্ষ করা যায়। রেখার ঘনত্ব, গতি, ছন্দ ও বিন্যাসে এই পার্থক্য শিল্পীদের স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিরীক্ষাপ্রবণতার পরিচয় বহন করে। একই মাধ্যমকে অবলম্বন করেও যে ভিন্ন ভিন্ন শিল্পী সম্পূর্ণ আলাদা অভিজ্ঞতা ও অনুভবের জগৎ নির্মাণ করতে পারেন, প্রদর্শনীর কাজগুলো তারই প্রমাণ।

শিশির ভট্টাচার্য্য

জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, সফিউদ্দীন আহমেদ—এই তিন শিল্পীর কাজের সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের কাজের তুলনা করলে বোঝা যায়, রেখার মৌলিক শক্তি অক্ষুণ্ন থাকলেও তার ব্যবহার, উদ্দেশ্য ও নান্দনিক অভিমুখ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। সময়ের পরিবর্তনে শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়, নতুন মাধ্যম ও প্রযুক্তি যুক্ত হয়, শিল্পের ভাষায় আসে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। বাস্তবধর্মী উপস্থাপনা থেকে বিমূর্ততা, ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি থেকে ধারণানির্ভর শিল্পচর্চা—প্রতিটি পর্যায়েই রেখা নতুনভাবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু তার প্রকাশক্ষমতা হারিয়ে যায় না; বরং নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেকে পুনর্নির্মাণ করে।

ফারাহ্ নাজ মুন

ছবিগুলোতে সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদের ধারা লক্ষ করা যায় অনেক কাজে। রেখার অবিরাম চলন ও জটিল জালবিন্যাস, বাস্তব অবয়ব ও বিমূর্ত আকৃতির মধ্যবর্তী অনিশ্চিত অবস্থান, সচেতন পরিকল্পনার বদলে অবচেতন মনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ, রেখার মধ্য থেকে নতুন অবয়ব আবিষ্কারের সম্ভাবনা—এসবই পরাবাস্তবের বৈশিষ্ট্য। দর্শক তাই কেবল একটি ছবি দেখেন না; বরং রেখার গতিপথ অনুসরণ করতে করতে নিজেই অংশ নেন অর্থ ও কল্পনা নির্মাণের প্রক্রিয়ায়। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে প্রদর্শনী চলবে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ।