অবচেতন বাস্তবতায় কল্পনার দর্পণ

শিল্পী জাকিয়া খান চন্দনার দুটি চিত্রকর্ম অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

শিল্পী জাকিয়া খান চন্দনার তৃতীয় একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘অবচেতন মনের বাস্তবতা’ সমসাময়িক বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন। ৩ জুলাই শুক্রবার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী শিল্পীর দীর্ঘদিনের সুররিয়ালিস্ট অন্বেষণের একটি পরিণত রূপ।

চন্দনার চিত্রকর্মে অবচেতন মন কেবল একটি মনস্তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং একটি দৃশ্যমান পরাবাস্তববাদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তার ক্যানভাসে ভেসে ওঠে স্বপ্ন, স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মপরিচয়ের জটিল স্তর, যা বাস্তব ও কল্পনার সীমারেখাকে ভেঙে দেয়। এই প্রবণতা স্বভাবতই আমাদের মনে করিয়ে দেয় বিশ্বখ্যাত সুররিয়ালিস্ট শিল্পী সালভাদর দালির কথা, যিনি অবচেতন মনের চিত্রায়ণকে শিল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছিলেন।

শিল্পী জাকিয়া খান চন্দনার চিত্রকর্মের দিকে তাকালে প্রথমেই যে অনুভূতিটি জন্ম নেয়, তা হলো ক্যানভাসের ভৌত সীমা যতটা না বিস্তৃত, তার চেয়ে বহুগুণ বড় তার ভেতরে বিস্তার লাভ করা শিল্পজগৎ।

‘অবচেতনের স্থাপত্য’, জাকিয়া খান চন্দনা
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

প্রতিটি চিত্র যেন একটি স্বতন্ত্র মহাবিশ্ব, যেখানে আলো ও ছায়ার মায়াবী বিন্যাসে দীপ্তিময় এক নিখিল সৃষ্টির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বাস্তব ও কল্পনার সীমারেখা এখানে ঝাপসা হয়ে গিয়ে দর্শককে টেনে নেয় এক গভীর অন্তর্লোকের দিকে।

‘পৃথিবীর শিরা’ শিরোনামের চিত্রকর্মে শিল্পী জলবায়ু সংকটের একটি শক্তিশালী রূপক নির্মাণ করেছেন। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লাল রঙের মেঘ যেন অশনিসংকেতের মতো ভাসে, আর তার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জরাজীর্ণ গাছে অল্প কিছু সবুজ পাতার উপস্থিতি আশার ক্ষীণ আলোকে ইঙ্গিত করে।

‘খণ্ডিত দিগন্ত’, জাকিয়া খান চন্দনা
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

গোলকের ভেতরে বন্দী শুকনো গাছ এবং চারপাশের রুক্ষ, নিষ্প্রাণ পরিবেশ মিলিত হয়ে একটি ভীত ভবিষ্যৎ বাস্তবতার চিত্র রচনা করে, যেখানে প্রকৃতি ও মানবসভ্যতার টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই চিত্রে অবচেতন মন যেন পরিবেশগত উদ্বেগকে রূপক ও প্রতীকের ভাষায় প্রকাশ করেছে।

জাকিয়া খান চন্দনার চিত্রকর্মগুলো সুররিয়ালিজমের পরিচিত কাঠামোর মধ্যে থেকেও একটি পৃথক ও ব্যক্তিগত ভাষা নির্মাণ করেছে।

‘ধ্বংসের বিরুদ্ধে যাত্রা’, জাকিয়া খান চন্দনা
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

ভাঙাচোরা দৃশ্যপট, অনির্দিষ্ট স্থাপত্য, ফাটলধরা ভূমি এবং মানবের অনুপস্থিতির মধ্য দিয়ে তিনি সৃষ্টি ও ধ্বংসের মধ্যবর্তী এক সূক্ষ্ম টানাপোড়েনকে রূপায়িত করেছেন। তাঁর কাজ ‘সময়ের ঊর্ধ্বে শিকড়’ এ মানুষের অনুপস্থিতিতে একাকী ল্যান্ডস্কেপ কেবল নিঃসঙ্গতার চিত্র নয়, বরং সময়, স্মৃতি ও অস্তিত্বের ভঙ্গুরতার প্রতীক হিসেবে হাজির হয়। এই নীরবতা দর্শককে গভীর মনস্তাত্ত্বিক স্তরে ভাবনার দিকে আহ্বান জানায়।

‘পৃথিবীর শিরা’, জাকিয়া খান চন্দনা
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

এ প্রসঙ্গে সুররিয়ালিস্ট শিল্পের কিংবদন্তি শিল্পী সালভাদর দালির সঙ্গে শিল্পী জাকিয়া খান চন্দনার শিল্পভাবনার একটি তাৎপর্যপূর্ণ তুলনা করা যায়। দালির শিল্পজগৎ অবচেতন মন, স্বপ্ন ও বিভ্রমের একটি সমৃদ্ধ প্রকাশ। তাঁর চিত্রে সময় গলে যায়, বাস্তবতা বিকৃত হয়, আর প্রতীকগুলো হয়ে ওঠে মানসিক অস্থিরতার দৃশ্যমান রূপ। জাকিয়া খান চন্দনার কাজেও আমরা এই অবচেতন বাস্তবতার প্রতিধ্বনি পাই, তবে পার্থক্য হলো দালির কাজ যেখানে ইউরোপীয় আধুনিকতার মনস্তাত্ত্বিক সংকটকে বহন করে, সেখানে জাকিয়ার চিত্রকর্ম বহন করে সমকালীন বিশ্বের বিবর্তন, পরিবেশগত অস্থিরতা এবং দক্ষিণ এশীয় বাস্তবতার অন্তর্নিহিত উদ্বেগ।

‘মহাকর্ষের মরীচিকা’, জাকিয়া খান চন্দনা
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

‘মহাকর্ষের মরীচিকা’ শিরোনামের এই কাজে একটি প্রাচীন বসতি ঝড়ের তাণ্ডবে ভেঙে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে স্থগিত হয়ে আছে। আলো ও ছায়ার সূক্ষ্ম ব্যবহারে নির্মিত এই দৃশ্য দালির ব্যঞ্জনাময় কম্পোজিশনের কথা স্মরণ করালেও, এখানে রয়েছে এক ভিন্ন প্রেক্ষাপট যা কেবল কল্পনার দৃশ্য নয়, বরং সভ্যতার ভঙ্গুরতার প্রতীক। দালির মতোই জাকিয়াও দর্শককে একটি অস্বস্তিকর, প্রশ্নবিদ্ধ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করান, তবে তাঁর ভাষা আরও সংযত, আরও নীরব এবং গভীরভাবে মানবিক।

‘যুবকদের জন্য অনুশোচনা’, জাকিয়া খান চন্দনা
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

অন্যদিকে, ‘খণ্ডিত দিগন্ত’ চিত্রকর্মে দর্শক প্রবেশ করে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কল্পজগতে। এখানে পৃথিবীর মাটি ভূপৃষ্ঠ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক স্তর ওপরে উঠে এসেছে, যেন বাস্তবতার ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে গেছে। আকাশে কাঠের তক্তাসদৃশ অসংখ্য বস্তু ভেসে বেড়ায়, যা একটি ভাঙাচোরা দিগন্তরেখা নির্মাণ করে। এই ভাসমান উপাদানগুলো একদিকে যেমন অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার প্রতীক, অন্যদিকে তেমনি সমকালীন বিশ্বের বিচ্ছিন্ন বাস্তবতার এক কাব্যিক রূপায়ণ।

‘যেখানে সময় ভেঙে পড়ে’, জাকিয়া খান চন্দনা
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

তাই বলা যায়, সালভাদর দালির কল্পনার জগতের সঙ্গে জাকিয়া খান চন্দনার শিল্পকর্মের তুলনা একদিকে যেমন সুররিয়ালিজমের ধারাবাহিকতাকে নির্দেশ করে, অন্যদিকে তেমনি এই বাংলাদেশি নারী শিল্পীর স্বতন্ত্র অবস্থানকে স্পষ্ট করে। তার শিল্পে আলো-ছায়া, রং ও রূপক একত্রে মিলিত হয়ে এমন এক দৃশ্যভাষা নির্মাণ করে, যেখানে অবচেতন মন ব্যক্তিগত অনুভূতির গণ্ডি ছাড়িয়ে সমষ্টিগত সংকট ও মানবিক প্রশ্নের প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে। তাঁর চিত্রকর্ম সমকালীন বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য একটি শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল রূপক প্রস্তাব করে, যা আজকের শিল্পচর্চায় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও গভীরভাবে সময়-সচেতন ও ভাবনামুখী। প্রদর্শনীটি চলবে ৮ জুলাই পর্যন্ত।