মাটির শরীরে শিল্প

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে ‘মাটির মায়া’ শীর্ষক সিরামিক প্রদর্শনীটি ১ অক্টোবর শুরু হয়েছে, চলবে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত।

প্রদর্শনীর একটি শিল্পকর্ম অবলম্বনে। প্রথম আলো গ্রাফিকস

মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যতটা প্রাচীন, শিল্পের সঙ্গে মাটির সম্পর্কও ততটাই গভীর। কিন্তু মাটি যখন কেবল প্রয়োজনের তৈজস থেকে শিল্পীর হাতে এসে অনুভূতি, স্মৃতি, কল্পনা ও অস্তিত্বের ভাষা হয়ে ওঠে, তখন তার চরিত্র বদলে যায়। সেই বদলে যাওয়া মাটির ভাষাই যেন দেখা গেল ‘মাটির মায়া’ শীর্ষক সিরামিক প্রদর্শনীতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সিরামিক বিভাগের বাহাত্তরতম ব্যাচের সদ্য-স্নাতকোত্তর তরুণ শিল্পীদের এ প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে প্রথম যে অনুভূতি জাগে, তা হলো চমক। প্রত্যেক শিল্পীর কাজেই রয়েছে অদ্ভুত রকমের সৃজনশীলতা। দীর্ঘ দুই-তিন দশক আগেও মৃৎশিল্প বিভাগে মৃৎপাত্র, পটারি ও ব্যবহারিক বস্তু নির্মাণের প্রবণতাই যেখানে তুলনামূলক প্রবল ছিল, সময়ের পরিবর্তনে সেই মাটিই আজ তরুণ শিল্পীদের হাতে বহুমাত্রিক সমকালীন শিল্পভাষার উপাদান হয়ে উঠেছে। পটারি আর কেবল পটারি নেই; কখনো তা ভাস্কর্য, কখনো টেরাকোটা ফলক, কখনো চিত্রের মতো দৃশ্যপট, আবার কখনো মানুষের অন্তর্জগতের বিমূর্ত সংকেত।

তবে এ প্রদর্শনীর একটি মজার বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় একই প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশে শিল্পচর্চা করেছেন। ফলে তাঁদের ভাবনার ধরন, নির্মাণকৌশল, টেক্সচার, ফর্ম ও উপাদান ব্যবহারে একধরনের আত্মীয়তা স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছে। কখনো কখনো শিল্পীর নাম না দেখলে একটি কাজকে একক প্রদর্শনীর অংশ বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সাদৃশ্যের মধ্যেই আবার প্রত্যেকে নিজের মতো করে একটি আলাদা স্বর খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এখানেই ‘মাটির মায়া’র সার্থকতা; একই মাটির ভেতর থেকে ৯ শিল্পীর আলাদা সম্ভাবনার উন্মোচন।

তাহসিন তাবাসসুম ঐশীর কাজে এ সৃজনশীল অনুসন্ধান বিশেষভাবে চোখে পড়ে। টেপা পুতুলের চিরপরিচিত লোকজ চরিত্রকে তিনি নিছক পুনর্নির্মাণ করেননি; বরং তার বসার ভঙ্গি, টেক্সচার এবং পাখির সঙ্গে পুতুলের কথোপকথনের অভিব্যক্তিকে এমনভাবে নির্মাণ করেছেন, যা লোকজ স্মৃতিকে সমকালীন নন্দনতত্ত্বের দিকে নিয়ে যায়। রাকু-গ্লেজের ক্র্যাকলড পৃষ্ঠ পুতুলের শরীরে একধরনের ভূমিনকশার মতো চরিত্র তৈরি করেছে। ফলে লোকশিল্পের পরিচিত অবয়বটি নতুন এক নান্দনিক পরিসর লাভ করেছে।

একই শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় একই প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশে শিল্পচর্চা করেছেন। ফলে তাঁদের ভাবনার ধরন, নির্মাণকৌশল, টেক্সচার, ফর্ম ও উপাদান ব্যবহারে একধরনের আত্মীয়তা স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছে। কখনো কখনো শিল্পীর নাম না দেখলে একটি কাজকে একক প্রদর্শনীর অংশ বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সাদৃশ্যের মধ্যেই আবার প্রত্যেকে নিজের মতো করে একটি আলাদা স্বর খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

ঐশীর রাকু-গ্লেজের আরেকটি কাজের বৃত্তাকার ফর্মে ছোট-বড় কয়েকটি হাতির সারিবদ্ধ চলনও উল্লেখযোগ্য। হাতির স্থূলতা, সৌম্যতা, শান্ত স্বভাব ও দলবদ্ধ চলনের মধ্যে একসঙ্গে ধরা পড়েছে শিশুমনের বিস্ময় ও শিল্পীর পরিণত নির্মাণবোধ। কিন্তু তাঁর শিল্পচিন্তা কেবল বহিরঙ্গের আনন্দময় জগতেই থেমে নেই। ‘অস্তিত্বের কোলাহল’ শিরোনামের স্টোনওয়্যার নির্মিত কাজে তিনি যেন চলে গেছেন অন্তর্জগতের দিকে। বিভিন্ন অভিব্যক্তিময় মুখাকৃতি ও ঠোঁটের বকসদৃশ পাখিগুলো যেন মানুষের মতানৈক্য, অস্থিরতা ও অন্তর্গত কথোপকথনের দৃশ্যমান রূপ।

‘টেপা পুতুল’, রাকু গ্লেজ, তাহসিন তাবাসসুম ঐশী

আয়শা সিদ্দিকা ঊষার ‘উদগীরণ’ কাজটিও মাটির প্রচলিত ব্যবহারকে অতিক্রম করার আকর্ষণীয় উদাহরণ। পটারি যখন লোকশিল্পীর হাতে প্রয়োজনের তৈজস হয়ে ওঠে, তখন শিল্পীর হাতে সেই একই পটারি পরিণত হতে পারে মননের নন্দনতাত্ত্বিক ভাষায়। ‘উদগীরণ’-এর গায়ে ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড় অসংখ্য ছিদ্র যেন কোনো অদৃশ্য অন্তর্গত সত্তা বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। এটি কি আবেগের উদগীরণ? চিন্তার? নাকি দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রিত কোনো মানসিক আকাঙ্ক্ষার?

‘নীর-অনল’, স্টোনওয়্যার, সামুরা আলম

এ প্রশ্নের উত্তর শিল্পী দেন না; বরং দর্শকের সামনে উন্মুক্ত করে দেন। মানুষের মনও তো প্রতিদিন এমনই—সামাজিক নিয়ম, সম্পর্ক ও বাস্তবতার খোলসের ভেতরে কত কথা, কত আবেগ, কত আকাঙ্ক্ষা আটকে থাকে। ‘উদগীরণ’ যেন সেই অন্তর্গত চাপেরই মাটির শরীরে দৃশ্যমান রূপ।

ঊষার ‘স্পর্শ’ শিল্পকর্ম আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আবহ। টেরাকোটা ফলককে তিনি প্রায় রঙিন চিত্রপটের মতো ব্যবহার করেছেন। দুটি মানব–ফিগার পরস্পরকে ধরে আছে আদর, স্পর্শ ও ভালোবাসার এক চিরন্তন মুহূর্তে। এখানে টেরাকোটার ফলক যেন দেয়ালের ম্যুরাল থেকে বেরিয়ে এসে চিত্রকলার আবেগ ধারণ করেছে। ফলে ঊষার কাজগুলোয় কখনো ভাস্কর্য, কখনো ফলক, কখনো চিত্রকলা—এই তিনের সীমারেখা পরস্পরের মধ্যে মিশে যায়।

‘স্পর্শ’, স্টোনওয়্যার, আয়শা সিদ্দিকা ঊষা

বিশাল সাহার ‘ঐতিহ্যের বৃত্ত’ টেরাকোটা ফলকে ঐতিহ্যকে সরলীকৃত নকশার ভেতর ধরার চেষ্টা রয়েছে। তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ফর্ম ও আকৃতি সহজ করে আনা। জটিলতাকে কমিয়ে আকারের মৌলিক চরিত্রকে সামনে নিয়ে আসার এ প্রবণতা তাঁর কাজে একধরনের ডিজাইন-সচেতনতা তৈরি করেছে।

এ প্রদর্শনীর অধিকাংশ কাজেই মানুষের শরীর, ফুল-লতা, পাখি, প্রাণী, পটারি-ফর্ম কিংবা প্রাকৃতিক অনুষঙ্গ কোনো না কোনোভাবে ফিরে এসেছে। কিন্তু সেগুলো কেবল বিষয় হিসেবে উপস্থিত নয়; বরং মাটির নিজস্ব গঠন, টেক্সচার, রং ও পোড়ানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গে মিশে গিয়ে শিল্পের বয়ান তৈরি করেছে। কোথাও কোথাও টেরাকোটার গায়ের রং ও পৃষ্ঠ এতটাই চিত্রময় যে তা পেইন্টিংয়ের স্বাদ দেয়।

রেজওয়ানা মল্লিক বর্ষার কাজেও ফর্মের প্রতি নিজস্ব আগ্রহ লক্ষ করা যায়। বিশেষত মানবদেহকে বাস্তব অনুকরণে না রেখে তার বিকৃত ও রূপান্তরিত সম্ভাবনাকে অনুসন্ধান করেছেন তিনি। মানুষের শরীর এখানে নিছক অ্যানাটমিক কাঠামো নয়; বরং একটি সৃজনশীল ফর্ম। দেহের পরিচিত অবয়বকে ভেঙে নতুন বিন্যাসে সাজানোর মধ্য দিয়ে তিনি নিজের শিল্পভাষা নির্মাণের চেষ্টা করেছেন।

‘মডার্ন পটারি’, আর্থেনওয়্যার, হিরন রায়

এ প্রদর্শনীর অধিকাংশ কাজেই মানুষের শরীর, ফুল-লতা, পাখি, প্রাণী, পটারি-ফর্ম কিংবা প্রাকৃতিক অনুষঙ্গ কোনো না কোনোভাবে ফিরে এসেছে। কিন্তু সেগুলো কেবল বিষয় হিসেবে উপস্থিত নয়; বরং মাটির নিজস্ব গঠন, টেক্সচার, রং ও পোড়ানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গে মিশে গিয়ে শিল্পের বয়ান তৈরি করেছে। কোথাও কোথাও টেরাকোটার গায়ের রং ও পৃষ্ঠ এতটাই চিত্রময় যে তা পেইন্টিংয়ের স্বাদ দেয়।

সামুরা আলমের ‘নীর-অনল’ ও ‘শেষ থেকে শুরু’ শিল্পকর্মে এই টেক্সচার–নির্ভর চিত্রময়তার স্বাদ বিশেষভাবে অনুভব করা যায়। মাটির পৃষ্ঠ যেন এখানে ক্যানভাসের বিকল্প নয়, বরং নিজস্ব চরিত্রসম্পন্ন একটি দৃশ্যপট। রং ও টেক্সচারের পারস্পরিক সম্পর্ক কাজগুলোকে একধরনের রহস্যময় আবহ দিয়েছে।

হৃষিক মজুমদার আবার মাটিকে নিয়ে গেছেন ঋতুর গল্পে। তাঁর কাজে প্রকৃতি ও ঋতুচক্রের অনুভব যেমন আছে, তেমনি আছে চিত্রকলার ভিজ্যুয়াল আনন্দ। ‘আস্থার আশ্রয়’ শিল্পকর্মে মাটির তৈরি উপাদান ও চিত্রের সমন্বয়ে যে মিশ্র মাধ্যমের ভাষা তৈরি হয়েছে, সেখানে পেইন্টিং ও সিরামিক একে অপরকে অতিক্রম না করে পরস্পরকে সমৃদ্ধ করেছে।

‘আস্থার আশ্রয়’, মিশ্র মাটি, হৃষিক মজুমদার

মারজিয়া আক্তার মৌমিতার কাজেও টেক্সচারের প্রতি বিশেষ মনোযোগ লক্ষ করা যায়। ছোট ছোট টেক্সচারাল বিন্যাস দিয়ে পটারি সাজানোর ফলে মাটির পৃষ্ঠ নিজেই হয়ে উঠেছে নকশার প্রধান ভাষা। কখনো রঙিন ক্যানভাসের মতো, কখনো আবার গড়নের বৈচিত্র্য, টেক্সচার ও রঙিন ফর্মের উজ্জ্বলতায় মৌমিতার কাজগুলো দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে।

মাহবুব আলম হৃদয়ের কাজেও পটারির গঠন ও রঙের সম্ভাবনাকে নানাভাবে ব্যবহার করার প্রবণতা রয়েছে। মাটির গায়ে রং, ফর্ম ও টেক্সচারের সমন্বয় তাঁর কাজকে নিছক পটারির গণ্ডি থেকে বের করে একটি স্বতন্ত্র ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতায় নিয়ে যায়।

‘মাটির মায়া’ তাই শেষ পর্যন্ত কেবল মাটি নিয়ে প্রদর্শনী নয়। এটি একদল তরুণ শিল্পীর মাধ্যমসচেতন হয়ে ওঠার গল্প। মাটিকে তাঁরা শুধু হাতের উপাদান হিসেবে নেননি; মাটির ভেতরে তাঁরা খুঁজেছেন শরীর, স্মৃতি, ঐতিহ্য, ভালোবাসা, অস্থিরতা, প্রকৃতি ও অস্তিত্বের নানা রূপ। কোথাও লোকজ পুতুল সমকালীন হয়ে উঠেছে, কোথাও টেরাকোটা ফলক চিত্রকলার ভাষা নিয়েছে, কোথাও মানুষের দেহ বিকৃত হয়ে নতুন ফর্ম পেয়েছে, কোথাও মাটির টেক্সচার নিজেই হয়ে উঠেছে দৃশ্যের মূল বিষয়।

‘উদ্‌গীরণ’, স্টোনওয়্যার, আয়শা সিদ্দিকা ঊষা

এই সব তরুণ শিল্পীর কাজে এখনো একাডেমিক শিক্ষার ছাপ স্পষ্ট। একই সঙ্গে সেই শিক্ষাকে অতিক্রম করে নিজস্ব শিল্পভাষা আবিষ্কারের আকাঙ্ক্ষাও প্রবল। ফলে তাঁদের কাজের মধ্যে যেমন পারস্পরিক সাদৃশ্য রয়েছে, তেমনি রয়েছে ব্যক্তিগত স্বরের সন্ধান। শিল্পী হিসেবে তাঁদের পথ এখনো দীর্ঘ; কিন্তু এ প্রদর্শনী সেই পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।

মাটির প্রতি মানুষের যে আদিম টান, তা হয়তো কেবল শিকড়ের টান নয়—সৃষ্টি করারও টান। মাটি ভেঙে যায়, আবার গড়ে ওঠে; পোড়ে, তবু নতুন রূপে ফিরে আসে। এই তরুণ শিল্পীরাও যেন সেই মাটির স্বভাবই ধারণ করছেন—প্রচলিত রূপকে ভেঙে, পোড়ার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে, নতুন শিল্পভাষায় ফিরে আসার চেষ্টা করছেন।

‘মাটির মায়া’ সে কারণেই মাটির প্রতি ভালোবাসার প্রদর্শনী যেমন, তেমনি নতুন শিল্পসম্ভাবনারও প্রদর্শনী। এখানে মাটি নীরব নয়, তার গায়ের টেক্সচারে, পোড়ার দাগে, রঙের স্তরে, ফর্মের বাঁকে এবং শিল্পীর স্পর্শে সে কথা বলে। আর সেই কথার ভেতরেই ধীরে ধীরে শোনা যায় নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে ‘মাটির মায়া’ শীর্ষক এ সিরামিক প্রদর্শনী ১ অক্টোবর শুরু হয়েছে, চলবে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত।