বাংলাদেশের মৃৎশিল্পের লোকব্যবহার

মূল মাটির অংশকে বলা হয় মৃণ্ময়। মৃৎশিল্পের প্রধান উপাদান কাদামাটি। মৃৎশিল্প তৈরিতে আদর্শ মাটি শুধু কিছু ভৌগোলিক এলাকায় পাওয়া যায়; যা দিয়ে তৈরি পণ্য এক অনন্য স্থানীয় মৃৎশিল্প রূপে গণ্য হয়। যেমন মটকি তৈরির জন্য ফতেহপুর, খেলনার জন্য বিক্রমপুর ও রাজবাড়ী, হাঁড়িকুড়ির জন্য বরিশাল ও নড়াইল।

পণ্যের এই বৈচিত্র্য শুধু ডেকোরেশনে নয়, ব্যবহারেও—যা একসময় সর্বত্র প্রচলিত ছিল। কিতাবে বলে, মাটির পাত্র ব্যবহার করা মানবদেহের জন্য ব্যাপক স্বাস্থ্যবর্ধক। মাটির পাত্র অন্য সব পাত্র অপেক্ষা মানবদেহের জন্য স্বাস্থ্যকর। মাটির পাত্র প্রচুর আর্দ্রতা প্রদান করে। মাটির পাত্র প্রাকৃতিকভাবে ক্ষার শোষণ করে, যা অম্লতা বা অ্যাসিডিটির সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে অম্লতা বা অ্যাসিডিটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। কাজেই মাটির পাত্রের পানীয় ও খাবার অ্যাসিডিটি নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে।

অভিধানমতে, মাটি তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত শব্দ মৃত্তিকা থেকে। সংস্কৃত—মৃত্তিকা; প্রাকৃত—মট্টিআ; বাংলা—মাটি। ঘুরন্ত চাকার ওপর এঁটেল মাটির তাল থেকে মাটির বাসনকোসন যাঁরা বানান, তাঁদের বলা হয় ‘কুমোর’, কুমহার বা কুমার। তদ্ভব শব্দ, এসেছে সংস্কৃত ‘কুম্ভকার’ থেকে।

আমাদের এই সমতটের অতি প্রাচীন শিল্পের নাম মৃৎশিল্প। যুগ যুগ ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা মাটি দিয়ে তৈজসপত্র তৈরির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। তাঁরা গভীর ভালোবাসা আর মমতা দিয়ে নিপুণ হাতের কারুকাজের মাধ্যমে তৈরি করেন নানা তৈজসপত্র।

কুমারদের জীবন-জীবিকার উপকরণ হলো মাটি। কিন্তু কালের বিবর্তনে আধুনিকতার ছোঁয়ায় তাঁদের ভালোবাসার সেই জীবিকার জায়গাটি দিন দিন ফিকে হয়ে আসছে। দিন যতই যাচ্ছে, ততই বাড়ছে নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার। আর প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে মাটির তৈরি তৈজসপত্রের জায়গা দখল করছে প্লাস্টিক-সিনথেটিকের সামগ্রী।

একসময় আমাদের দেশে মাটির তৈরি নানা তৈজসপত্রের আধিক্য থাকলেও প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে মাটির জিনিসপত্রের ব্যবহার কমে গেছে অনেকাংশে। তবে মাটির সব জিনিস কিন্তু হারিয়ে যায়নি। গ্রামে এখনো রুটি সেঁকতে খোলা ব্যবহার করা হয়। পানি রাখতে স্থানভেদে কুজো, শুরাই, মটকি, কোলাকলসি, ঘট ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে ভাত রান্না করতে হাঁড়ি, তরকারি রান্না করতে কড়াই অথবা বাগি, ভাতের মাড় গালাতে আউত্তা, সবজি-তরকারি রাখতে খোরা, ভাত খাওয়ার প্লেট হিসেবে বাসন বা সানকি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের ব্যবহারিক মৃৎপাত্র
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

মাটির তৈরি নানা পট-পটারি, ফুলদানি, টব ও বাহারি মাটির হাঁড়ির কদর আছে শহরে। শহরবাসী ঘর সাজাতে অনেকেই মাটির সামগ্রী ব্যবহার করেন। এ ছাড়া বিশেষ ব্যবহারে ক্ষেত্রে, যেমন আখের গুড় রাখতে ব্যাপকভাবে জালা বা জাইল্লা ব্যবহার করা হয়। চ্যাপাশুঁটকি তৈরি প্রক্রিয়া ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত জাইল্লার ব্যবহার আবশ্যকীয়। একসময় সারা দেশে গরুর খাবার পরিবেশনের কাজে চাড়ির ব্যবহার ছিল। দেশের কোথাও কোথাও এখনো চাড়ির ব্যবহার আছে। সমুদ্রে গমনের সময় উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ পানীয় জলের সংস্থানে মাটির কোলা ব্যবহার করেন। বিশেষ করে সুন্দরবন–সংলগ্ন বসবাসকারী মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে কোলা ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। মৌয়াল, মৎস্যজীবী, বনজীবীরা সুন্দরবনে বা সাগরে গমনাগমনে নৌকায় পানের উপযোগী স্বাদুপানি বহনে এসব পাত্র ব্যবহার করেন। এ ছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণেও জাইল্লা-মটকি ব্যবহার করা হয় উপকূলীয় অঞ্চলের বাড়ি বাড়ি। সুন্দরবন–সংলগ্ন কালীগঞ্জের ফতেহপুর বাঁশবাড়ি পালবাড়িতে জাইল্লা ও মটকি তৈরি হয় এখনো।

শুধু পাহাড়ের দুটি জেলা রাঙামাটি ও বান্দরবান ব্যতিরেকে দেশের সব জেলাতেই মাটির পণ্য তৈরি হয়। পাহাড়ের তিনটি জেলায় মৃৎপাত্র সরবরাহকারী হচ্ছে খাগড়াছড়ি ও চকোরিয়ার কুমারেরা। খাগড়াছড়িতে মুসলমানেরা মাটির পাত্র তৈরি করেন। চকোরিয়া পালবাড়ি, যাঁরা সাধারণত পানীয় প্রস্তুত ও পূজার ঘট-পাত্র তৈরি করে থাকেন। খাগড়াছড়িতে তৈরি কলস পাহাড়ের জুমঘরে ব্যবহৃত হয়। পাহাড়ে চলাচলকারী পথিকের বিশ্রামের জন্য নির্দিষ্ট দূরত্বে জুমঘর থাকে।

সেখানে পিপাসার্ত পথিকের জন্য বিশ্রাম ও পানের পানি রাখা থাকে একটা কলসে; পাশে একটা বদনা থাকে, সেটা দিয়ে পথিক তাঁর পিপাসা নিবারণ করেন। যাঁকে তাঁরা ‘ওখক-কাড়া’ বলেন। একটা লক্ষণীয় বিষয় হলো, একমাত্র খাগড়াছড়ির মাটির কারিগরেরাই মুসলমান। প্রাচীনকালে হিন্দু মৃৎশিল্পীদের রুদ্রপাল আর মুসলমান মৃৎশিল্পীদের কুলাল বলা হতো বলে জানা যায়। মাটির বদনা এখন শুধু খাগড়াছড়িতেই তৈরি হয়ে থাকে। পাহাড়ি পথে জুমঘরে পথিকের তৃষ্ণা নিবারণের নিমিত্তে পানিবোঝাই ‘কলসি ও বদনা’ রাখা হয়।

সনাতন ধর্মের আচার–অনুষ্ঠানে ঘটের ব্যবহার আবশ্যকীয়। ফলে প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই মৃৎপাত্র পাওয়া যায়। প্রতিটি উপজেলাতে প্রতিমাশিল্পী কদর আছে ধর্মীয় কারণে। একই কারণে মহাদেবের তুষ্টির জন্য কলকির ব্যবহার অত্যাবশ্যক। কাজেই কলকির ব্যবহার দেশের সর্বত্রই। বান্দরবানসহ বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চলে চুয়ানি বানাতে মাটির বিশেষ রকমের হাঁড়ি ব্যবহার করা হয়। মধুপুর কিংবা শেরপুর চ্যু বানাতে মাটির ছোট-বড় মটকি ব্যবহার করা হয়।

কালিয়াকৈরের টেপাপুতুল
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

সুন্দরবন–সংলগ্ন বাঁশবাড়ি (ফতেহপুর), কালিগঞ্জ, দেবহাটা পালবাড়িতে ব্যবহারিক সব পাত্রই হয়, তবে প্রধানত মটকি ও জালার ব্যবহার এখানে সবচেয়ে বেশি বলে তৈরিও হয় বেশি পরিমাণে। পঞ্চগড় গেলে দেখা যাবে, দেশের সর্ব-উত্তরের জনপদে সাধারণত পানির রাখার কলস, ভাতের হাঁড়ি, রুটির তাওয়া, তরকারি রান্নার কড়াই অনেক বেশি ব্যবহার করা হয়। দেশের পশ্চিমাঞ্চলে ভারতের মালদহের প্রভাব দৃশ্যমান। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারঘরিয়া কুমারবাড়িকে উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়, যেমনটা ধরা যায় দক্ষিণাঞ্চলের ফতেহপুর কুমারবাড়িকে। এ ছাড়া রাজশাহীর প্রেমতলী পালবাড়িতে তৈরি লম্বা মুখের কলস, যাকে স্থানীয়রা শুরাই বলেন, এর ব্যবহার জেলার সর্বত্র। মাটি এবং বালুমাটির মিশ্রণে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি এই শুরাইতে পানি ঠান্ডা থাকে। টেপাপুতুলের জন্য বিখ্যাত ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা। মনসাপূজায় ব্যবহৃত ব্যতিক্রমী মনসার ঘটের জন্য ঝালকাঠির শিমুলেশ্বর পালবাড়ি। এ ছাড়া জুড়ি, বড়লেখা, বিক্রমপুর, মানিকগঞ্জ, ঝিনাইদহ, রাজবাড়ীতে মনসার ঘট তৈরি হয়। লক্ষ্মীপূজায় ব্যবহৃত লক্ষ্মীর সরার জন্য বিক্রমপুরের বাসাইলের ভেঙ্গু পালের বাড়ি বিখ্যাত। এ ছাড়া নরসিংদী, ধামরাই ও সাভারে লক্ষ্মীসরা হয়।

এদিকে ভাত রান্নার হাঁড়ির জন্য নড়াইল বিখ্যাত। নড়াইলের দিঘলিয়া অথবা কুরুলিয়ার ভাতের হাঁড়ি যায় মৃৎশিল্পের গুরুবাড়ি বরিশালে। বিক্রমপুরের সিরাজদিখানের শেখরনগরে আছে জাইল্লা বানানোর উৎকৃষ্ট কারিগর। মাদারীপুরের বিপুল পাল চাকায় জাইল্লার ওপর এবং নিচের অংশ আলাদাভাবে বানিয়ে রাখেন। শেখরনগরের দেখা যায় পুরো পরিবার মিলে সেগুলো পুরোনো মাটির জাইল্লা বা খাঁজের ওপর রেখে কাঠের গইড়া দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে দুই অংশ জোড়া লাগিয়ে পূর্ণাঙ্গ জাইল্লার রূপ দেন। এই জাইল্লা কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে চ্যাপাশুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে ব্যবহৃত হয়। কিছু পরিমাণ আখের গুড় রাখার কাজেও ব্যবহৃত হয়। তবে আকারে বড় হওয়ার কারণে গুড় রাখার কাজে কম ব্যবহার হয় শেখরনগরের জাইল্লা।

রাজবাড়ীর পালবাড়িতে অপেক্ষাকৃত ছোট জাইল্লা তৈরি হয়। যেগুলো আখের গুড় রাখার কাজে বেশি ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ পালবাড়ির ছোট এবং বড় লম্বাকৃতি জাইল্লা খেজুরের গুড় রাখার কাজে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া জাইল্লা হয় নেত্রকোনার বিরিশিরির নাজিরপুর পালবাড়িতে। গরুর খাবার দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা মাটির চাড়ি, যা একসময় দেশের সর্বত্র চোখে পড়লেও এখন শুধু দেশের পশ্চিমাঞ্চলে দেখা যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারঘড়িয়া ও রাজশাহীর প্রেমতলীতে এসব চাড়ি তৈরি হয় প্রচুর। রাজশাহীর প্রেমতলী পালপাড়ার পালেরা পানি ঠান্ডা রাখার জন্য এঁটেল ও বালুমাটি মিশিয়ে একরকমের কলসি তৈরি করেন, যা খাওয়ার পানি রাখার কাজে ব্যবহার করা হয়। এই কলসিকে তাঁরা সুরাই বলেন। দেশের সর্ব-উত্তরের জনপদ পঞ্চগড়ের ধাক্কামারা ছাড়িয়ে মালিপাড়া গ্রামে প্রবেশমুখেই চোখে পড়বে মাটির হরেক তৈজসপত্র। এখানকার পালবাড়িতে কালো রঙের কলসির খুব কাটতি। এসব কলসি পানি গরম করার কাজে ব্যবহার করা হয়। আরও একটি বিশেষ দিক হলো, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ে এখনো মাটির সাজিতে পান রাখা হয়। তবে বর্তমান সময়ে বহুল ব্যবহৃত চায়ের কাপ সারা দেশে পাওয়া গেলেও দামের দিক দিয়ে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের পিরোজপুর পালবাড়ি, ঢাকা দক্ষিণের পালবাড়ি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারঘড়িয়া পালবাড়ির চায়ের কাপ সবচেয়ে কম মূল্যে পাওয়া যায়। যার মূল্য ২ টাকা।

এ ছাড়া ব্যবহারিক মাটির পাত্রের জন্য বরিশালের পালবাড়ির কুমারদের তৈরি আউত্তা-খোরা-বাসন-কলসি বিখ্যাত। যশোরের মনিরামপুরে ঘরের ছাউনির টালি হয় দেদার, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের পালপাড়ায় হয় দালানের ছাদের পানি নিষ্কাশনের পাইপ।

মাদারীপুর-বিক্রমপুর-ঢাকা-মধুপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চলে চাকার ব্যবহার খুব কম। তবে এখানে ছাঁচে নানা তৈজসপত্র তৈরি হয়। ঢাকার রায়েরবাজারের পালদের সেই সুদিন আর নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মৃৎশিল্প বিভাগের প্রধান মরণচাঁদ পাল গত হয়েছেন। এর আগে থেকেই রায়েরবাজারের মৃৎশিল্পের বিদায়ঘণ্টা বাজে। এখন বরিশালের তৈরি মাটির তৈজসপত্র বিক্রি ও তন্দুর রুটির চুলা বানানোর মধ্যে রায়েরবাজারের মৃৎশিল্পীদের কর্ম সীমাবদ্ধ। ঢাকার রায়েরবাজারের গদিঘর, বেড়িবাঁধ এলাকা; গেন্ডারিয়ার আরসিনগেট; ডেমরার সারুলিয়া; নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে আছে মাটির নানা পণ্যের পাইকারি গুদাম। বরিশাল-সাভার-ধামরাইসহ নানা জায়গার মাটির পাত্রগুলো নৌকায় করে এসব গুদামে পৌঁছে যায়। সেখান থেকে দোয়েল চত্বরের খুচরো বিক্রেতারাসহ অন্যরা কিনে বিক্রি করেন। এই তিন হাত বদলসহ নানা কারণে মৃৎশিল্পের সামগ্রীগুলোর দাম বেড়ে যায়। কাজেই কুমারেরা কিন্তু সেই অর্থে তেমন লাভবান হতে পারেন না।

মৃৎশিল্পীদের কুম্ভকার বা কুমার বলা হয়। যেখানে মৃৎপাত্র তৈরি হয়, তাকে কুম্ভশালা, কুমারবাড়ি বা কুমারশালা বলা হয়। কাদামাটি দিয়ে তৈরি মৃৎশিল্পকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়—মাটির পাত্র, পাথুরে পাত্র ও পোর্সেলিন। তবে ঐতিহাসিকেরা মৃৎশিল্পকে দুই ভাগ ভাগ করেছেন—চারুকলামূলক মৃৎশিল্প ও কারিগরি মৃৎশিল্প। শৈল্পিক ছোঁয়ার পরিমাণ বেশি এবং সাধারণত গৃহস্থালি ব্যবহারের চেয়েও শোভাবর্ধনে বেশি ব্যবহৃত হয় এগুলো চারুকলামূলক মৃৎশিল্প। আবার যা সাধারণত ততটা নকশা করা থাকে না এবং গৃহস্থালি কাজে বেশি ব্যবহৃত হয়, তাকে কারিগরি মৃৎশিল্প বলে।

আমাদের দেশে মাটির তৈজসপত্র ব্যবহারের ইতিহাস

এই অঞ্চলের জনবসতির ইতিহাসের প্রায় সমান। একসময় বরেন্দ্র অঞ্চলে মাটির পণ্য পোড়ানোর কাজে মহিষের চামড়া ব্যবহার করা হতো বলে জানা যায়। মহিষের চামড়ার আগুনে পোড়ানো হাঁড়ি–পাতিলের রং হতো লালচে বাদামি। আর এই রকমের বস্তগুলোকে টেরাকোটা বলা হতো। সেই সময়ের টেরাকোটাগুলোর রংও তাই লালচে বাদামি। এখনো তেমনই হয়, তবে মাটি পোড়ানোর কাজে আর চামড়া ব্যবহার করা হয় না। গড়পড়তা একটা কথা সবাই বলে থাকেন, মৃৎশিল্প ‘হারিয়ে যাচ্ছে’। এই কথার সঙ্গে সব সময় দ্বিমত পোষণ করি। আসলে আমাদের সব শিল্পই তার নিজের জায়গায় আছে এবং থাকে। আমরা তার খবর রাখি না। মৃৎশিল্পের বেলাতেও একই কথা প্রযোজ্য। যাঁরা শিল্পচর্চা করেন, তাঁদের মধ্যে কতজন আছেন দেশের ঐতিহ্যবাহী এবং এখনো জৌলশপূর্ণ সুন্দরবন–সংলগ্ন সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের ফতেহপুরের কুম্ভপাড়ার জয়দেব পালের নাম জানেন! কিংবা চাঁপাইনবাবগঞ্জের বারঘরিয়ার নির্মল পালের নাম জানেন। আরও সহজ করে বললে, রাজশাহীর বসন্তপুরের শখের হাঁড়ির কিংবদন্তি শিল্পী সুশান্ত পালের নাম জানেন কতজন? ১৮৮৩ সালে করা ব্রিটিশ-ভারতের প্রথম সিভিল সার্জন ডা. ফওনস নরটন জেমস ওয়াইজের করা শুমারি অথবা এরও প্রায় শতবর্ষ পর ১৯৭৪ সালে করা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও কামরুল হাসানের তত্ত্বাবধানে লোকশিল্প সমীক্ষাই আমাদের লোকশিল্পের ভুক্তি–ব্যবহার, বিবেচনাকার্যে, মূল্যায়নে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কেউ কেউ আবার প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা বলে আরও দুই কদম এগিয়ে, অনলাইন থেকে তথ্য নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে থাকেন। যার কারণে সেই পুরোনো ভুক্তিই বারবার উপস্থাপিত হয়, পুরোনো মন্তব্যের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে ভিন্ন নামে।

চিত্রিত মৃৎশিল্প: লক্ষ্মীসরা
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি বাংলাদেশের মৃৎশিল্পের সঠিক তথ্য নতুন করে তুলে ধরা প্রয়োজন। তার চেয়ে বড় কথা, লোকগবেষক ও লোকসংস্কৃতিপ্রেমীদের জন্য একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করা প্রয়োজন। একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক সমীক্ষার প্রয়োজন আমাদের। কিন্তু এই বিশাল কাজ ব্যক্তিপর্যায়ে সম্ভব নয়, তবে কাজটা করতে হবে। এই চিন্তা থেকে লোকসংস্কৃতির একটি শাখা ‘মৃৎশিল্প সমীক্ষা’র কাজ নিজেই শুরু করি। তা–ও প্রায় ১২ বছর হয়ে গেল। ঘুরে বেড়াচ্ছি দেশের বিভিন্ন এলাকার কুমার পাড়ায়। এই কাজে উৎসাহ-পরামর্শ দিয়ে সঙ্গে আছেন বর্তমান সময়ের লোকসংস্কৃতির অন্যতম প্রণোদনাদাতা ও লোকসংস্কৃতি–গবেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন শিল্পী নিসার হোসেন। নিসার স্যার প্রতিনিয়ত আমার কাজের মূল্যায়নের মাধ্যমে আমার ভেতরের আগ্রহটা আরও বাড়িয়ে দেন। আমি আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করি।

এর মধ্যে ২০১৭ সালে ‘জয়নুল উৎসব’-এ জয়নুল গ্যালারিতে আমার ‘লোকমেলা-পার্বণ’-এর ছবি নিয়ে একটি প্রদর্শনী ও ২০২১ সালের জয়নুল উৎসবে ‘বাংলাদেশের ব্যবহারিক মৃৎপাত্র’ নামে জয়নুল গ্যালারিতে আমার সংগৃহীত মৃৎপাত্র থেকে ‘ব্যবহারিক মৃৎপাত্র’গুলো নিয়ে আরও একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেন; যা আমার এই পরিশ্রমলব্ধ কাজের একটা মূল্যায়ন ও প্রণোদনা বলে আমি মনে করি। এ ছাড়া ইউডার চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক শিল্পী আলাউদ্দিন আহমেদের প্রেরণা ও পরামর্শ বিভিন্নভাবে প্রেরণা জুগিয়েছে।

সম্প্রতি বাহারি নকশার মাটির তৈজস, ব্যবহারিক জিনিস এবং ঘর সাজানোর নানা পণ্য পাওয়া যায় বাজারে। এর চাহিদাও প্রচুর। বরিশালের বাউফল, কুমিল্লার বিজয়পুর ছাড়াও রংপুরের ও কুষ্টিয়ায় গড়ে উঠেছে কলচালিত চাকে মসৃণ এবং নতুন নতুন নকশার নানা তৈজস; যা কিনা এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। বড় বড় কোম্পানি এসব পণ্যের বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত। কাজেই এই প্রকারের পণ্য নিয়ে বলার তেমন প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। প্রয়োজন আমাদের সনাতন মৃৎশিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা। এ দেশের আলো-বাতাসে বড় হওয়ার কারণেই হোক, আর জগতে এসে এ মাটিতে প্রথম পা রাখার কারণেই হোক, সনাতন বা আমাদের কুমারবাড়ির মৃৎশিল্পীদের পেশা বাঁচাতে সবার মাটির জিনিস ব্যবহার করা প্রয়োজন। কারণ, মাটির পণ্য বাঁচলে বাঁচবে একটি পেশাজীবী গোষ্ঠী। এ ছাড়া বিদেশি কাঁচামালে তৈরি পণ্যের পরিবর্তে দেশি কাঁচামালে তৈরি পণ্য ব্যবহারের ফলে বাঁচবে বৈদেশিক মুদ্র। এভাবে কমবে আমদানিনির্ভরতা। প্লাস্টিক, সিনথেটিক স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, মাটির তৈজস পরিবেশবান্ধব, স্বাস্ব্যসম্মতও। অতিমাত্রায় সিনথেটিক ব্যবহারের ফলে ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রোগ বাড়ছে। কাজেই আজই আপনার পাত হিসেবে ব্যবহৃত হোক একটি মাটির বাসন—সবশেষে রইল এই আহ্বান।

২০২৬ সালের ৩ আগস্ট জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া সেমিনার বক্তৃতার লিখিত রূপ