২০ শতকের নারী জাগরণের অন্যতম প্রভাবশালী সাহিত্যিক হিসেবে দেখা হয় ফ্রেঞ্চ কথাসাহিত্যিক সিমোন দ্য বোভোয়ারকে। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য সেকেন্ড সেক্স প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে। যে বইটি আবার দ্বিতীয় লিঙ্গ এবং নারী শিরোনামে অনুবাদ করেন বাংলাদেশি লেখক হুমায়ুন আজাদ। বইটি সম্পর্কে মিশেল ফুকো, জ্যঁ পল সার্ত্রে, টরিল মই, কেট মিলেট, জার্মেইন গ্রিয়ার প্রমুখ বিদগ্ধজন একবাক্যে স্বীকার করেন পাশ্চাত্যের আধুনিক নারী জাগরণের তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করে এই বই। তবে নারী জাগরণে প্রাচ্যের নারীরা যে কোনো অংশে পিছিয়ে ছিলেন না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্যথায় বাঙালি অন্তঃপুরে বসেও যে ১৯০৫ সালে বেগম রোকেয়া সুলতানার স্বপ্ন রচনা করছেন, তা সম্ভব হয়েছে মন ও মননে এই অঞ্চলের নারীরা সমসাময়িক পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের নারীদের থেকে প্রজ্ঞাবান ছিলেন বলে। যে আধুনিকতার বয়ান পাশ্চাত্য তৈরি করে, তার থেকে অবশ্যই স্বতন্ত্র হয়ে এ অঞ্চলের নারীকে দেখার অবকাশ তাই বরাবর রয়ে যায়। সুলতানার স্বপ্ন বেগম রোকেয়া যে দেখেছেন এবং সাহিত্যে সে স্বপ্ন পাঠকের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন, তার প্রাসঙ্গিকতা সে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে কীভাবে তৈরি হয়েছিল, তারও হয়তো পুনঃপাঠ আজ প্রয়োজন।
২০২৪ সালের মে মাসে বেগম রোকেয়ার অনবদ্য এই সাহিত্যকর্মকে ইউনেসকো মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড-এশিয়া প্যাসিফিক রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্তি করেছে। এই অর্জনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। জাদুঘরে সংরক্ষিত বেগম রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্ন পুস্তিকার আদি সংস্করণসহ বিভিন্ন দলিল ইউনেসকোর কাছে বিধি মোতাবেক আবেদন করে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ, এর পরিপ্রেক্ষিতে আজকের এই প্রাপ্তি। এ উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের উদ্যোগ নেয়। যার একটি বর্তমানে চলমান ‘পুনঃকল্পনায় সুলতানার স্বপ্ন’ বা ‘রিইমাজিনিং সুলতানাস ড্রিম’ প্রদর্শনী। প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করা হয়েছে গত ডিসেম্বরের ৬ তারিখে। ১৯ জন নবীন শিল্পীকে নিয়ে অভিনব এই প্রদর্শনীর আয়োজন। কিউরেটর হিসেবে সম্পৃক্ত ছিলেন শর্মিলি রহমান। প্রদর্শনীর ধারণাপত্রে শর্মিলি রহমান বলেন, ‘শিল্পীরা এখানে অস্তিত্বের অযৌক্তিকতা, কল্পনাপ্রসূত বৈপরীত্য, অদৃশ্য লিঙ্গভিত্তিক শ্রম এবং গল্পের মাধ্যমে ছবি আঁকার কাব্যিক রূপক ব্যবহার করে ক্ষমতা সম্পর্ক, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বয়ে আসা স্মৃতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের দেহের সহাবস্থানকে নতুন করে মূল্যায়ন করেছেন।’
বেগম রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্ন সাহিত্যকর্ম যখন পাঠ করা হয়, তখন পাঠকের কাছে তা যেভাবে ধরা দেয়, সে অভিজ্ঞতা থেকে একেবারে ভিন্ন এক জগতে নিয়ে যায় এই প্রদর্শনীর শিল্পীদের শিল্পকর্ম। প্রতিটি শিল্পকর্ম যেমন স্বতন্ত্র শিল্পীমনের বহিঃপ্রকাশ, আবার একই সঙ্গে প্রতিটি শিল্পকর্ম সুলতানার স্বপ্নকে ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ। এ যেন স্বপ্নের বাস্তব এক জগৎ, যে জগৎ স্বপ্ন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আবার বাস্তবতায় দর্শকের কাছে ধরা দেয়।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ষষ্ঠ তলার অস্থায়ী গ্যালারিতে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে এ প্রদর্শনী। বন্ধ থাকবে প্রতি রোববার। চলবে ৭ মার্চ পর্যন্ত।