পরাবাস্তবে ভ্রমণ

জাকিয়া খান চন্দনার দুটি চিত্রকর্ম অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

আমাদের দেশে যাঁরা সুররিয়ালিস্টিক বা পরাবাস্তববাদী ধারার শিল্পচর্চা করেন এবং ওই শিল্পরীতিকে ধারাবাহিকভাবে নিজেদের সৃজনশীলতার সঙ্গে জড়িয়ে নিজেদের অনুভূতি ও ভাবনাগুলো প্রকাশ করেন, তাঁদের একজন জাকিয়া খান চন্দনা। একক প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ বিরতি হলেও চিত্রকলাচর্চায় সচল ছিলেন। গত জুনে ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে তাঁর তৃতীয় একক চিত্রপ্রদর্শনীর পর বেশ দ্রুতই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে ২ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে চতুর্থ একক চিত্রপ্রদর্শনী।

সুররিয়ালিজম কী আর এর ইতিহাসই-বা কী বলছে? সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদ একটি শিল্প ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে সুররিয়ালিজমের উৎপত্তি ও বিকাশ মূলত ইউরোপে।

১৯২৪ সালের অক্টোবরে পরাবাস্তববাদী আন্দোলনটি ১৯১৭ সালে সুররিয়ালিজম ফরাসি কবি গিয়ম আপেলিনিয়রের উচ্চারিত শব্দ। শব্দটি মনে ধরেছিল পরাবাস্তববাদীদের। ১৯২৪ সালের অক্টোবরে ব্রেতঁ ‘পরাবাস্তববাদী ইশতেহার’ প্রকাশ করলে শব্দটি তাঁদের অধিকারে আসে।

‘হারানো ভূ-দৃশ্যের স্মৃতি’, জাকিয়া খান চন্দনা
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

আঁদ্রে ব্রেতঁ-এর মতে, এর উদ্দেশ্য ছিল—‘স্বপ্ন ও বাস্তবতার আপাতবিরোধী অবস্থাকে এক পরম বাস্তবতায় মিলিয়ে দেওয়া।’

ব্রেতেঁর সঙ্গে এই দলে ছিলেন সালভাদর দালি, ম্যাক্স আর্নেস্ট, জোয়ান মিরো, ফিনি, রেনে মাগ্রিত, লিওনোরা ক্যারিংটন, মেরেট ওপেনহেইম, ডরোথি টানিং প্রমুখ। পরাবাস্তব বৈশিষ্ট্যের অন্য অনেক বিশিষ্ট শিল্পীর মধ্যে মার্ক শাগাল, রবীন্দ্রনাথ ও ফ্রিদা কাহলো উল্লেখযোগ্য।

জাকিয়া খান যেন সুররিয়ালিজমের উদ্ভাবকদের মতো ফ্যান্টাসিকে গ্রহণ করেছেন। তাঁর চিত্রকর্ম প্রকৃতি, প্রকৃতির উপাদান এবং মানবের সরল উপস্থাপনার মাধ্যমে অস্তিত্ব ও রূপান্তরের মতো বিষয়বস্তু অন্বেষণ করে, যা সাময়িক পরিবর্তন এবং পুনর্জন্মের ইঙ্গিত দেয়। অতিপ্রাকৃত উপায়ে সামঞ্জস্য বজায় রেখে ছবিগুলোকে তিনি স্বপ্নময় পরিবেশে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন।

পর্বতসদৃশ কাঠামোর মাধ্যমে অস্তিত্বের সংকটসহ মানবজাতির ক্ষণস্থায়িত্বকে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন তিনি, আবার মানব এবং অন্যান্য উপাদানের মাধ্যমে জীবনের সম্ভাবনাকেও তুলে ধরেছেন।

‘নীরবতার চিহ্ন’, জাকিয়া খান চন্দনা
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

শিল্পীর আঁকায় নানা আকৃতি এবং খণ্ডিত ভূদৃশ্যগুলোয় সৃষ্টি ও ধ্বংসের মধ্যকার টানাপোড়েন দেখা যায়। ২০২৫ সালে তাঁর আঁকা পাঁচ গুণিতক তিন ফুট আকৃতির চিত্রপটে ‘সময়ের ঊর্ধ্বে শিকড়’ (রুটস বিয়ন্ড টাইম) শিরোনামের চিত্রে প্রত্যক্ষ করি ঘরের বাইরে জনমানবহীন মাটিফাটা চৌচির মাঠের দুই প্রান্তে নানা বস্তু সাজিয়ে এমন এক গঠন দেখা যাচ্ছে যাতে ফ্রেমের ভেতরে ছবির ফ্রেম, একটি জলকণা থেকে সৃষ্ট জলাশয়, ভাঙা মৃৎপাত্রে শিকড়বিস্তৃত কাণ্ড ও ডাল পেঁচানো পাতাবিহীন গাছ! আকাশের খোলা ছাদ দিয়ে নামছে ধবল আলো—এসব ফ্যান্টাসি! এ রকম কাছাকাছি তাঁর আরেকটি কাজের শিরোনাম—‘সূর্যালোকের জ্যামিতি’ (সানলিট জিওমেট্রি)।

জাকিয়ার আঁকা কাজগুলোয় বিশ্বের ক্রমবিবর্তনের দৃশ্যমান রূপক উপলব্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ২০২৪ সালে আঁকা ‘মহাকর্ষের মরীচিকা’ (দ্য মিরাজ অব গ্র্যাভিটি) নামে পাঁচ গুণিতক তিন ফুট আকৃতির চিত্রে যেন তীব্র ঝড়ে উপড়ানো এক প্রাচীন লোকালয় সজোরে আছড়ে পড়বে এমন এক মুহূর্তের ডিটেইল আলো-ছায়াময় ছবি!

‘তরুণদের জন্য অনুশোচনা’, জাকিয়া খান চন্দনা
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

তিনি পরাবাস্তব শিল্পের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বুনন এবং টেক্সচার প্রয়োগে চিত্রকর্মকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনে দর্শককে রস ও রহস্যে আন্দোলিত করার প্রয়াস পান। আবার প্রকৃতির মহাদুর্যোগ যেমন ঝড়, বন্যা, ভূমিকম্পের আঘাতের পর নতুন করে জেগে ওঠার সংকল্প দৃশ্যমান হয় মানবাকৃতির পাথুরে অবয়বে। যেমন, ২০২৪-এর কাজ সাড়ে পাঁচ গুণিতক সাড়ে তিন ফুট আকৃতির চিত্রকর্ম ‘নীরব পুনরুত্থান’(সাইলেন্ট রেজারেকশন)। এরূপ আরেকটি চিত্র ‘শিরাময় পৃথিবী’ (ভেইনস অব আর্থ)। ডিমের খোসার মতো ভঙ্গুর গোলাকৃতির এক ফর্মের ভেতরে এবং বাইরে গাছের বেঁচে থাকার আকুতি। এ ছাড়া জীবনের প্রতীক মানবনির্মিত একটি টুল আশাবাদিতার ইঙ্গিত বহন করে। শিল্পীর আরও কয়েকটি চিত্রকর্মের শিরোনাম—‘অবচেতনে স্থাপত্য’ (আর্কিটেকচার অব সাবকনশাস), ‘ধ্বংসের বিরুদ্ধে যাত্রা’(দ্য জার্নি এগেইনস্ট ডেস্ট্রাকশন), ‘শ্যাওলার ফিসফিসানি’ (দ্য হুইস্পার্স অব মস), ‘যেখানে সময় ভেঙে পড়ে’ (হোয়ার টাইম কলাপসেস) প্রভৃতি।

‘ভবিতব্যের বিস্ময়’, জাকিয়া খান চন্দনা
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

জাকিয়া খান তাঁর বেশির ভাগ চিত্র রচনা করেছেন ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙে। বর্ণ প্রয়োগে তিনি বাদামি, খয়েরি, কমলা, সাদাটে, কালচে, নীলের প্রাধান্য দিয়েছেন। বাস্তবানুগ ছবি আঁকার তুমুল দক্ষতা কাজে লাগে পরাবাস্তব ধারার চিত্র রচনার ক্ষেত্রে। ক্রমাগত কাজ করে করে উপকরণের স্বভাবকে পাঠ করা যায়। শিল্পী চিত্রপটে এর সারাৎসার প্রয়োগ করে দর্শকের অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিকে তৃপ্ত করতে সমর্থ হয়েছেন বলে মনে করছি। এর প্রমাণ তাঁর পরপর দুটি একক প্রদর্শনী।

অবচেতন মন ও মানস নিয়ে চিত্রপটে একের পর এক অবিশ্বাস্য সব ফ্যান্টাসি ফুটিয়ে অসাধ্য সাধন করেছেন শিল্পী। ক্রমাগত শ্রমলব্ধ শিল্পচর্চা ও শিল্পভাবনার শক্তিতে দর্শক ও শিল্পবোদ্ধাদের সামনে জাকিয়ার এই প্রকাশ যেমন তাঁর সার্থকতার পদচিহ্ন, তেমনই আমাদের চিত্রকলায় পরাবাস্তবতা চর্চার বুদ্ধিবৃত্তিক বৃদ্ধির এক উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা।

চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারির দুটি হলে প্রদর্শনীটি ৮ আগস্ট শনিবার পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে।