সুন্দরবনের প্রান্তভূমি—লবণাক্ত জল, গহিন অরণ্য, জোয়ার-ভাটার অনিশ্চয়তা আর বাঘের ভয়ের ভেতরেও মানুষের অবিচল জীবনযাপন। এই ভূগোল শুধু প্রকৃতি নয়, এক গভীর সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। মৌয়ালদের মধু সংগ্রহ, বনবিবির পুরাণ, নদীতীরবর্তী জনপদের দৈনন্দিন সংগ্রাম ও বিশ্বাস—সব মিলিয়ে সুন্দরবন এক জীবন্ত নৃতাত্ত্বিক ও নন্দনতাত্ত্বিক পরিসর। ঢাকাস্থ ব্রিটিশ কাউন্সিল অডিটোরিয়ামে ‘দ্য হাইভ অ্যান্ড দ্য’ প্রদর্শনী সেই পরিসরকেই শিল্পের ভাষায় পুনর্নির্মাণ করেছে।
পটচিত্র, আলোকচিত্র, গবেষণা ও নাট্য উপস্থাপনার সমন্বয়ে এখানে সুন্দরবনকে একটি ভূখণ্ডের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক স্থিতিস্থাপকতার প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়েছে।
বিশেষত প্রদর্শিত পটচিত্রের ভেতর চারটি স্বতন্ত্র শিল্প-স্বভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই বিষয়—অরণ্য, বনবিবির আখ্যান, মৌয়ালদের মধু সংগ্রহ এবং তীরবর্তী মানুষের জীবন—চার শৈলীর শিল্পীর হাতে চার ভিন্ন নন্দনভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। ফলে পট এখানে একরৈখিক ধারাবাহিকতা না থেকে বহুস্বরময় শিল্প-মানচিত্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে লোকঐতিহ্য সমকালীন ব্যাখ্যার ভেতর নতুন অর্থ ধারণ করেছে।
প্রথম শিল্প-স্বভাবটি লোকশিল্পী। পটুয়া শম্ভু আচার্য্যের গাজির পট লোকআখ্যানের স্বাভাবিক ধারায় নির্মিত। রঙের উজ্জ্বলতা, ধারাবাহিক দৃশ্যবিন্যাস ও চরিত্রের সরলীকৃত রূপায়ণ তাঁর পটকে স্মৃতিনির্ভর আখ্যানের ভরসায় দাঁড় করায়। বন ও মানুষের সম্পর্ক এখানে বিশ্বাসমণ্ডিত, বিপদের মধ্যেও রক্ষাকর্তার উপস্থিতি দৃশ্যমান। ঐতিহ্য তাঁর কাছে পুনরাবৃত্ত নয়, জীবন্ত উত্তরাধিকার।
দ্বিতীয় শিল্প-স্বভাবটি আধুনিক ও নথিমুখী। শিল্পী কে. কিংকর সর্দারের পটে মৌয়ালদের জীবন একটি বাস্তব চক্র হিসেবে উঠে আসে—বন বিভাগের অনুমতি, দলে সংগঠিত হওয়া, অরণ্যে প্রবেশ, ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়া, মধু আহরণ ও বাজারজাতকরণ। ইলাস্ট্রেশনধর্মী স্পষ্ট বিন্যাসে দৃশ্যগুলো সাজানো হয়েছে। রং সংযত, ফর্ম তথ্যনির্ভর, যা আমাদের দেশে এনজিওনির্ভর লোকশিক্ষার একটি নির্মাণ ধারা। লোকঐতিহ্যের কাঠামোর ভেতরে সমকালীন উন্নয়ন-বাস্তবতার উপস্থিতি স্পষ্ট। পট এখানে প্রায় একটি ভিজ্যুয়াল রিপোর্ট, নন্দন ও নথির মিলিত ভাষা।
তৃতীয় শিল্প-স্বভাবটি প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্নির্মাণের। শৈলী শ্রাবন্তী প্রাতিষ্ঠানিক প্রাচ্যধারার শিল্পী। ‘বনবিবির পট’ উল্লম্ব বিন্যাসে নির্মাণ করেছেন, যেখানে উজ্জ্বল রঙের বিন্যাস, প্রকৃতির রৈখিক কাঠামো ছবিকে ধ্যানমগ্ন নীরবতা দেয়। রেখার সংযম ও প্রাচ্য নন্দনের ইঙ্গিত মিলিয়ে শিল্পী ঐতিহ্যকে নতুন ভিজ্যুয়াল ভাষায় পুনর্বিন্যাস করেছেন। আখ্যানের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মূর্তিরূপী আবহ।
চতুর্থ শিল্প-স্বভাবটি সম্প্রদায়ভিত্তিক সহ-সৃষ্টি। কর্মশালার মাধ্যমে সুন্দরবনসংলগ্ন অঞ্চলের নারী ও শিশুরা যে পটচিত্র এঁকেছে, তা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে আবদ্ধ নয়। অনুপাতের নিখুঁততা নেই, পারস্পেকটিভের নিয়ম মানা হয়নি, কিন্তু আছে অভিজ্ঞতার সরল সত্যতা। নদী, কাদা, নৌকা, ঘরবাড়ি—সবকিছু একধরনের স্বতঃস্ফূর্ত ভঙ্গিতে ধরা পড়েছে। যাঁদের জীবন নিয়ে আখ্যান নির্মিত হয়, তারাই যখন আখ্যানকার হন, তখন পট হয়ে ওঠে আত্মপ্রতিকৃতি। এখানে শিল্প আর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন নতুনভাবে উত্থাপিত হয়েছে।
এই চার শিল্প-স্বভাব একত্রে পটচিত্রের ভেতরকার বৈচিত্র্য ও বহুস্বরকে দৃশ্যমান করে। ঐতিহ্য, নথি, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্নির্মাণ ও আত্মপ্রকাশ সব একসঙ্গে উপস্থিত। ফলে পট এখানে জাদুঘরীয় বস্তু নয়, চলমান শিল্প-সংলাপে পরিণত হয়েছে।
পাশাপাশি নাট্যদলের ‘দুখের বনবাস’ পরিবেশনা ও গবেষণাভিত্তিক প্রজেক্ট উপস্থাপনা প্রদর্শনীকে আরও বহুমাত্রিক করেছে। স্থিরচিত্রের পাশে জীবন্ত অভিনয়, পটের পাশে আলোকচিত্র ও তথ্যচিত্র—সব মিলিয়ে এটি একটি আন্তশাস্ত্রীয় অভিজ্ঞতা।
‘দ্য হাইভ অ্যান্ড দ্য হিম’ তাই কোনো চূড়ান্ত বক্তব্য নয়, বরং অরণ্য ও মানুষের মাঝখানে দাঁড়ানোর আমন্ত্রণ। এখানে পট কেবল গল্পই বলে না, একই সঙ্গে শিল্পের ভাষা, প্রতিনিধিত্ব ও ঐতিহ্যের ধারণাকেও নতুন করে ভাবতে শেখায়। এই বহুস্বরই প্রদর্শনীর মূল শক্তি।
ইউনিক ক্লাস্টার বাংলাদেশ এবং টিম প্ল্যাটফর্মের যৌথ আয়োজনে ২৩ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া প্রদর্শনটি আজ ২৬ ফেব্রুয়ারি শেষ হচ্ছে।