দুই কবির জীবনের নান্দনিক ছবি

প্রদর্শনীর একটি ছবিতে আল মাহমুদ নামাজে দাঁড়িয়েছেন শামসুর রাহমানের শ্যামলীর বাসায়, ইফতার করছেন শামসুর রাহমান। ২০০৪ সালের অক্টোবরে আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের তোলা। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

সময়কে ধরে রাখার এক নীরব শিল্প হলো আলোকচিত্র। প্রতিকৃতি আলোকচিত্রে খ্যাতিমান নাসির আলী মামুন সেই শিল্পেই সমকালীন বাংলা কবিতার দুই প্রধান কবি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের জীবন, সৃজন আর অন্তরঙ্গ মুহূর্ত তুলে এনেছেন দর্শকদের সামনে।

৪ এপ্রিল ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে শুরু হয়েছে ‘ফটোজিয়াম: লাইফ অব পোয়েট্রি’ নামে আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের তোলা কবি শামসুর রাহমন ও আল মাহমুদের আলোকচিত্রের প্রদর্শনী। তিনি প্রায় স্বাধীনতার পর থেকেই এই দুই কবির জীবনের বিভিন্ন মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করেছেন। সেখান থেকেই বাছাই করা ৫৮টি ছবি নিয়ে এই প্রদর্শনী। কয়েকটি রঙিন ছবি ছাড়া সব কটিই সাদাকালো। প্রদর্শনীর শেষ দিন ১৬ এপ্রিল। চলবে প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পর্যন্ত।

এ প্রদর্শনীতে নাসির আলী মামুন শুধু কবিদের প্রতিকৃতি তুলে ধরেননি, বরং তাঁদের জীবনযাপনের বহুমাত্রিক দিকও উন্মোচন করেছেন।

এখানে যেমন রয়েছে বিভিন্ন বয়সের প্রতিকৃতি, তেমনি আছে তাঁদের ব্যক্তিগত গেরস্তালি জীবনের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত, অফিসের কাজ, বিদেশভ্রমণ কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের দৃশ্য। ফলে এ প্রদর্শনী হয়ে উঠেছে দুই কবির জীবন ও সৃষ্টির এক প্রামাণ্য দলিল, যেখানে দর্শকেরা তাঁদের কাব্যচর্চার পাশাপাশি জীবনযাপনের বাস্তবতাও অনুধাবন করতে পারবেন।

দর্শকেরা দেখতে পাবেন দৈনিক বাংলা কার্যালয়ে কবি শামসুর রাহমান বসে আছেন তাঁর কক্ষে। ১৯৭৮ সালের কোনো এক দিনে। খোলা জানালা দিয়ে একফালি আলো এসে আলতো করে স্পর্শ করেছে তাঁর মাথাভরা ঢেউখেলানো কালো চুল, কপাল, চিবুক আর ঠোঁটের খানিকটা অংশ। পাশ থেকে তোলা ছবি। আলো-আঁধারির অনন্য মিশেলে কবির মুখ যেন হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত কবিতা।

অন্যদিকে ১৯৭৬ সালে কবি আল মাহমুদেরও একটি ছবি তুলেছিলেন নাসির আলী মামুন শিল্পকলা একাডেমিতে কবির কার্যালয়ে। সরু কালো বর্ডারের কলার আর বুকে কালো চেইন লাগানো সাদা টি–শার্ট পরে আছেন তারুণ্যদীপ্ত কবি।

মুখে স্মিত হাসি। মায়াময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ক্যামেরার লেন্সের দিকে, যেন এক নিঃশব্দ পঙ্‌ক্তিমালা।

দেশের প্রধান এই দুই কবির একসঙ্গে বেশ কিছু ছবি আছে। তখন তাঁরা বার্ধক্যে উপনীত। আল মাহমুদ শুভ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত, আর শামসুর রাহমানের মাথায় কাশফুলের মতো পালিত কেশ।

অনেকেই জানেন, একসময় এই দুই কবির মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। শীতল সম্পর্ক। বন্ধ কথাবার্তা। সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে ২০০৪ সালে তাঁদের পুনর্মিলনের উদ্যোগ নেন নাসির আলী মামুন। পবিত্র রমজান মাসে শ্যামলীতে শামসুর রাহমানের বাসায় আল মাহমুদকে নিয়ে যাওয়ার সেই ঘটনা বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে আছে।

শামসুর রাহমান সহাস্যে উষ্ণ করমর্দনে আল মাহমুদকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে এসেছিলেন নিজের শয়নকক্ষে। সেখানে দুই কবি খুবই অন্তরঙ্গ পরিবেশে লম্বা সময় ধরে আড্ডা দিয়েছেন। আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেই মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দী করেছেন আলোকচিত্রী।

অনেক বছর থেকেই নাসির আলী মামুন দুই কবির ছবি তুলছিলেন। বাড়িতে, অফিসে, বাইরেসহ বিভিন্ন স্থানে। সেই সূত্রে কবিদের পরিবারের সঙ্গেও তাঁর হৃদ্যতা সৃষ্টি হয়েছিল। কবিদের পারিবারিক পরিবেশের ছবিতে তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও ছবি তুলেছিলেন তিনি।

একসময় বেলা গড়িয়ে ইফতারের সময় এলে একত্রে ইফতার করেছেন দুই কবি। এ সময়ের এক অসাধারণ ছবি ধারণ করেছেন নাসির আলী মামুন। ঘরের মেঝেতে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে দাঁড়িয়েছেন আল মাহমুদ। আর বিছানায় ইফতারির থালা হাতে তাঁর দিক তাকিয়ে আছেন শামসুর রাহমান। প্রদর্শনীর অধিকাংশ সাদাকালো ছবির মধ্যে এই রঙিন ছবিটি যেন মুহূর্তটির আবেগকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে।

অনেক বছর থেকেই নাসির আলী মামুন দুই কবির ছবি তুলছিলেন। বাড়িতে, অফিসে, বাইরেসহ বিভিন্ন স্থানে। সেই সূত্রে কবিদের পরিবারের সঙ্গেও তাঁর হৃদ্যতা সৃষ্টি হয়েছিল। কবিদের পারিবারিক পরিবেশের ছবিতে তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও ছবি তুলেছিলেন তিনি। এমন কিছু ছবিও আছে প্রদর্শনীতে। ছবি ছাড়াও আছে তাঁদের হাতে লেখা কবিতার পাণ্ডুলিপিসহ বেশ কিছু নিদর্শন।

শামসুর রাহমানের ছবিগুলোর মধ্যে দেখা যাবে তাঁর কবিতা লেখার মুহূর্ত। চুল আঁচড়ানো, মুখে সেভিংক্রিম মাখিয়ে খৌরকর্মের প্রস্তুতি, স্ত্রীর সঙ্গে পাশাপাশি বসে থাকার দৃশ্য। দেখা যাবে কবি ওস্তাদ বাহাদুর খানের সরোদবাদন শুনছেন, রিকশায় পুরান ঢাকার রাস্তায়, শান্তিনিকেতনে—এমন অনেক দৃশ্য।

আল মাহমুদকে পাওয়া যাবে তাঁর গ্রামে দেহাতি মানুষদের সঙ্গে, মমতাময়ী মায়ের নিবিড় সান্নিধ্যে, বই পড়া, কাব্যভাবনায় গভীর নিমগ্ন হয়ে থাকার মুহূর্তে, স্ত্রী ও নাতি–নাতনিদের সঙ্গে পারিবারিক পরিবেশে।

দর্শকেরা আরও দেখতে পাবেন দুই কবি আমন্ত্রিত হয়ে গেছেন শান্তিনিকেতনে। দাঁড়িয়ে আছেন ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজের ভাস্কর্যের সামনে। কোনো এক অনুষ্ঠানে পাশাপাশি দুই কবি। একসঙ্গে আহার করছেন, মেতে আছেন আড্ডায়—এমন আরও বেশ কিছু দৃশ্য রয়েছে, যা তাঁদের অন্তরঙ্গতাই তুলে ধরবে দর্শকদের সামনে।

আলোচকিত্র সময়কে ধরে রাখে। আর মানুষের হৃদয় ধরে রাখে স্মৃতি, অনুরাগ, ভালোবাসা। এ প্রদর্শনী শুধু দুই কবির জীবনচিত্র নয়, স্মৃতি, অনুরাগ ও ভালোবাসা মিলেমিশে যেন বাংলা কবিতার এক জীবন্ত ইতিহাস হয়ে উঠেছে। এর কথা দর্শকদের মনে অম্লান হয়ে থাকবে দীর্ঘদিন।