মহাফেজখানা থেকে
মুর্তজা বশীর: ধ্রুপদি ধ্যানের শিল্পী
২০০৫ সালের ১৯ আগস্ট মইনুদ্দীন খালেদের লেখা ‘মুর্তজা বশীর: ধ্রুপদি ধ্যানের শিল্পী’ প্রকাশিত হয় প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে। এত দিন শুধু কাগজের পাতাজুড়ে থাকা লেখাটি আজ অন্য আলো অনলাইন পাঠকের সামনে তুলে ধরা হলো।
তিনি প্রেরণাবাদী, তবু শক্ত কবজিতে লাগাম ধরে সৃষ্টির ধূম্রদেশে পঙ্খিরাজে উড্ডীন থেকেছেন। রেখা তার সর্পিল হলেও শিথিল হয়নি, রং তার বস্তুর সাদৃশ্যের অনুগামী নয়, জ্যামিতির নিগড় খোঁজে। বিশ্বাসের জগতে একটা দাপাদাপি আছে। সেই দাপাদাপি ব্যাপক ভুবনজুড়ে। জগৎ-সংসারে নানা আস্থা ও অনাস্থা, বস্তুগত ও বস্তু-উত্তীর্ণ, ধরা ও অধরা, আছে ও নেই, প্রাচ্য ও পশ্চিম, মিল ও অমিল—এমন অনেক ঠিকানা আছে তাঁর, তবে একক গন্তব্য নেই। তিনি আবারও ঘুরে দেখতে চান, নিজেকে খুঁড়ে দেখতে চান আরেকটু।
তিনি ‘দুরন্ত শিশু’, ফরাসিতে যাকে বলে ‘অফ তেরিবল’। বাবা বলেছিলেন, ‘আলীগড়ে যাও।’ তিনি বলেছিলেন, ‘না, আর্ট কলেজ।’ উত্তীর্ণ-কৈশোরেই তিনি কমিউনিজমের মন্ত্রণায় দুরন্ততর হয়ে উঠেছিলেন। তবে আরও অনেক প্রতিভাবান শিল্পীর মতো শিশুবেলা থেকেই তাঁর আঁকার হাত ভালো ছিল না, ইশকুলে ড্রয়িংয়ে গোল্লা পেতেন। তাঁর রাজনীতি তাঁকে নির্দেশ দিল—পোস্টার লেখো, মানুষের দুর্দশা আঁকো। ১৯৫২-এর ভাষাশহীদ বরকতের গুলিবিদ্ধ লাশ বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন আর্ট কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মুর্তজা বশীর। শহীদের রক্তমাখা দেহে পুত্র বাসায় ফিরলে জ্ঞানতাপস পিতা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ গরীয়ান হয়ে যান। তাঁর কালো আচকান কেটে পুত্রকে তিনি বলেন, ‘আমার বাহুতে বেঁধে দাও শোকের কালো কাপড়।’ অনেক নাটকীয় সংঘাতে আহত-বিক্ষত হয়ে অনেক লোমহর্ষক ঘটনার মধ্য দিয়ে নিজেকে চালিত করে শিল্পী মুর্তজা বশীর বুঝেছেন, জীবন পরিণামে আশায় বেঁচে থাকে, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গে অভিজ্ঞ হয়, কিন্তু আত্মরতিতে সব তুচ্ছ হয়ে যায়। শিল্পের আইডিয়া-অভিযানে তিনি জীবন সচল রেখেছেন; সরল পথের অভ্যস্ততা তাঁকে আকর্ষণ করেনি, বাঁক ফিরিয়ে নতুন জগৎ দেখেছেন, নিজেকে যে নতুন বিস্ময়ে নতুন শক্তিতে পরখ করা যায় এই ধ্রুবত্বে অচঞ্চল থেকেছেন।
একাডেমি মুর্তজা বশীরকে বস্তুসাদৃশ্য আঁকার তালিম দিয়েছে, আলোছায়া মাপতে বলেছে এবং দূর ও কাছের হিসাব কষতে বলেছে। পরিমিতির জ্যামিতি তাঁর কাজে দর্শনীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ভাষা আন্দোলন, জন্মজ প্রখর মানস আর সমাজ বদলের পূর্বশর্ত তো নিজেকে বদলানো—এসবের অভিঘাতেই হয়তোবা ছাত্রাবস্থাতেই তিনি নতুন ভাষা খুঁজলেন। নতুন হয়তো তখন নতুন নয়, তবে একাডেমি ঠিক তা শিক্ষা দেয় না। শ্রমজীবী মানুষের জীবন, ভাষা আন্দোলনের লিনোকাট ও স্কেচ তাঁর শিল্পীজীবনের উষাকালের সাক্ষী।
একাডেমি তাঁকে বস্তুসাদৃশ্য আঁকার তালিম দিয়েছে, আলো-ছায়া মাপতে বলেছে এবং দূর ও কাছের হিসাব কষতে বলেছে। পরিমিতির জ্যামিতি তাঁর কাজে দর্শনীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু ভাষা আন্দোলন, জন্মজ প্রখর মানস আর সমাজ বদলের পূর্বশর্ত তো নিজেকে বদলানো—এসবের অভিঘাতেই হয়তোবা ছাত্রাবস্থাতেই তিনি নতুন ভাষা খুঁজলেন।
স্বদেশের সজীব নিসর্গ ও শ্রমজীবীদের ছন্দময় জীবন আঁকায় মুর্তজা বশীর খুব বেশি দিন তৃপ্তি ধরে রাখতে পারেননি। অনেক কাল পর তিনি যদিও শান্তি ও সান্ত্বনার বন্দরে প্রবেশ করেছিলেন, তবে তখন তিনি ক্ষুব্ধ, চেতনা তাঁর রক্তাপ্লুত। ছায়া সুনিবিড় বাংলার প্রকৃতি ও প্রকৃতিবেষ্টনে মানুষের ছবি রিপ্রেজেনটেশাল শৈলীতে তাঁর সতীর্থরা এঁকেছেন। তাঁদেরও পরিবর্তন এসেছে। তবে তিনি সেই পথ থেকে দ্রুত চলে এসেছেন। চেতনার দিক থেকে প্রকাশবাদী, চিত্রের এক্সপ্রেসিভ গুণটা তাঁকে আক্রান্ত করেছিল। ভ্যান গঘীয় দাহে তাঁর হৃদয় পুড়েছে। বিষয় হয়েছে তাঁর ‘জবাই করা দুটি মোরগ ও রক্তাক্ত ছুরি’, দীর্ঘ পথচলার সাক্ষী ‘ছেঁড়া বুট জুতা’ ইত্যাদি। এসব বিষয় নির্বাচনেই নয় শুধু, তপ্ত লাল-হলুদ রং, তির্যক স্বভাবী এলোপাতাড়ি রেখারাশি এক্সপ্রেশনিজমের আদিগুরু ভ্যান গঘকে মনে করিয়ে দেয়।
তবে সাদৃশ্যায়নের পথ যে আর সঠিক পথ নয়, একাডেমিক রিয়েলিজমে যে শিল্পের মুক্তি নেই, এই সত্য তখন অনেকেই হৃদয়ঙ্গম করে ফেলেছেন। সময়টা পঞ্চাশের দশক। শিল্পাকাশে জয়নুল আবেদিন যতই জ্বলজ্বলে নক্ষত্র হোন না কেন, পঞ্চাশের দশকের শিল্পীদের বেশির ভাগ শিল্পীই সেই নক্ষত্রের পথে ভ্রমণ করেননি। একাডেমিক রিয়ালিজমের সীমাবদ্ধতা আর জলরঙের নিসর্গদৃশ্যের মায়াময়তা—এ দুই শৈলীতেই আঘাত হানলেন শিল্পীরা। ছবি তখন বিশেষ রহস্যজালে বন্দী ছিল, প্রকৃতির কুহক চিত্রার্পিত করাই ছিল পরমারাধ্য। রিয়ালিজমের স্পষ্ট হিসাবও নয়, জলরঙের মিস্টিফায়েড অবস্থাও নয়, স্পষ্ট ফর্মের ওপর শিল্পকে দাঁড় করাতে চাইলেন তাঁরা নিরীক্ষাপ্রবণ অবলোকন থেকে প্রথমত, রহস্যভেদ করলেন প্রচল নিয়মের; তারপর আবার নতুন রহস্য ঘনীভূত হলো তাঁদের কাজে। কারণ, রহস্য ছাড়া শিল্প কোথায়। তবে তা যতই অপরিমেয় হোক না কেন, রেখা ও গড়নে তাকে পরিমেয় করেই তো চিত্রশিল্পের জন্ম। আমিনুল ইসলাম, মোহাম্মদ কিবরিয়া, হামিদুর রাহমান, মুর্তজা বশীর, কাইয়ুম চৌধুরী নয়নসুখকর বর্ণতল ভুলে জ্যামিতিক হিসাব স্পষ্ট করলেন তাঁদের কাজে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বদলালেন শিল্পীগুরু জয়নুল ও কামরুলও। গুরু ও শিষ্যরা একই সময়ে রূপান্তরিত হলেন। তবে একজন অন্যের অনুকারী হলেন না। জয়নুল ময়মনসিংহের দীঘলগলার পুতুলে, কামরুল সরাচিত্র ও কালীঘাট পটে, কাইয়ুম বিশেষভাবে বাঁশ-বেতের বুননশিল্পের দিকে চেয়ে শিল্পের নতুন ভাষা অন্বেষণ করলেন। কিবরিয়া, হামিদুর, আমিনুল, মুর্তজা কিন্তু পশ্চিমের গঠন ও সংগঠনে ধ্যানস্থ হয়েই নতুনত্বের বীজ উন্মীলিত করলেন। কিবরিয়া জাপানে, অন্য তিন শিল্পী ইউরোপে শিল্পশিক্ষা নিয়েছেন এবং পশ্চিমমুখিনতায় তাঁরা শিল্পের বৈশ্বিক রূপ অন্বেষণ করেছেন। অভিনবত্বে আকর্ষণের প্রাবল্যের কারণে বিদেশে যাওয়ার আগেই মুর্তজা বশীর স্পষ্ট জ্যামিতিকতায় কর্মের সরলীকরণের দিকে অগ্রসর হয়েছেন। ১৯৫৬ সালে ফ্লোরেন্সে শিল্পশিক্ষার জন্য যাত্রা করার আগেই এই শিল্পী ফর্মনিষ্ঠ। দেহসংস্থান বা অ্যানাটমি ভেঙে ফেলে তিনি নতুন নিয়মে বিন্যাস করতে শুরু করেন। ‘একতারাবাদক’, ‘ধানভানানি’—এসব ছবির দিকে তাকালে বোঝা যায়—অনুপুঙ্খতা নয়, মুষ্টিমেয় রেখায় কীভাবে কম্পোজিশনের নিষ্পত্তি সম্ভব।
ফ্লোরেন্সের অভিজ্ঞতা মুর্তজা বশীরের সৃজনশীলতায় নতুন আলো জ্বালিয়েছে। তিনি রূপবন্ধ বা ফর্মের বন্ধনেও অবিমিশ্র রঙে মানুষ আঁকলেন; সুখ ও দুঃখ দুই-ই আঁকলেন। তবে নয়নভরে আচমন করলেন নারীর শরীর। নারীর শরীর না দেখলে ইউরোপের শিল্প দেখা হয় না। গ্রিক, এট্রুস্ক্যান, রোমান কী তা বোঝা যায় না। যে ধ্রুপদি হিসাবটা একদিন পূর্ব-পশ্চিম শাসিয়েছে এবং আজও তার দাপট ক্ষীয়মাণ নয়, সেই শিল্পভাষা অজস্র ড্রয়িং ও পেইন্টিংয়ে তিনি আয়ত্ত করলেন। কিন্তু একদিকে অ্যানাটমির অর্জিত বিদ্যায় মানুষ ও অন্যান্য বস্তুর ভলিউম দেখানোর চমকারিত্ব দ্বিমাত্রিক পটে ত্রিমাত্রিকতার ইশারা, আবার অন্যদিকে স্পষ্ট পুরু কন্টুর রেখায় ম্যুরাল ও ম্যুরালের মতো স্পষ্ট রেখার আলংকারিকতা—দুই প্রান্তেই গতায়ত রয়ে গেল মুর্তজা বশীরের। বস্তুপৃথিবী দেখার ক্ষেত্রে সব শিল্পীই অন্তর্ভেদী ক্ষমতার অধিকারী। মানুষের নগ্নদেহ শুধু নয়, পরিচ্ছদ–আবৃত দেহও তিনি রঞ্জনরশ্মির মতো চোখের মণির জোড় তাকিয়ে দেখলেন। পরিচ্ছদ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্বিমাত্রিক পটে পরস্পরিত হয়ে ফর্মের রঙিন মানচিত্র হয়ে গেল। কখনো সামান্য ভলিউম দেখানো, কখনোবা বিভিন্ন বর্ণের পরস্পরিত সম্পর্কের কারণে উঁচু-নিচু ও আগে-পিছের ইঙ্গিত তৈরি হলো। মুর্তজা বশীর এভাবে কিউবিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এক স্বচ্ছ শিল্পভাষার জন্ম দিলেন।
ফ্লোরেন্সে শিল্পী মুর্তজা বশীরের নতুন জন্ম হয়েছে। রেনেসাঁর সূতিকাগার যদিও তাঁর এক প্রধান তীর্থ, তবু মিকেলেঞ্জেলো, দ্য ভিঞ্চি নয়, তাঁর প্রিয় রেনেসাঁর উষালগ্নের শিল্পীরা। সিমাবু, জত্তো, দুচ্চো, ফ্রা অ্যাঞ্জেলিকো, বত্তিচেল্লি। মুর্তজা মোনালিসার হাসির দিকে তাকাননি, বত্তিচেল্লির ভেনাসের চুলের কুণ্ডলী খুলে চিকুররেখা নিয়েছেন, মিকেলেঞ্জেলোর আয়তনিক গুরুভার নয়, ফ্রা অ্যাঞ্জেলিকোর দেবদূতের রঙিন পাখা দেখেছেন তিনি গভীর বিস্ময়ে। মুর্তজা বশীর একান্ত বাস্তব, আবার পরমুহূর্তেই অশরীরী বস্তুর অতীত কোনো দূরের উৎস থেকে আলো আহরণ করতে চান।
শিল্পাকাশে জয়নুল আবেদিন যতই জ্বলজ্বলে নক্ষত্র হোন না কেন, পঞ্চাশের দশকের শিল্পীদের বেশির ভাগ শিল্পীই সেই নক্ষত্রের পথে ভ্রমণ করেননি। একাডেমিক রিয়েলিজমের সীমাবদ্ধতা আর জলরঙের নিসর্গদৃশ্যের মায়াময়তা—এ দুই শৈলীতেই আঘাত হানলেন শিল্পীরা।
ষাটের দশকে মুর্তজা বশীর আঁকেন ‘দেয়াল’ সিরিজ। দাঁত বের করা আয়তাকার ইটের দেয়াল, পলেস্তারাখসা দেয়াল, শেওলাজমা ও চিড় ধরা দাগটানা, আঁকিবুঁকি ভরা দেয়াল—এসব বিষয় নির্বাচনে মুর্তজা আমাদের শিল্পচর্চাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন। সব বড় শিল্পই শিল্পীর মানসিক অবস্থার স্মারক। নোনা ধরা, চিড় ধরা দেয়ালে এ শিল্পীর অস্তিত্বের সংকট অনূদিত হয়েছে। শিল্পী দেয়ালবন্দী হয়েছেন। একা হয়েছেন। খুব কাছ থেকে নিজেকে দেখেছেন। বিমূর্তপ্রায় প্রকাশশৈলীর মধ্যে মানবসত্তার সংকট মূর্ত করে এই শিল্পী একটা বড় ঘটনার জন্ম দিয়েছেন। বস্তুনিরপেক্ষ শিল্পভাষার শিল্পীচূড়ামণি কিবরিয়ার পথানুসারী না হয়েও মুর্তজা বশীর বিমূর্ত শৈলীর নতুন ভাষায় মানবসত্তার গভীরতর স্তর উপস্থাপন করেছেন। যদিও কিবরিয়া ও মুর্তজার মনোভঙ্গিতে বিস্তর ফারাক রয়েছে। মুর্তজা কিবরিয়ার চেয়ে অনেক বেশি আশাবাদী চৈতন্যের সংবাদ পরিবেশন করেন। তাঁর ‘দেয়াল’ একদিকে যেমন আহত অন্তরের জর্জরিত রূপ প্রদর্শন করে, অন্যদিকে এই ‘দেয়ালে’ই আশার আলো ও সুবিন্যাসের গাঁথুনি প্রকটিত হয়ে থাকে। একটি ভাঙা দেয়াল যখন হাহাকার করে, অন্য দেয়াল তখন বিন্যাসের দৃঢ়তায় আস্থার শর্ত জানান দেয় এবং এই দেয়ালে পোড়ামৃত্তিকার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিচর্যাগুলো চোখকে শান্তি দেয়।
মুর্তজার বীক্ষণ কেবলই আণুবীক্ষণিক হতে চায়। তিনি ব্যবচ্ছেদ করে বুঝতে চান বস্তুর অন্তর্বয়ন। সত্তরের দশকে তিনি রচনা করেন ‘এপিটাফ’। সবই পাথরের গড়ন। প্রাকৃতিক কাঠামো। স্পষ্ট রেখার জ্যামিতি নয়। বৃত্তাকার ও কৌণিক গড়নের মেলবন্ধনের কম্পোজিশনই এখানে বড় কথা নয়, হালকা হলুদ, লাল বর্ণবলয়ের মধ্যে কেমন একটা সমাহিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, নিবেদিত হয়েছে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। ফর্মের শুদ্ধতা শিল্পীদৃষ্টির স্বচ্ছতা প্রমাণ করেছে।
সত্তরের দশকের শেষে মুর্তজা বশীর স্পষ্টত ধর্মীয় অনুষঙ্গনির্ভর শিল্প রচনা করেন। জায়নামাজের ডিজাইন আর বৃত্ত ও চৌখুপিতে যেভাবে তাবিজ লেখা থাকে, তা-ই হয় তাঁর বিষয়। নীল ও সবুজ রঙের প্রশস্ত জমিন, সোনালি পাড়ের মতো বর্ণপ্রস্থের বৃত্তের মধ্যে সেঁধিয়ে যাওয়া আরেকটি বৃত্ত এবং মধ্যখানে আরবিতে আল্লাহ-রসুলের নাম। এই বিষয় নির্বাচনে তাঁর বিশ্বাসের পরিবর্তন ঘটে থাকবে। তবে অলৌকিক কোনো শক্তির নির্দেশেই এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় বিষয় যে যার নিয়মে আচরণ করে চলেছে—এই ভাবনার মুর্তজা বশীরকে আমরা ইতিপূর্বে দেখিনি। কিন্তু মরমি সন্তাপ তাঁর স্পস্টতর হয়, যখন তিনি কলেমা তাইয়েবা নিজস্ব নিয়মের ক্যালিগ্রাফি ও বর্ণযোজনে রূপায়িত করেন। কান্তোস সিরিজে নির্ভেজাল রঙের উদ্গিরণ ও কলেমার অক্ষরের বর্ণাপ্লুত হওয়ার বিষয়টি পাশাপাশি রেখে তুলনা করলে মনে হয় শিল্পী সর্বত্রই সৃজনকর্তার উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করেছেন। কখনো ধর্মীয় বাণী লিখে, কখনোবা শুধুই বর্ণের উদ্গিরণে তিনি সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করছেন। তন্ত্র ও মন্ত্রের পথেও অবশ্য মুর্তজা বশীর দুষ্পাঠ্য বর্ণতল বা রেখার কুণ্ডলায়নে যাননি।
ফ্লোরেন্সের অভিজ্ঞতা মুর্তজা বশীরের সৃজনশীলতায় নতুন আলো জ্বালিয়েছে। তিনি রূপবন্ধ বা ফর্মের বন্ধনেও অবিমিশ্র রঙে মানুষ আঁকলেন; সুখ ও দুঃখ দুই-ই আঁকলেন। তবে নয়নভরে আচমন করলেন নারীর শরীর। নারীর শরীর না দেখলে ইউরোপের শিল্প দেখা হয় না।
মুর্তজা বশীর বলেন, কেউ একজন আছেন তাঁকে দিয়ে আঁকিয়ে নেন, তিনি নিজে আঁকেন না। রবীন্দ্রনাথও এ রকম অধরা প্রেরণায় বিশ্বাস করতেন। একান্ত ধর্মীয় বিশ্বাস ছাড়াও অধ্যাত্মের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি শোনান মুর্তজা বশীর তাঁর ‘প্রজাপতির ডানা’ সিরিজের কাজে। অনেক দিন তিনি রঙিন ডানা এঁকেছেন। আতশি কাচের ভেতর দিয়ে প্রজাপতির পাখার রং ও গড়ন দেখেছেন তিনি। ঠিক ডানা আঁকতে চাননি, ডানার ঝাপটা আঁকতে চেয়েছেন আর ডানার ঝাপটা মানে বর্ণেরই ঊর্মিমুখর অবস্থা। প্রজাপতির ডানাকে উপলক্ষ করে বর্ণিল গতির বিবিধ ব্যঞ্জনা চিত্রার্পিত করেছেন শিল্পী। এখানে রূপমুগ্ধতার অন্তরালে মরমি পবিত্রতা কাজ করছে—এমন কথা শিল্পরসিকের মনে হতে পারে।
মুর্তজা বশীর কায়াপ্রধান, ছায়ায় তিনি বিশ্বাসী নন। কিন্তু জগতে যত ছায়া, তত কায়া। স্পষ্ট বলিষ্ঠ প্রান্তরেখা বিশুদ্ধ রং, গড়ন ও গঠনের জোরে দ্বিমাত্রিক পটের, দ্বিমাত্রিক গুণের বৈশিষ্ট্য নষ্ট না করে কীভাবে ছবি রচনা করতে হয়, তার অনেক স্বাক্ষর দিয়েছেন তিনি। তবু তাঁর নারী মায়াবী বিষাদিনী। বাইজান্টাইন ম্যুরালের সন্তের চোখ যেমন মৃত মাছের মতো নীরব, তেমনি তাঁর নারীর চোখ। নারী এঁকেছেন তিনি গ্রিক রোমান ক্ল্যাসিকের নিয়মে। আধুনিক ক্ল্যাসিক পিকাসোর মতো এবং বাংলার লোকশিল্পের ভাষায় মৃদু ইঙ্গিতেও। কামরুল সরাচিত্রের রেখা, কালীঘাট ও পিকাসো মিশিয়ে যে শিল্পভাষার জন্ম দিয়েছেন এবং যামিনী রায়ের লোকশিল্পায়ন—এর কোনোটাই মুর্তজা বশীর গ্রহণ করেননি। তিনি ফর্মের ভাঙাগড়ার খেলায় পিকাসোর ঘনিষ্ঠ। অনেক সময় মনে হয়, পশ্চিমই তাঁর ছবিতে বেশি মাত্রায় সাংকেতিক। তবে নারীর মুখে যে ছায়া তা নিয়তি, তাদের চোখের তারায় করুণা। জীবনের অনিত্যতা ভাবনায় তাদের চোখ স্তব্ধ—এখানেই মুর্তজা বশীর প্রাচ্যমনের ভাবনার সারাৎসার স্ফূরিত করে দিয়েছেন, হয়তোবা তা প্রাচ্যের নয়, তা বৈশ্বিক।
(সামান্য পরিমার্জিত)