জাদুবাস্তবতার ধারালো টানে শিশির ভট্টাচার্যের ‘রেখাচিত্র’

কলাকেন্দ্রে চলছে শিল্পী শিশির ভট্টাচার্যের একক প্রদর্শনী—‘রেখাচিত্র’ছবি: কলাকেন্দ্রের সৌজন্যে

শিল্পী কী চিন্তা করে, সে প্রশ্নের চেয়ে বড় কথা, আমরা তাঁর শিল্পকর্ম দেখে কী চিন্তা করতে পারছি। দর্শক তাঁর নিজস্ব ভাবনাশক্তি দিয়েই শিল্পকে আবিষ্কার করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে একই শিল্পকর্মের একাধিক ব্যাখ্যা হতে পারে। সম্প্রতি শুরু হওয়া শিল্পী শিশির ভট্টাচার্যের একক প্রদর্শনীর রেখাচিত্রগুলো নিজেই যেন দর্শকের চোখে আঙুল দিয়ে জিজ্ঞেস করছে, তুমি কী ভাবতে চাও?

তাঁর রেখার জাদু আমাদের প্রচলিত ভাবনার জগৎ থেকে সহসা টান মেরে অন্য এক জগতে নিয়ে ফেলে। সে জগতে কখনো মানুষ হয়ে যায় গাছ, শরীর থেকে বের হয় লতাপাতা, কখনো দুটো কান হয়ে যায় পাখির ডানা কিংবা কাগজের শরীরজুড়ে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকে একাধিক চোখ, সে চোখ হয়তো আমাদের দৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় সূর্যের কাছাকাছি। কিংবা সূর্য স্বয়ং এসে উপস্থিত হয় বারবার সেই পরাবাস্তব জগতে। প্রায় সব ছবিতেই একটা নৌকা বা মাছ যেন সুখ-দুঃখের গভীর জলে ভেসে বেড়ায়। সেই মাছ আলেয়ার মতো ধরা দেয়, তো দেয় না। আবার কখনো কাক এসে অশনিসংকেত দেয় এই সব দৃশ্যের কোলাহলে। আর এত সব অদ্ভুত ঘটনা যেন ঘটে যাচ্ছে শিল্পীর ঘুমের ঘোরে, চেতন ও অবচেতন মনের এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ, যা আমাদের চমকে দেয়।

শিশির ভট্টাচার্যের রেখাচিত্র
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

এই ঘুম আসলে ঘুম নয়; এক পরাবাস্তব সংযোগ। শিল্পীর ভাষ্যে, চোখ খোলা রেখে দেখেছি আবার চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে নানা রকম স্বপ্নও দেখেছি। ডান দিকে কাত হয়ে ঘুমালে এক রকম আবার বাঁ দিকে কাত হয়ে ঘুমালে অন্য রকম। কী দেখলাম ,তার ব্যাখ্যা করলাম না।

শিশির ভট্টাচার্যের রেখাচিত্র
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

ব্যাখ্যাহীন হলেও সব যেন আমাদের চেনা। শিল্পী শুধু একটা রসাত্মক ভঙ্গিমা নিয়ে রূপ বদল করে দিচ্ছে আমাদের চারপাশে থাকা বিষয়বস্তুগুলোকে। থালায় একটা মুখ হাসছে, চোখ উড়ছে, মস্তিষ্কের উনুনে দেশলাই জ্বালানো হচ্ছে, কেউ আলপিন মেরে হাত জোড়া দিচ্ছে—এসব প্রচলিত অর্থের বিবর্তন ঘটায়। শিল্পীর ছবিতে বরাবরই স্যুরিয়েলিজম বা পরাবাস্তববাদের বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যার মধ্যে সামাজিক অস্থিরতা, অনৈতিকতা, সুখ-দুঃখ, বিষণ্নতা সব মিলেমিশে অস্ত্রে পরিণত হয়, যা দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য।

পরাবাস্তববাদের প্রবর্তক শিল্পী সালভাদর দালির ছবিতে যেমন গলিত বস্তু, ভাসমান প্রাণী ও বিকৃত মানবদেহ দেখা যায়, যা বাস্তবের বস্তু হলেও ভিন্ন অর্থ বহন করে; তেমনই এক বিভ্রান্তি তৈরি করে শিল্পী শিশির ভট্টাচার্যের ছবিগুলো। তবে এসব ছবি শুধু রেখা দিয়ে তৈরি হয়েছে বলেই এক অনন্য সংযোজন হয়ে উঠেছে শিল্পপরিসরে।

শিশির ভট্টাচার্যের রেখাচিত্র
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

শিল্পী শিশির ভট্টাচার্যের আরেক পরিচয়, তিনি কার্টুনিস্ট। একসময় জনপ্রিয় রাজনৈতিক কার্টুন আঁকতেন প্রথম আলোয়। তাঁর আঁকা কার্টুনগুলো একধরনের হাতিয়ার যা সামাজিক অবক্ষয়, দুর্নীতি ও অসংগতি বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় লড়াই চালিয়ে গেছে।

শিশির ভট্টাচার্যের রেখাচিত্র
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

বহুরৈখিক নন্দনপ্রয়াসে সামান্য রেখাতেই কত কিছু ঘটিয়েছেন শিল্পী! রেখার জাদু দর্শককে মুগ্ধ করে। একজন শিল্পীই সবচেয়ে স্পর্শকাতর অস্তিত্ব এ সমাজে। তাঁর যাপিত জীবনের বিভিন্ন সময়, সামাজিক অস্থিরতা, বিষণ্নতা তাঁর রেখায় ধরা দেয় হাস্যরসাত্মক, ব্যাঙ্গাত্মকভাবে। কখনো স্কেচবুকে, কখনো খুচরো কাগজে, কালি-কলম বা মার্কার পেনে কী সহজভাবেই না প্রতীকী চরিত্রগুলো তুলে ধরেছেন মানুষের ভেতরের সত্যকে।

শিশির ভট্টাচার্যের রেখাচিত্র
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

শিশির ভট্টাচার্য ‘দাগ তামাশা’ নামে তাঁর সর্বশেষ প্রদর্শনীটির আয়োজন করেছিলেন ২০১৩ সালে। প্রায় এক যুগ পর ৫ সেপ্টেম্বর ‘রেখাচিত্র’ নামক এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্র গ্যালারিতে। প্রদর্শনীতে ঠাঁই পেয়েছে ৯৫টি ছবি। রঙের আধিক্য নেই, সাদা কিংবা বাদামি রঙের কাগজেই শুধু লাইন ড্রইং করে ছবিগুলো কম্পোজ করা হয়েছে যা ইতিমধ্যে দর্শনার্থীদের মনে আলোড়ন জাগিয়েছে। প্রদর্শনীটি চলবে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।