হোলি আর্টিজেন ঘটনার অবিন্তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল, কিন্তু তাঁর ইচ্ছা ও স্বপ্নের মৃত্যু হয়নি। তাঁর স্মৃতির উদ্দেশে ‘অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন’ যেসব কাজ করছে, তার মধ্যে রাজধানীর উত্তর বাড্ডার প্রগতি সরণিতে অবিন্তা গ্যালারি অব ফাইন আর্টসের উদ্যোগে দেশ-বিদেশে কর্মশালা, প্রদর্শনী এবং স্বদেশি চিত্রকলার বিকাশে দ্বিবার্ষিক প্রাচ্য-চিত্রকলা প্রদর্শনীর আয়োজন বাংলাদেশের চিত্রকলার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন নিলু রওশন মুর্শেদ ৪৯ নারী শিল্পীর শিল্পকর্ম নিয়ে ‘উইমেন ইন আর্ট ২০২৬’ শিরোনামে প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন। প্রদর্শনীটি নিছক একটি দলগত শিল্পায়োজন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের নারী শিল্পীদের সৃজনশীল অবস্থান, অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস ও শিল্পভাষার এক বহুমাত্রিক উচ্চারণ হিসেবেই বিবেচ্য।
বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষা থেকে শুরু করে সমকালীন শিল্পভাষার নির্মাণে নারী শিল্পীদের উপস্থিতি ক্রমেই দৃঢ় ও বিস্তৃত হচ্ছে। এই প্রদর্শনী সেই চলমান যাত্রারই একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
এখানে প্রবীণ ও তরুণ শিল্পীরা একই পরিসরে মিলিত হয়ে নারীত্ব, স্মৃতি, স্বপ্ন, সংগ্রাম, মমতা, স্বাধীনতা ও আত্মপরিচয়ের নানা অনুষঙ্গকে শিল্পের ভাষায় প্রকাশ করেছেন। প্রদর্শনীর অন্যতম তাৎপর্য হলো এখানে নারীত্বকে কোনো একরৈখিক বা প্রচলিত আবেগময় রূপে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং কখনো বাস্তব, কখনো বিমূর্ত, কখনো প্রতীকী ও রূপক অর্থে শিল্পীরা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে নির্মাণ করেছেন। ফলে প্রদর্শনীটি হয়ে উঠেছে এক বহুস্বরের শিল্পভাষা।
শিল্পী ফরিদা জামান তাঁর পরিচিত শৈলীতে শৈশব, দেশ ও স্মৃতির ভুবনকে পুনর্নির্মাণ করেছেন।
‘সুফিয়ান ও তার বন্ধু’ কিংবা ‘আমার দেশ’ সিরিজে রঙের সরলতা ও ফর্মের সহজাত প্রাণশক্তি দর্শককে এক নস্টালজিক অনুভূতির ভেতর নিয়ে যায়। তাঁর কাজের ভাষা সহজেই চেনা যায়, যেখানে লোকজ আবহ, শিশুসুলভ স্বচ্ছতা ও মানবিক উষ্ণতা মিলেমিশে থাকে। অন্যদিকে শিল্পী আইভী জামানের নারী মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক চিত্রকর্ম শক্তি ও সাহসের এক গভীর প্রতীক হয়ে উঠেছে। এখানে নারীর রূপ নিছক কোমলতার প্রতিরূপ নয়; বরং সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও ইতিহাসের সক্রিয় উপস্থিতি।
ক্যানভাসে রং ও ফর্মের গঠনশৈলী কাজটিকে দিয়েছে এক অন্তর্গত শক্তিময়তা। শিল্পী গুলশান হোসেনের ‘আমরা সবাই পারি’ শিরোনামের কাজে সারিবদ্ধ নারীমুখ যেন সম্মিলিত জয়ের উচ্চারণ। কম্পোজিশনের দৃঢ় বিন্যাস এবং মুখাবয়বের অভিব্যক্তিতে এখানে নারীর আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক অগ্রযাত্রার বার্তা প্রতিফলিত হয়েছে।
প্রদর্শনীর একটি গভীর রূপকধর্মী কাজ শিল্পী কনক চাঁপা চাকমার ‘বাসনা’। এখানে আলোকবর্তিকার মতো ভেসে ওঠা ফানুস এক বহুমাত্রিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
ফানুস যেমন আকাশে উড়ে যায়, তেমনি নারীর স্বপ্নও কখনো মুক্তির, কখনো অনিশ্চয়তার, কখনো ক্ষণস্থায়ী আলোর ইঙ্গিত বহন করে। শিল্পী সেই রূপককে এমনভাবে নির্মাণ করেছেন, যা দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে—নারীর আকাঙ্ক্ষা কি এখনো ভঙ্গুর, নাকি এই আলোকবর্তিকাই ভবিষ্যতের সম্ভাবনার প্রতীক? ‘ঐক্যের লাল সুতো’ শিরোনামের কাজে শিল্পী যুক্তা সাহা গাণিতিক বিন্যাস ও রেখার সংগঠনে নারীর সম্মিলিত শক্তিকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন। এখানে লাল সুতো যেন সম্পর্ক, সংহতি ও প্রতিরোধের প্রতীক।
প্রদর্শনীতে ভাস্কর্যের উপস্থিতিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শিল্পী মুক্তি ভৌমিকের ভাস্কর্যে মা ও কিশোরীর সম্পর্ক, কিংবা মানুষ ও প্রাণীর আন্তরিক ভাববিনিময়—মমতা ও মানবিকতার কোমল এক জগৎ নির্মাণ করেছে। একইভাবে সিগমা হক অঙ্কন, রেহানা ইয়াসমিনের ভাস্কর্যে ভালোবাসা, আনন্দ ও সম্পর্কের উষ্ণতা ধরা পড়ে। মাতৃত্ব ও স্নেহ এখানে নিছক আবেগ নয়; বরং অস্তিত্বের এক নান্দনিক ভাষা।
শিল্পী শাকিলা খানের কাজে নারী অবয়বের শাশ্বত সৌন্দর্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
রঙের স্তরায়ণ, জামদানি শাড়ির আবহ, কপালের টিপ—সব মিলিয়ে তিনি বাঙালি নারীর এক চিরায়ত অথচ আধুনিক রূপ নির্মাণ করেছেন। তবে প্রদর্শনীর কিছু কাজে বক্তব্যের অতিরিক্ত জটিলতা বা প্রতীক ব্যবহারের মারপ্যাঁচও চোখে পড়ে। কোথাও কোথাও ভাবের গভীরতা দর্শকের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে উন্মোচিত হয় না। কিন্তু সমগ্র আয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে এই বৈচিত্র্যই প্রদর্শনীটিকে প্রাণবন্ত করেছে। কারণ, সমকালীন শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো বহুমাত্রিক পাঠের সম্ভাবনা।
‘উইমেন ইন আর্ট’ মূলত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—বাংলাদেশের শিল্পভুবনে নারী শিল্পীরা এখন কেবল অংশগ্রহণকারী নন, বরং তাঁরা শিল্পচর্চার ভাষা ও দিকনির্দেশনাকে সক্রিয়ভাবে নির্মাণ করছেন। তাঁদের কাজের মধ্যে যেমন ব্যক্তিগত অনুভব আছে, তেমনি আছে সামাজিক বাস্তবতা, প্রতিবাদ, আত্মমর্যাদা ও স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশ। এই প্রদর্শনী তাই শুধু নারীত্বের উদ্যাপন নয়; এটি নারী শিল্পীদের শিল্পদর্শন, আত্মপ্রকাশ ও সৃজনশীল স্বাধীনতার এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঘোষণা। শিল্পের ভুবনে নারীর এই অগ্রযাত্রা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে—এই প্রদর্শনী ঘুরে দেখার পর এমন আশাই জাগে।
রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় প্রগতি সরণিতে অবিন্তা গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে ৯ মে শুরু হওয়া প্রদর্শনীটির সমাপনী দিন আজ।