ছাপচিত্র এই উপমহাদেশে কখনো পেইন্টিংয়ের সমান মর্যাদা পেয়েছে কি? কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজে এটি পড়ানো হতো পেইন্টিংয়েরই উপশাখা হিসেবে। স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশে ছাপচিত্রশিল্পীরা সংগ্রাহক, প্রতিষ্ঠান, এমনকি শিল্পজগতের ভেতর থেকেও বারবার এই প্রশ্নের মুখে পড়েছেন, এটা কি আসলে ‘আসল’ শিল্প? এই মাসে লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্র গ্যালারিতে শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, মনিরুল ইসলাম ও রফিকুন নবীর ছাপচিত্র একই ছাদের নিচে এসেছে। এটা একটা প্রদর্শনী, কিন্তু ভাবতে গেলে এর চেয়ে বেশি কিছু। বাংলাদেশের ছাপচিত্রের চার পথিকৃৎ একসঙ্গে এবং তাদের কাজ সামনে রাখলে সেই পুরোনো প্রশ্নটার উত্তর আর খুঁজতে হয় না।
সফিউদ্দীন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, মনিরুল ইসলাম, রফিকুন নবী—চারজনের জন্ম প্রায় দুই দশকের ব্যবধানে। প্রত্যেকে চিত্রশিল্পী হিসেবে সমানভাবে পরিচিত। তবু প্রত্যেকে ছাপচিত্রকে তাঁদের নিবিড় মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এই বেছে নেওয়াটা সচেতনভাবেই। ছাপচিত্রে যা বলা যায়, তেলরঙে তা যায় কি? রেখা, টেক্সচার, ছাপের চাপ, উপকরণের নিজস্ব প্রকৃতি এই মাধ্যমের ভেতরে এমন কিছু সম্ভাবনা রাখে, যা এই চারজন আলাদাভাবে চিনেছেন। চারজন চারটি ভিন্ন দেশে গেছেন—লন্ডন, টোকিও, মাদ্রিদ, এথেন্স।
ভিন্ন গুরুর কাছে শিখেছেন, ভিন্ন ধারার সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। কিন্তু কেউ পশ্চিমের অনুকরণ করে ফেরেননি। ফিরে এসেছেন নিজের ভাষা নিয়ে।
শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ উড-এনগ্রেভিং বেছে নেওয়ার পেছনে একটি সচেতন নান্দনিক কারণ ছিল। উডকাটের তীব্র সাদা-কালো বিভাজন তাঁকে টানেনি। তিনি চেয়েছিলেন সূক্ষ্ম রেখা, আলোছায়ার খেলা এবং একটা নিশ্বাস নেওয়ার জায়গা। উডকাটে কাঠ চেরা হয় তক্তার আদলে, উড-এনগ্রেভিংয়ে কাটা হয় আড়াআড়িভাবে। এই পার্থক্যটা কেবল কারিগরি বললে পুরোপুরি বলা হয় না, এটা দার্শনিকও। একটা মাধ্যম কাটা কাটা, অন্যটা সূক্ষ্ম। সফিউদ্দীন বেছে নিয়েছিলেন সূক্ষ্মতার পথ।
লন্ডনের সেন্ট্রাল স্কুল অব আর্টসে তিনি স্ট্যানলি হেইটারের ঘনিষ্ঠ মেলুইন ইভান্সের কাছে শিখেছিলেন। হেইটার, যিনি আধুনিক প্রিন্ট মেকিংয়ের অন্যতম উদ্ভাবক। সেই শিক্ষার ছাপ তাঁর কাজে স্থায়ী হয়ে গেল। তাঁর ‘মেলার পথে’ ছবিটিতে ঘোড়া, মানুষ, গাছের ছায়া, বিড়াল—এসব মিলের গ্রামীণ বাংলার একটা চেনা দুপুর ধরা যায়।
একইভাবে কালোর ভেতর থেকে সাদা রেখা দিয়ে আলো বের করে আনার যে পদ্ধতি, সেটা এই ছবিকে নিছক দৃশ্য থেকে তুলে এনে একটা অনুভবে পরিণত করে।
সফিউদ্দীন সম্পর্কে তাঁর জীবনীকার লিখেছেন, তিনি কাজ করতেন ন্যূনতম উপায়ে সর্বোচ্চ প্রকাশের লক্ষ্যে। এ কারণেই তিনি ‘পিউরিস্ট’। তাঁর শিল্পচর্চাকে তিনি কখনো সহজ মনে করেননি। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় প্রিন্টমেকিং বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে ১৯৭৯ পর্যন্ত সেই বিভাগের প্রধান থেকে তিনি এই মাধ্যমটিকে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা দিলেন। বাংলাদেশে ছাপচিত্রের ইতিহাস শুরু হয় তাঁর হাত ধরে।
শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ফাইন আর্টসে পড়তে গিয়েছিলেন ১৯৫৯ সালে। সেখানে কাজু ওয়াকিতার তত্ত্বাবধানে লিথোগ্রাফি শিখলেন। লিথোগ্রাফির পাথর, তার দানাদার টেক্সচার, তার নিজস্ব শোষণক্ষমতা কিবরিয়ার কাছে হয়ে উঠল এক বিচিত্র আবিষ্কারের জায়গা। তিনি বলতেন, পাথরের বুকে জীবনের বিচিত্র বিকিরণ ছড়িয়ে আছে। জাপানে থাকতেই তাঁর ‘টু ফ্লাওয়ার্স’ বা ‘ফেডিং’-এর মতো কাজগুলো তৈরি হলো।
দুটি বৃত্তাকার কালো ভর, নীলাভ আলোর বলয়ে ঘেরা, নাম ফুল কিন্তু চেনা রূপ নেই কোথাও। বা ‘ফেডিং’-এ ওপরে হালকা, নিচে গাঢ়, মাঝে বিন্দু বিন্দু টেক্সচার, যেন কিছু একটা মিলিয়ে যাচ্ছে। এই কাজগুলো ১৯৬২ সালের। বাংলাদেশে তখন এ ধরনের বিমূর্ততা প্রায় অনুপস্থিত। ঢাকায় ফিরে প্রিন্টমেকিং বিভাগে যোগ দিলেন এবং সফিউদ্দীনের বাস্তববাদী ভিত্তির পরে বাংলাদেশের ছাপচিত্রে বিমূর্ততার দরজা খুললেন। তাঁর কাজ এ অঞ্চলে আধুনিকতার মাপকাঠি হয়ে উঠেছিল। তাঁর লিথোগ্রাফ সম্পর্কে বলতে গেলে বলা যায়, পাথরকে মনোদর্পণ করার এই ক্ষমতা আর কারও মধ্যে দেখা যায় নেই।
শিল্পী মনিরুল ইসলাম ১৯৬৯ সালে স্পেনে গেলেন বৃত্তি নিয়ে। উদ্দেশ্য ছিল ম্যুরাল শেখা। কিন্তু মাদ্রিদে গিয়ে এচিংয়ের জগতে ঢুকে পড়লেন এবং আর বের হলেন না। মুক্তিযুদ্ধের কারণে দেশে ফেরা হলো না, স্পেনেই থাকলেন। এই না-ফেরাটা তাঁর শিল্পের ভেতরে একটা স্থায়ী টান তৈরি করল। ১৯৭২ সালে মাদ্রিদের গ্যালারি ড্যানিয়েলে ‘হোমেজ টু বাংলাদেশ’ শিরোনামে প্রদর্শনী করলেন।
গয়ার যুদ্ধচিত্র থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এচিংয়ে তৈরি করলেন ‘অ্যাগনি’ সিরিজ। হাজার মাইল দূরে বসে দেশের মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করলেন এচিংয়ের প্লেটে।
মাদ্রিদের গ্রুপো কিন্সে-তে যোগ দিলেন তিনি। যেখানে আন্তোনিও সাউরা, আন্তোনি তাপিয়েস, রাফায়েল কানোগার-দের মতো ইউরোপের ‘আভাঁ-গার্দ’ শিল্পীরা কাজ করতেন। এই সান্নিধ্যে তাঁর ‘ফ্রি-বাইট’ এচিং টেকনিক গড়ে উঠল। যেখানে এসিড সরাসরি প্লেটে পড়ে, নিয়ন্ত্রিত নয়, এবং স্বতঃস্ফূর্ত। এই টেকনিক এতটাই স্বাতন্ত্র্য অর্জন করল যে স্পেনের শিল্পজগতে তা ‘এস্কুয়েলা দে মনির’ বা মনিরের স্কুল নামে পরিচিত হলো। একজন বাংলাদেশি শিল্পীর নামে ইউরোপে একটি প্রিন্টমেকিং ধারা তৈরি হওয়া, এটা নিছক ব্যক্তিগত স্বীকৃতি না, এটা এই মাটির শিল্পের আন্তর্জাতিক পরিচিতিরও একটি বিরল ঘটনা। ১৯৯৭ সালে তিনি স্পেনের কালকোগ্রাফিয়া নাসিওনাল পুরস্কার পেলেন, প্রথম অ-স্প্যানিশ শিল্পী হিসেবে।
তাঁর কাজের বৈশিষ্ট্য হলো শূন্যতার ব্যবহার। মনিরুল ইসলামের এচিংয়ে অনেকটা জায়গা ফাঁকা থাকে। কিন্তু সেই ফাঁকা জায়গা নিষ্ক্রিয় না, সেটাই কথা বলে।
‘টানেল অব টাইম’-এ একসারি কম্পাসের মতো জ্যামিতিক অবয়ব, ওপরে ঘন, নিচে বিস্তৃত সাদা শূন্যতা। সেই শূন্যতাটাই টানেল, সময়ের গহ্বর। ছবিতে ক্যালিগ্রাফির মতো অস্পষ্ট লেখা, পাঠযোগ্য নয়, কিন্তু উপস্থিত। তিনি নিজে বলেছেন, ‘আমি ইমেজকে অনন্তের ব্যঞ্জনা দান করেছি, যা দেখা যায় না, উপলব্ধি করতে হয়।’ মনিরুল নিজের কাগজ নিজে তৈরি করেন। পুরোনো, ক্ষয়ে যাওয়া কাগজ তাঁকে সাদা কাগজের চেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে। পুরোনো মিষ্টির বাক্সের কাগজ, মুদিখানার হিসাবের খাতা, এই উপকরণগুলো তাঁর কাজে স্মৃতি ও ক্ষয়ের একটি স্তর যোগ করে যা পরিকল্পনা করে আনা সম্ভব না।
মনিরুল ইসলাম এচিং মাধ্যমের মধ্যে জলরঙের স্বচ্ছতা ও প্রবাহমানতার আবহ সৃষ্টি করেছেন, যা পূর্ববর্তী ছাপচিত্রচর্চায় সচরাচর দেখা যায়নি। এমনকি একই প্লেটে চারটি রঙের সমন্বিত ব্যবহার করে তিনি এচিংয়ে নতুন প্রযুক্তিগত ও নান্দনিক সম্ভাবনার সূচনা করেন।
শিল্পী রফিকুন নবী গ্রিসে গেলেন ১৯৭৩ সালে, শিল্পী গ্রামাতোপুলসের কাছে শিখলেন।
ঢাকায় রঙিন কাঠখোদাইয়ে রঙের ক্রম ছিল নির্দিষ্ট। প্রথমে হলুদ, তারপর লাল, নীল—সবশেষে কালো। গ্রিসে সেই বাধ্যবাধকতা নেই। শিল্পী নিজে ঠিক করেন কোন রং আগে, কোনটা পরে, পুরোটাই তাঁর সৃজনভাবনার ওপর নির্ভরশীল। রফিকুন নবী বেছে নিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত পথ, আগে সবচেয়ে গাঢ় রং কালো, তারপর ধীরে ধীরে হালকার দিকে। এই উল্টো প্রক্রিয়া তাঁর কাজে একটি নতুন গভীরতা এনে দিল।
কাঠকে তিনি লুকালেন না। ঢাকায় শেখার সময় ধারণা ছিল কাঠের আঁশ ঢেকে যাবে রঙে। গ্রিসে বুঝলেন, কাঠের নিজস্ব বুনট চিত্রভাষার অংশ হতে পারে। ‘রিভারস্কেপ উইথ ফিশেস’-এ হলুদ আকাশ, নীল নদী, মাছ-নৌকা-মানুষের আধা বিমূর্ত সমাহার এবং ছবিজুড়ে কাঠের অনুভূমিক আঁশ যেন নদীর স্রোতের মতো বইছে। বাস্তব নদীদৃশ্য এখানে ভেঙে গিয়ে স্মৃতি, সংকেত ও রঙের গঠনে রূপান্তরিত হয়েছে। ‘এ ম্যান চাইল্ড ফলেন ফ্রম এ হার্ট’-এ কেন্দ্রে একটি ছোট্ট মানব অবয়ব, চারদিক থেকে কালো-ধূসর ভার নামছে, মাঝে হলুদ আলোর বিস্ফোরণ, এটা কেবল একটি ছবি না, একটা সামাজিক বক্তব্য।
রফিকুন নবীর কাজে আরও একটা দিক আছে, যা বাকি তিনজনের চেয়ে আলাদা। তাঁর টোকাই চরিত্র, রাস্তার ছেলে, সমাজের প্রান্তিক মানুষ—বাংলাদেশের শ্রেণিবৈষম্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতার রূপক হয়ে উঠেছে। সেই একই সামাজিক দৃষ্টি তাঁর ছাপচিত্রেও কাজ করে। ছাপচিত্রকে তিনি শুধু গ্যালারির মাধ্যম রাখেননি, তার ভেতরে গণমানুষের অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, জীবনের তিক্ততাও নিয়ে এসেছেন।
এই চারজনকে পাশাপাশি রাখলে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়, এটা চারজন আলাদা শিল্পীর গল্প না, একটা ভাষারই চারটা স্তর। সফিউদ্দীন ভিত্তি গড়লেন, বাংলার জীবন ও প্রকৃতিকে রেখার ভেতর ধরলেন, এই মাধ্যমটাকে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা দিলেন। কিবরিয়া সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ভাষাটাকে ভেতরের দিকে নিয়ে গেলেন। বাইরের দৃশ্য থেকে সরে গিয়ে যে জায়গায় পৌঁছালেন, সেখানে শুধু অনুভব আছে, ব্যাখ্যা নেই। মনিরুল সেই ভাষা নিয়ে মাদ্রিদে গেলেন এবং প্রমাণ করলেন, এই মাটির শিল্প শুধু বিশ্বের সঙ্গে কথা বলতে পারে না, নতুন ধারাও তৈরি করতে পারে।
রফিকুন নবী পুরো পরিক্রমাটাকে আবার মাটিতে নামালেন, রঙে, সামাজিক বক্তব্যে, গণমানুষের অভিজ্ঞতায়। এই চারটা স্তর আলাদা করলে প্রত্যেকে গুরুত্বপূর্ণ, একসঙ্গে রাখলে একটা পূর্ণ ইতিহাস।
ছাপচিত্রে শিল্পীর হাতের শ্রম দৃশ্যমান থাকে। কাঠের আঁশের দাগ, পাথরের টেক্সচার, এসিডের কামড়ের চিহ্ন। পেইন্টিংয়ে উপকরণ শিল্পীর অধীন, ছাপচিত্রে উপকরণ নিজেও কথা বলে। সফিউদ্দীনের উড-এনগ্রেভিংয়ে কাঠের শরীর থেকে আলো বের করে আনতে হয়, কিবরিয়ার লিথোগ্রাফিতে পাথরের দানা চিন্তার অংশ হয়ে যায়, মনিরুলের এচিংয়ে এসিড নিজের মতো চলে। শিল্পী শুধু পথ দেখান, বাকিটা মাধ্যমের। রফিকুন নবীর কাঠখোদাইয়ে কাঠের আঁশ নদীর স্রোত হয়ে ওঠে।
ফলে কলাকেন্দ্রের এই প্রদর্শনীতে শুধু চারজন শিল্পীর কাজ নেই, আছে বাংলাদেশের ছাপচিত্রের প্রায় আট দশকের একটা পূর্ণ মানচিত্র। একটা মাধ্যমকে বারবার গৌণ বলা হয়েছে, কিন্তু এই চারজন সেই মাধ্যমেই তাঁদের সবচেয়ে গভীর কিছু কথা বলেছেন। গৌণত্বের প্রশ্নটা এখানে আসে না, প্রশ্নটা কোনো দিন মাধ্যমের ছিল না, ছিল দৃষ্টির এবং দৃষ্টিভঙ্গির। এই চারজন সেই দৃষ্টি দিয়ে বাংলাদেশের ছাপচিত্রকে যেখানে নিয়ে গেছেন, সেটা এ অঞ্চলের শিল্পের ইতিহাসে একটা অপরিহার্য অধ্যায়।