প্রদর্শনী
যন্ত্রণাবিদ্ধ অভিব্যক্তির চিত্ররূপ
গত ২ অক্টোবর, ২০২৬ শুক্রবার আবু কালাম শামসুদ্দিনের আঁকা অর্ধশতাধিক চিত্রকর্ম নিয়ে তাঁর একক চিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছে ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে। প্রদর্শনীটি চলবে ১৩ অক্টোবর ২০২৬, মঙ্গলবার পর্যন্ত।
আমাদের সমকালীন চারুশিল্পাঙ্গনে একঝাঁক তরুণ চিত্রকর ও ভাস্করের আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁরা শিল্পসৃজন, দেশ-বিদেশের প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে নানা জার্নালে তাঁদের গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ, আর্টক্যাম্পসহ বিভিন্ন কর্মশালায় যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে পেশাজীবী শিল্পী হিসেবে ব্যস্ত সময় পার করছেন। শিক্ষাজীবনে কৃতী এই শিল্পীদের অনেকেই আবার দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক।
এই একাডেমিশিয়ানদের অন্যতম শিল্পী ড. আবু কালাম শামসুদ্দিন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রকলা বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে তিনি স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আর্টের অঙ্কন ও চিত্রায়ণ ডিসিপ্লিনে শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিযুক্তি।
গত ২ অক্টোবর, ২০২৬ শুক্রবার আবু কালাম শামসুদ্দিনের আঁকা অর্ধশতাধিক চিত্রকর্ম নিয়ে তাঁর একক চিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছে ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে। প্রদর্শনীর কিউরেটর দিল্লির আক্ষাত সিনহা।
কিউরেটর একটু অন্যভাবে সাজিয়েছেন গ্যালারির ভেতরটা। এর অভ্যন্তরে ঢুকেই বাঁ দিক থেকে যন্ত্রণাবিদ্ধ অবয়বের একেকটি পেইন্টিং, উল্টো দিকে চারটি ইজেলে চাররঙা চিত্র সাজানো, সোজাসুজি চোখ গেলে দর্শক দেখতে পাবেন কাঠের পুরোনো খড়খড়ি করা দরজার দুই পাল্লার মাঝে বড় একটি চিত্রকর্ম।
তাঁর আঁকায় মানব অবয়ব ও তার শরীরীভাষায় ফেটে পড়া যে বিক্ষুব্ধতা, ক্রোধ, হিংস্রতার উপরিভঙ্গিমা প্রত্যক্ষ করেছি, তাতে আমার মনে হয়েছে সমকালীন তারুণ্যের অস্থিরতা ও রাগী আবেগের তীব্রতার প্রতিফলন ঘটেছে চিত্রপটে!
শিল্পী আবু কালাম ষড়রিপু যেমন কাম, ক্রোধ, লোভ, দম্ভ, আসক্তি ও ঈর্ষা—এসবকে মনে করেন মানুষের মনুষ্যত্বকে বাধাগ্রস্ত করার একেকটি রিপু। ষড়রিপুর কোনো একটি যার মধ্যে সক্রিয়, নিজের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে তার সুস্পষ্ট ধারণা না–ও থাকতে পারে। সেই সভ্য মানুষটির অভব্য বিকৃত চিৎকৃত চেহারা আর অঙ্গভঙ্গিমার তীব্রতা নিয়ে ছবি আঁকেন তিনি। রিপুর এই তাড়না সহজাত হলেও এসব একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজ গঠনের পথে অন্তরায় বলে মনে করেন শিল্পী।
তাঁর আঁকায় মানব অবয়ব ও তার শরীরীভাষায় ফেটে পড়া যে বিক্ষুব্ধতা, ক্রোধ, হিংস্রতার উপরিভঙ্গিমা প্রত্যক্ষ করেছি, তাতে আমার মনে হয়েছে সমকালীন তারুণ্যের অস্থিরতা ও রাগী আবেগের তীব্রতার প্রতিফলন ঘটেছে চিত্রপটে!
ষড়রিপুর আবিষ্কার ও এর দার্শনিক ব্যাখ্যা এসেছে এতদঞ্চলের হিন্দু কিংবদন্তি থেকে। ওই মিথ নিয়ে এঁকে শিল্পী চোখ রেখেছেন মানবসৃষ্টির মুসলিম মিথে। প্রথম মানব-মানবী আদম–হাওয়ার ভুলে তাঁদের স্বর্গচ্যুতির মর্মযাতনা ও অনুশোচনার রূপকে চিত্রপটে মূর্ত করেছেন আবু কালাম। তাঁর ওই চিত্রকর্মের শিরোনাম ‘বিলাপ স্মৃতি-১ ও ২ পৃথিবীর জন্ম’। এর প্রথমটিতে আদমের অনুশোচনা ও দ্বিতীয়টিতে আমরা হাওয়ার ভুলের লজ্জা ও বিলাপের তীব্রতা দেখতে পাই দেহ-মুখভঙ্গিতে।
২.
মানুষের এরূপ মনোভঙ্গির বিচিত্র প্রতিফলন নিয়ে চিত্র রচনার ইতিহাস অনেক দিনের। গ্রিক-রোমান সভ্যতার চিত্রকলা আদর্শ রূপের খোলসে আবৃত হলেও দেব-দেবীর অঙ্গভঙ্গিতে এরূপ মনোভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার ভাস্কর্য ও চিত্রকলায়ও এরূপ এক্সপ্রেশন অর্থাৎ মুখভঙ্গির দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে।
রেনেসাঁ যুগের শিল্পীদের অঙ্কিত চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্যে পাত্র-পাত্রীর মুখাবয়বে এক্সপ্রেশনে আসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এবং এর দারুণ বাস্তবানুগ প্রয়োগ সেকালের শিল্পচর্চাকে গতিময়তা দিয়েছে।
রেনেসাঁর পর ক্রমান্বয়ে শিল্প আর অধিকাংশ মানুষ থেকে দূরের নয়। সে এসেছে মানুষের কাছে মানবিক মূল্যবোধের শক্তি হয়ে। সেই থেকে শিল্পের ভেতরকার মানুষের মুখাবয়বে তাঁর মানসিক অবস্থা যেমন ক্রোধ, রাগ, হাসি-কান্না, দুঃখ-কষ্ট, মান-অভিমান সবকিছুরই ছায়া পড়তে শুরু করে!
ইউরোপে শিল্পায়ন, বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কার, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি, ক্ষমতাধরদের সাম্রাজ্য বিস্তার, নাগরিকদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, ধনী-গরিবের মধ্যে তীব্র বৈষম্য, এসব মিলে মানুষের মধ্যে যে সচেতনতার বোধ ও ভেদাভেদ দূর করার জন্য যে বিদ্রোহী চেতনা তৈরি হয়, তারই হাত ধরে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লব।
স্বভাবতই চারুশিল্পেও যুগে যুগে দেশে দেশে পরিবর্তনের হাত ধরে জনভাবনা, সমাজব্যবস্থা, রাজনীতি-অর্থনীতি এসবের প্রভাব পড়েছে।
প্রথম মহাযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ষড়যন্ত্র, অবিশ্বাস, হত্যা, নির্মমতার তীব্র কষাঘাতে পাশ্চাত্যের মানুষের মধ্যে যে অস্তিত্বের সংকট ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়, এর প্রতিফলন ঘটে শিল্পকলায়। দাদাবাদ, পরাবাস্তববাদ এসব থেকে ক্রমান্বয়ে পাশ্চাত্যের অভিব্যক্তিবাদের জন্ম। সেই অভিব্যক্তির গড়নে ছিল বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ভাঙন, কষ্ট, উদ্দেশ্যহীন নির্লিপ্ততা আর রেখার উচ্ছ্বাস।
রেনেসাঁর পর ক্রমান্বয়ে শিল্প আর অধিকাংশ মানুষ থেকে দূরের নয়। সে এসেছে মানুষের কাছে মানবিক মূল্যবোধের শক্তি হয়ে। সেই থেকে শিল্পের ভেতরকার মানুষের মুখাবয়বে তাঁর মানসিক অবস্থা যেমন ক্রোধ, রাগ, হাসি-কান্না, দুঃখ-কষ্ট, মান-অভিমান সবকিছুরই ছায়া পড়তে শুরু করে!
পাশ্চাত্য শিল্পের ঢেউ আমাদের এখানেও লেগেছে। গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের শিল্পীদের হাত ধরে পাশ্চাত্যের নানা শিল্প আন্দোলনের প্রভাব আমাদের সমকালীন চারুশিল্পকে পশ্চিমা আধুনিকতার চর্চায় শিল্পীদের উদ্বুদ্ধ করেছে। আমাদের চারুশিল্পে অভিব্যক্তিবাদের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধকালে কামরুল হাসানের আঁকা ইয়াহিয়া খানের রক্তচক্ষুর রক্তখেকো মুখাবয়ব, শিল্পী যার শিরোনাম দিয়েছেন ‘এই জানোয়ারকে হত্যা করতে হবে’ এবং ১৯৮৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারিতে মৃত্যুবরণের অব্যবহিত আগে জাতীয় কবিতা পরিষদের মঞ্চে বসে আঁকা ‘দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে’ শীর্ষক অঙ্কনধর্মী চিত্রকর্মে।
৩.
শিল্পী আবু কালাম শামসুদ্দিনের আঁকা ও প্রদর্শিত ‘যন্ত্রণার গান’ শীর্ষক চিত্রকর্মের সিরিজটির মূল উদ্দেশ্য হলো আগে বিবৃত মানসিক অবস্থাকে ব্যক্তির অবয়ব ও শরীরী ভাষায় তুলে ধরা, এই উদ্বেগজনক আচরণের চিত্রায়ণ। এসব আচরণ সভ্য সমাজে অবক্ষয় ঘটিয়েছে এবং বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য বিনষ্ট করেছে।
শিল্পী মানুষের মানবিক মূল্যবোধ জাগরণে আস্থা রেখেছেন। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ে, তিনি বলেছেন, ‘মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ’। এমনতর বিশ্বাসে শিল্পীও উদ্বুদ্ধ, তিনি মনে করেন, ক্রোধে উন্মত্ত মানুষ যদি তার ওই হিংস্রতার প্রতিরূপ প্রত্যক্ষ করে সে হয়তো একসময় অনুতপ্ত হবে।
আবু কালামের আঁকা ফিগর-১ ‘যন্ত্রণাবিদ্ধ—আত্ম প্রতিবিম্ব’ শিরোনামে কাগজে–কলমে আঁকা লতাগুল্মময় শক্তপোক্ত এক দেহ কাঠামো, যেন প্রকৃতি থেকে জন্ম নেওয়া এই শশ্রুমণ্ডিত উৎফুল্ল অবয়ব লোভাতুর মানুষের হাতে প্রকৃতি ধ্বংসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।
সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রাণ, এ অঞ্চলের ভূমিপুত্র শিল্পী আবু কালাম বনভূমির উপকারিতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। পরিবেশ সচেতন শিল্পী আবু কালাম মানুষ ও প্রকৃতির পরিপূরক সহাবস্থানে বিশ্বাসী। এ ধরনের কয়েকটি চিত্রে শিল্পী দেখাতে চেয়েছেন মানুষের মধ্যে থাকা ক্ষতিকর রিপুর তাড়না বন্য প্রাণিকুল ও বনভূমির জন্যও ক্ষতির কারণ। এই কাজগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি বন্য প্রাণী ও বনভূমি উজাড় হওয়ার বিষয়ে সবার সতর্কতা আশা করেন। দর্শক তাঁর চিত্রকর্মের মাধ্যমে শিল্পীর আকাঙ্ক্ষিত সচেতনতার প্রতিরূপ প্রত্যক্ষ করে নিজেরাও উদ্বুদ্ধ হতে পারেন।
শিল্পীর আঁকা ফিগার ২ এ ‘যন্ত্রণাবিদ্ধ রূপ আত্ম প্রতিবিম্ব-১৭, ১৮, ১৯’ শীর্ষক তিনটি চিত্রে অবয়ব এবং শরীর কাঠামোর অস্থিতে লকলকিয়ে বেড়ে ওঠা লতার মতো রেখার ছন্দ যেমন অবলোকন করি, তেমনই হাতের পাঞ্জা আর আঙুলে ঢাকা অবয়বিক লজ্জাকে আড়াল করা, ভীতত্রস্ত দুহাত দিয়ে কপাল ঢাকা, দুচোখে হাত দিয়ে নিবিষ্ট হয়ে দূর ভবিষ্যৎকে দেখার চেষ্টা দর্শক বুঝতে পারেন। হিংসা, ক্রোধের পাশাপাশি মানুষের লাজলজ্জা, ভয়, বিলাপ, অনুশোচনা এসবের আন্তক্রিয়াশীল শারীরিক ভাষা, যা শিল্পীর সঙ্গে দর্শককেও যুক্ত করে। অর্থাৎ দর্শক নিজেও যেন তাঁর হাত ও আঙুলের পরিবর্তনশীল আচরণ দিয়ে ওই সব অনুভূতিকে আত্মস্থ করেন!
সার্বিক বিবেচনায় শিল্পী আবু কালাম শামসুদ্দিন অনন্য গুণের সমাহারে বাস্তবানুগ অঙ্কনে সিদ্ধিলাভকারী একজন কর্মব্যস্ত সৃজনশিল্পী ও অভিজ্ঞতাপুষ্ট শিক্ষক। এই প্রদর্শনীতে তাঁর অঙ্কন ও অভিব্যক্তি প্রধান কাজ নবীন শিল্পশিক্ষার্থীদের জন্য যেমন অনুকরণীয়, তেমনি আমাদের সমকালীন চারুশিল্পে সচল এখনকার প্রধান ট্রেন্ডকে শক্তিমান হতে সহায়ক হবে।
প্রদর্শনীটি চলবে ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ মঙ্গলবার অবধি।