বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক চারুকলা চর্চার ইতিহাসে জয়নুল আবেদিনের নামটি সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়। কেবল একজন অসাধারণ শিল্পীই নন, একই সঙ্গে তিনি এ দেশের চারুশিক্ষা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের প্রধান সংগঠক। সাধারণত দেখা যায়, দক্ষ সংগঠক অনেক সময় শিল্পচর্চায় উত্তীর্ণ হন না; বিপরীতভাবে শক্তিমান শিল্পী সাংগঠনিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকেন। সেদিক থেকে জয়নুল আবেদিন এক প্রবাদপ্রতিম ব্যতিক্রমী, যাঁর চিত্রভাষা যেমন শক্তিশালী ও স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ, তেমনি তাঁর সাংগঠনিক প্রজ্ঞা এ দেশের চারুকলার পরিচয় নির্মাণে অনেকটাই নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
এই উত্তরাধিকারকে সামনে রেখেই জয়নুল আবেদিনের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের আটটি বিভাগের (অঙ্কন ও চিত্রায়ণ, গ্রাফিক ডিজাইন, ছাপচিত্র, প্রাচ্যকলা, ভাস্কর্য, কারুশিল্প, সিরামিক, শিল্পকলার ইতিহাস) শিক্ষকদের বিভিন্ন মাধ্যমের শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে। বিভাগভিত্তিক মাধ্যম-বৈচিত্র্যের শিল্পকর্ম দিয়ে সাজানো হয়েছে প্রদর্শনী।
জয়নুল আবেদিনের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন, তাঁর আদর্শিক উত্তরাধিকারকে স্মরণ এবং ভবিষ্যৎ শিল্পী প্রজন্মের জন্য প্রদর্শনীটি একটি প্রেরণাদায়ক দৃষ্টান্ত।
শিক্ষকেরা এখানে কেবল পাঠদানের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ নন, বরং তাঁদের সৃজনশীল সত্তাও সক্রিয় এবং স্বয়ং শিক্ষকদের শিল্পকর্ম নিঃসন্দেহে শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পাঠ্য। শ্রেণিকক্ষের তাত্ত্বিক জ্ঞান যখন শিক্ষকের নিজস্ব শিল্পভাষা ও বিষয়ভিত্তিক উৎকর্ষে রূপ নেয়, তখন তা শিক্ষার্থীদের কাছে এক গভীর অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।
একই সঙ্গে এই প্রদর্শনী বাংলাদেশের প্রধানতম প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার বর্তমান অবস্থান ও বৈচিত্র্যকে একসঙ্গে দেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
কারুশিল্প বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক হেলেনা নাজনীন জোবাইদা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালার অনুপ্রেরণায় ‘গুরুবন্দনা-২’ পোশাকটির ডিজাইন করেছেন। তিনি মূলত দুর্ভিক্ষ চিত্রের কাকের আকারটি ভেঙে নানা অসম প্যাটার্ন ব্যবহার করে অঙ্গসজ্জায় চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন। একই বিভাগের প্রভাষক জাকিয়া আহমেদ ঝুমা শিল্পাচার্যের ‘পাইন্যার মা’ চিত্রের অনুপ্রেরণা নিয়ে কাঠখোদাইয়ে নির্মাণ করেছেন ‘নারী-২’ শিরোনামের শিল্পকর্ম।
ভাস্কর্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুকুল কুমার বাড়ৈ তাঁর ‘অন্তর্মুখী অন্বেষণ-১’ রিলিফ ভাস্কর্যে মানুষের অন্তর্গত সংকট ও অনুভূতির নীরব অনুসন্ধানকে রূপ দিয়েছেন। সমতল ও ত্রিমাত্রিকতার সংযোগে নির্মিত এই কাজ দর্শককে সমসাময়িক ভাস্কর্যের রূপক ভাষার গভীর ও অন্তর্মুখী অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করাবে। যেখানে রূপ, উপাদান এবং প্রকাশের সংমিশ্রণের মাধ্যমে মানুষের অস্তিত্বের অভ্যন্তরীণ সংকট এবং অনুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে।
অঙ্কন ও নির্মাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সহিদ কাজী আগুনে পোড়া ফুলের প্রতীকের মাধ্যমে প্রকৃতি ও মানব সম্পর্কের ভঙ্গুর অবস্থাকে একসূত্রে তুলে ধরেছেন। সৌন্দর্য, শান্তি ও সম্প্রীতির এই প্রতীক আজ যেমন পরিবেশগত সংকটে, তেমনি আমাদের সামাজিক সম্পর্কও গভীর ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে—এ উপলব্ধিই ছবিটির মূল ভাষ্য। একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুস সাত্তারের ‘গ্রামীণ জীবনচক্র’ চিত্রে গ্রামবাংলা কোনো বর্ণনামাত্র নয়, বরং শিল্পীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে গড়ে ওঠা এক চেনা অথচ নতুন দৃশ্যভাষা। বলদের গাড়ি ও মানব অবয়বের ভেতর দিয়ে সময় এগোয়, শ্রম কথা বলে আর রঙের প্রবল ছন্দে প্রকাশ পায় তাঁর স্বতন্ত্র শৈলী, যেখানে স্মৃতি ও বাস্তবতা মিলেমিশে গ্রামীণ জীবনের নীরব কাব্য রচনা করে।
প্রাচ্যকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অমিত নন্দীর ‘প্রার্থনার অভিব্যক্তি’ চিত্রে প্রকৃতি ও প্রাণিকুলের পারস্পরিক নির্ভরতার নীরব আধ্যাত্মিকতা ধরা পড়ে। প্রাচ্য জলরঙের ধৌত পদ্ধতিতে গরুর প্রকৃতির দিকে মুখ তুলে আহার করার দৃশ্যটি আবহমান বাংলার সৌন্দর্যের ভেতর দিয়ে জীবনের কৃতজ্ঞতা ও প্রার্থনাময় অনুভবকে সংবেদনশীলভাবে প্রকাশ করেছে।
ছাপচিত্র বিভাগের অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ‘মেরিনা তাবাসসুমের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি’ চিত্রে স্থানীয় স্থাপত্য ও সমসাময়িক স্থানিক চিন্তার এক গভীর সংলাপ নির্মিত হয়েছে। স্তরায়িত বাঁশসদৃশ কাঠামো ও খণ্ডিত রেখার বিন্যাসে ভূমি-জল, ঐতিহ্য-উদ্ভাবনের রূপান্তর এবং জলবায়ু-সংবেদনশীল নকশার নীরব কিন্তু দৃঢ় ভাষ্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের প্রভাষক মো. তারিক বিন আকরামের ভিডিও অ্যানিমেশন ‘ইনফিনিট স্ক্রোলিং’ সমসাময়িক ডিজিটাল সংস্কৃতির এক তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক ভাষ্য। দুটি আঙুলের অবিরাম স্ক্রোলিং এবং একের পর এক বিনোদনচিত্রের স্রোতের মাধ্যমে শিল্পী স্ক্রোলিংকে একটি অভ্যাসগত অস্তিত্বে রূপ দিয়েছেন, যেখানে সময়, মনোযোগ ও আত্মযত্ন অ্যালগরিদমের কাছে পরাজিত। কাজটি দর্শককে বিনোদনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানসিক ক্লান্তি ও আধুনিক মানুষের আত্মবিচ্ছিন্নতার তাত্ত্বিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আজহারুল ইসলাম শেখের ‘ত্যাগ’ শীর্ষক সিরামিক শিল্পকর্মটি জাতির আত্মত্যাগী মানুষের প্রতি এক গম্ভীর ও শক্তিশালী শ্রদ্ধার্ঘ্য। কেন্দ্রে স্থাপিত মুখাবয়বটি যেন নীরব সাক্ষ্য সময়, শ্রম ও জীবন উৎসর্গের ইতিহাস বহন করে, আর চারপাশে খণ্ডিত আয়তনে ছড়িয়ে থাকা লোকজ আলপনার বিন্যাস সেই ত্যাগকে জাতিগত স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে যুক্ত করে।
এ প্রদর্শনীতে ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুন নবী, সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক ফরিদা জামান, অনারারি অধ্যাপক আবদুস সাত্তার, শাকুর শাহ্, সৈয়দ আবুল বার্ক্ আলভী, জামাল আহমেদসহ প্রবীণ শিল্পীদের কাজে যেমন ধারাবাহিক উত্তরাধিকার পাওয়া যাবে, তেমনি সহযোগী অধ্যাপক দেবাশীষ পাল, মো. আবদুল মোমেন, সহকারী অধ্যাপক সঞ্জয় চক্রবর্ত্তী, প্রভাষক ঝোটন চন্দ্র রায়সহ অনেকের কাজ ভাবনার খোরাক জোগাবে।
যেহেতু বিভাগের পঠন-পাঠন মূলত মিডিয়াভিত্তিক বিভাজনের ওপর নির্ভরশীল, তাই মাধ্যম ও কৌশলগত বৈচিত্র্যপূর্ণ নান্দনিক শিল্পকর্ম নির্মাণ শুধুমাত্র শিক্ষকদের দক্ষতা প্রমাণ করে না, বরং শিক্ষার্থীদের জন্যও এটি একটি কার্যকর শিক্ষণীয় প্রদর্শনী হিসেবেই গুরুত্বপূর্ণ।
শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শেখ মনির উদ্দিনের কিউরেটিংয়ে প্রদর্শনীটি গত ২৯ ডিসেম্বর শুরু হয়ে ৪ জানুয়ারি শেষ হয়েছে।