গ্যালারির ভেতরে যখন ধীর লয়ের বাঁশি, এসরাজ, সারেঙ্গি, বেহালা, দোতারা কিংবা একতারার সুর ভেসে আসে, তখন দৃশ্যমান শিল্পকর্ম যেন ধ্বনির সঙ্গে এক অন্তর্লীন সংলাপে প্রবেশ করে। দর্শন তখন কেবল চাক্ষুষ অভিজ্ঞতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তা শ্রবণ, অনুভব ও মনন—এই তিনের সমন্বয়ে এক সমগ্র নান্দনিক অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়। এই সংগীতময় আবহ বুদ্ধপূর্ণিমা উপলক্ষে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে দ্য ঢাকার লা গ্যালারি, জুম গ্যালারি ও ক্যাফেটেরিয়াজুড়ে আয়োজিত ‘বাংলার বুদ্ধ: আমাদের পবিত্র সংঘ’ প্রদর্শনীকে দিয়েছে এক বিশেষ মাধুর্য ও অন্তর্মুখী গভীরতা।
প্রাচ্য-চিত্রকলা অনুশীলন সংঘ ও লার্নিং ডিজাইন স্টুডিও আয়োজিত এই বাৎসরিক প্রদর্শনীর এটি চতুর্থ পর্ব। পূর্ববর্তী আয়োজনগুলোর ধারাবাহিকতায় এ প্রদর্শনীও নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র—বিশেষত এ বছর শুধু বাংলাদেশের শিল্পীদের কাজ নিয়ে বিন্যস্ত হওয়ায় একক ভূগোলের ভেতরেই বহুস্বরের শিল্পভাষা দৃশ্যমান হয়েছে।
২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রাচ্য-চিত্রকলা অনুশীলন সংঘ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিল্পশিক্ষার্থীদের স্বদেশি শিল্পরীতির চর্চায় উৎসাহিত করে আসছে; সেই ধারাবাহিকতায় লার্নিং ডিজাইন স্টুডিওর সহযোগিতায় ‘বাংলার বুদ্ধ’ তাদের একটি সুসংগঠিত ও চিন্তাপ্রসূত প্রয়াস। এ প্রেক্ষাপটে প্রদর্শনীটি প্রাচ্যশৈলীর শিল্পশিক্ষার্থী ও শিল্পপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য শিক্ষণীয় ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিভাত—যেখানে রীতি, অনুশীলন, মাধ্যম ও দর্শনের সমন্বিত পাঠ একত্রে উপলব্ধ হয়।
উন্মুক্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাড়ে তিন শর বেশি শিল্পী পাঁচ শতাধিক শিল্পকর্ম জমা দেন। সেখান থেকে কিউরেটর মিখাইল ইদ্রিস ৮০ জন শিল্পীর ৯৭টি কাজ নির্বাচন করেন। প্রদর্শনীর অন্যতম শক্তি এর মাধ্যমগত বৈচিত্র্য। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ এই বৈচিত্র্যের ভেতরে প্রাচ্য নন্দনতত্ত্বের সুস্পষ্ট উপস্থিতি।
ড্রয়িংয়ে সূক্ষ্ম রেখার নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ, যেখানে রেখা কেবল আউটলাইন নয়, বরং ধ্যানমগ্ন গতির বহিঃপ্রকাশ। ওয়াশ ও গোয়াশে রঙের স্তরায়ন—কখনো স্বচ্ছ, কখনো ঘন—জলীয় গতিময়তায় ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় অন্তর্গত বোধির আলোক। এই সংযম ও নিয়ন্ত্রণ শিল্পীদের প্রক্রিয়াভিত্তিক অনুশীলনেরই সাক্ষ্য বহন করে, যা প্রাচ্যশৈলীর শিক্ষার্থীদের জন্য একটি কার্যকর রেফারেন্স ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
বুদ্ধের জীবন, কর্ম ও দর্শনকে কেন্দ্র করে নির্মিত চিত্রাবলিতে পুনরাবৃত্ত ধ্যানমগ্নতার এক নীরব আবহ তৈরি হয়েছে, যা দর্শককে ক্রমশ অন্তর্মুখী স্তরে নিয়ে যায়। অন্যদিকে ভাস্কর্যে মাটি, কাঠ ও ধাতুর ব্যবহার স্পর্শযোগ্য আধ্যাত্মিকতার অনুভূতি সৃষ্টি করে। এখানে বুদ্ধের অবয়ব নিখুঁত বাস্তবতায় আবদ্ধ নয়; বরং ভাঙন, সরলীকরণ, প্রতীকের মধ্য দিয়ে রূপাতীতের ইঙ্গিত বহন করে।
তেলরং, জলরং কিংবা অ্যাক্রিলিক—সব মাধ্যমেই প্রাচ্য নান্দনিকতার মৌল বৈশিষ্ট্য অটুট থেকেছে; পাশ্চাত্য প্রভাব উপস্থিত থাকলেও তা প্রাধান্য বিস্তার করেনি। ফলে এ প্রদর্শনী প্রাচ্যরীতির ভাষা ও তার সমকালীন প্রয়োগ বোঝার জন্য একটি জীবন্ত পাঠশালা হিসেবে বিবেচ্য।
এ প্রদর্শনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের বড় অংশই শিক্ষার্থী। দেশের প্রায় সব কটি চারুকলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ রয়েছে। প্রস্তুতি পর্বে তাঁদের পারস্পরিক সংলাপ, সংঘের পাঠশালায় সম্মিলিত অনুশীলন ও অভিজ্ঞতা বিনিময়—সব মিলিয়ে শিল্পচর্চা এখানে একক সৃষ্টির সীমা অতিক্রম করে সমবেত সাধনায় রূপ নিয়েছে। প্রতিটি কাজের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সময়, সংশোধন ও আত্মসমীক্ষা, যা বৌদ্ধ ধ্যানচর্চার সঙ্গে এক গভীর সাযুজ্য স্থাপন করে।
এই প্রক্রিয়াগত অনুশীলন শিল্পশিক্ষার্থীদের জন্য যেমন শিক্ষণীয়, তেমনি শিল্পপ্রেমীদের জন্যও শিল্পসৃষ্টির অন্তর্গত ধ্যানময়তার উপলব্ধির এক বিরল সুযোগ।
শিল্পকর্মের বিশ্লেষণে দেখা যায়—নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউটের রিয়েল বড়ুয়ার ‘সংসারচক্র থেকে বোধির আলো’, তন্ময় কুমার গাইনের থাংকা শৈলীর ‘পঞ্চকুলীয় ধ্যানী বুদ্ধ’ এবং তপেস মণ্ডলের চাল দিয়ে নির্মিত ‘জ্ঞানের আলোয় বুদ্ধ’—মাধ্যমনির্ভর দক্ষতা ও শৈল্পিক শৃঙ্খলার দৃষ্টান্ত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের প্রাক্তনী সৌরভ ঘোষের ‘বুদ্ধচরিত’-এ বেঙ্গল স্কুলের ধ্রুপদি বিন্যাস—বর্গাকার জমিনে বৃত্তাকার বলয়ে জীবনপরিক্রমার উপস্থাপন—এক সংহত ন্যারেটিভ নির্মাণ করে। ঢাকা আর্ট কলেজ শিক্ষার্থী শরীফা আক্তারের কাজে ওয়াশ পদ্ধতির আখ্যানভিত্তিক প্রয়োগ এই ধারাকে সম্প্রসারিত করেছে।
জলরঙের ধৌত পদ্ধতির প্রবর্তক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবশিষ্য হিসেবে প্রগতি চাকমার কাজে মোলায়েম রংস্তরের অন্তরালে সমকালীন যুদ্ধ ও সহিংসতার ইঙ্গিত লক্ষণীয়—যেখানে শাশ্বত সৌন্দর্যের ভেতরে সময়ের অস্থিরতা নীরবে অনুরণিত হয়। পার্থ কুমার হাজরার ‘আধ্যাত্মিক যাত্রা’ ম্যুরালে পোড়া মাটির ভাঙা টুকরা সংযোজনে বুদ্ধের অবয়ব নির্মাণ—নির্বাণপথের এক রূপক চিত্রায়ণ।
অমিত নন্দীর ‘ধ্বংসস্তূপে প্রণতি’ ও ‘জ্যোতির পথিক’—এ দুই কাজে ইতিহাস-সচেতন আখ্যানের মধ্য দিয়ে বাংলায় বৌদ্ধ উপস্থিতির পুনর্নির্মাণ ঘটে। রাহিলী রুবাইয়াতের মিনিয়েচারধর্মী ‘শান্তি সম্মেলন’-এ গৌতম বুদ্ধ, কনফুসিয়াস, মহাবীর, শ্রীচৈতন্য, লালন শাহ, গুরু নানক, মাওলানা রুমি, জরাথুস্ট্র প্রমুখ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের একত্র উপস্থাপন সমকালীন বিশ্বে শান্তির সম্ভাব্য রূপক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
তিথি রানী রায়, নিভৃতা সাহা, কানিজ ফাতিমা ও ইস্কিন্দার মির্জার কাজে ওয়াশ পদ্ধতির লাবণ্যে বুদ্ধমূর্তি পেয়েছে এক অতীন্দ্রিয় আভা। মংমংসোর ‘তুহুয়াং স্বপ্নের জলচ্ছবি’তে চীনা ভূদৃশ্য ও বাংলার জলজ পরিবেশের সংমিশ্রণ আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপের ইঙ্গিত বহন করে। বলা যায়, আবদুস সাত্তার থেকে শুরু করে বয়ঃকনিষ্ঠ অন্বেষা বালা পর্যন্ত—সব কাজেই বুদ্ধের করুণা ও শান্তির বাণী এক অন্তর্মুখী জাগরণের আহ্বান জানায়।
প্রদর্শনীর সঙ্গে যুক্ত প্রতিদিনের সাংস্কৃতিক আয়োজন—যন্ত্রসংগীত, নৃত্য, সংগীত, চর্যা গান এ অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। সমাপনী দিনে পুরস্কার বিতরণ ছাড়াও এসরাজ ও সেতারের যুগলবন্দী এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নটীর পূজা’ অবলম্বনে নৃত্য পরিবেশনা পুরো আয়োজনকে বহুমাত্রিক শিল্প-অনুষ্ঠানে রূপ দেবে বলে আশা করা যায়।
সবশেষে বলা যায়, ‘বাংলার বুদ্ধ: আমাদের পবিত্র সংঘ’ কেবল একটি প্রদর্শনী নয়; এটি এক নান্দনিক সাধনা, যেখানে শিল্প, দর্শন ও সমবেত চেতনা একত্রে মিশে যায়। সংঘের এই আলোকবর্তিকায় দাঁড়িয়ে আমরা উপলব্ধি করি—শিল্পের গভীরে নিহিত আছে মানবিকতা, নীরবতা ও আত্মজাগরণের এক চিরন্তন সম্ভাবনা। একই সঙ্গে বুদ্ধের জীবন, দর্শন ও আদর্শের এই নান্দনিক অনুশীলন নিভৃতে এক মানবিক, সহমর্মিতাপূর্ণ ও শান্তিনির্ভর সমাজ গঠনের দিকেও আমাদের মনোযোগী করে তোলে।
২৮ এপ্রিল শুরু হওয়া এই আয়োজন আজ ৬ মে শেষ হলেও এর অনুরণন দর্শকের চেতনায় দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়ে থাকবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।