শিল্পচর্চার ভিন্ন পথরেখা

প্রকৌশলবিদ্যার কঠোর সূত্র, পরিমাপ ও নির্ভুলতার ভেতরেই সাধারণত বুয়েটকে কল্পনা করা হয়। সেখানে ক্যানভাস, রং কিংবা রেখার জন্য আলাদা কোনো অবকাশ থাকার কথা নয়, এমনটাই আমাদের প্রাত্যহিক ধারণা। অথচ সেই বুয়েটের শিক্ষার্থীরাই যখন ছবি আঁকেন, প্রদর্শনী করেন এবং অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক শিল্পসংলাপে যুক্ত হন, তখন বিষয়টি আর স্বাভাবিক থাকে না, তা হয়ে ওঠে ব্যতিক্রমী ও কৌতূহলোদ্দীপক।

১ / ৭
‘নোঙর’। শিল্পী সজল জমাদ্দার
লেখকের সৌজন্যে

বলছি, বুয়েটের শিল্পমনস্ক আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘চারকোল’-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত আন্তবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতামূলক চতুর্থ শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘মায়া’র প্রসঙ্গে। ‘মায়া’ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী বুয়েটের শিক্ষার্থীদের কাজগুলোতে লক্ষ করা যায় একধরনের নিয়ন্ত্রিত আবেগ—যেখানে কম্পোজিশন সচেতন, ফর্ম সংযত এবং ভাবনা স্পষ্ট। একই সঙ্গে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ প্রদর্শনীটিকে একটি বিস্তৃত আন্তবিশ্ববিদ্যালয় পরিসরে রূপ দিয়েছে, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন একাডেমিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে উঠে আসা শিল্পচিন্তা পরস্পরের সঙ্গে সংলাপে লিপ্ত হয়েছে।

২ / ৭
‘রূপসি বাংলাদেশ’। শিল্পী আফরা নওরহান
লেখকের সৌজন্যে

এই প্রদর্শনী দেখায়—শিল্প কোনো নির্দিষ্ট বিষয় বা বিভাগের একচেটিয়া চর্চা নয়; বরং তা মানুষের অন্তর্গত অনুভব ও প্রকাশের এক স্বাভাবিক প্রবণতা, যা কখনো কখনো প্রকৌশল শিক্ষাঙ্গনের কঠোরতার মাঝেও নিজস্ব পথ তৈরি করে নেয়। ‘মায়া’ সেই পথচলারই এক অনন্য দলিল, যেখানে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা শুধু প্রকৌশলী হওয়ার প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ থাকেন না; বরং শিল্পী হিসেবেও নিজেদের উপস্থিতি ঘোষণা করেন।

বুয়েটের শিক্ষার্থী আফরা নওরহানের কাগজের কোলাজে নির্মিত ‘রূপসি বাংলাদেশ’ প্রকৃতির আলো, রং ও জলপথের ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ভূদৃশ্যকে কেবল রোমান্টিক সৌন্দর্যে নয়; বরং মাটির অন্তর্গত মূল্যবোধের প্রতীকে রূপ দেয়। এখানে আকাশ, জল ও মাটির রঙের সাদৃশ্য একটি গভীর ঐক্যের ইঙ্গিত বহন করে। বুয়েটের আরেক শিক্ষার্থী ফেরদৌস আলম সজীব সৌহার্দ্য, মমতা ও অহিংসার প্রতীক গৌতম বুদ্ধের মুখাবয়ব এঁকেছেন প্রকৃতির রঙের আভাসে। এই প্রদর্শনীতে বুদ্ধ বিভিন্ন রূপ ও ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যায় উপস্থিত।

৩ / ৭
‘বুদ্ধ’। শিল্পী ফেরদৌস আলম সজীব
লেখকের সৌজন্যে

ফারিয়া নওশীন আহমেদের ‘পারাপার’ গ্রামীণ জীবনের নিত্যযাত্রাকে কলমের সূক্ষ্ম বিন্দু ও রেখায় ধারণ করেছে। নদী এখানে শুধু ভূগোল নয়—এটি সময়, শ্রম ও জীবনের প্রতীক। খেয়াঘাটের নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত এক প্রজন্মের সংগ্রাম ও নির্ভরতার ইতিহাস বহন করে, যা শিল্পীর হাতে এক সংবেদনশীল ন্যারেটিভে রূপ নিয়েছে।

৪ / ৭
‘বিষাক্ত চিন্তা’। শিল্পী পুষ্পিতা দে
লেখকের সৌজন্যে

সজল জমাদ্দারের ‘নোঙর’ জলরঙে আঁকা হলেও বিষয়বস্তুর দিক থেকে এটি মানসিক ও সাংস্কৃতিক স্থিতির প্রতীক। নোঙর যেমন জাহাজকে স্থির রাখে, তেমনি এই কাজটি যাত্রাপথের অনিশ্চয়তার মধ্যেও একধরনের ভরকেন্দ্রের সন্ধান করে। অন্যদিকে আল-ফুরকান নয়নের ‘কাঁথা সেলাই’ নিছক গৃহস্থালির অনুষঙ্গ নয় এটি স্মৃতি, যত্ন ও নারীর শ্রমের নীরব ইতিহাস, যা স্তর ও সেলাইয়ের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

৫ / ৭
‘অধ্যাপক শামসুল ওয়ারেসের প্রতিকৃতি’। শিল্পী ফারহানা ইসলাম এমা
লেখকের সৌজন্যে

ফারহানা ইসলাম এমার চারকোল প্রতিকৃতি ‘অধ্যাপক শামসুল ওয়ারেস’ প্রদর্শনীতে এক ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করে। এখানে ব্যক্তিত্বটি কেবল অবয়ব নয়; বরং জ্ঞান, স্থাপত্যচিন্তা ও সময়ের ভার বহনকারী এক নীরব উপস্থিতি। চারকোলের ধূসর টোন চিন্তা ও প্রজ্ঞার গভীরতা আরও প্রসারিত করে।

প্রসেনজিৎ ভদ্রের ‘অভিভাবকত্ব’ ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে উঠে এলেও এর সামাজিক তাৎপর্য ব্যাপক ও বহুমাত্রিক।

৬ / ৭
‘কাঁথা সেলাই’। শিল্পী আল-ফুরকান নয়ন
লেখকের সৌজন্যে

জলরং, অ্যাক্রিলিক, চারকোল, ডিজিটাল আর্ট, কোলাজ, ভাস্কর্য ও ছাপচিত্র—এসব মাধ্যম মিলিয়ে প্রদর্শনীতে এক পরীক্ষামূলক ও বহুধাবিস্তৃত শিল্পপরিসর গড়ে উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, এনএসইউসহ চুয়েট, চবি, খুবি, সাস্ট প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ প্রদর্শনীটিকে একটি প্রকৃত আন্তবিশ্ববিদ্যালয় সংলাপে রূপ দিয়েছে, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক ও একাডেমিক অভিজ্ঞতা শিল্পভাষ্যে প্রতিফলিত হয়েছে।

৭ / ৭
‘পারাপার’। শিল্পী ফারিয়া নওশীন আহমেদ
লেখকের সৌজন্যে

সব মিলিয়ে শিল্পশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক সীমা অতিক্রম করে এখানে মনন, স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার এক সংযোগস্থল নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশের তরুণ শিল্পচর্চার বর্তমান ধারা অনুধাবনে এবং আগামী দিনের শিল্পভাষার আভাস পেতে এই প্রদর্শনী নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

বুয়েটের ১৪ শিক্ষার্থীর শিল্পকর্মসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধশতাধিক শিল্পীর অংশগ্রহণে প্রদর্শনীটি রাজধানীর শফিউদ্দিন শিল্পালয়ে ১৬ থেকে ১৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়।