নারী শিল্পীদের প্রদর্শনী

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

না বলা নানা কথা বলার অভিনব সব চেষ্টা গ্যালারির চার দেয়ালজুড়ে! দর্শকদের দেখার জন্য দেয়ালের সামনেই ছোট ছোট টেবিল বা তাক বানিয়ে শিল্পীদের স্কেচবুক, খসড়া অঙ্কন, সেলাই, টেক্সটাইল, সংগ্রহকৃত উপকরণ, কোলাজ কিংবা প্রজেক্টের মতো বানানো হাতের কাজ ইত্যাদি যুক্ত করে বানানো নিরীক্ষামূলক বইয়ের নানা রূপের মাধ্যমে শিল্পীরা তাঁদের স্মৃতি, পরিচয়, ঐতিহ্য, আকাঙ্ক্ষা ও জীবন-অভিজ্ঞতার মতো বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। ব্যক্তিগত অনুভব ও শিল্পভাবনার সঙ্গে স্মৃতির মিশেলে তাঁরা যা দৃশ্যমান করেছেন, সেটিকে উপস্থাপন করেছেন দর্শকদের সামনে।

এসব কিছু নিয়ে ‘না বলা কথা’ শিরোনামে ৯ দিনব্যাপী একটি প্রদর্শনী শুরু হয়েছে ১ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার থেকে ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে। এই প্রদর্শনীতে শিল্পীদের গড়া বই ও শিল্পকর্মে তাঁদের একান্ত ও প্রায়শই অনুচ্চারিত অভিজ্ঞতাগুলোকে তুলে ধরা হয়েছে।

পুতুল খেলার দিনগুলো, এষা আহমেদ

আয়োজনটির কিউরেটর বিশিষ্ট চিত্রকর ফারেহা জেবা। তিনি বাংলাদেশের স্বনামধন্য একজন ছাপচিত্রশিল্পী। তাঁরই আহ্বানে সাড়া দিয়ে এ আয়োজনে অংশ নেওয়া শিল্পীদের মধ্যে আছেন—এষা আহমেদ, ফৌজিয়া মাহিন চৌধুরী, কাজমিন সামিয়া, সুলেখা চৌধুরী, সুমনা আকতার, সুরভী আকতার। অতিথি শিল্পী হিসেবে যুক্ত হয়েছেন আরও কয়েকজন। তাঁরা হলেন—আলিয়া কামাল, অর্পিতা সিংহ, মাহমুদা সিদ্দিকা, রাফিয়া মাহজাবীন, ঋতুপর্ণা সাহা ও ভেনিসা কায়সার। সবাই নারী। তাঁদের সবাই যে শিল্পশিক্ষা নিয়েছেন এমন নয়, কেউ কেউ পাঠ নিয়েছেন বিদেশে, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিদেনপক্ষে বিশ্বভারতীর কলাভবনে। কয়েকজন পড়েছেন ঢাকার চারুকলা অনুষদে। এ দলে পেশাদার স্থপতিও আছেন।

কিউরেটর নোটে শিল্পী ফারেহা জেবা বলেন, ‘সবার জীবনে আছে অব্যক্ত কিছু কথা। মনে থাকে বঞ্চনা, নির্যাতন, শোক আর ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের বৈষম্যমূলক ব্যবহার। প্রথম সাতজন শিল্পী এক বছর ধরে নিজেদের ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশের জন্য বই বানিয়ে খসড়া এঁকেছেন কিংবা নানা কিছু যুক্ত করে কিছু বলার প্রয়াস পেয়েছেন। পরে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে অতিথি শিল্পীরা অল্প সময়ে একই ভাবনাকে তাঁদের নিজ নিজ শিল্পভাষায় অনুসন্ধান করেছেন।’

তাঁদের একত্র হওয়ার গল্পে শোনা হলো গত বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এক আয়োজনে দিন কয়েক তাঁরা সাতজন শিল্পী একসঙ্গে বেশ সময় কাটিয়েছেন। গল্পে গল্পে পরিকল্পনা হয় প্রতি মাসে তাঁরা এক দিন একত্র হয়েছেন, গল্প আড্ডায় মিলিত হয়েছেন, ছবি আঁকার কর্মশালা করেছেন। এভাবেই তাঁদের অব্যক্ত কথা নিয়ে দলগত প্রদর্শনীর ভাবনা।

দ্য স্টোরি উইদিন আজ, মাহমুদা সিদ্দিকা

এই না বলা কথা কোনো একক আখ্যান নয়, এটি নানা খণ্ডে বিভক্ত, প্রকাশিত ও অপ্রকাশিতের মাঝখানের পরিসর। প্রদর্শনীটি এমন যেটি মন লাগিয়ে দেখলে দর্শক হয়তো উপলব্ধি করতে পারবেন—একেকজন শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাবনার ঐক্যে কীভাবে সামষ্টিক অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে!

শিল্পীদের বৈচিত্র্যপূর্ণ কাজের মধ্য দিয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিকে ধারণ, ঘটনা কিংবা ভাবনার বয়ান, ব্যাখ্যা-পুনর্ব্যাখ্যা এবং অনুভূতি প্রকাশের নানা পদ্ধতিকে দর্শকদের সামনে নিয়ে এসেছে।

এবার দেখা যাক শিল্পীরা তাঁদের উপস্থাপিত শিল্পকর্মে না বলা কী কথা বলছেন!

এষা আহমেদ সুররিয়ালিস্ট শিল্পী। স্নাতক করেছেন টরন্টোয়, মনস্তত্ত্বে স্নাতকোত্তর ইংল্যান্ডের ডার্বিতে। দেশে–বিদেশে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ দলগত প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। চট, কাপড়, উলেন সুতা আর সেলাই দিয়ে মিশ্রমাধ্যমে গড়া তাঁর বই ও কাজের শিরোনাম ‘পুতুল খেলার দিনগুলো’। চটের ওপর সেলাই করে যা লিখেছেন, তাতে সত্যি সত্যি দর্শকমনে শিশুকালের রূপকথা পাঠের অনুভূতি জাগ্রত হয়! যেমন এর এক পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে—‘ফুলের পোলাও পাতার রোস্ট খেলো সবাই মজা করে’।

দ্য স্ট্রে উইদিন আস, সুমনা আকতার

ফৌজিয়া মাহিন চৌধুরী বহুমুখী সৃজনশীল শিল্পী, গবেষক, কবি। সম্প্রতি ঢাকায় তাঁর কিউরেটিংয়ে ‘আমার ফুসফুসের ভেতরে’ শিরোনামে গার্মেন্টস কর্মী নারীদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ইস্যু নিয়ে একটি প্রদর্শনী হয়েছে। নরওয়েতে আয়োজিত এক চিত্রপ্রদর্শনীর আলোকে এই প্রদর্শনী। শিশুদের জন্য ছড়া ও কবিতার বই প্রকাশ করেছেন। শিল্পকে তিনি সামাজিক পরিবর্তনের কাজে প্রয়োগে বিশ্বাসী।

না বলা কথায় তাঁর অংশগ্রহণ ‘সূর্যালোকের নিচের কিছু’কে কেন্দ্র করে। একটি গল্প লিখে এবং এঁকে বই বানিয়েছেন, যার পাতায় পাতায় লিখেছেন আর এঁকেছেন অব্যক্ত কিছু বিষয়।

আলিয়া কামাল স্পেনের বার্সেলোনা একাডেমি অব আর্টে অঙ্কন ও চিত্রায়ণ শিখেছেন। তিনি ফিগারেটিভ ছবি এবং মুখাবয়ব আঁকায় পারদর্শী। শ্রমনির্ভর সাধারণ মানুষ ও তাঁদের যাপিত জীবন, আর্থসামাজিক অবস্থা এসব তাঁর আঁকার বিষয়।

এই প্রদর্শনীতে তিনি উপস্থাপন করেছেন একটি শিশুকে কেন্দ্র করে তিন প্রজন্মের সেতুবন্ধের গল্প।

ইন সার্চ অব মাই হোম, ঋতুপর্ণা সাহা

সুমনা আকতার বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পের দৃশ্যকলা ও পারফরম্যান্স শিল্পী। পারফরম্যান্স আর্টে তিনি ২০১৪ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সম্মানসূচক পুরস্কার পান। তিনি ২০২০–এর ঢাকা আর্ট সামিটের নির্বাচিত শিল্পী।

না বলা কথায় তাঁর অংশগ্রহণকৃত কাজের শিরোনাম—‘আমাদের ভেতরের গল্প’। যোগচিহ্নের আকৃতির এক লাল কাপড়ে সেলাই করে মা ও সন্তানের গল্প বুনেছেন। সুমনার অভিমত—মাতৃত্ব এক গভীর পরিবর্তন নিয়ে আসে নারীর মধ্যে, যখন একটি সন্তান একজন নারীর সমগ্র জগতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। বইটিতে মা ও সন্তানের মধ্যে গড়ে ওঠা সুন্দর বন্ধনটি তুলে ধরা হয়েছে, যা জন্ম নেয় মায়ের প্রতিটি কাজে তার অবিরাম উপস্থিতি অনুভব করার মাধ্যমে।

কাজমিন সামিয়া অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড আর্ট কলেজে পড়েছেন। এরপর শিক্ষায় ডিপ্লোমা করে কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি থেকে চারুশিল্পে স্নাতক সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

কাজমিন সামিয়া এ প্রদর্শনীতে দুটি বই উপস্থাপন করেছেন, যাতে শারীরিক-মানসিক ট্রমার মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগকে ভিজ্যুয়াল ইমেজ, লেখা, অঙ্কন ও ব্যক্তিগত বয়ান দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। বৃত্তাকার পটে লতাপাতা ঘেরা পর্বতসদৃশ অবয়ব এঁকে অব্যক্ত অনুভূতি প্রকাশের প্রয়াস করেছেন কাজমিন।

মাহমুদা সিদ্দিকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন। তিনি ছাপচিত্র থেকে বিচিত্র সব মাধ্যমে আঁকেন। টেক্সটাইল শিল্পের টেকনিকে রঙিন কাপড় জোড়া লাগিয়ে গাছপালাসমেত ভূদৃশ্য এঁকেছেন—যার নাম দিয়েছেন ‘বাড়ির টানে’, যেটি দেয়ালে ঝুলিয়েছেন। তাঁর তৈরি কাইনেটিক বই ‘আমাদের ভেতরের গল্প’ শোভা পেয়েছে ছোট টেবিলে।

পান্থকুঞ্জ, রাফিয়া মাহজাবীন

প্রদর্শনীর কিউরেটর শিল্পী ফারেহা জেবা অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের অগ্রজ। গত শতকের আশির দশকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে ছাপচিত্রে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। এশীয় দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনী ও জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে দুবার সম্মাননা পুরস্কার অর্জন করেছেন।

ফারেহা জেবার আঁকা ছাপচিত্র ও স্কেচবুক এই প্রদর্শনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দেয়ালে দৃশ্যমান ছাপচিত্রের শিরোনাম ‘সিড উইদাউট হার’। ছাপচিত্রের কেন্দ্রে হলুদ আর রক্তপিণ্ডের মতো পোড়া রঙের ক্ষেত্রভূমিতে সাদা সেলাইয়ের মতো রেখা আর অস্ফুট বীজ। পাশেই বাংলা ও ইংরেজি বর্ণে মা ছাড়া বীজের সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন শিল্পী ‘কেন কথা বলছ না, তোমার কথা শুনতে ইচ্ছে করে’!

ভেনেসা কায়সার পেশাদার একজন স্থপতি হলেও ছবি আঁকা তাঁর ভালোবাসা। তিনি বিশ্বাস করেন মানুষ ভালোবাসা আর মায়া দিয়ে সব অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। তাঁর উপস্থাপনকৃত কাজের নাম ‘আজ তোমার স্মৃতির ছুটি’। চিত্রপটে কাগজ সেঁটে রঙ চাপিয়ে এঁকেছেন মানুষের হৃদয় নামক হৃৎপিণ্ড, সেখান থেকে প্রস্ফুটিত হয়েছে ফুল ও অভিমান শব্দ। তাঁর বইয়ের ভেতর অন্তর্গত জীবনের ছায়াপাত, ভালোবাসা আর সৃজিত দূরত্বের অসমাপ্ত গল্প!

ঋতুপর্ণা সাহা টেক্সটাইল শিল্পী ও নকশাবিদ। বিশ্বভারতীর কলাভবনে টেক্সটাইল ডিজাইনে পাঠ নিয়েছেন। তাঁর কাজে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষ, উপকরণ ও স্মৃতির সম্পর্ক পাওয়া যায়। প্রদর্শনীতে তাঁর সৃজনকর্মের নাম ‘আমার নিবাসের সন্ধানে’। ক্যানভাসের জমিনে খণ্ড খণ্ড কাপড়জুড়ে সেলাই আর জ্যামিতিক রেখায় দুদিকে বাড়ির নকশার মধ্যবর্তী স্থানে জুতার ছাপ তাঁর ভাব প্রকাশকে করুণ করে তুলেছে! ভাড়াবাড়িতে বেড়ে ওঠা, বাড়ি বদল, জায়গা বদল, ঘর বদল, জানালা বদলে যাওয়া, অনেককে হারিয়ে ফেলার অজস্র স্মৃতি আর মনোকষ্ট উত্থাপিত হয়েছে ঋতুপর্ণার কাজে।

স্বদেশ, সুলেখা চৌধুরী

রাফিয়া মাহজাবীন বিশ্বভারতীর কলাভবন থেকে পড়ে টেক্সটাইল শিল্পী ও নকশাবিদ হয়েছেন। তিনি ঢাকার প্রাণকেন্দ্রের পাঁচ একর জায়গায় প্রতিষ্ঠিত মানুষ, পাখির আশ্রয় ‘পান্থকুঞ্জ পার্ক’-এর গাছপালা কেটে জায়গা সংকুচিত করে এক্সপ্রেস রাস্তার সংযোগ নির্মাণ কাজের ফলে এর পরিবেশ বিপর্যয়ের হতাশা ব্যক্ত হয়েছে তাঁর কাজে।

অর্পিতা সিংহ লোপা গ্রাফিক ডিজাইনে স্নাতকোত্তর করেছেন ঢাকার চারুকলা অনুষদ থেকে। দেশে–বিদেশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনীতে তিনি অংশ নিয়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন। এ প্রদর্শনীতে লোপা সাদা ক্যানভাসে এঁকেছেন এক মেয়েশিশু, ডিজাইনিক লতাপাতা, প্রজাপতি ও চঞ্চল হরিণের পরিবেশবাদী ছবি। বিশ্বব্যাপী পরিবেশের বিপর্যয়, মানুষের সঙ্গে প্রাণীর সম্পর্ক এই ভাবনা নিয়ে তাঁর কাজের শিরোনাম ‘গল্পের পেছনের গল্প’।

ভিজ্যুয়াল শিল্পী সুরভী আকতার চিত্রকলায় স্নাতক করেছেন ইউডা চারুকলা থেকে। তিনি এঁকেছেন আত্মোপলব্ধির ‘আত্মচক্র'। চিত্রপটে আত্মআলিঙ্গনের ছবি ও শিল্পীর আত্মপ্রতিকৃতির প্রতিচ্ছায়া। একপাশে লিখেছেন, ‘ভালো মন্দ নিজের সবটারে গ্রহণ করিয়া পাই নিজেরে খুঁজিয়া’।

শিল্পী সুলেখা চৌধুরী শিল্পে পাঠ নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে। তাঁর শিল্পীজীবনের শুরু থেকেই নারীর আনন্দ বেদনা, বঞ্চনা ও দুঃখ–কষ্ট নিয়ে ছবি আঁকছেন। ‘স্বদেশ’ শিরোনামে শিল্পী সুলেখা সাদা কাপড়ের ওপর সেলাইয়ের এ–ফোঁড় ও–ফোঁড় দিয়ে যেন বেদনাহত বীরাঙ্গনা নারীর অবয়বে বাংলাদেশ ৭১ লিখে মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন দেশের উল্টোযাত্রাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

‘না বলা কথা’ নামের প্রদর্শনীটি শেষ হচ্ছে ৯ সেপ্টেম্বর, বুধবার।