default-image

বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার বড় অংশই একই মাতৃভাষার মানুষ। একই দেশেরই নাগরিক ছিল তারা কয়েক দশক আগেও। কিন্তু আজ পরস্পরকে তারা খুব কমই জানে। আবার খোদ পশ্চিমবঙ্গেও হিন্দু-মুসলমানরা একই রাজ্যে থেকেও পরস্পর সম্পর্কে অনেক অজ্ঞতায় ভোগে। অনেক ভুল ধারণা নিয়ে চলে। আন্তসীমান্ত ও আন্তধর্মীয় এ রকম জানাবোঝার ঘাটতি যে কত অস্বাভাবিক স্তরে নেমে গেছে তা বোঝা যায়, উভয় দেশের রাজনৈতিক নানান লেখাজোখায়ও। ক্রমবর্ধমান পারস্পরিক সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাবোধেও ওই অজ্ঞতার বিষয়টি বেশ ধরা পড়ে।

সাংবাদিক-লেখক মিলন দত্ত সেই শূন্যতা পূরণের একটা চেষ্টা করেছেন এ বইটা লিখে। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের অবস্থা সম্পর্কে যারা জানতে-বুঝতে আগ্রহী, তাদের জন্য এটা একটা প্রয়োজনীয় বই। একাডেমিক ধাঁচে নয়, বরং সাংবাদিকসুলভ সহজ ভাষায় লেখক এই সম্প্রদায়ের প্রায় সব দিককে স্পর্শ করেছেন ১১টি পৃথক পৃথক নিবন্ধে।

কোটি কোটি মানুষের একটা সম্প্রদায়ের সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতি-সংস্কৃতিকে একই বইয়ে তুলে আনা সহজ নয়। বলা যায়, সমাজবিদ্যার দিক থেকে জটিল কাজই সেটা। মিলন দত্ত সহজে তা পেরেছেন। কারণ, সাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘদিন তিনি পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান সম্প্রদায়কে ভেতর থেকে দেখেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি তাঁদের আর্থসামাজিক বিষয়ে লিখেছেন। তাঁর লেখার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পক্ষে-বিপক্ষের বাইনারি দিয়ে এ সম্প্রদায়কে দেখেননি তিনি। এ সম্প্রদায়কে হেয় করা যেমন তাঁর লেখার কোনো প্রকল্প ছিল না, তেমনি সাম্প্রদায়িক তোষণ থেকেও তাঁর কলম মুক্ত বলেই মনে হয়েছে। অনেক সময় তীব্র সত্যকে খুব তিক্তভাবেই বলেন লেখক। তবে পাঠককে তা সঠিক ধারণা পেতেই সাহায্য করে।

বিজ্ঞাপন

এ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন হচ্ছে। মুসলমানরা এ রাজ্যের শুমারিতে প্রায় এক–তৃতীয়াংশ। ফলে নির্বাচনী গণিতে তাদের ভোটের খতিয়ান খোঁজা হচ্ছে হরদম। দেখা যাচ্ছে, এ রকম অনেক প্রতিবেদনেই মুসলমানদের ভোট–আচরণ নিয়ে মনগড়া নানান গল্প তুলে ধরা হচ্ছে। মিলন দত্তের বইয়ে কথিত ‘মুসলমান ভোটব্যাংক’ নিয়েও বিস্তর সমাজতাত্ত্বিক আলোচনা রয়েছে।

এ রাজ্যের মুসলমানদের মধ্যে কেবল ভাষাভিত্তিক বৈচিত্র্যই নয়, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রয়েছে বিস্তর। ফলে রাজ্যের মুসলমানদের কোনো একক চরিত্রে, একক মনোভাবে ফেলা যে বড় ভুল, সেটাই লেখক নানান তথ্য-উপাত্ত-ইতিহাস দিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর লেখা পাতায় পাতায় তথ্য-উপাত্তে ঠাঁসা, তবে তাতে নিবন্ধগুলো পড়তে হোঁচট খেতে হয় না, ক্লান্তও করে না সেসব পাঠককে।

কেমন আছে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান মিলন দত্ত প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা প্রকাশকাল: জানুয়ারি ২০২১ প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল দাম: ২৫০ টাকা।

পশ্চিমবঙ্গ ভারতের দারিদ্র্যকবলিত কোনো রাজ্য নয়। কিন্তু এ রাজ্যে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। কেন এ রকম অবস্থা এ সম্প্রদায়ের, তারও উত্তর খুঁজেছেন লেখক। এ রাজ্যে বামপন্থীরা ক্ষমতায় ছিল ৩৪ বছর। তাদের সময়ও শিক্ষা ও চাকরিতে এ সম্প্রদায়ের তেমন প্রবেশ ঘটেনি। পরের সরকারগুলোও পরিস্থিতির মৌলিক কোনো রূপান্তর ঘটাতে পারেনি। এর মধ্যেই আবার সম্প্রদায়ের অভ্যন্তর থেকে জেগে ওঠা কিছু উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা এখন বেশ এগিয়েছে। এ উভয় প্রবণতারই চুলচেরা অনুসন্ধান করেছেন মিলন দত্ত। সাংবাদিকের নীতিমালার মধ্যেই তাঁর বিবরণ ঘুরপাক খেয়েছে। তিনি কেবল পরিস্থিতির বিবরণ তুলে ধরেন, কোনো সুপারিশ নিয়ে হাজির হন না। সেটাও জরুরি বটে, কিন্তু সে কাজটি নিশ্চয়ই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক।

ধর্ম কীভাবে বাংলাভাষী এ রাজ্যে মুসলমানদের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিবিধ টানাপোড়েনের জন্ম দিয়েছে, সেটাও লেখক বিস্তারিত তুলে আনতে ছাড় দেননি। মাদ্রাসাশিক্ষা এবং তার প্রভাব সম্প্রদায়গত বিকাশে কতটা কী ভূমিকা রাখছে, আদৌ রাখছে কি না, তা নিয়ে মাঠপর্যায়ের অনেক পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায় এ বইয়ে। যে বিবরণের কিছু কিছু বাংলাদেশের সঙ্গেও মিলে যাবে হয়তো।

বিজ্ঞাপন
বইপত্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন