default-image

মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহিম এই ঘটনার কথা লিখে পাঠিয়েছিলেন, বাংলার আবহমান ঐতিহ্য—সহমর্মিতা আর সহযোগিতার একটা উদাহরণ হিসেবে এটি গণ্য হতে পারে। যুদ্ধের আগুনে যা পুড়ে যায়নি। অথবা পুড়তে পুড়তে বেঁচে গেছে; এখনো বেঁচে আছে।

জুলেখার বাবা ছিলেন পেশোয়ারের মানুষ; চাকরি করতেন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের কুষ্টিয়া শাখায়। যুদ্ধের শুরুতে অবরুদ্ধ শহরে আটকে পড়া অনেক বাঙালি সহকর্মীকে হানাদারদের হাত থেকে রক্ষার রেকর্ড ছিল তাঁর। পরিবার নিয়েই থাকতেন কুষ্টিয়ায়। সবাই চিনত তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে। এ দেশটাকে কি তিনি একটু বেশিই ভালোবেসে ফেলেছিলেন? নাকি অনেক চেষ্টা করেও বদলি হতে পারেননি? পারেননি প্লেনের টিকিট জোগাড় করতে?

নভেম্বর মাসে রোজার খতম তারাবিহ শেষ হতে হতে পাকিস্তান খতমের সব আলামত পরিষ্কার হয়ে যায়। কর্মরত অনেক অবাঙালি রোজার আগেই লোটা-কম্বল নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। তখন পিআইএর টিকিটের বেশ কড়াকড়ি ছিল। বেসামরিক লোকদের টিকিট নানা স্তরের সামরিক কর্মকর্তা বা মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটরদের অনুমতি সাপেক্ষে দেওয়া হতো। যাঁরা ঢাকা থেকে দূরে অথবা ছোটখাটো চাকরি করতেন, তাঁদের জন্য সে সুযোগ ছিল আকাশের চাঁদ পাওয়া। তাই দিন যতই ঘনিয়ে আসতে থাকে, তাঁদের চিন্তা ততই বাড়তে থাকে। রাজবাড়ীর হঠাৎ বড়লোক হওয়া বিহারি থেকে শুরু করে কারও সাতে-পাঁচে না থাকা চাকুরে অবাঙালিরা এ সময় আস্তে আস্তে ঢাকার পথ ধরতে থাকেন। ওলি মোহাম্মদ যখন তাঁর পরিবার-পরিজন নিয়ে কুষ্টিয়া থেকে ঈশ্বরদীর পথে পা বাড়ালেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। পাকিস্তান রেডিওর প্রচারে হয়তো তিনিও বিভ্রান্ত ছিলেন। যশোর মুক্তির পর মিত্রবাহিনী কুষ্টিয়ায় আসতে গিয়ে পাকিস্তানিদের পাতা ফাঁদ-যুদ্ধে প্রচণ্ড ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হয়। ফলে কুষ্টিয়া শহরে মিত্রবাহিনী ব্যাপক বিমান আক্রমণের পথ বেছে নেয়। শহরে আটকে পড়া মানুষের জন্য সেটা ছিল শহর ছাড়ার বার্তা। পাকিস্তানের খেল খতমের সব আলামত ওলি মোহাম্মদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাওয়ায় তিনিও ঈশ্বরদী হয়ে ঢাকা পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। ভেড়ামারা পর্যন্ত তাঁদের পৌঁছাতে কোনো কষ্ট হয়নি। পদ্মা পার হয়ে পাকশী-ঈশ্বরদী পৌঁছানোর তখন একটাই পথ। সাঁড়া রেলসেতু হেঁটে পার হতে হতো।

বিজ্ঞাপন

দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অবাঙালিদের ঢল তখন সাঁড়া ব্রিজের ওপর। সবাই ছুটছে ঈশ্বরদীর দিকে, যেন রেলসেতু পার হলেই পাকিস্তানের দেখা পাওয়া যাবে। পাকশী-ঈশ্বরদী তখন বিহারিদের আর পাকিস্তানি সৈন্যদের শক্ত ঘাঁটি। কেউ কেউ তখনো বিশ্বাস করছিলেন ঈশ্বরদী বা পাকশী পর্যন্ত যেতে পারলে এবারের মতো তাঁরা রক্ষা পাবেন। বর্ডার থেকে একটু দূরে হওয়ায় তাঁদের মনে এই বিশ্বাস বা ভরসা জন্মে। ওলি মোহাম্মদেরও সে রকম বিশ্বাস হয়ে থাকবে। কোনোমতে ঢাকা পৌঁছাতে পারলে করাচির একটা টিকিট জোগাড় করা যাবেই যাবে। রাজবাড়ী, মিরপুর, ভেড়ামারা, জগতি, কুষ্টিয়ার সব বিহারি তখন নিরাপদ অবস্থানের সন্ধানে একবুক শঙ্কা নিয়ে ছুটছে ‘পাকিস্তানে’র দিকে—কারও কাছে তখন পাকশী পাকিস্তান, কেউ ভাবছে ঈশ্বরদী, কারও মঞ্জিলে মকসুদ আবার ঢাকা; মিরপুর, মোহাম্মদপুরে তখনো পাকিস্তানের ঘাঁটি।

কুষ্টিয়ার ফাঁদ-যুদ্ধে মিত্রবাহিনীকে আটকিয়ে দিয়ে পাকিস্তানিরা পাবনা হয়ে ঢাকায় যাওয়ার ধান্দা করেছিল। মিত্রবাহিনী তাই আকাশ থেকে তাদের অনুসরণ করে পাকশীতে আটকে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। সাঁড়া রেলসেতুর ওপর যুদ্ধবিমান থেকে হামলা করে তারা। আকাশ থেকে ছোড়া বোমায় ব্রিজের একটা গার্ডার ভেঙে যায়। ওলি মোহাম্মদ তখন ব্রিজের ওপরে। ওলি তাঁর কিশোরী মেয়েকে নিয়ে ছিটকে পড়েন পদ্মায়। জুলেখা শুধু এটুকুই মনে করতে পারেন। তাঁর বাবা ওলি মোহাম্মদকে তিনি আর খুঁজে পাননি। খোঁজ মেলেনি তাঁর মা আর ভাইবোনদের। বোমায় ব্রিজের যে অংশটা ভেঙে পড়ে, তার ওপাশে মানে পাকশীর দিকে ছিলেন মেয়ের সঙ্গে ওলি মোহাম্মদ আর ছোট দুই ছেলেকে নিয়ে ভেড়ামারার দিকে ছিলেন ওলি মোহাম্মদের স্ত্রী। বোমার আঘাতে সম্ভবত তাঁরা প্রাণ হারান। ওলি তাঁর কিশোরী মেয়েকে নিয়ে ছিটকে পড়েন পাকশীর দিকে। পাকশী ঘাটে সামছুদ্দিন মেম্বার জুলেখাকে খুঁজে পান। সামছুদ্দিন মেম্বারের নৌকায় তাঁর ঠাঁই হয়। নৌকার লোকেরা তাঁকে নদী পার করে আবার ভেড়ামারার দিকে নিয়ে আসেন। মুক্তিযোদ্ধাদের নজরে পড়ে ঘটনা। তখনো যুদ্ধ শেষ হয়নি, পেছন থেকে পাকিস্তানি সৈন্যদের আক্রমণের ভয় কাটেনি। তাঁরা তখন তাড়াহুড়োর মধ্যে সামছুদ্দিন মেম্বারকে নির্দেশ দেন মেয়েটিকে তাঁর হেফাজতে রাখতে। জুলেখা বেঁচে যান। সামছুদ্দিন মেম্বারের বাড়িতে তার ঠাঁই হয়।

জুলেখা বেঁচে যান। কুষ্টিয়া গার্লস স্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়া জুলেখা ভালো বাংলা জানতেন। স্কুলে থাকতেই জুলেখার নাটক, নাচ-গানে খুব মনোযোগ ছিল। যুদ্ধ শেষে তখন চারদিকে উৎসব আর উৎসব। নাটক হয়, গানের আসর বসে, জুলেখাকেও গাইতে হয়, নাচতে হয়। সদ্য পরিবার হারানো একটা কিশোরী মেয়ে কতটুকু মন থেকে এসব করতেন আর কতটুকু বাঁচার জন্য, আশ্রয়দাতার আগ্রহে, সে কথা জুলেখা ছাড়া আর কেউ কি জানে? তবে তাঁর নাম হয়ে যায় চারদিকে। প্রায় সপ্তাহে তাঁকে মঞ্চে উঠতে হয়। নাটক করতে হয়। কাঁদতে হয়। অভিনয়ে এমন সত্যিকার কান্না মানুষ আগে দেখেনি। মানুষের প্রশংসা পায় তাঁর অভিনয়। চারদিকে জুলেখার নাম ছড়িয়ে পড়ে। সামছুদ্দিন মেম্বারের চিন্তা বাড়ে। নাটকপাগল মুক্তিযোদ্ধা বিলাস শেষ পর্যন্ত বিয়ে করেন জুলেখাকে। জুলেখা বিলাসদের বাড়ি চলে আসেন। সংসার করেন। সাঁড়া ব্রিজের ভাঙা অংশ জোড়া লাগে। আবার ট্রেন যায়, মানুষ যায়। জুলেখা তাকিয়ে থাকেন ব্রিজের দিকে। তাঁর বাবা, মা ও দুই ভাই ওই ব্রিজেই ছিল। তাঁরা আর আসবেন না।

বইপত্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন