অশনি সংকেত ছবির জন্য বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ডাক এসেছে। সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ছবির অন্যতম প্রধান শিল্পী ববিতা জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে পৌঁছালেন, কিন্তু ইমিগ্রেশনে তাঁর বাংলাদেশি পাসপোর্ট আটকে গেল। কারণ, জার্মানি তখনো স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি।
ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে সবার বার্লিন যাওয়ার কথা। ছবির পরিচালক সত্যজিৎ রায়সহ অন্য কলাকুশলীরাও ফ্রাঙ্কফুর্টে। এ অবস্থায় ববিতাকে যেতে দেওয়া হবে না শুনে সত্যজিৎ ফোনে কথা বললেন উৎসব কমিটির চেয়ারম্যানের সঙ্গে। বললেন, ববিতা তাঁর ছবির শিল্পী। ববিতাকে ছাড়া তিনি উৎসবে যেতে পারবেন না। তাঁর কথায় বিশেষ ছাড়পত্র পেলেন ববিতা।
১৯৭৩ সালের ঘটনাটির কথা জানা যাবে সত্যজিৎ স্মৃতি বইটিতে। বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষে প্রথমা প্রকাশ করেছে এটি। তাতে সংকলিত হয়েছে এই চলচ্চিত্রস্রষ্টাকে নিয়ে বাংলাদেশের কিছু গুণী মানুষের স্মৃতিচারণা।
সত্যজিৎ রায়ের শিকড় এই বঙ্গেই, কিশোরগঞ্জের মসুয়ায় তাঁর পূর্বপুরুষের ভিটেবাড়ি। সেই বাড়ি ঘুরে এসে লিখেছেন পিয়াস মজিদ। সত্যজিতের মামাবাড়ি ছিল পুরান ঢাকার ওয়ারীতে, ছেলেবেলায় এসেছিলেন। স্টিমারে আসার পথে দেখেছিলেন পদ্মার অপরূপ রূপ। তখনই বাংলাদেশ তাঁর হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের খোঁজখবর তিনি রাখতেন।
সত্যজিতের ভাবমূর্তি ছিল বেশ গম্ভীর, রাশভারী প্রকৃতির মানুষ হিসেবে। অনেকে কাছে ঘেঁষতে ভয় পেতেন। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে যখনই কেউ সত্যজিতের সঙ্গে কেউ দেখা করতে গেছেন, শত ব্যস্ততার মধ্যে তিনি সময় দিয়েছেন।
আগে থেকে না জানিয়ে আলোকচিত্রী সাঈদা খানম গিয়েছিলেন দেখা করতে। তখন ১৯৫৫ সাল, পথের পাঁচালী কিছুদিন আগেই মুক্তি পেয়েছে। পূর্ব বাংলার কথা শুনে সত্যজিৎ দেখা দিলেন। সাক্ষাৎকার দিলেন। যে পদ্মাকে তিনি দেখে এসেছিলেন, তার কথা জানতে চাইলেন। বললেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চান। শুটিং করতে চান পদ্মাপাড়ে।
না জানিয়ে সপরিবার চলে গিয়েছিলেন সাংবাদিক মতিউর রহমানও। সময়টা ১৯৮৬ সাল। ঢাকা থেকে এসেছেন শুনেই সত্যজিৎ দেখা দেন। মতিউর রহমানের স্মৃতিচারণায় জানা যাচ্ছে, একান্ত সৌজন্যমূলক আলাপে সত্যজিৎ বাংলাদেশের খবরাখবর নিয়েছিলেন। কবি শামসুর রাহমান ও শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর কাজ সম্পর্কে জানেন। বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের যথাশব্দ বইটির খুব প্রশংসা করেছিলেন। লোকমুখে সত্যজিতের এমনই প্রশংসার কথা জানতে পেরেছিলেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার, বিটিভিতে তাঁর নির্দেশিত রবীন্দ্রনাথের নাটক রক্তকরবীর জন্য।
মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয় লাভের কিছুদিন পরেই ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সত্যজিৎ রায় ঢাকায় এসেছিলেন। পল্টন ময়দানের বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, শহীদ দিবসের পুণ্য তিথিতে বাংলাদেশ তাঁকে যে সম্মান দিয়েছে, তিনি কখনো ভুলবেন না। ভাষণটি এই সংকলনে স্থান পেয়েছে।
বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের শুরুর বছরগুলোতে নানাজনের স্মৃতিতে সত্যজিৎকে পাওয়া যায়। তিনি ঘরে-বাইরে ছবিতে অভিনয়ের জন্য অভিনেতা সৈয়দ হাসান ইমামকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন ১৯৭২ সালের শেষের দিকে, যদিও পরে তা হয়ে ওঠেনি। সে বছরই ববিতা অশনি সংকেত-এ অভিনয়ের জন্য নির্বাচিত হন। কীভাবে সেটি সম্ভব হলো, সে–ও এক বিচিত্র গল্প।
সত্যজিৎ স্মৃতি সংকলন ও সম্পাদনা: পিয়াস মজিদ প্রচ্ছদ: শহীদ কবির, প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, প্রকাশকাল: মে ২০২১, পৃষ্ঠা, দাম: ২৫০ টাকা পাওয়া যাবে www.prothoma.com এবং মানসম্মত বইয়ের দোকানে।
পরের বছর ১৯৭৩ সালে সস্ত্রীক সত্যজিৎ গিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের লন্ডনে। সেখানে সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক বিবিসির পক্ষ থেকে সত্যজিতের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলেন। একপর্যায়ে সত্যজিৎ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, স্বাধীন হলেও বাংলাদেশে এখনো পাকিস্তানি ধ্যানধারণা রয়ে গেছে। ‘বাংলাদেশে না প্রতিক্রিয়াশীলরাই আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।’ কিছুদিন পরেই তাঁর শঙ্কা সত্যি হয়েছিল।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝিতে ভারতের পুনের চলচ্চিত্র ইনস্টিটিউটে পড়ার সময় সত্যজিৎকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকী। কাছাকাছি সময়ে সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কাছে সেলিনা হোসেন জানতে পারেন, তাঁর হাঙর নদী গ্রেনেড গল্পটি সত্যজিৎ পড়েছেন। গল্পটি অবলম্বনে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে আগ্রহী। এ নিয়ে ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮ সালে বেশ কয়েক দফায় সেলিনা হোসেনের সঙ্গে সত্যজিতের চিঠি চালাচালি হয়। কিন্তু শেষমেশ ছবিটি হয়নি। সাহিত্যিক শাহেদ আলীর জিব্রাইলের ডানা গল্পটি থেকেও সত্যজিতের চলচ্চিত্র নির্মাণের ইচ্ছা ছিল।
সংকলন বইটিতে আরও আছে ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন ও শিশুসাহিত্যিক আলী ইমামের সত্যজিৎ–দর্শনের গল্প। আছে সত্যজিৎকে নিয়ে শামসুর রাহমান ও বেলাল চৌধুরীর দুটি কবিতা। আর আলোকচিত্রী আমানুল হক কীভাবে সত্যজিতের দ্বিতীয় সেরা ছবিটি তুলেছিলেন, সেটি জানার জন্যও পড়তে হবে সত্যজিৎ স্মৃতি। শিল্পী শহিদ কবীরের প্রচ্ছদও হয়েছে দারুণ।