default-image

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা শুরু হয়েছিল দেড় শ বছরেরও আগে, অক্ষয়কুমার দত্তের হাত দিয়ে। জগদীশচন্দ্র বসুর অব্যক্ত তো রীতিমতো বিজ্ঞানসাহিত্য বলে বিবেচিত হতে পারে। তাতে যেমন তরুলতার নিঃশব্দজগতের কথা জানা যায়, তেমনি সহজ–সরল সুললিত ভাষার জন্য এতে সাহিত্যের স্বাদও পাওয়া যায়। এ রকমের আরেকটি অসাধারণ বই হলো রবীন্দ্রনাথের বিশ্বপরিচয়—একই মলাটের মধ্যে মহাকাশ ও সাহিত্য।

আমাদের ছেলেবেলায় আমরা কুদরাত-ই-খুদার বিজ্ঞানের বই পড়েছি—পাঠ্যপুস্তক হিসেবে। ১৯৬০-এর দশকে আবদুল্লাহ আল–মুতী শরফুদ্দীন, আমিনুল ইসলাম প্রমুখের বিজ্ঞানের বই পড়েছি, যা পাঠ্যপুস্তক ছিল না। আল–মুতীর বইগুলো প্রধানত শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা। বড়দের জন্যও আছে। সব মিলিয়ে তাঁর বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৫০। বিজ্ঞানসাহিত্যে এই ভূমিকা রাখার জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং একুশে পদক লাভ করেন। আমিনুল ইসলামের চিল ময়না দোয়েল কোয়েলও পুরস্কার পাওয়া বই।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর উচ্চশিক্ষার জন্য বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার বহু বই প্রকাশিত হয়, যেগুলোর বেশির ভাগই অনূদিত, পাঠ্যপুস্তক। কিন্তু সাধারণ পাঠকের ভালো লাগতে পারে অথবা তাঁদের কৌতূহল মেটাতে পারে, এ রকমের বিজ্ঞানের বই বড় একটা প্রকাশিত হয় না। পশ্চিমবঙ্গ থেকে মানুষের ঠিকানা মহাকাশের ঠিকানা দিয়ে আরম্ভ করে পথিক গুহর ঈশ্বরকণা মানুষ ও অন্যান্য–এর মতো কিছু উচ্চমানের বই অবশ্য প্রকাশিত হয়েছে।

খানিকটা বিজ্ঞানের বইয়ের অভাব মেটাতে, খানিকটা নিজেকে প্রকাশ করার টানে কয়েক বছর আগে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চায় এগিয়ে আসেন মহাজাগতিক বিজ্ঞানী অধ্যাপক শিশিরকুমার ভট্টাচার্য। তিনি কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণের পর সময়টাকে কী কাজে ব্যয় করবেন, তা–ই নিয়ে ভাবছিলেন। শেষ পর্যন্ত পরকালচর্চা না করে মহাবিশ্ব চর্চা করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর সেই উদ্যোগের প্রথম ফসল মানুষ ও মহাবিশ্ব (২০০৪)। প্রথম বই-ই তাঁর জন্য যথেষ্ট সাফল্য নিয়ে আসে। এ বইয়ের একাধিক সংস্করণ থেকে এই সাফল্যের আভাস পাওয়া যায়। বইটি কলকাতা থেকেও প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম বইয়ের পর অধ্যাপক ভট্টাচার্য একে একে মহাবিশ্বের নানা দিক নিয়ে বই লিখেছেন।

এসবের মধ্যে আছে মহাজাগতিক মহাকাব্য (২০১০), কালের প্রকৃতি ও অন্যান্য (২০১৩), সৃষ্টির মহান পরিকল্পনা (২০১৫), সৌরজগতের সৃষ্টি ও নানা প্রসঙ্গ (২০১৫), ব্ল্যাকহোল (২০১৬) এবং ছোটদের বড়দের মহাবিশ্ব (২০১৮)। তাঁর এ বইগুলোর মধ্যে একটিমাত্র অনুবাদ—সৃষ্টির মহান পরিকল্পনা। অন্য বইগুলো মৌলিক রচনা। অনুবাদের আড়ষ্টতা নেই তাঁর রচনায়। তিনি উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন মহাকাশবিজ্ঞানে। ফলে তাঁর বইগুলোতে আড়ষ্টতার বদলে আছে বিশেষজ্ঞ ও স্বতঃস্ফূর্ততার ছাপ।

অতিসম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর আরেকটি বই—আইনস্টাইন: জীবন ও আপেক্ষিক তত্ত্ব। জীবনী-সাহিত্যে আমার বিশেষ আগ্রহ আছে। তাই বইটি আমি ঢাকা থেকে ডাকযোগে আনিয়ে পড়লাম। পড়ে মনে হলো ডাকযোগে আনানোর চেষ্টাটা আমার যথেষ্ট মাত্রায় পুরস্কৃত হয়েছে। এককথায় চমৎকার বই। এ গ্রন্থ থেকে কেবল যে বিশ্বের অতি বিরল এক প্রতিভা হয়ে ওঠার কাহিনি সংক্ষেপে জানতে পারলাম, তা–ই নয়, সেই বিজ্ঞানীর অমর কীর্তি—আপেক্ষিক তত্ত্বের মতো অত্যন্ত জটিল বিষয়ও খানিকটা বুঝতে পারলাম। ‘বুঝতে পারলাম’ বলাটা প্রায় বেয়াদবি হয়ে যাচ্ছে, বরং বলি, ‘আপেক্ষিক তত্ত্ব’ কী জটিল বস্তু, তার খানিকটা স্বাদ পেলাম। তা ছাড়া জানতে পারলাম আইনস্টাইনের বর্ণাঢ্য জীবনের সংক্ষিপ্ত পরিচয়।

বইটি ১৪টি অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রথম দুই অধ্যায়ের বিষয়বস্তু হলো আইনস্টাইনের জন্ম ও শিক্ষা। ইতিহাসের অতি দুর্লভ প্রতিভা হলেও, আলবার্টের জন্ম ও শিক্ষা অসাধারণ কিছু ছিল না। তিনি জন্মেছিলেন জার্মানির উলম নামের একটি ছোট্ট শহরে, এক মধ্যবিত্ত ইহুদি পরিবারে। অল্প বয়সেই তাঁদের পরিবার চলে যায় উলমে‌র প্রায় দেড় শ কিলোমিটার পুবের শহর মিউনিখে। সেখানে এবং তারপর সুইজারল্যান্ডে তিনি লেখাপড়া শেখেন।

তাঁর লেখাপড়া সম্পর্কে যা জানা যায়, তার মধ্যে খানিকটা অভিনবত্ব আছে। প্রচলিত অর্থে তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন না। স্কুল তাঁর কাছে ভালো লাগত না। শিক্ষকেরাও তাঁকে ভালো ছাত্র বলে মনে করতেন না। এমনকি কেউ কেউ তাঁকে মানসিক প্রতিবন্ধী হিসেবেও শনাক্ত করেছিলেন। শিক্ষাজীবন শেষ করে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি কাজ পাননি, সাধারণ কর্মচারীর চাকরি পেয়েছিলেন পেটেন্ট অফিসে। আলবার্ট তাতে অবশ্য অখুশি হলেন না। কারণ, সেখানে বেশি কাজ ছিল না।

default-image

সেখানে বসে বসে তিনি নিজের গবেষণা করতেন। এই অফিসে থাকার সময়ে ১৯০৫ সালের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে তিনি পাঁচ-পাঁচটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন জার্মানির বিখ্যাত সাময়িক পত্রিকা অ্যানালেন ডার ফিজিক–এ (জার্নাল অব ফিজিকস)। তাঁর এই প্রবন্ধগুলো পদার্থবিজ্ঞানের এমন কয়েকটি বিষয় নিয়ে রচিত, আগে যেগুলো সম্পর্কে কেউ প্রশ্ন করেননি। যেমন, আলোর গতিপথ ও মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, পরমাণুর গতি এবং বস্তুর ভর ও গতির পারস্পরিক সম্পর্ক। এসব প্রবন্ধে তিনি এতকাল ধরে প্রতিষ্ঠিত একাধিক তত্ত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন। এই বছরটাকে তাই আখ্যায়িত করা হয়েছে তাঁর জীবনের ‘বিস্ময়কর বছর’ হিসেবে। তিনি পিএইচডি ডিগ্রিও করেছিলেন এ বছর।

তিনি আশা করেছিলেন যে তিনি এসব বিষয়ে এমন এমন প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, যা থেকে পদার্থবিজ্ঞানীদের মধ্যে হইচই পড়ে যাবে। তাঁরা বিস্মিত ও উত্তেজিত হবেন। কিন্তু বিষয়গুলো এমন জটিল ছিল যে তার বেশির ভাগই পদার্থবিজ্ঞানীদের মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল। তাঁরা নিন্দা ও প্রশংসা কিছুই করলেন না।

সত্যি বলতে কি, তাঁর জীবনের একটা সময় পর্যন্ত তিনি বারবার বাধার মুখোমুখি হয়েছেন। যেমন তাঁর পিএইচডি করার ঘটনা। তাঁর প্রস্তাব ও অভিসন্দর্ভ নানা অজুহাতে বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। শেষে ১৯০৫ সালে ষষ্ঠবার তা গৃহীত হয়। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার ব্যাপারেও তিনি বারবার বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তাঁর আপেক্ষিক তত্ত্ব সম্পর্কে বলা হয় যে জার্মান বিজ্ঞানকে হেয় করার জন্য আইনস্টাইন এই তত্ত্ব খাড়া করেছেন—আসলে এটা একটা ইহুদি ষড়যন্ত্র। শেষ পর্যন্ত তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়ে এই পুরস্কারকেই অলংকৃত করেছিলেন। কিন্তু তিনি যাতে এই পুরস্কার না পান, সে জন্য এক নোবেল বিজয়ী পণ্ডিত তিন বছর ধরে পুরস্কারটি আটকে রাখেন। অবশেষে ১৯২২ সালে পুরস্কারটি তাঁকে দেওয়া হয় ফোটন আবিষ্কার ও আলোক-বিদ্যুৎ ক্রিয়ার ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য। আইনস্টাইনের আগে নিউটন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অস্তিত্ব প্রমাণ করেছিলেন। কিন্তু মহাকাশের গ্রহ–নক্ষত্রগুলো কীভাবে একে অন্যকে আকর্ষণ করে, সেই রহস্য ভেদ করেন আইনস্টাইন। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব বস্তুত আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের প্রশস্ত দরজা খুলে দিয়েছে। এই তত্ত্ব তিনি প্রকাশ করেন ১৯১৫ সালে। সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব অতি দুর্ভেদ্য বিষয়, কিন্তু আলোচ্য গ্রন্থে লেখক বিষয়টিকে বোধগম্য করে পরিবেশন করেছেন।

লেখক এই দুঃসাধ্য কাজটি করতে পেরেছেন দুটি কারণে—বিষয়টির ওপর এবং ভাষার ওপর তাঁর অসাধারণ দখল থাকায়। তিনি অত্যন্ত সহজ–সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় বিষয়টি বুঝিয়ে বলেছেন। তাঁর ভাষার একটা নমুনা দিচ্ছি:

সাত বছর তিনি পেটেন্ট অফিসে গবেষণার কাজ চালিয়ে গেছেন। কিন্তু ১৯০১ থেকে ১৯০৪ সাল পর্যন্ত তিনি কোনো কিছুই করতে পারেননি। যেসব সমস্যা নিয়ে তিনি ভাবছিলেন, তার সমাধানগুলো যেন মাথার ভেতরে কেবলই ঠেলাঠেলি করছিল। কিন্তু বের হওয়ার পথ পায়নি। ‘বাহিরিতে চায় দেখিতে না পায়/ কোথায় কারার দ্বার।’ অবশেষে ১৯০৫ সালে কারার দ্বার খুলে গেল। গড়গড় করে বেরিয়ে আসতে লাগল তাঁর সমাধানগুলো। আইনস্টাইন নিজেই বলেছেন, ‘a storm broke loose in my mind.’ ঠিক যেমন রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’তে বলেছিলেন, ‘জাগিয়া উঠেছে প্রাণ/ ওরে উথলি উঠেছে বারি।’

অধ্যাপক ভট্টাচার্যের ভাষায় কঠিন যা আছে, তা হলো পারিভাষিক শব্দগুলো। নয়তো বাক্যগুলো ছোট ছোট, শব্দগুলো অনাভিধানিক, শব্দক্রম সাবলীল।

বাঙালি পাঠকদের কাছে আলোচ্য গ্রন্থটির আরেকটি আকর্ষণ হবে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আইনস্টাইনের দেখাসাক্ষাতের ঘটনা। তাঁদের প্রথম দেখা হয় ১৯২৪ সালে। তারপর তাঁদের আরও চারবার দেখা হয় ১৯৩০ সালের জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও ডিসেম্বরে। প্রথম চারবার দেখা হয় বার্লিনে আর শেষবার দেখা হয় নিউইয়র্কে। তাঁদের মধ্যে দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের সময়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে মহাবিশ্ব, সংগীত ও সত্য-সুন্দর বিষয়ে আলোচনা হয়। আলোচনাটির পুরোটাই এ বইতে উদ্ধৃত হয়েছে।

বইয়ের একটি অধ্যায়ের নাম ‘গল্পে আইনস্টাইন’। নিতান্ত অরসিক পাঠককেও হাসাবে হাসির এই টুকরোগুলো। এর আগের অধ্যায়ের বিষয়বস্তু ‘আইনস্টাইনের ধর্মবিশ্বাস’। আর পরের অধ্যায়ের বিষয়বস্তু ‘আপেক্ষিক তত্ত্ব’। মাঝখানে হাসির বাণ। মনে হয়, অধ্যায়-বিন্যাস আরেকটু সুশৃঙ্খল হতে পারত। বইয়ের শেষে দুর্ভাগ্যক্রমে কোনো নির্ঘণ্ট নেই।

এ বইয়ের অনেক নামই জার্মান ভাষার। তাদের উচ্চারণ ইংরেজি নাম থেকে আলাদা। লেখক Luitpold–কে লিখেছেন ‘লাইটপোল্ড’, Weber–কে লিখেছেন ‘ওয়েবার’, Ulm–কে ‘উল্‌ম্‌’। হওয়া উচিত ছিল লুইটপোল্ড, বেবার ও উল্‌ম্‌। এ রকম শব্দ আরও আছে। কয়েকটা ছাপার ভুলও চোখে পড়ল।

কিন্তু এ রকম তুচ্ছ কয়েকটা ছাপার ভুল নয়, যা সত্যিকার লক্ষ করলাম, তা হলো পাঠ্যপুস্তক নয়, এমন একটা বিজ্ঞানের বইয়ের আবির্ভাব, যা সাধারণ পাঠক পড়তে পারবেন নিজের জানার কৌতূহল মেটানোর জন্য। এ রকমের যত বই প্রকাশিত হয়, সাধারণ পাঠকদের মধ্যে বিজ্ঞানের বই পড়ার আগ্রহ ততই বাড়বে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0