বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমরা এবার তৃতীয় খণ্ড নিয়ে আলোচনায় ব্রতী হব। এ খণ্ড লেখক কর্তৃক ‘মসনভি শরীফের কাহিনী ও মর্মবাণী’ শিরোনামে আগেই প্রকাশিত হয়েছে (আল্লামা রুমি সোসাইটি, আগস্ট, ২০০০)। বর্তমানে এটি নতুন কলেবরে তৃতীয় খণ্ডে জায়গা করে নিয়েছে। এ খণ্ডে জালালউদ্দিন রুমির ছয় খণ্ডে প্রকাশিত ‘মসনভি’র চার শতাধিক গল্প থেকে ১১৫টি আহমদুল হক বেছে নিয়েছেন এবং নিজ ব্যাখ্যাসহ প্রকাশ করেছেন। তৃতীয় খণ্ডকেও ছয় ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সংগত কারণেই তৃতীয় খণ্ডের ভূমিকায় সম্পাদনা পরিষদ মন্তব্য করেছে, ‘“মসনভি শরীফের কাহিনী ও মর্মবাণী” গ্রন্থের ছয়টি খণ্ডের সমুদয় গল্পই তৃতীয় খণ্ডের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’

বইয়ের শুরুতে সংক্ষেপে সৈয়দ আহমদুল হক ও তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু মাওলানা জালালউদ্দিন রুমির জীবনালেখ্য ও তাঁদের মতবাদ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সাধারণ পাঠক মাওলানা রুমি ও বাংলার রুমি সম্পর্কে এ লেখার মাধ্যমে অতি সহজেই এক সম্যক ধারণা তৈরি করতে পারবেন।

আহমদুল হক মসনভির গল্পগুলো পাঠকের কাছে সুচারু শিল্পীর মতো নিজস্ব ব্যাখ্যাসহ পরিবেশন করেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য সৈয়দ আলী আহসান এ বইয়ের ভূমিকায় জালালউদ্দিন রুমির ‘মসনভি’ প্রসঙ্গে বলেন, ‘মানুষের চেতনালোক কী কামনা করে এবং দুজ্ঞেয় কোন রহস্যে মানবাত্মা চমকিত হয়, তা তাঁর কাব্যে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। যেসমস্ত দুরূহ তত্ত্বের ব্যঞ্জনা তাঁর কবিতায় আছে, তা বিস্ময়কর। পৃথিবীর বহু মনীষী “মসনভি”র রহস্য সন্ধান করেছেন। মাওলানা রুমির জিজ্ঞাসার অন্ত ছিল না। তিনি জিজ্ঞাসা করেছেন যে মানুষ কোন সত্যের সন্ধান করবে এবং সে সত্যই–বা কোথায়?’

default-image

সৈয়দ আহমদুল হক রচনাবলী: তৃতীয় খণ্ড
(মসনভি শরীফের কাহিনীসম্ভার)
প্রথম প্রকাশ: আগস্ট ২০১৯, চট্টগ্রাম
প্রকাশক: আল্লামা রুমি সোসাইটি বাংলাদেশ
সম্পাদনা পরিষদ: সৈয়দ রেজাউল করিম, লিয়াকত আলী চৌধুরী, মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ, সাইফুল ইসলাম খান ও মেহেদী হাসান, ৩৪৬ পৃষ্ঠা, দাম: ৪০০ টাকা।

সৈয়দ আহমদুল হকের তৃতীয় খণ্ডটি মনোযোগের সঙ্গে পড়লে ‘মসনভি শরীফ’–এ মাওলানা রুমির জগৎ, জীবন, সৃষ্টি, স্রষ্টা, ইহকাল, পরকাল ও অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া অনেক সহজ হবে। বর্তমান বইয়ের লেখক নানা উপমার সাহায্যে সহজ, সরল ও সুন্দরভাবে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি, সংস্কৃত, বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লেখকের অসাধারণ ব্যুৎপত্তি থাকায় তাঁর পক্ষে এ কাজ সহজ হয়েছে। তিনি এসব ভাষার সৃষ্ট সাহিত্য থেকে নানা উদ্ধৃতি দিয়ে সুচারু শিল্পীর মতো নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন। এ ছাড়া তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে অগাধ পাণ্ডিত্য থাকায় তিনি কোরআন-হাদিস ছাড়াও বাইবেল, বেদ, উপনিষদ, গুরু গ্রন্থ সাহেব, ত্রিপিটক, জেন্দাবেস্তা, তোরা প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থ থেকে নিজ মতের সমর্থনে অনেক উদাহরণ দিয়েছেন। এর ফলে মসনভির ব্যাখ্যা খুবই শক্তিশালী রূপ পেয়েছে। এ জন্য নিঃসন্দেহে তিনি কৃতিত্বের দাবিদার।

বইটির প্রতিটি গল্পে ধর্মতত্ত্ব, মরমিবাদ, অধ্যাত্মবাদ, মানবতাবাদ, দর্শন ও সাহিত্যের যেমন অপূর্ব মিলন ঘটেছে, ঠিক তেমনি ধর্মের, বিশেষত ইসলামের আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে, যা মুসলমানদের বিশ্বনাগরিক হতে সাহায্য করবে। তবে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা তাঁর লেখনীর মধ্যে লক্ষ করা যায়। তাই বলি, সমস্যাসংকুল হিংসায় পরিপূর্ণ বর্তমান পৃথিবীতে যখন জাতি-বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা, সংকীর্ণতা, উগ্র জাতীয়তাবাদ বাসা বেঁধেছে এবং মনুষ্য সমাজ মারামারি ও হানাহানিতে মত্ত, সে রকম দুঃসময়ে মাওলানার সুফিবাদ ও প্রেমবাদের চর্চা বিশ্বমানবকে ভ্রাতৃত্বের ও মানবতার বন্ধনে অটুট রাখতে সাহায্য করবে। মানুষের একতা ও অখণ্ডতা রক্ষার জন্য রুমিচর্চা অত্যন্ত জরুরি। সৈয়দ আহমদুল হক তাঁর রচনার সাহায্যে এ কাজকে সহজ করেছেন এবং সাধারণ মানুষকে রুমির প্রেমমন্ত্রে দীক্ষিত করে মানবতার জয়গান করেছেন। তাঁর সংবেদনশীল লেখা এবং মর্মস্পর্শী আবেদন পাঠকসমাজের চৈতন্যোদয় ঘটাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্বাস করি। আলোচ্য গ্রন্থটি ‘মসনভি শরীফ’–এর একটি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। ফলে এর অন্যতর আবেদন বিদ্যমান।

পরিশেষে বলি, এ বইয়ের ভাষা সাবলীল। রচনাশৈলী অনবদ্য। শব্দচয়ন ও বাক্যবিন্যাস অসাধারণ। লেখক তাঁর রচনায় অনেক আরবি, ফারসি, উর্দু, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষার শব্দ ব্যবহার করেছেন। এর ফলে আলোচ্য বইয়ের বাক্যবিন্যাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ রূপ পেয়েছে। আমি সর্বান্তকরণে গ্রন্থটির বহুল প্রচার কামনা করি। আশা করি, গ্রন্থটি পাঠ করে পাঠকসমাজ দারুণভাবে উপকৃত হবে।

বইপত্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন