default-image

অনেকে বলেন, বাংলাদেশের মানুষ তুলনামূলক কম বই পড়ে। কিন্তু সেই কম আসলে কতটা, তা জানার কৌতূহল থাকাই তো স্বাভাবিক, না? সেই কৌতূহল মেটাতে অন্তর্জালে বিস্তর ঘাঁটাঘাঁটি করা হলো। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত জবাব মিলল না। কারণ, বাঙালির পাঠাভ্যাস নিয়ে তেমন কোনো জরিপ বা গবেষণাই হয়নি। তবে প্রথম আলোর উদ্যোগে ২০১৯ সালে ওআরজি-কোয়েস্ট একটি জরিপ পরিচালনা করেছিল, যেখানে তরুণদের বই পড়ার হার আগের দুই বছরের চেয়ে সেই বছরে ৬ শতাংশ কমেছে বলে তথ্য উঠে এসেছিল। জরিপের ফল প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছিল ২০১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বরে। এখন ২০২১। মাঝখানে পেরিয়ে গেছে ভয়ংকর করোনাকবলিত ২০২০ সাল। প্রায় পুরোটা বছরই মানুষ ঘরবন্দী অবস্থায় কাটিয়েছে। তাহলে কি ঘরে বসে মানুষ আবার বইয়ের কাছে ফিরেছে? বেশি বেশি বই পড়েছে? এ ব্যাপারে নেই কোনো গ্রহণযোগ্য তথ্য। হয়তো বেড়েছে, হয়তো বাড়েনি। কে জানে!

এই যখন বাংলাদেশের চিত্র, তখন বহির্বিশ্বের কী অবস্থা? অন্তর্জালে তালাশ করে পাওয়া গেল একটি গবেষণা প্রবন্ধ। এটি প্রকাশ করেছে গ্লোবাল ইংলিশ এডিটিং নামের একটি সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই সংস্থা প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের পাঠাভ্যাস নিয়ে জরিপ পরিচালনা করে। সম্প্রতি প্রকাশিত জরিপে উঠে এসেছে গত বছর বই পড়ার পেছনে কোন দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় করেছে, কোন দেশের মানুষ সবচেয়ে কম সময় ব্যয় করেছে, ছাপা বই বেশি বিক্রি হয়েছে নাকি ই-বুক, রহস্য নাকি রোমান্টিক কোন ঘরানার বই বেশি কিনেছে মানুষ, করোনাকালে বই বিক্রি কত শতাংশ বেড়েছে নাকি কমেছে ইত্যাদি।

বিজ্ঞাপন

বইপড়ুয়া জাতি কারা?

বইপড়ুয়া জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে স্থান করে নিতে চলেছে ভারতীয়রা। শীর্ষ বইপড়ুয়া জাতির তালিকায় টানা দুই বছর ধরে প্রথম স্থান অধিকার করে আছে প্রতিবেশী এই দেশের মানুষ। গত বছর ভারতের মানুষ সপ্তাহে ১০ ঘণ্টা ৪২ মিনিট ব্যয় করেছে বই পড়ার পেছনে। বলা ভালো, ১২০ কোটি জনসংখ্যার দেশে জনসংখ্যার আধিক্যের কারণেই ভারতীয়রা বই পড়ার দিক থেকে এগিয়ে থাকবে, এটা স্বাভাবিক। তবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ওখানে সাক্ষরতার হার কম হলেও যাঁরা মোটামুটি শিক্ষিত, তাঁরা বই পড়ার পেছনে বেশি সময় ব্যয় করেন। এই জরিপ অন্তত সেটাই প্রমাণ করে। ভারতের পরের অবস্থানে রয়েছে থাইল্যান্ড। তারা ব্যয় করেছে ৯ ঘণ্টা ২৪ মিনিট। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন। চীনের মানুষ বই পড়েছে সপ্তাহে ৮ ঘণ্টা। এই তালিকায় বাংলাদেশের কোনো নাম নেই। তবে তালিকার একেবারে পাদদেশে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নাম। হ্যাঁ, মার্কিনরা সবচেয়ে কম সময় ব্যয় করেছে বই পড়ার পেছনে—মাত্র ৫ ঘণ্টা ৪২ মিনিট।

২৭ শতাংশ মানুষ একটিও বই পড়েনি

মার্কিন জাতি সম্পর্কে আরও চমকজাগানিয়া তথ্য হচ্ছে গত বছর ২৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন একটিও বই পড়েননি। তাঁদের মধ্যে ৩২ শতাংশ পুরুষ এবং ২২ শতাংশ নারী। তবে যেসব মার্কিন বই পড়েন, তাঁরা বছরে গড়পড়তা চারটি বই পড়েন। সবচেয়ে বেশি পড়েন বাইবেল। শতকরা ৪৮ জন মার্কিন জানিয়েছেন, তাঁরা বছরে একবার হলেও বাইবেল পড়েন।

ব্রিটিশ পুরুষের তুলনায় নারীরা এগিয়ে

বই পড়ার দিক থেকে ব্রিটিশ পুরুষের তুলনায় নারীরা এগিয়ে আছেন। শতকরা ২৭ জন নারী স্বীকার করেছেন, তাঁরা দৈনিক কিছু না কিছু পড়েন। অন্যদিকে, ১৩ শতাংশ ব্রিটিশ পুরুষ দিনে কিছু একটা পড়েন। পড়ার চেয়ে শুনতে পছন্দ করেন ৮ শতাংশ ব্রিটিশ। তাঁরা সাধারণত অডিও বুক শোনেন। আর পঞ্চাশোর্ধ্ব ৩৪ শতাংশ ব্রিটিশ বলেছেন, তাঁরা দিনে একটি করে বই পড়েন। কম বয়সীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বই পড়ে জার্মানরা। অনূর্ধ্ব–১৪ বছর বয়সী জার্মান কিশোর-কিশোরীদের ২৮ শতাংশ প্রতিদিন ১৭ মিনিট ব্যয় করে বই পড়ার পেছনে।

এশীয়দের কী খবর

এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের কথা আগেই বলা হয়েছে। তারা সাপ্তাহিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি সময় খরচ করে বই পড়ার পেছনে। শিক্ষার হারের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে সিঙ্গাপুর। দেশটির সাক্ষরতার হার ৯৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এ দেশের মেয়েরাও বই পড়ার দিক থেকে ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে। শতকরা ৭৫ ভাগ মেয়ে বই পড়েন, অন্যদিকে ছেলেদের হার ৫৯ শতাংশ।

বই প্রকাশে কারা এগিয়ে

২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি বই ছেপেছে চীন। এক বছরে ছেপেছে ৪ লাখ ৪০ হাজার বই। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা ছেপেছে ৩ লাখ ৪ হাজার ৯১২টি বই। তৃতীয় অবস্থানে আছে যুক্তরাজ্য, ছেপেছে ১ লাখ ৮৪ হাজার বই। ভারতের মানুষ বই পড়ার দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও বই ছাপার দিক থেকে খানিকটা পিছিয়েই আছে। তালিকায় ভারতের অবস্থান সপ্তম। তারা গত বছর বই ছেপেছে ৯০ হাজার।

ছাপা বই থেকেই আয় বেশি

সবাই ভেবেছিল করোনাকালে ই-বুকের বিক্রি বাড়বে। কিন্তু ঘটনা ঘটেছে উল্টো। বরং ছাপা বই-ই বেশি বিক্রি হয়েছে। ছাপা বই থেকে গত বছর বিশ্বের বইয়ের বাজার আয় করেছে ১৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ই-বুক বিক্রি হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ। আর ছাপা বইয়ের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল হার্ড কভার ও ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ ছিল পেপারব্যাক। বিস্ময়করভাবে অনলাইন বইয়ের দোকান থেকে বই কেনার হার বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় অনলাইনে বই কেনার হার বেড়েছে আগের বছরের চেয়ে ২৫ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ৩৩ শতাংশ। তুরস্কে বেড়েছে ৩০ শতাংশ। আর নিউজিল্যান্ডে অনলাইন লাইব্রেরিতে সদস্য বেড়েছে ৫০ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

রোমাঞ্চ বইয়ের রমরমা

গত বছর সারা বিশ্বে যতগুলো বই বিক্রি হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে রোমাঞ্চ ঘরানার বই। গ্লোবাল ইংলিশ এডিটিংয়ের জরিপে উঠে এসেছে, মোট বিক্রীত বইয়ের এক-তৃতীয়াংশই ছিল রোমাঞ্চ উপন্যাস। এসব বইপড়ুয়ার গড় বয়স ৪২ বছর। তাঁদের মধ্যে ১৬ শতাংশ নারী।

জরিপই সর্বশেষ কথা নয়; তবু একটা ধারণা তো পাওয়া গেল! জানা গেল, ছাপা বই খুব সহজে হারিয়ে যাচ্ছে না, দেশের মানুষের পাঠাভ্যাস কমলেও বৈশ্বিক পরিসরে তরুণদের পাঠাভ্যাস বাড়ছে, ছাপা বই, ই-বুক, অডিও বুক ইত্যাদি মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বইয়ের বাজার বাড়তে বাড়তে ১১৯ বিলিয়ন ডলার আয়তনে ঠেকেছে। এসবই সুড়ঙ্গের শেষে আশার আলো। নিশ্চয় বাংলাদেশের মানুষও একদিন বইয়ের ভেতর মুখ গুঁজবে।

বইপত্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন