বিজ্ঞাপন

আনিসুজ্জামান যথার্থ অর্থেই চাইতেন ধর্মনিরপেক্ষ, উদার গণতান্ত্রিক, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ। মহামানবের সাগরতীরে গ্রন্থের বেশির ভাগ লেখায় তাঁর বিশ্বাস ও স্বপ্ন প্রতিফলিত হয়েছে। ‘আমরা কি এক সংকটের মুখোমুখি?’ শিরোনামে একটি নিবন্ধে লিখেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারতীয় বন্ধুদের কাছে খুব বড়মুখ করে বলেছিলাম, বাংলাদেশ স্বাধীন হলে দুটি ব্যাপার আর কখনো ঘটবে না; সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আর সামরিক শাসন। আমার ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যে প্রতিপন্ন হয়েছে।’ কিন্তু নিরাশা নয়, দেশ সম্পর্কে বরাবরই তাঁর উচ্চাশা ছিল। ‘এই মাটি এই মানুষ’ শিরোনামে লেখার উপসংহার টেনেছেন এভাবে, ‘বাংলাদেশ মানে কোটি কোটি মানুষের হৃৎস্পন্দন, কঠোর জীবনসংগ্রাম, স্বার্থত্যাগ ও আত্মদান, বাংলাদেশ মানে চরিতার্থতার জন্য অপেক্ষমাণ স্বপ্ন, অশেষ সম্ভাবনা, নতুন সূর্যোদয়।’

মহামানবের সাগরতীরে বইয়ে ইতিহাস ও রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, শিল্পসাহিত্য, স্মৃতি—এ রকম কয়েকটি ভাগে লেখাগুলোকে সাজানো হয়েছে। আনিসুজ্জামানের গদ্য সম্পর্কে বইয়ের ভূমিকায় সাজ্জাদ শরিফ লিখেছেন, ‘তাঁর অনাড়ম্বর সংযত গদ্যের একটি আলাদা স্বাদ ছিল। লেখায় বক্তব্যের স্পষ্টতা ছিল তাঁর কাছে মুখ্য কেউ তাঁর সঙ্গে একমত হোক বা না হোক।’

স্মৃতির মানুষ বইটিতে আছে আবু জাফর শামসুদ্দীন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মুনীর চৌধুরী, শামসুর রাহমান, আলতাফ মাহমুদ, মণি সিংহ, কাইয়ুম চৌধুরী, তপন রায়চৌধুরীসহ বিশজন বিশিষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ মূল্যায়ন। কামাল হোসেনের সত্তর বছর বয়স পূর্তিতে লিখেছেন, ‘গণফোরামের উদ্বোধনে তাঁদের শুভেচ্ছা জানিয়েছি, কিন্তু কামালের অনুরোধ সত্ত্বেও তাতে আমি যোগ দিইনি। কেননা, আমি জানতাম, এটা বেশি দিন অরাজনৈতিক থাকতে পারবে না।’ আনিসুজ্জামান রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিকে কখনো পছন্দ করেননি।

আনিসুজ্জামান গবেষণামূলক লেখায় যথেষ্ট মনোযোগী হননি বলে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক আফসোস করেছেন। এই আফসোস আরও অনেকের ছিল। স্মৃতির মানুষ গ্রন্থে আনিসুজ্জামান লিখেছেন, তিনি হাসপাতালে গেছেন অসুস্থ আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে দেখতে। তখন তাঁর উদ্দেশে ইলিয়াস বললেন, ‘আপনি সমাজসেবক হয়ে গেলেন! অপ্রীতিকর হলেও অনুরোধ, উপরোধ উপেক্ষা করেন—সভা-সমিতি বাদ দিয়ে লেখেন।’ কিন্তু ইতিহাস সবাইকে এক রকম দায়িত্ব দেয় না। আনিসুজ্জামান তাঁর বিস্তৃত অভিজ্ঞতা থেকে সভা-সেমিনারে যা বলেছেন এবং বিভিন্ন অনুরোধ-উপরোধে যা লিখেছেন, তাতে এমন অনেক তথ্য আছে, যা অনেক গবেষণাকে অতিক্রম করে যায়। বিচারপতি হাবিবুর রহমান প্রসঙ্গে আনিসুজ্জামান লিখেছেন, ‘...শেষ জীবনে জাতির অভিভাবকস্বরূপ ছিলেন। তাঁর প্রজ্ঞা ও শ্রেয়বোধ থেকে তিনি যে-পথপ্রদর্শন করেছিলেন, আমাদের কল্যাণ সেখানে নিহিত ছিল।’ আনিসুজ্জামান প্রসঙ্গেও কথাটি সত্য। জাতির পথনির্দেশনের গুরুভার তিনি মৃদুহাস্যে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন—বিভিন্ন সামাজিক, আনুষ্ঠানিক কাজের মধ্য দিয়ে।

মাত্র ৬২ শব্দের ভুক্তি নিয়ে তৈরি হয়েছে আমার অভিধান। শব্দ প্রয়োগে মানুষের অনাবশ্যক জোরের কারণে বাংলা ভাষার অনেক শব্দ সহজ জায়গা থেকে সরে এসেছে। আনিসুজ্জামান সেই বিচ্যুতিটুকু ধরিয়ে দিতে চেয়েছেন একেকটি শব্দের সংক্ষিপ্ত আলোচনায়। যেমন, ‘তবু’ শব্দে লিখেছেন: ‘তৎসত্ত্বেও, তথাপি, তা হলেও। এর সঙ্গে আবার ও যোগ করে তবুও লিখলে কি তার গৌরব বৃদ্ধি হয়?’ ‘ব্যক্তিত্ব’ প্রসঙ্গে লিখেছেন: ‘ব্যক্তির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকে ব্যক্তিত্ব বলে। আমরা কিন্তু প্রায়ই ব্যক্তি অর্থে ব্যক্তিত্ব ব্যবহার করি।’ তবে ভাষার পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রে এত অনায়াসগ্রাহ্য হয় যে অভিধানসম্মত না হলেও মেনে নিতে হয়। যেমন ‘নিন্দুক’ শব্দে লিখেছেন, ‘বলি বটে নিন্দুক, কিন্তু অভিধানমতে শব্দটা নিন্দক। ভাষায় যখন নিন্দুক চলে গেছে, তখন নিন্দুকই সই। পণ্ডিতেরা হয়তো নিন্দা করবেন, তা করুন।’ বক্তব্যের ফাঁকে প্রাসঙ্গিকভাবে কৌতুক করার প্রবণতাও তাঁর ছিল—কি লেখায়, কি কথায়।

একজন আনিসুজ্জামান ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে একটি নির্দিষ্ট কালপর্বে অবস্থান করেন। কিন্তু ব্যক্তির ভাবনা সঞ্চারিত হয় পরবর্তী কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত। মহামানবের সাগরতীরে, স্মৃতির মানুষ, আমার অভিধান—বই তিনটির মধ্য দিয়ে আনিসুজ্জামানকে তাঁর চেনা রূপেই পুনরাবিষ্কার করা সম্ভব।

তিনটি বইয়েরই প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২১

পাওয়া যাবে: www.prothoma.com;সহ মানসম্মত বইয়ের দোকানে।

বইপত্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন