সাংবাদিকতা ও ইতিহাসের মিশেল

অশোক কর্মকারের কোলাজ অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

সংবাদপত্রকে বলা হয় ইতিহাসের প্রথম খসড়া লেখক। সংবাদপত্র অথবা সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন হলো সেই রসদ অথবা কাঁচামাল, যা ব্যবহার করে গবেষকের নিবিড় বিশ্লেষণে নির্মিত হয় সেই বয়ান ও ব্যাখ্যা, যাকে আমরা ইতিহাস বলি। এই দুইয়ের মধ্যে যেমন মিল রয়েছে, তেমনি রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রভেদ। দুটোই সত্য জানার জ্ঞানতাত্ত্বিক পদ্ধতি: একটি তাৎক্ষণিকতার তাগিদে গড়া, অন্যটি ব্যাখ্যার প্রয়োজনে শৃঙ্খলাবদ্ধ পুনর্নির্মাণ। ফলে সাংবাদিকতা সত্য প্রতিষ্ঠায় জরুরি, কিন্তু তাতে আমরা সম্পূর্ণ সত্য পাই না, কারণ সত্য জানতে হলে প্রয়োজন সময় ও স্থানগত দূরত্ব, যে দূরত্ব আমরা পাই ইতিহাসে।

প্রবীণ সাংবাদিক মনজুর আহমদের দুই খণ্ডের স্মৃতিকথন আমার সেই সময় ও আমার এই সময় সাংবাদিকতাও নয়, ইতিহাসও নয়, বরং এই দুইয়ের সাহসী মিশেল। তিনি ৮৫ বছর জীবনের দুই-তৃতীয়াংশ ব্যয় করেছেন পেশাদার সংবাদকর্মী হিসেবে। শুধু দর্শক বা পর্যবেক্ষক হিসেবে নন, কখনো কখনো অনাগ্রহী অংশগ্রহণকারী হিসেবেও ইতিহাসের যে তাৎক্ষণিক নির্মাণ প্রত্যক্ষ করেছেন, এই দুই খণ্ডে বিবৃত বয়ান সেই ইতিহাসের সরলীকৃত পুনর্নির্মাণ। এই পুনর্নির্মাণের কেন্দ্রে রয়েছে ‘সরকারি’ বয়ানের ঊর্ধ্বে উঠে ক্রমাগত প্রশ্ন তোলার সাহস, যার উৎস সংশয় বা স্কেপ্টিসিজম, বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চার জন্য যা অপরিহার্য। মনজুর আহমদের ভাষ্যে সেই সংশয়ের সংযত প্রকাশ পাঠক হিসেবে আমাকে আগ্রহী করেছে।

ভ্লাদিমির নাবোকভ স্মৃতিকথাকে ডায়েরির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যে ডায়েরি আমরা সর্বক্ষণ নিজের সঙ্গে নিয়ে ঘুরি। সেই অর্থে এই গ্রন্থ মনজুর আহমদের ব্যক্তিগত ডায়েরি। অন্যদিকে জর্জ ওরওয়েল স্মৃতিকথা বা আত্মজীবনীর ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন, এতে সত্য কথা রয়েছে খুব সামান্যই, কারণ স্মৃতিচারী লেখক অপ্রিয় সব সত্য লিপিবদ্ধ করার বদলে তা এড়িয়ে চলেন। তাঁর কথায়, ‘অ্যান অটোবায়োগ্রাফি ইজ টু বি ট্রাস্টেড হোয়েন ইট রিভিলস সামথিং ডিসগ্রেসফুল।’ মনজুর আহমদ তাঁর গ্রন্থে এই বিবাদ এড়িয়ে গেছেন মূলত ‘ব্যক্তিগতের’ বদলে সেই সব ঘটনা ও বিবরণ পুনর্নির্মাণে ব্যাপৃত থেকে, যাকে আমরা ‘সামষ্টিক’ হিসেবে অভিহিত করতে পারি। তাঁর চোখের চশমাটি নিজস্ব, অর্থাৎ ব্যক্তিগত, কিন্তু তিনি যা দেখছেন এবং যা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় পুনরুদ্ধার করেছেন তার অধিকাংশ সামষ্টিক।

মনজুর আহমদের ‘আমার সেই সময়’ বইয়ের প্রচ্ছদ

ব্যক্তিগত জীবনে, মননে ও ভাবনায় মনজুর আহমদ প্রবল রাজনৈতিক। ফলে তাঁর ব্যক্তিগত অবলোকনও প্রায় অনিবার্যভাবে রাজনৈতিক। তাঁর শৈশব কেটেছে ঝিনাইদহে, সে সময়ের একটি ঘটনার উদাহরণ দিই: ১৯৫৭ সাল, তিনি তখন নবম শ্রেণির ছাত্র হলেও রাজনীতিক পিতার প্রভাবে তত দিনে তাঁর পাকিস্তানবিরোধী রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছে। একদিন দলীয় কাজে অংশ নিতে তাঁদের শহরে গেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। মনজুরদের পিতৃগৃহে তাঁর রাতের খাবারের ব্যবস্থা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু খেতে বসে হাত গুটিয়ে গম্ভীর মুখে বসে রয়েছেন। সবাই তো অবাক। শুরু করার অনুরোধ করতেই বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘মরিচ কই? ফরিদপুরের মানুষ, মরিচ ছাড়া কি খেতে পারি?’

ঘটনাটি সামান্য, কিন্তু মানুষ বঙ্গবন্ধুর সারল্য ও নিরাভরণতা স্পষ্ট। যে গুরুত্বের সঙ্গে গল্পটি বিবৃত হয়েছে, তাতে আমার মনে হয়েছে—আজকের পরিণত মনজুর আহমদ মানুষ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সেই সারল্যের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। এটি তাঁর রাজনৈতিক ঘরানার ইঙ্গিতবাহীও বটে। সেদিন এক সুযোগে মনজুর আহমদ বঙ্গবন্ধুর কাছে আবদার ধরেছিলেন, তিনি একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করতে চান। সে জন্য সাহায্য চান। প্রায় বালক মনজুরের সেই অনুরোধ শুনে বঙ্গবন্ধু বিস্মিত হয়েছিলেন, তা সত্ত্বেও সব সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ঢাকায় ফিরে তাঁর নামে চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। মনজুর আহমদের সে পত্রিকা বের করা হয়নি, কিন্তু তাঁর নিজের স্বীকারোক্তি অনুসারে সারা জীবনের এক মূল্যবান সম্পদ হয়ে রয়েছে সেই চিঠি।

ক্লাস নাইনে পড়ার সময়েই মনজুর আহমদ দৈনিক ইত্তেফাক–এর মফস্‌সল প্রতিনিধির দায়িত্ব পান। সেখান থেকে প্রথমে দৈনিক সংবাদ ও পরে দৈনিক বাংলায় পেশাদার সাংবাদিকতা। আরও একাধিক পত্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ নানা দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এমনকি ২০০০ সালে যখন ঢাকা ছেড়ে নিউইয়র্কে থিতু হন, তখনো সেখানে পেশা হিসেবে বেছে নেন সাংবাদিকতা।

তাঁর স্মৃতিকথনের প্রথম খণ্ড শেষ হয় একাত্তরের ডিসেম্বরে বিজয় দিবসের ঘটনায়। দ্বিতীয় খণ্ড পুরোটাই স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর সাংবাদিক–জীবনের গল্প, যা শেষ হয় ২০০০ সালের নভেম্বরে ঢাকা ত্যাগের মধ্য দিয়ে।

মনজুর আহমদের ‘আমার এই সময়’ বইয়ের প্রচ্ছদ

১৯৫৭ থেকে ২০০০ সাল—এই ৪৩ বছরে বাংলাদেশে বিস্তর ঘটনা ঘটেছে, যার তিনি প্রত্যক্ষদর্শী। কিন্তু মনজুর আহমদ বেছে বেছে সেই সব ঘটনাকেই অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন, যা শুদ্ধ রাজনৈতিক। যেমন ১৯৬১ সালের রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী ঘিরে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৪ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, ১৯৬৮ সালের ছয় দফা আন্দোলন এবং সবশেষে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালি কীভাবে তার দাসত্ব ছেড়ে স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে উঠল, এই ঘটনাবলি সে পথপরিক্রমার প্রায় আনুপূর্বিক বৃত্তান্ত।

ব্যক্তিগত কহন-কথন যে নেই তা নয়। যেমন অভিনয়শিল্পী রেখা আহমদের সঙ্গে তাঁর প্রেম ও বিয়ে। নানা নাটকীয়তায় ভরা সে কাহিনি। বিয়ের পর প্রায় কিশোরী রেখা কীভাবে একদম একা ঢাকায় মনজুরের বাসায় ওঠেন, তা নিয়ে অনায়াসে একটি চমৎকার প্রেমোপাখ্যান লেখা যেত, কিন্তু মনজুর আহমদ অতি রক্ষণশীল বাঙালি পুরুষ, সে পথে গেলেনই না। রেখার সঙ্গে প্রেম করছেন, অথচ লিখতে গিয়ে জানাচ্ছেন, রেখার সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক ছিল। হায়রে বাঙালি পুরুষ!

দ্বিতীয় খণ্ডের পুরোটাই স্বাধীন বাংলাদেশকে ঘিরে। কত ঘটনারই না তিনি সাক্ষী। বঙ্গবন্ধু যেদিন ঢাকা ফেরেন, দলীয় নেতা–কর্মীর সঙ্গে সাংবাদিক হিসেবে তিনিও উপস্থিত। তিনি লিখেছেন, এই প্রত্যাবর্তনের যে কাহিনি সরকারি উদ্যোগে তথ্যচিত্র আকারে বর্ণিত হয়েছে, তার অনেকটা বানানো, অতি নাটুকেপনায় ভরা। তথ্যচিত্রে রয়েছে বঙ্গবন্ধু বিমান থেকে নেমে বাংলার মাটিতে চুমু খেলেন। মনজুর আহমদ লিখেছেন, এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। একই তথ্যচিত্রে বঙ্গবন্ধুর বিয়ের যে গল্প রয়েছে তাতেও বাস্তবের চেয়ে কল্পনাই বেশি।

বঙ্গবন্ধুর প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা সত্ত্বেও একাত্তর–পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অব্যবস্থা মনজুর আহমদ নিরাসক্তভাবে বর্ণনা করেছেন। সেই কঠিন সময়ে প্রয়োজন ছিল একটি বহুদলীয় জাতীয় সরকারের। বঙ্গবন্ধু তাতে রাজি হননি। মনজুরের বয়ানে জানছি, সে সময় বঙ্গবন্ধু ঐক্যের ডাকের জবাবে বলেছিলেন, ‘ঐক্য ঐক্য করে আমাকে পাগল করে তুলছে। কিসের ঐক্য, কার সাথে ঐক্য? আগে নির্বাচন করে আসুন, তারপর দেখব ঐক্য করা যায় কি না।’

রুদ্ধশ্বাসে পড়ার মতো একের পর এক ঘটনা। অধিকাংশই আমাদের জানা ইতিহাস, কিন্তু মনজুর আহমদের বয়ানে তা শেষ পর্যন্ত শুধু স্মৃতিকথা হিসেবে পড়ার দাবি করে না; বরং এগুলো একধরনের অপেক্ষমাণ উৎস-উপাদান বা ‘সোর্স ম্যাটেরিয়ালস-ইন ওয়েটিং’ হয়ে দাঁড়ায়। এই গ্রন্থদ্বয়ের সঙ্গে তুলনীয় উপমহাদেশের আরেক সাংবাদিক কুলদীপ নায়ারের বিয়ন্ড দ্য লাইনস স্মৃতিকথার।

১৯৭৩ সালের সে নির্বাচনে যে অভাবনীয় জালিয়াতি ঘটে, আজকের বাংলাদেশের গভীর অসুখের সংক্রমণের শুরু ছিল সেটা। সে সময়েই ঘটে আমাদের প্রথম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিতর্কেরও সেই শুরু। মনজুর আহমদ লিখেছেন, সে সময় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক সখেদে বলেছিলেন, ‘ইতিহাস শেখ সাহেবেরে স্টেটসম্যান হইবার একটা সুযোগ দিছিল। তিনি এইডা কামে লাগাইবার পারলেন না।’

১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫—এই দু-তিন বছর বাংলাদেশ একের পর এক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় দুর্যোগ ১৫ আগস্ট সপরিবার বঙ্গবন্ধুর হত্যা। এই হত্যাকাণ্ডের কোনো ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণে যাননি মনজুর আহমদ, কিন্তু একটি আশ্চর্য মন্তব্য করেছেন। বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর তার প্রতিবাদে রাস্তায় মানুষ নামেনি। বরং মানুষ নেমেছিল হত্যাকাণ্ডের সমর্থনে।

রুদ্ধশ্বাসে পড়ার মতো একের পর এক ঘটনা। অধিকাংশই আমাদের জানা ইতিহাস, কিন্তু মনজুর আহমদের বয়ানে তা শেষ পর্যন্ত শুধু স্মৃতিকথা হিসেবে পড়ার দাবি করে না; বরং এগুলো একধরনের অপেক্ষমাণ উৎস-উপাদান বা ‘সোর্স ম্যাটেরিয়ালস-ইন ওয়েটিং’ হয়ে দাঁড়ায়। এই গ্রন্থদ্বয়ের সঙ্গে তুলনীয় উপমহাদেশের আরেক সাংবাদিক কুলদীপ নায়ারের বিয়ন্ড দ্য লাইনস স্মৃতিকথার। তাঁরা দুজনেই ঘটনাবহুল ইতিহাসের সাক্ষী। মফস্‌সল শহরে কাটানো শৈশবের উদ্বেগ, সংবাদপত্রের অন্দরের নৈতিক সমঝোতা, রাজনৈতিক বিপর্যয়ের তাৎক্ষণিকতা, তাঁরা দুজনেই এই অভিন্ন অভিজ্ঞতার অংশীদার। সম্ভাবনার অর্থে এই অভিজ্ঞতা বিগত সময়ের সেই সব ঘটনাবলি, যা একটি সময় বা কালকে সংজ্ঞায়িত করতে সক্ষম।

এখানেই মনজুর আহমদের এই স্মৃতিকথনের গুরুত্ব। কোনো সন্দেহ নেই, সমসাময়িক দলিলপত্র, আর্কাইভ ও স্মৃতিকথা, পণ্ডিতেরা যেগুলোকে ‘ইউজেবল সাবজেক্টিভিটি’ বা ব্যবহারযোগ্য বিষয়সত্তা নামে অভিহিত করে থাকেন, মনজুর আহমদের গ্রন্থদ্বয় সেই রকম তথ্য-উৎস। ইতিহাসবিদেরা এই তথ্য-উৎসে ফিরে যান কেবল কোনো মৌলিক তাত্ত্বিক বিবাদ নিষ্পত্তির জন্য নয়, বরং এ কথা বোঝার জন্য যে এই তথ্যাবলি কীভাবে জীবিত অভিজ্ঞতায় রূপ নিয়েছিল, কীভাবে তা মীমাংসিত হয়েছিল এবং পরে কীভাবে তা আমাদের অভিন্ন স্মৃতিসত্তার অন্তর্গত হলো।

আমার বিশ্বাস, ভবিষ্যতে যাঁরা বাংলাদেশের প্রথম অর্ধশতকের গল্পটি লিখবেন, এই গ্রন্থদ্বয়ে তাঁদের বারবার ফিরে আসতে হবে কোনো চূড়ান্ত বা নিরঙ্কুশ বয়ান উদ্ধারের জন্য নয়; বরং একটি রূপান্তরমান সমাজের বুনন উপলব্ধি করতে।

 ...

আমার সেই সময় ও আমার এই সময় (দুই খণ্ড)
মনজুর আহমদ

প্রকাশক: আগামী প্রকাশনী
প্রকাশকাল: ২০২৪ ও ২০২৫
পৃষ্ঠা : ১৮৭ ও ২৬৩
মূল্য: ৬০০ টাকা ও ৮০০ টাকা

  • হাসান ফেরদৌস:  প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট