পুঁজির চলার পথ

আনু মুহাম্মদের কার্ল মার্ক্সের পুঁজি: পুঁজি সঞ্চালনের প্রক্রিয়া দ্বিতীয় খণ্ড: একটি পাঠ পর্যালোচনা’ বইয়ের প্রচ্ছদ অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বইটির শিরোনামের নিচে আনু মুহাম্মদের নামটি স্পষ্ট। তবে তার আগে লেখা হয়েছে একটি পাঠ পর্যালোচনা। এর মধ্য দিয়ে অনুবাদক আগেই জানালেন যে বইটি কার্ল মার্ক্সের বইয়ের হুবহু অনুকরণ নয়; বরং কিছু পুনরাবৃত্ত বিষয় বাদ দিয়েছেন এবং মাঝে মাঝে আনু মুহাম্মদ নিজের বক্তব্যকেও স্থাপন করেছেন গ্রন্থটিতে। কার্ল মার্ক্সের পুঁজি গ্রন্থটির সম্পাদক এঙ্গেলস। বইটির ভূমিকা লিখন এবং প্রথম খণ্ড থেকে উদ্ভূত বিতর্ক, অপপ্রচারের জবাবও দিয়েছেন তিনি। নামকরণে উপশিরোনামের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। বইটির উপশিরোনাম পুঁজি সঞ্চালনের প্রক্রিয়া। প্রসঙ্গত, প্রথম খণ্ডের উপশিরোনাম ছিল ‘পুঁজি উৎপাদনের প্রক্রিয়া’। মূল্য ও উদ্বৃত্ত মূল্য বাজারপ্রক্রিয়ায় কীভাবে কাজ করছে, তা এই গ্রন্থের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। বইটি ২৮টি অংশে বিভক্ত। প্রতিটি অংশ অর্থনৈতিক তাৎপর্যের পৃথক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। বিভিন্ন পথে পুঁজি এসে উৎপাদনক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কার্যকারণ ও সে সম্পর্কে ফিজিওক্র্যাট এবং অন্য অর্থনীতিবিদদের তুলনামূলক বক্তব্যকেও তুলে ধরা হয়েছে পর্যায়ক্রমে।

মার্ক্সের মতে, উৎপাদনের উপায় ও শ্রমশক্তি ক্রয়ের মধ্য দিয়ে মুদ্রা পরিণত হয় উৎপাদনশীল পুঁজিতে, যা এগিয়ে নিচ্ছে পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রক্রিয়াকে। এই উৎপাদনপ্রক্রিয়া প্রথমবার শুরু হলে পুঁজিপতিকে শ্রমশক্তি কেনার আগে উৎপাদনস্থান ও যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করতে হয়। কেন্দ্রীভূত উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় শ্রমশক্তি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মার্ক্স যখন পুঁজি নিয়ে কাজ করছিলেন, তখন ভূমিদাস প্রথা বাতিল হয়েছে। তাই ভূস্বামীরা মুক্ত কৃষকদের মজুরি শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়। এই মজুরি শ্রমিকদের মাধ্যমেই উৎপাদনশীল পুঁজি তৈরি ও সঞ্চালন হয়।

আনু মুহাম্মদের কার্ল মার্ক্সের পুঁজি: পুঁজি সঞ্চালনের প্রক্রিয়া দ্বিতীয় খণ্ড: একটি পাঠ পর্যালোচনা’ বইয়ের প্রচ্ছদ
পুঁজির প্রকৃত পুঞ্জীভবন বা উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎপাদনশীল পুঁজিতে রূপান্তর এবং তার সঙ্গে সম্প্রসারিত পুনরুৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রা বা অর্থেরও পুঞ্জীভবন ঘটতে থাকে, যার একাংশ পুঁজি হিসেবে তখনই সক্রিয় হয় না। সরল পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্রে বিনিময় কীভাবে কাজ করে, তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

অন্যদিকে শিল্প পুঁজি হচ্ছে পুঁজির অস্তিত্বের একমাত্র বাহন, যা উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ করে একই সঙ্গে পুঁজি হিসেবে নিজের ক্রিয়া সৃষ্টি করতে থাকে। এর কারণে পুঁজিপতি এবং মজুরি শ্রমিকের শ্রেণিসংঘাতও সৃষ্টি হয়। মুদ্রা পুঁজি এবং পণ্য পুঁজি যতক্ষণ শিল্প পুঁজির পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসার বাহন হিসেবে সক্রিয় থাকে, সেগুলোর ভিন্ন অস্তিত্ব লোপ পায়। কারণ, শিল্প পুঁজি সব কটিকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসে। সামাজিক শ্রমবিভাজনের জন্য শিল্প পুঁজি একপেশেভাবে বিকশিত হতে থাকে।

মার্ক্স মনে করেন, পুঁজির গতিশীলতা উৎপাদনের পরিসর অতিক্রম করে। এর মধ্য দিয়ে তা পণ্যের সাধারণ সঞ্চালনের সঙ্গে যুক্ত হয়। পুঁজির গতিপথের তিনটি সূত্র বিশ্লেষণ করে মার্ক্স বলেন, প্রতিটি সূত্রে প্রতিটি উপাদান একটি প্রস্থান, একটি ক্রান্তি, একটি প্রত্যাবর্তন নির্দেশ করে। আবার পুরো প্রক্রিয়া উৎপাদন ও বিতরণ প্রক্রিয়ার ঐক্য নির্দেশ করে। পুঁজিবাদী উৎপাদনে এই ধারাবাহিকতা রক্ষা একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। উৎপাদনশীল পুঁজির জোগান আসে উৎপাদনের উপায় আকারে।

উৎপাদনশীল পুঁজির স্থির ও সঞ্চালনশীল অংশের বিভিন্ন খণ্ডাংশের চক্রকাল বিভিন্নভাবে বিভিন্ন মেয়াদে কাজ করে। ফ্রাঁসোয়া কেনে কৃষিতে নিয়োজিত পুঁজি বা কৃষকের পুঁজিকেই একমাত্র এবং প্রকৃত উৎপাদনশীল পুঁজি হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তবে অ্যাডাম স্মিথ এই বিভাজন সব ধরনের পুঁজির ক্ষেত্রেই কার্যকর বলেছেন। অ্যাডাম স্মিথের বিশ্লেষণে আদি অগ্রিম হলো স্থির পুঁজি এবং বার্ষিক অগ্রিম হলো সঞ্চালনশীল পুঁজি। তবে মার্ক্স অ্যাডামের ‘সঞ্চালনশীল পুঁজি’কে ‘সঞ্চালনের পুঁজি’ বলতে অধিক আগ্রহী। এ ছাড়া ডেভিড রিকার্ডোর পুঁজি–সম্পর্কিত ধারণায় ত্রুটি বের করে আলোচনা করেছেন তিনি। শ্রম, উৎপাদন ও সঞ্চালনের সময় নিয়ে বিস্তৃত আলোচনাও করেছেন। পুঁজির প্রকৃত পুঞ্জীভবন বা উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎপাদনশীল পুঁজিতে রূপান্তর এবং তার সঙ্গে সম্প্রসারিত পুনরুৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রা বা অর্থেরও পুঞ্জীভবন ঘটতে থাকে, যার একাংশ পুঁজি হিসেবে তখনই সক্রিয় হয় না। সরল পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্রে বিনিময় কীভাবে কাজ করে, তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

সমাজের অর্থনৈতিক গঠনকাঠামোকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পুঁজি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন মার্ক্স। এ বইয়ে অর্থনৈতিক শোষণের মূলনীতি, পুঁজিপতি এবং শ্রমিকের মধ্যকার কাঠামোগত বৈপরীত্য, পুঁজিবাদে অর্থনৈতিক সম্পর্কের অস্থিতিশীল চরিত্রের স্বরূপ উন্মোচনের প্রচেষ্টা হয়েছে। বইটি মার্ক্সের বহুল আলোচিত তাত্ত্বিক মনস্তত্ত্বের একটি সফল সংযোজন।

মার্ক্স সামষ্টিক পুঁজির পুনরুৎপাদন ও সঞ্চালন নিয়ে কথা বলেছেন। এ ক্ষেত্রে ফিজিওক্র্যাট ও অ্যাডাম স্মিথের বক্তব্যকে তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। অ্যাডাম স্মিথের মতে, পণ্যের মূল্য—খাজনা, মজুরি ও মুনাফার সমন্বয়ে গঠিত। ডেভিড রিকার্ডোও এই বক্তব্যকে অনুসরণ করেছেন। তাঁদের উভয়ের বক্তব্যকে খণ্ডিত করেছেন নিজস্ব বিশ্লেষণে। মার্ক্স স্থির পু্ঁজির প্রতিস্থাপনকে সূত্রবদ্ধ করেন। যন্ত্রপাতি, ভবনসহ স্থির পুঁজির দীর্ঘমেয়াদি অংশের আয়ু দীর্ঘ হলেও এটা হতে পারে যে এগুলোর খণ্ড খণ্ড উপাদান ওই বছরের মধ্যেই প্রতিস্থাপন করতে হবে। পুঁজিপতির পুঞ্জীভবন এবং পুনরুৎপাদন কীভাবে শ্রমিকদের ভোগ নিয়ন্ত্রণ করে এবং মজুতের অনুপাত হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটায়, তার একটি আলোচনা রয়েছে। বিভাগ-১ ও ২ চিহ্নিত আকারে পুঞ্জীভবন ও পুনরুৎপাদনকে বিশ্লেষণ করেছেন মার্ক্স।

বর্তমান বিশ্ব পুঁজিনিয়ন্ত্রিত। পুঁজি হলো অর্থ বা সম্পদের এমন একটি উৎস, যার সাহায্যে আরও বেশি আয় করা সম্ভব। শুধু অর্থ নয়, বরং ব্যবসায়িক মূলধন, যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি, মানুষের শিক্ষা ও দক্ষতাও পুঁজি ধারণার অন্তর্ভুক্ত। পুঁজি ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে একে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত, বিভাজিত করা যায়। সমাজের অর্থনৈতিক গঠনকাঠামোকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পুঁজি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন মার্ক্স। এ বইয়ে অর্থনৈতিক শোষণের মূলনীতি, পুঁজিপতি এবং শ্রমিকের মধ্যকার কাঠামোগত বৈপরীত্য, পুঁজিবাদে অর্থনৈতিক সম্পর্কের অস্থিতিশীল চরিত্রের স্বরূপ উন্মোচনের প্রচেষ্টা হয়েছে। বইটি মার্ক্সের বহুল আলোচিত তাত্ত্বিক মনস্তত্ত্বের একটি সফল সংযোজন।

  • কার্ল মার্ক্সের পুঁজি
    পুঁজি সঞ্চালনের প্রক্রিয়া দ্বিতীয় খণ্ড
    একটি পাঠ পর্যালোচনা
    আনু মুহাম্মদ

    প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
    প্রকাশ: মার্চ ২০২৬
    প্রচ্ছদ: আনিসুজ্জামান সোহেল
    পৃষ্ঠা: ২৪৮; মূল্য: ৬০০ টাকা