ভাষার ঐশ্বর্যে, নৈতিকতার আয়নায়
রোদনরূপসী বইটি প্রথম পড়েছি ১৯৯৬ সালে, প্রকাশের পরপর। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ উপস্থাপক, সম্পাদক, সংগঠক হিসেবে যতটা পরিচিত, গল্পকার হিসেবে ততটা পরিচিত নন। তাঁর চারটি গল্প পড়ে খুব বিস্মিত হয়েছিলাম। বইয়ের ভূমিকায় লেখক বলেছেন, এই ৪টি গল্প ৩০ বছরজুড়ে বিক্ষিপ্তভাবে লেখা। এমন গল্প যিনি লেখেন, তিনি কেন আরও নিয়মিত গল্প লেখেননি?
আজ ৩০ বছর পর বইটি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে যখন পুনঃপাঠ করতে বসলাম, দেখলাম, ৪টি গল্পই বেশ ভালোভাবে মনে আছে। স্মরণযোগ্যতা যদি ভালো সাহিত্যের একটা শর্ত হয়, রোদনরূপসী বইটির চারটি গল্পই সে শর্ত পূরণ করে।
৮৫ পৃষ্ঠার এই বইয়ে মাত্র ৪টি গল্প আছে, এটা শুনেই পাঠক বুঝে যাবেন যে ছোটগল্প হলেও গল্পগুলো আকারে পরিপূর্ণ। প্রতিটি গল্পই বিচিত্র স্বাদের এবং ভিন্ন অনুভূতির।
‘ল্যাজারাসের প্রত্যাবর্তন’ উত্তরবঙ্গের এক জেলা শহরের এক নামজাদা গায়ককে নিয়ে। যে গায়ক প্রেমিকার জন্য নিজের যাবতীয় সুনাম, সাফল্য জলাঞ্জলি দিয়েছিল আর শেষ পর্যন্ত প্রেমে প্রতারিত হয়ে নিজের জীবনের অমিতসম্ভাবনাকে অবহেলা আর আত্মনিগ্রহ দিয়ে ধ্বংস করেছে। ‘একজন প্রতিভাবান মানুষের যাবতীয় দোষ আর গুণের নিষ্ঠুর সমন্বয় ঘটেছিল তার চরিত্রে। অবশ্যি এই পরস্পরবিরোধী মানসিকতার মূল্য তাকে নির্মমভাবে এবং হাতে–নাতেই পেতে হয়েছিল—তার চেয়ে প্রিয় ও ঘৃণিত মানুষ সে সময় এ শহরে আর ছিল না।’
গায়কের জীবনের নাটকীয় উত্থান-পতন নয়, কথক রেডিওর বড় কর্তা গায়কের শেষবারের মতো জ্বলে ওঠা প্রতিভার পরিচয় যখন পেতে চাইলেন, তখন কী ঘটল, সেটাই মূল গল্প।
এ গল্পের ভাষা খুব সমৃদ্ধ। গায়কের ‘ঘসা-খাওয়া, কর্কশ, দুমড়ানো’ গলার পরিচয় পেয়েও কথক যখন তাঁকে গান গাইতে বললেন, তখন গায়কের চাহনির বর্ণনা লেখক এভাবে দিয়েছেন, ‘তার মর্মভেদী দৃষ্টি যেন অক্ষমতার করুণ পতাকা। এই সেই তীব্র আর্ত অন্তর্ভেদী চাউনি, যা একদিন দেখা যেত অতীতযুগের পরাক্রান্ত নির্বাসিত সম্রাটদের চোখে—জীবনের দীর্ঘ ব্যর্থতার পর মৃত্যু মুহূর্তে আবার সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের বিমর্ষ স্বপ্নে তারা যখন উজ্জীবিত হয়ে উঠত।’
আবার শেষ পর্যন্ত যখন গায়ক গান ধরল, তার গানের বর্ণনা এ রকম, ‘সংগীতে যে উচ্চগ্রামের অধিকারের সঙ্গে সে বিভিন্ন স্বরগুলোকে নিয়ে খেলা করছিল, বিবাদী স্বরগুলোকে পাশাপাশি জুড়ে দিয়ে সুস্মিত আর অবলীল সব সাংগীতিক মুহূর্ত সৃষ্টি করছিল, গমক আর মিড়ের কোমল স্নিগ্ধ গভীর ব্যবহারে ঠুমরির পরিচিত মাধুর্য-জগৎকে জোছনান্বিত করে তুলছিল, তা অবাক করার মতো।’
গল্প লেখক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ওপর বিশ্বসাহিত্যের স্পষ্ট প্রভাব এই গল্পে দেখি। গল্পের মেজাজ ম্যাক্সিম গোর্কি কিংবা আন্তন চেখভের আর ভাষার ঐশ্বর্য যেন ও. হেনরির গল্পের কথা মনে করিয়ে দেয়।
ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি রাখা, সুবিন্যস্ত পোশাক পরা, ওপরে ওপরে মেয়েদের সৌজন্য দেখানো এই শিল্পপতিকে গল্প পড়ার সময় যেমন কল্পনা করেছিলাম, পরবর্তীকালে পত্রিকার খবরে যৌন কেলেঙ্কারির জন্য দায়ী হওয়া কয়েকজন মানুষের সঙ্গে তার বিস্ময়জাগানো মিল পেয়েছি। সাহিত্য তো বাস্তব জীবন থেকেই অনুপ্রেরণা নেয়। তথাকথিত উঁচুতলার মানুষের সঙ্গে অল্প পরিসরে যে মেলামেশা, সেখান থেকেই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এই চরিত্রদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
এ গল্পের একটিমাত্র দিক আমার ভালো লাগেনি, সেটি হলো প্রেক্ষাপটের বিস্তৃতি। মূল গল্প শুরুর আগে গল্পের কথক যে বাড়িতে আতিথ্য নিয়েছিলেন, সে বাড়ির গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রীর, তাদের কাপড় দান করার ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা গল্পের পক্ষে একটু গুরুভার লেগেছে। এই অংশটুকু আরও সংক্ষিপ্ত হলে গল্পের ধার আরও বাড়ত। গল্পে কথক হিসেবে রেডিওর বড় কর্তাই যথেষ্ট ছিলেন, তার ওপর আরেক কথক (জজকোর্টের উকিল) জুড়ে দেওয়া গল্পের গতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
তার পরেও গল্পটির ভাষার সৌন্দর্য ও বক্তব্যের চিরায়ত আবেদন একে বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য একটি স্থান দিয়েছে বলেই আমার মনে হয়। প্রতিভাবানের প্রতিভাটুকু চাপ দিয়ে নিংড়ে নিতেই আমাদের সমাজের যাবতীয় উৎসাহ। প্রতিভার বিকাশ, পালন ও সংরক্ষণে আমাদের জাতীয় অবহেলার নিদর্শন এ গল্পে থেকে গেল।
‘বেহুলা-ভাসান’ গল্পটি ঢাকা শহরের নাগরিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের গল্প। হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে। ১৯৮৫ সালে লেখা গল্পটিও যেন নিচু গলায় সে কথাই বলে। মফস্সল শহরের এক অপরূপার বিয়ে হয় শহরের বহুজাতিক কোম্পানির নির্বাহীর সঙ্গে। কলেজ অধ্যাপকের মেয়ে তার মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ ছেড়ে ঢাকার উঁচুতলার পার্টি-জীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে চেষ্টা করে। সে আবিষ্কার করে, আধুনিকতার নামে ওই পার্টি-জীবনে মানুষের মিথস্ক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে তাদের আদিম জৈবিক তাড়না। সে দেখে, তার রূপমুগ্ধ স্বামী অন্য শরীরের লোভে তার সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করছে, ওদিকে তার শরীরটিকে পাওয়ার জন্য হন্যে হয়ে যাচ্ছে অন্য শিকারি পুরুষেরা। নিজের মূল্যবোধ, আত্মসম্মান বাঁচিয়ে রাখার লড়াই করে কথক মেয়েটি একদিন টের পায়, এতে কেবল সে-ই ঠকছে। সে নিজেকে বিসর্জন দেয় এক লোলুপ শিল্পপতির কাছে। নিজেকে ‘অপবিত্র’ করে সে তার স্বামীর বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশোধ নেয়।
ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি রাখা, সুবিন্যস্ত পোশাক পরা, ওপরে ওপরে মেয়েদের সৌজন্য দেখানো এই শিল্পপতিকে গল্প পড়ার সময় যেমন কল্পনা করেছিলাম, পরবর্তীকালে পত্রিকার খবরে যৌন কেলেঙ্কারির জন্য দায়ী হওয়া কয়েকজন মানুষের সঙ্গে তার বিস্ময়জাগানো মিল পেয়েছি। সাহিত্য তো বাস্তব জীবন থেকেই অনুপ্রেরণা নেয়। তথাকথিত উঁচুতলার মানুষের সঙ্গে অল্প পরিসরে যে মেলামেশা, সেখান থেকেই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এই চরিত্রদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
এ গল্পের মূল বক্তব্য কি এই যে বিশ্বাসভঙ্গের জবাবে মানুষকে অবিশ্বস্ততা দিয়েই শাস্তি দিতে হয়? তা–ই যদি হয়, সে বক্তব্যের সঙ্গে আমি একমত নই। গল্পটি কোথায় যেন ‘সতীত্বের’ অতি পুরোনো, পুরুষতান্ত্রিক এক ধারণাকেই আঁকড়ে ধরে আছে বলে মনে হয়। কিন্তু এ কারণেই গল্পটিকে খারিজ করে দিতে পারি না; কারণ, সমাজেও বহু মানুষ ওই পুরোনো ধারণাকে যে আঁকড়ে রেখেছে, সে সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই।
‘মুক্তিযোদ্ধা’ এ বইয়ের শেষ গল্প। গল্পটি নানা কারণেই খুব তাৎপর্যপূর্ণ। মুক্তিযোদ্ধা মাযহার যুদ্ধ শেষে চাকরি নিয়েছিলেন রেডিও অফিসে। জিনিসপত্রের বাড়তি দামে সংসার চালাতে নাজেহাল হয়ে রেডিও অফিসের অন্য মুক্তিযোদ্ধা সহকর্মীদের সঙ্গে একজোট হয়ে মাযহার কিছু বাড়তি সুবিধার জন্য আন্দোলন করেছিলেন। সে আন্দোলন সফল হলো। বাড়তি টাকা পকেটে নিয়ে বাড়িতে যাওয়ার সময় একটি আত্মজিজ্ঞাসা মাযহারকে আক্রমণ করল—মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এই বাড়তি সুবিধা আদায় করে নেওয়া তাঁর পক্ষে অনৈতিক হলো কি না।
‘রোদনরূপসী’ গল্পটি অস্বস্তিকর। এক কামুক, ধর্ষক তরুণের স্বীকারোক্তি নিয়ে লেখা গল্পটি ভাবিয়ে তোলে। প্রশ্ন জাগে, আমরা কি ঘরে ঘরে এমন সব মানুষের সঙ্গেই নিশ্চিন্তে বসবাস করছি? তাদেরই সঙ্গে আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব পাতিয়েছি? চারপাশে যেসব অপরাধের বিবরণ আমরা শুনি-পড়ি-দেখি, তাতে এই ভেবে নিশ্চিন্ত হওয়া মুশকিল যে এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম।
গল্পের কথক তার বোনের এক বান্ধবীর প্রতি লুব্ধ হয়ে ওঠে। মেয়েটি তার ব্যাপারে উৎসাহী ছিল না, বোনটিও নিজের বান্ধবীকে ভাইয়ের আগ্রাসন থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল। তবু শিকারির মতো ওত পেতে থাকা কথক একদিন খালি বাড়িতে মেয়েটিকে পেয়ে যায়, তাকে প্রতারণা করে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। মেয়েটি কথকের সঙ্গে জোর খাটিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে না পারলেও অঝোরে কাঁদতে শুরু করে। তার অসহায় কান্না দেখে কথকের ভাবান্তর হয়। ‘মেয়েটার সেই মুহূর্তের সেই কান্নার বিরতিহীন সৌন্দর্যের মধ্যে এমন অপরূপ কিছু ছিল, যার দিকে তাকিয়ে তুমি অনন্য কোনো রোদনরূপসীকে দেখতে পেতে।’
এ গল্পের শেষ অংশটিই আমার প্রিয়। কথক যখন মেয়েটির অঝোর কান্নায় ভয় পেয়ে, পরাস্ত হয়ে তাকে ছেড়ে দিতে যাবে, তখনই বাড়ির দরজায় ঘা পড়ে। কথক দরজা খুলে দেখে, পরিবারের সদস্যরা কঠোর মুখে দাঁড়িয়ে আছে। এ যেন ও. হেনরির গল্পের সেই চরিত্র, যে জেলে যাওয়ার নানা চেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছিল, কিন্তু যখনই ঠিক করল পাপের পথ ছেড়ে দেবে, তখনই এক পুলিশ কনস্টেবল তাকে উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরির অপরাধে গ্রেপ্তার করে ফেলে।
‘রোদনরূপসী’ গল্পের কথকের মধ্যে একই সঙ্গে অপরাধপ্রবণ আর দুর্বলচিত্ত এক বাঙালি ধর্ষক-পুরুষের রূপায়ণ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। যদিও আজকের পাঠকের এই গল্প অবিশ্বাস্য মনে হবে; কারণ, এখন আর ভুক্তভোগীর কান্নায় কোনো ধর্ষকের মন গলে না—অপরাধের ক্ষেত্র যা–ই হোক না কেন!
‘মুক্তিযোদ্ধা’ এ বইয়ের শেষ গল্প। গল্পটি নানা কারণেই খুব তাৎপর্যপূর্ণ। মুক্তিযোদ্ধা মাযহার যুদ্ধ শেষে চাকরি নিয়েছিলেন রেডিও অফিসে। জিনিসপত্রের বাড়তি দামে সংসার চালাতে নাজেহাল হয়ে রেডিও অফিসের অন্য মুক্তিযোদ্ধা সহকর্মীদের সঙ্গে একজোট হয়ে মাযহার কিছু বাড়তি সুবিধার জন্য আন্দোলন করেছিলেন। সে আন্দোলন সফল হলো। বাড়তি টাকা পকেটে নিয়ে বাড়িতে যাওয়ার সময় একটি আত্মজিজ্ঞাসা মাযহারকে আক্রমণ করল—মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এই বাড়তি সুবিধা আদায় করে নেওয়া তাঁর পক্ষে অনৈতিক হলো কি না। তিনি মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন দেশপ্রেমের তাড়নায়, কিন্তু বাড়তি সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে তিনি সেই দেশপ্রেমের চেতনাকেই বিক্রি করে দিলেন কি না। প্রশ্নটি সব আদর্শ ও চেতনার জন্যই সত্যি। মুক্তিযুদ্ধ, ধর্ম, প্রগতি—যেকোনো আদর্শ ভাঙিয়ে যেকোনো সুবিধা নেওয়াই কি নীতির পরিপন্থী নয়?
রোদনরূপসী গল্পগ্রন্থের চারটি গল্প বাংলা সাহিত্যের সেরা গল্প না হতে পারে, কিন্তু মানের দিক থেকে ষাট, সত্তর ও আশির দশকের ভালো ছোটগল্পের চেয়ে ন্যূন নয়। লেখক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ নিজে এবং তাঁর অনেক ভক্ত-শুভানুধ্যায়ী হয়তো তাঁর কাছ থেকে এর চেয়েও অনেক ঋদ্ধ গল্প কামনা করেছিলেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশার ভারে যদি তাঁর লেখালেখির পরিমাণ কমে গিয়ে থাকে, তাহলে বলতেই হয়, অমন বাড়াবাড়ি প্রত্যাশা আমাদের আরও কিছু ভালো গল্প পড়ার সুযোগ নষ্ট করেছে।
জানি, আজকের এই সর্বপ্লাবী দুর্নীতি ও অন্যায়ের দিনে এই সূক্ষ্ম নৈতিক বিচ্যুতিকে কেউ ধর্তব্যের মধ্যে আনতে চাইবেন না। কিন্তু বিচ্যুতি সে তো বিচ্যুতিই। আদর্শ থেকে পতন যত সন্তর্পণে, সীমিত আকারেই শুরু হোক না কেন, তার থেকেই তো একদিন পাহাড়ধসের মতো ভয়াবহ অন্যায়গুলো ঘটার ক্ষেত্র তৈরি হয়। মুক্তিযোদ্ধা মাযহারের সঙ্গে আদর্শবিচ্যুতির বেদনায় তাই আমাদেরও কাঁদতে হয়। কতবারই না আমরা আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নানা বিচ্যুতির প্রলোভন এড়াতে না পেরে নিজেদের ভবিষ্যৎ দুর্দশার ভিত্তি স্থাপন করেছি!
লেখক এ গল্পগ্রন্থের ভূমিকায় নিজেই বলেছেন, ‘নিয়মিতভাবে লিখে চললে লেখায় যে সাবলীলতা দেখা দেয় বা লেখার কলকব্জার ওপর যে সহজ অধিকার আসে, তার অনটন গল্পগুলোয় স্পষ্ট।’ আমার অবশ্য মনে হয়, বাঙালি পাঠক গল্পের সাবলীলতার ওপর অতিনির্ভরশীল। সমৃদ্ধ লেখার ভাষা ও আঙ্গিকের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য যেটুকু কষ্ট স্বীকার করতেই হবে, সেটুকু না করে সমৃদ্ধ সাহিত্যের উত্তরাধিকার পাওয়ার আশা কেবলই দুরাশা। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বিশেষণবহুল গল্পভাষার সমালোচনা শুনেছি। কিন্তু ওই বিশেষণবাহুল্য যে গল্পের চরিত্র আর প্রেক্ষাপটকে ছবির মতো চোখের সামনে তুলে ধরে, সেটাও তো অস্বীকার করতে পারি না। সবারই গল্প বলার কায়দা ‘সহজিয়া’ হতে পারে না।
রোদনরূপসী গল্পগ্রন্থের চারটি গল্প বাংলা সাহিত্যের সেরা গল্প না হতে পারে, কিন্তু মানের দিক থেকে ষাট, সত্তর ও আশির দশকের ভালো ছোটগল্পের চেয়ে ন্যূন নয়। লেখক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ নিজে এবং তাঁর অনেক ভক্ত-শুভানুধ্যায়ী হয়তো তাঁর কাছ থেকে এর চেয়েও অনেক ঋদ্ধ গল্প কামনা করেছিলেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশার ভারে যদি তাঁর লেখালেখির পরিমাণ কমে গিয়ে থাকে, তাহলে বলতেই হয়, অমন বাড়াবাড়ি প্রত্যাশা আমাদের আরও কিছু ভালো গল্প পড়ার সুযোগ নষ্ট করেছে।
যেসব সম্পন্ন পাঠক এখনো রোদনরূপসী পড়েননি, তাঁদের অনুরোধ করি, এই চারটি গল্প মন দিয়ে পড়ে দেখুন। আর সবকিছু বাদ দিলেও শুধু ভাষার শক্তি ও সৌন্দর্যের কারণেই এ গল্পগুলো আপনার মনোযোগ দাবি করে।
রোদনরূপসী
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
প্রকাশক: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র
প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৩
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
পৃষ্ঠা: ৮৫; মূল্য: ২১০ টাকা