সত্যেন সেন ছিলেন একজন রাজনীতিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও প্রগতিশীল সাহিত্যিক। তাঁর লেখনীতে সমাজ পরিবর্তনের দৃঢ় আগ্রহ ও রাজনৈতিক সচেতনতার প্রতিফলন ছিল স্পষ্ট। সাহিত্য ও সংস্কৃতি ছিল তাঁর কাছে সমাজের গভীরে প্রবাহিত হওয়ার এক শক্তিশালী মাধ্যম। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভাষার শক্তি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা মানুষের মনোজগতে পৌঁছানো সম্ভব। তাঁর সাহিত্যকর্মে সামাজিক–রাজনৈতিক বাস্তবতা গভীরতা ও গাম্ভীর্যের সঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের প্রগতিশীল ধারায় তিনি একজন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব হয়ে আছেন। সন্জীদা খাতুন নিজেও এক বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী। তরুণ বয়স থেকেই তিনি বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামে যুক্ত হন, বিশেষত বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে সংগীত ও সংস্কৃতির চর্চা করলেও শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সাংস্কৃতিক সংগঠক ও কর্মী হিসেবে অসামান্য অবদান রেখেছেন। সত্যেন সেনের সঙ্গে সন্জীদার সম্পর্ক ছিল গভীর বন্ধুত্বের, যা আমার সত্যেনদা বইয়ে প্রকাশ পায়। এই গ্রন্থে তাঁদের আন্তরিক সম্পর্ক ও একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সৌহার্দ্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
সত্যেন সেনের জীবদ্দশায় ও মৃত্যু-উত্তর সময়ে সন্জীদা খাতুন আটটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা লিখেছেন। এগুলো তাঁর সামগ্রিক সত্তা আবিষ্কারে সাহায্য করে। এসব রচনায় সত্যেন সেনের আদর্শিক অবস্থান, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং বর্ণাঢ্য জীবনের নানা ছোটখাটো প্রসঙ্গের পাশাপাশি তাঁর কিছু সাহিত্যকর্মের গভীর বিশ্লেষণও পাওয়া যায়। সন্জীদার এই সংক্ষিপ্ত লেখাগুলো সত্যেন সেনের ভাবনা ও কাজের নানা দিক উন্মোচন করেছে। এগুলো সত্যেন সেনের চিন্তাধারা ও সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে।
সত্যেন সেনের সঙ্গে সন্জীদার সম্পর্ক ছিল গভীর বন্ধুত্বের, যা আমার সত্যেনদা বইয়ে প্রকাশ পায়। এই গ্রন্থে তাঁদের আন্তরিক সম্পর্ক ও একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সৌহার্দ্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
আমার সত্যেনদা
সন্জীদা খাতুন
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশ: জানুয়ারি ২০২৬
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল
পৃষ্ঠা: ৮০
মূল্য: ২২০ টাকা
সত্যেন সেনের মতে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পরও যদি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসে ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় থাকে, তবে মুক্তি পূর্ণতা পায় না। তাঁর ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা গ্রন্থে এই ধারণার স্পষ্ট প্রতিফলন পাওয়া যায়। তিনি সাম্প্রদায়িক ইতিহাসচর্চার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দেখান, মুসলমান সমাজ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়, সংগ্রামী এবং শ্রেণিগতভাবে বহুবিধ ছিল। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ় অবস্থান ছিল। ‘সত্যেন সেনের পদচিহ্ন’ প্রবন্ধে সন্জীদা খাতুন লিখেছেন, ‘শহরবাসী আধুনিক রুচিমান ও মননশীল মহৎ আদর্শে বিশ্বাসী মুসলিম তরুণ আনিসের, হিন্দু বন্ধু সুবিনয়ের পরিবার ও উল্লিখিত প্রকার গ্রামের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রে গ্রন্থটি অনুসৃত। জমাট কাহিনি সংরোচনের চাইতে সংখ্যালঘু হিন্দুর পক্ষে পাকিস্তানে বসবাস ও তৎসংক্রান্ত বিবিধ সমস্যা এবং হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক সম্বন্ধে উভয় পক্ষের সঙ্গেই একাত্ম হয়ে সকল বক্তব্য প্রকাশ করবার দুরূহ সাধনা করেছেন লেখক এই গ্রন্থে।’ এখানে সন্জীদার মূল্যায়নে সত্যেন সেনের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট গবেষক কানাই সামন্তের সত্যেন-মূল্যায়ন গ্রন্থটির গুরুত্ব বাড়িয়েছে নিঃসন্দেহে। স্মৃতিচারণা ও মূল্যায়নের যুগলবন্দীতে গ্রন্থটি অকপটে জোগান দেবে নানা নতুন চিন্তার খোরাক।
প্রতিটি রাষ্ট্রের ইতিহাসে একটি কেন্দ্রবিন্দু থাকে, যা নাগরিকের জন্য আলোর পথপ্রদর্শক। কেন্দ্রবিন্দুটি খুঁজে পাওয়া সহজ নয়, কিন্তু সত্যেন সেন তা খুঁজে পেয়েছিলেন।
প্রতিটি রাষ্ট্রের ইতিহাসে একটি কেন্দ্রবিন্দু থাকে, যা নাগরিকের জন্য আলোর পথপ্রদর্শক। যখন সরকার নাগরিকের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন মানুষ সেই কেন্দ্রবিন্দুর দিকে ফিরে শক্তি সঞ্চয় করে। কেন্দ্রবিন্দুটি খুঁজে পাওয়া সহজ নয়, কিন্তু সত্যেন সেন তা খুঁজে পেয়েছিলেন। ইংরেজ আমলে স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রত্যয়ে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। ‘মানব ঐক্যের প্রবক্তা সত্যেন সেন’ প্রবন্ধে দেখা যায়, দেশ ও দুস্থ মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং এই ভালোবাসার থেকেই তাঁর আন্দোলন শুরু। কারাবাসকালে কমিউনিস্ট আদর্শের প্রতি আগ্রহ এবং সহচরদের সাহচর্য তাঁকে সমাজতন্ত্রের প্রতি উৎসাহিত করেছিল। মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় তিনি কারাগারে কাটিয়েছেন, কিন্তু তাঁর আদর্শ কখনো নুয়ে পড়েনি।
সত্যেন সেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে জীবনের দীর্ঘ সময় জেলে কাটিয়েছেন। পাকিস্তানি শাসনের ২৩ বছরে প্রায় ১৩ বছর তিনি কারাবন্দী ছিলেন, কিন্তু এই দুঃসময়েও তাঁর সংগ্রাম থেমে যায়নি। ৫০-এর দশকে গণ–আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়লে, তিনি কারাগারে থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির দিকে মনোযোগ দেন। তাঁর সাহিত্য রচনা ছিল কেবল সাহিত্যিকতার জন্য নয়, বরং মেহনতি মানুষের সংগ্রাম ও সমাজের প্রগতি সাধনের উদ্দেশ্যে। সন্জীদা খাতুন তাঁর ‘রাজনীতির লোক? না সংস্কৃতির?’ লেখায় সত্যেন সেনের এই দ্বৈত ভূমিকার দিকে আলোকপাত করেন। সত্যেন সেন তথাকথিত রাজনীতিবিদ নন। মানুষের ভালোবাসাই তাঁর রাজনীতির আরাধ্য।
সত্যেন সেনের ‘রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ’ কারাগারের ভেতরের মানুষের বিচিত্র জীবন, চরিত্র ও সমস্যা নিয়ে রচিত একটি প্রবন্ধ। সন্জীদা খাতুন তাঁর ‘রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ’ প্রবন্ধে বলেন, নায়ক চরিত্রের দৃষ্টিতে জীবন ও সমস্যা যেভাবে ফুটে উঠেছে, তা খুবই প্রাঞ্জল ও মনোহর। নায়িকার পত্র-সাহায্যে লেখক-নায়ক পুরো ঘটনাগুলো একটি সূত্রে গেঁথে তুলতে পেরেছেন, যা পাঠককে গভীরভাবে ভেবে দেখাতে সক্ষম। সন্জীদার এই সমালোচনায় সত্যেন সেনের গ্রন্থটির সৃজনশীলতা ও কাহিনির এককথায় সুন্দর উপস্থাপন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।