পাতায় পাতায় গাছের পরিচয়

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

আমাদের দেশে উদ্ভিদ অচর্চিত একটি বিষয়। এখানকার উদ্ভিদবিদ্যার হাতেখড়িও ভিনভাষীদের হাতে। এই অঞ্চলের স্থানীয় উদ্ভিদের বিজ্ঞানভিত্তিক শ্রেণীকরণ ও শনাক্তকরণ দুটোরই গোড়াপত্তন ব্রিটিশদের বদান্যতায়। এরপর উদ্ভিদ নিয়ে মোটাদাগে আর কোনো দালিলিক কাজ হয়নি।

জ্যাকব থমাসকে তাদের উত্তরসূরি বলা যায়। তিনি একজন ভিনভাষী হয়েও বাংলাদেশের উদ্ভিদ নিয়ে একটি সাহসী কাজ করেছেন। তিনি প্ল্যান্টস অব বাংলাদেশ নামে দুই সহস্রাধিক প্রজাতির উদ্ভিদের পরিচয়সংবলিত একটি চমৎকার ফিল্ডগাইড আমাদের উপহার দিয়েছেন। বাংলাদেশের উদ্ভিদ নিয়ে এটি দ্বিতীয় ফিল্ডগাইড। ২০১৭ সালে যৌথভাবে তরুপল্লব ও আইইউসিএন থেকে বাংলাদেশের পুষ্প-বৃক্ষ লতা-গুল্ম নামে আরেকটি ফিল্ডগাইড প্রকাশিত হয়েছিল। আমরা জানি, উদ্ভিদ শনাক্ত থেকে শুরু করে পরিচিতি ও উপস্থাপন সম্পূর্ণ জটিল একটি প্রক্রিয়া। এই জটিল কাজটিই জ্যাকব থমাস করেছেন একাগ্রতা দিয়ে। সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে।

প্ল্যান্টস অব বাংলাদেশ
জ্যাকব থমাস

প্রকাশক: নিমফিয়া পাবলিকেশন
প্রকাশ: জুন ২০২৫
প্রচ্ছদ: জ্যাকব থমাস
পৃষ্ঠা: ৫২০
মূল্য: ১৫০০ ৳

গ্রন্থভুক্ত প্রজাতিগুলোর বিন্যাস করা হয়েছে পরিবারের ভিত্তিতে। ৫১৮ পৃষ্ঠার একটি বই হিসেবে গাছের সংখ্যা পর্যাপ্তই বলতে হয়। প্রতি পৃষ্ঠায় গড়পড়তা আট প্রজাতির গাছের ভুক্তি স্থান পেয়েছে। প্রতিটি ভুক্তির ভেতর ছোট-বড় মিলিয়ে চার থেকে আটটি চিত্র ও ছবি ব্যবহৃত হয়েছে। ছোট পরিসরে হলেও যুক্ত করা হয়েছে স্থানীয় ও আঞ্চলিক মানচিত্র। প্রতিটি গাছের ক্ষেত্রেই রয়েছে ফুল-ফল-পাতা-কাণ্ড ও ডালপালার চিত্র।

বইয়ের প্রথম অংশে পরিবার শ্রেণীকরণে মুদ্রিত হয়েছে বিভিন্ন উদ্ভিদের পাতার ছবি ও পত্রগুচ্ছ। এসব ছবি মূল ভুক্তির সঙ্গে পৃষ্ঠা নাম্বার নির্দেশে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাতে গ্রন্থভুক্ত কোনো গাছের সঠিক শনাক্তের জন্য কেউ চাইলে পাতার ছবি ও আকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারবেন। আলাদা করে কিছু প্রজাতির ফুল-ফল-বীজ ও গাছের বাকলও একই পদ্ধতিতে তুলে ধরা হয়েছে। উপ-অধ্যায়গুলোর শেষে বর্ণিত পরিবারের দুর্লভ উদ্ভিদগুলোর বৈজ্ঞানিক নামের একটি চেকলিস্ট পাওয়া যাবে। পরিবার বা অধ্যায়ের বিন্যাসে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বোঝার সুবিধার জন্য সরলীকরণ করা হয়েছে। শেষে জুড়ে দেওয়া বাংলা ও ইংরেজি সূচিপত্র থেকেও সহজে মূল পাঠের তথ্য খুঁজে পাওয়া যাবে।

আমরা জানি, উদ্ভিদ শনাক্ত থেকে শুরু করে পরিচিতি ও উপস্থাপন সম্পূর্ণ জটিল একটি প্রক্রিয়া। এই জটিল কাজটিই জ্যাকব থমাস করেছেন একাগ্রতা দিয়ে। সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে।

বইটিতে ১০ হাজারের বেশি ছবি রয়েছে। অর্ধেকের বেশি ছবি লেখকের নিজস্ব। তবে ছবির সংখ্যা এত বেশি আর আকৃতি এতই ছোট যে বিষয়ের মূল পাঠে খানিকটা দুর্বোধ্যতা তৈরি করেছে। ভুক্তি বিন্যাস পরিবারভিত্তিক হওয়ায় এবং তা বর্ণক্রম অনুযায়ী না থাকায় সাধারণ পাঠক কাঙ্ক্ষিত উদ্ভিদ খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়তে পারেন। কোনো কোনো ভুক্তির শিরোনাম বাংলা আবার কোনো ভুক্তির শিরোনাম ইংরেজি হওয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে। কিছু কিছু উদ্ভিদের প্রচলিত বাংলা নামে বিভ্রান্তি তৈরির অবকাশ রয়েছে। যেমন ম্যাগনোলিয়া গ্রান্ডিফ্লোরার প্রচলিত বাংলা নাম হিমচাঁপা বা উদয়পদ্ম হলেও বইয়ে আছে বিলেতি চাঁপা। মুদ্রিত কিছু ছবিতে অস্পষ্টতাও রয়েছে। বইটি প্রধান তথ্য উৎস বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ গ্রন্থমালা ২০১১ সালে প্রকাশিত হওয়ায় সম্প্রতি থিতু হওয়া উদ্ভিদগুলো এখানে বাদ পড়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে উদ্ভিদপ্রেমীদের প্রয়োজন মেটাতে বইটি নানাভাবে সাহায্য করবে।