জীবনের গাঢ় সমাচার
মঈনুল হাসান তাঁর ছোটগল্পগুলোতে জীবনের বহুমাত্রিকতা অনুসন্ধান করেছেন মূলত সামাজিক বাস্তবতার বিস্তৃত পরিসরে। ব্যক্তি-মানুষের অন্তর্জগতের জটিল ও রহস্যময় গোলকধাঁধায় প্রবেশের চেয়ে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন সমাজজীবনের প্রত্যক্ষ ও সম্মিলিত অভিজ্ঞতাকে। বাংলার বিস্তীর্ণ সমতলভূমিতে ছড়িয়ে থাকা প্রান্তিক মানুষের বর্ণিল অথচ উপেক্ষিত জীবনযাপন তাঁর রচনায় বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। অসংখ্য সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও জীবন্ত বর্ণনায় তিনি এঁকেছেন তাদের সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম ও স্বপ্নের অনুপম চিত্র; বাস্তবের উষ্ণ স্পর্শে এগুলো হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত। জলসংসার গল্পগ্রন্থের গল্পগুলোতে রয়েছে নানা ঘটনা, রহস্য ও মানবিক দ্বন্দ্ব। গল্পগুলো কখনো কখনো ব্যক্তিগত পরিণতির দিকে অগ্রসর হলেও, সমাপ্তির পর পাঠকের মনে থেকে যায় একধরনের অপূর্ণতার আয়েশি অনুভব।
মানুষ যখন একটি নির্দিষ্ট সমাজ ও ভূগোলে জীবন যাপন করে, তখন তার জীবনের সব রূপ—বিশেষ করে শক্তি, ক্ষয়, স্ফুরণ, বিকাশ, আলোছায়া, রং ও অন্ধকার—নিস্তব্ধভাবে চোখে পড়ে। দৈনন্দিন জীবনের এমন ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণই বাস্তবতাকে প্রকটভাবে সামনে নিয়ে আসে। হার্ডির ‘ওয়েসেক্স’ বা ফকনারের ‘গভীর দক্ষিণে’র কথাগুচ্ছের মতো, এই পর্যবেক্ষণ আমাদেরকে জীবনের কাঁচা, নিখুঁত ও বিশ্বাসঘাতক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। ছোটগল্পের জন্য জীবনকে নির্দিষ্টভাবে সীমাবদ্ধ করার কোনো বিকল্প নেই। সেদিক থেকে ছোটগল্প স্বভাবতই আঞ্চলিক হয়ে ওঠে। মঈনুল তাঁর জলসংসার গল্পগ্রন্থে এই কৌশল অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করেছেন। নির্দিষ্ট ভূগোলে প্রকৃতির প্রতিটি রেখা, জল-আলো-হাওয়া ও দৃশ্যমান উপাদানকে কাজে লাগিয়ে তিনি সফলভাবে জীবনের গভীরতম তলগুলো উন্মোচন করতে পেরেছেন। মানব অস্তিত্বের বহুতল বাস্তবকে তিনি সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা কালজ বন্ধনে বেঁধেছেন। গ্রন্থভুক্ত নয়টি গল্পের মধ্যে ‘মাশুল’ ছাড়া বাকি গল্পগুলো চাঁদপুরে বসেই লেখা। স্থানীয় পরিবেশ, মৃত্তিকামূললগ্ন মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও নদ-নদীর ছন্দ গল্পগুলোর বাতাবরণকে জীবন্ত করেছে। প্রান্তিক মানুষের স্পন্দন পাঠক এ গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে টের পাবেন।
‘জলসংসার’ গল্পে জলের সঙ্গে জীবনের গভীরতা ও পরিবর্তন মিশে আছে। লেখকের অসাধারণ লিপিকুশলতা পাঠককে রচনার প্রতি বিস্ময়াবিষ্ট ও আকৃষ্ট করে। গল্পের নদী বেহুলা ‘ভীষণ জলসোহাগী’, যার মাধ্যমে নিয়তির ছন্দ ও জীবনের অদৃশ্য রহস্য ফুটে ওঠে।
‘বেনেবউ’ গল্পটি ডাকাতিয়ার জলমগ্ন তীরের বাসিন্দাদের কাহিনি। মেঘনা-ডাকাতিয়ার উত্তাল ঢেউ ভেঙে যারা জীবনকে টিকিয়ে রাখে তাদের ইতিবৃত্ত। এ গল্পে প্রেম আছে; আছে জীবনসংগ্রাম। ‘জীবনের আবর্তে নিতাইপুর থেকে অনেক দূরের মাছঘাটে এসে একদিন তার বা তাদের সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায় সিতারার মতো স্বপ্নবান এক মানবীর। সেখান থেকেই পরিচয়... তারপর একদিন অজান্তেই লেখা হয়ে যায় স্বপ্ন বোনার গল্প, নতুন উচ্চাশার গল্প।’ সেকান্দারকে ভালোবেসে নিতাইপুরের একজন সিতারা হয়ে যেতে পারে বটে, তবে জীবন চালানো ঢের কঠিন। কখনো হেতেম ব্যাপারী, কখনো রশিদ মণ্ডলের মতো আড়তদার-মহাজনদের শোষণ থেকে সেকান্দারদের মুক্তি নেই। মুক্তির জন্য সংগ্রামী তারা হয়ে উঠতে চায়, কিন্তু পারে কি আসলে? কী হয় পরিণতি—লেখক এই গল্পে তার একটি বিশ্বস্ত চিত্র অঙ্কন করেছেন।
‘জলসংসার’ গল্পে জলের সঙ্গে জীবনের গভীরতা ও পরিবর্তন মিশে আছে। লেখকের অসাধারণ লিপিকুশলতা পাঠককে রচনার প্রতি বিস্ময়াবিষ্ট ও আকৃষ্ট করে। গল্পের নদী বেহুলা ‘ভীষণ জলসোহাগী’, যার মাধ্যমে নিয়তির ছন্দ ও জীবনের অদৃশ্য রহস্য ফুটে ওঠে। কখনো এই নিয়তি সরল-সোজা-স্বাভাবিক, আবার কখনো অজানা; কখনো কারণ-পরম্পরায় গঠিত, আবার কখনো জীবনের অন্ধকারে ঢাকা। তমিজ আলী যৌবনবতী নদী বেহুলার ভালোবাসায় বেড়ে ওঠে, কিন্তু বেহুলার ধ্বংসলীলায় তার সংসার, ঘরবাড়ি ও জীবিকা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তবু ডুবোজলের মধ্যে সে খুঁজে পায় স্বাচ্ছন্দ্য। প্রকৃতির কাছে মানুষ সর্বদা অসহায়, আশা ছাড়া কিছুই থাকে না।
‘জলসংসার’ গ্রন্থে কোথাও পুনরাবৃত্তি নেই, নেই লেখকের ক্লান্তির ছাপ। তিনি সাধারণ জীবনের আপাততুচ্ছ অনুষঙ্গের মধ্যেই খুঁজে নিয়েছেন অমৃতের স্বাদ এবং সেই সন্ধানের পথও পাঠকের সামনে উন্মুক্ত করেছেন।
গল্পের শেষাংশে রাবেয়ার আশাবাদ পাঠককে নিয়তির অমোঘ লীলার ছাপে আশান্বিত করে:
‘কাঠের মূর্তির মতো রাবেয়া সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে নিষ্পলক...অনেকক্ষণ। তাকে ঘিরে থাকে লংগরখানায় অনিশ্চয়তার সংসারপাতা অগণ্য আশাহত মুখ। তাদের চোখেমুখে আনন্দ-হাসি-কান্নার ছবি নাকি অনিশ্চিত চাপা শঙ্কা লেপটে ছিল সে উত্তর জানা নেই কারও। তবু ঘোর অন্ধকারের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রাবেয়া জোরে চেঁচিয়ে বলে, “আমার সোয়ামির বুকে আছে সাত মানুষের সুমান রাইজ্যের দোম। তোমরা দেইখো, ঝন্টুকে নিয়ি সে ঠিক উইঠি আসপি।”’
‘নীলকণ্ঠলতা’, ‘বিহঙ্গবালক’, ‘মাশুল’ ও ‘এলিনের বাবা’—প্রতিটি গল্পেই জীবন তার সহজ, স্বাভাবিক অথচ গভীর রূপে ধরা দিয়েছে। কোথাও পরিলক্ষিত হয় রাজনীতির অন্তঃসলিলা প্রবাহ, আবার কোথাও বা গ্রামীণ জীবনের নির্মমতা ও কদর্য বাস্তবতা। লেখকের স্বপ্নময় সৃজনক্ষমতা গল্পগুলোকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। গল্পগুলোর নামেই রয়েছে কৌতূহলোদ্দীপক কাব্যিক আবেশ। বিচিত্রমাত্রিক অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, কৈশোরের স্মৃতি, অপূর্ণ ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন মিলেমিশে গল্পগুলোকে করেছে প্রাণবন্ত ও নিখাদ। লেখক তাঁর আখ্যানকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও শিল্পবোধের সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে গল্পগুলোকে সফল পরিণতির দিকে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছেন।
‘জলসংসার’ গ্রন্থে কোথাও পুনরাবৃত্তি নেই, নেই লেখকের ক্লান্তির ছাপ। তিনি সাধারণ জীবনের আপাততুচ্ছ অনুষঙ্গের মধ্যেই খুঁজে নিয়েছেন অমৃতের স্বাদ এবং সেই সন্ধানের পথও পাঠকের সামনে উন্মুক্ত করেছেন। গ্রন্থটি পাঠ করার পর পাঠক নিজে সেই অমৃতের স্বাদ কতটুকু পাবেন তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকলেও, লেখকের শিল্পসাধনার আন্তরিকতা ও সাফল্য সম্বন্ধে কোনো সংশয় থাকবে না একেবারেই। বাকিটুকু পাঠকের রুচি ও অনুভবের বিষয়।
জলসংসার
মঈনুল হাসান
প্রকাশনা: পাঞ্জেরী
প্রচ্ছদ: মানব
প্রকাশ: জানুয়ারি ২০২৬
পৃষ্ঠা: ১১০; মূল্য: ৩০০ টাকা