বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাস দীর্ঘ এবং বৈচিত্র্যময়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে যে ছোটগল্পের বিকাশ, তা পরবর্তীকালে তারাশঙ্কর, মানিক, জগদীশ গুপ্ত, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ হয়ে হাসান আজিজুল হক ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতো মহারথীদের হাতে নব নব মাত্রা পেয়েছে। আশির দশক থেকে বাংলা কথাসাহিত্যে যে বাঁকবদল পরিলক্ষিত হয়, সেখানে নাগরিক জীবনের জটিলতা, নৈরাজ্য, অস্তিত্বের সংকট এবং মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে। এই সময়ের অন্যতম শক্তিমান এবং স্বকীয়তাসম্পন্ন কথাসাহিত্যিক ওয়াসি আহমেদ। তাঁর নির্বাচিত গল্প গ্রন্থটি কেবল কয়েকটি গল্পের সংকলন নয়; বরং এটি মানবমনের অতল গহ্বরে ডুব দেওয়ার, নাগরিক জীবনের অসংলগ্নতাকে ব্যবচ্ছেদ করার এবং বাস্তব ও স্বপ্নের মধ্যকার সীমারেখা মুছে ফেলার এক অসাধারণ সাহিত্যিক দলিল। গ্রন্থটির প্রারম্ভিক কথিকা, গল্পের বিষয়বস্তু, চরিত্রচিত্রণ এবং ভাষার বুনন বিশ্লেষণ করলে ওয়াসি আহমেদের সাহিত্যদর্শনের একটি পরিষ্কার রূপরেখা পাওয়া যায়।
গ্রন্থের শুরুতে ‘স্বপ্ন যখন প্রতিতুলনা’ শিরোনামের ভূমিকাংশে ওয়াসি আহমেদ নিজের লেখার পেছনের মনস্তত্ত্ব ও দর্শন অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি লেখার প্রক্রিয়াকে স্বপ্নের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আপাতদৃষ্টিতে লেখা একটি সচেতন প্রক্রিয়া এবং স্বপ্ন একটি অবচেতন বা চেতনাতীত প্রক্রিয়া—যাদের মধ্যে বিস্তর বিরোধ থাকার কথা। কিন্তু লেখক সাহিত্যিক হোর্হে লুইস বোর্হেসের বিখ্যাত উক্তিটি স্মরণ করিয়ে দেন: ‘রাইটিং ইজ নাথিং আদার দ্যান আ গাইডেড ড্রিম’; অর্থাৎ লেখালিখি নিয়ন্ত্রিত স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়।
স্বপ্নে পাত্র-পাত্রী বা ঘটনাপ্রবাহ যেমন বাধাবন্ধনহীন, স্বাধীন ও প্রবল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, ঠিক তেমনি লেখকের কলমেও একটি জগৎ সৃষ্টি হয়, যা কৃত্রিম হলেও জীবনের গভীরতম সত্যকে ধারণ করে। ওয়াসি আহমেদ বিশ্বাস করেন, জীবনকে অকপটে ও গভীরভাবে ধারণ করতে গেলে লেখার বিকল্প নেই। জীবনের জটিল জট খুলতে গিয়ে লেখক প্রতিনিয়ত যে আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হন, সেটিই শিল্পের মূল চালিকা শক্তি। চারপাশের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবতাকে লেখকের কাছে মনে হয় ‘ইন্দ্রিয়াতীত জগতের প্রতীকমাত্র’। এই ওপরতলের বাস্তবতাকে অনেক সময় ‘ভাঁওতা, কৃত্রিম, আনরিয়েল’ মনে হয় তাঁর কাছে। এই দার্শনিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ওয়াসি আহমেদ তাঁর গল্পগুলো নির্মাণ করেছেন, যেখানে প্রাত্যহিক জীবনের খুব সাধারণ ঘটনার আড়ালে লুকিয়ে থাকে পরাবাস্তবতার চমক এবং মনস্তাত্ত্বিক গহনতা।
তিনি লেখার প্রক্রিয়াকে স্বপ্নের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আপাতদৃষ্টিতে লেখা একটি সচেতন প্রক্রিয়া এবং স্বপ্ন একটি অবচেতন বা চেতনাতীত প্রক্রিয়া—যাদের মধ্যে বিস্তর বিরোধ থাকার কথা। কিন্তু লেখক সাহিত্যিক হোর্হে লুইস বোর্হেসের বিখ্যাত উক্তিটি স্মরণ করিয়ে দেন: ‘রাইটিং ইজ নাথিং আদার দ্যান আ গাইডেড ড্রিম।’
নাগরিক জীবনের মনস্তত্ত্ব
ওয়াসি আহমেদের গল্পগুলোর অন্যতম প্রধান পটভূমি হলো শহর বা নগরজীবন। নগরজীবনের একাকিত্ব, বেকারত্ব, হতাশা, ভয় ও যান্ত্রিকতা তাঁর গল্পে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।
‘ডলফিন গলির কুকুরবাহিনী’ গল্পটি এর এক চমৎকার উদাহরণ। প্রথম দেখায় এটি ঢাকা শহরের কোনো এক গলির বেওয়ারিশ কুকুর নিধনের সাধারণ গল্প মনে হতে পারে। সিটি করপোরেশনের লোকেরা এসে সুশৃঙ্খলভাবে, ইনজেকশন পুশ করে কুকুরগুলোকে ট্রাকে তুলে নিয়ে যায়। এই আপাতসাধারণ ঘটনার আড়ালে লেখক তুলে ধরেছেন নাগরিক মধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্বকে। রাতে কুকুরের ডাকে গলিবাসীর ঘুম হতো না, তাদের মনে হতো এটি যেন জোটবদ্ধ সন্ত্রাস। কিন্তু কুকুরগুলো মরে যাওয়ার পর যখন গলিতে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে, তখন মানুষের অবচেতন মনের আসল রূপটি বেরিয়ে পড়ে। তারা উপলব্ধি করে যে তারা আসলে শান্তিতে ঘুমাতেই ভুলে গেছে। কুকুরের ডাকের বদলে এখন তাদের তাড়া করে ফেরে নিজেদের জীবনের দুঃস্বপ্ন, দিনের বেলার গ্লানি ও পরাধীনতা। কুকুর নিধনের এই ঘটনাটি আসলে নাগরিক জীবনের অন্তর্নিহিত নিষ্ঠুরতা, অসহিষ্ণুতা এবং মানুষের নিজস্ব স্বপ্নের মৃত্যুর এক নিপুণ রূপক।
‘বীজমন্ত্র’ গল্পে আমরা পাই মধ্যবিত্ত শিক্ষিত যুবকের বেকারত্বের যন্ত্রণা ও অস্তিত্বের সংকট। তপু নামের এক তরুণ ‘কর্মীসংঘ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে রহস্যময় নিয়োগপত্র পায়। চিঠিটি পাওয়ার পর পরিবারে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, তা আমাদের সমাজের চিরচেনা রূপ। বেকার বড় ভাই রাজীবের হতাশা এবং তপুর প্রতি তার সুপ্ত ঈর্ষা, বৈবাহিক সম্পর্ক চ্ছিন্ন হওয়া বড় বোন রিনির একমাত্র সম্বল কলমটি ভাইকে উপহার দেওয়া—এসব ছোট ছোট অনুষঙ্গ মধ্যবিত্তের সংগ্রামের চিত্র ফুটিয়ে তোলে। কিন্তু গল্পের আসল চমকটি অপেক্ষা করে, যখন তপু সেই অফিসে যায়। একটি দৈত্যাকার, জানালাবিহীন, কৃষ্ণকায় ভবন, যেখানে ঢোকার পথটি স্বাভাবিক নয়; সেখানে লেখা: ‘পেছনের দরজা ব্যবহার করুন’। এই পরাবাস্তব বা কাফকায়েস্ক পরিবেশটি আসলে রাষ্ট্র বা করপোরেট কাঠামোর এক ভয়াল রূপ, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার অত্যন্ত জটিল ও গোলকধাঁধাময়।
‘সহচর’ গল্পটি আধুনিক ঢাকা শহরের রাতের ভয়াবহতা এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ভীতির একটি নিখুঁত স্কেচ। জামিল নামের মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি রাতে হেঁটে বাসায় ফিরছে। হঠাৎ তার মনে হয় কেউ তার পিছু নিয়েছে। পেছন থেকে ভেসে আসা ‘ধুপুস-ধাপুস’ ভারী কেডসের আওয়াজ তার মনে যে আতঙ্কের সৃষ্টি করে, তা কেবল জামিলের একার নয়, এটি এই শহরের প্রত্যেক নাগরিকের প্রতিদিনের ভীতি। রাস্তায় কোনো লাইট জ্বলছে না, চারদিক নিঝুম—এই পরিবেশটি সাসপেন্স থ্রিলারের মতো কাজ করে। লেখক এখানে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধীর চেহারা দেখাননি; বরং ‘ভয়’ নামক অদৃশ্য বস্তুটিকে মূর্ত করে তুলেছেন।
রাজনৈতিক স্যাটায়ার ও প্রাত্যহিক অসংলগ্নতা
ওয়াসি আহমেদ তাঁর গল্পে সমকালীন রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার অসংলগ্নতাকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম স্যাটায়ারের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তাঁর স্যাটায়ার কখনো উচ্চকিত নয়; বরং অত্যন্ত পরিশীলিত ও বুদ্ধিদীপ্ত।
‘চক্রবৃদ্ধি’ গল্পটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর একটি মোক্ষম চপেটাঘাত। প্রখর রোদ আর গরমে তোপখানা রোডের জ্যামের মধ্যে মাত্র তিনজনের একটি মিছিল চলছে: ‘বিচার চাই, বিচার চাই’। স্বপন ভাই হত্যার বিচারের দাবিতে শাহীবাগ সবুজ সংঘের এই কর্মসূচি। বিশাল ব্যানার ধরে রাখা তিনজন মানুষের এই ক্ষুদ্র মিছিলটি যানজটের মধ্যে পড়ে যেভাবে হাস্যাস্পদ হয়ে ওঠে, তা আসলে আমাদের বর্তমান রাজনীতির অন্তঃসারশূন্যতাকেই প্রমাণ করে। আটটি জায়গা থেকে মিছিল আসার কথা, চেয়ার-টেবিল আসার কথা; কিন্তু কিছুই আসে না। রাস্তার সাধারণ মানুষের টিপ্পনী—‘মইরা গেছে, বিচার চাইয়া ফায়দা কী, বাইত গিয়া ঘুমান’। এই উক্তি প্রমাণ করে, সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক এই ভণ্ডামিগুলো সম্পর্কে কতটা উদাসীন ও বীতশ্রদ্ধ। লেখক এখানে প্রখর রোদ ও গরমকে যেন একটি চরিত্র হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন, যা এই রাজনৈতিক প্রহসনের উত্তাপকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
‘নাগাল’ গল্পে ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম ও রাস্তা পারাপারের নিত্যদিনের ভয়াবহতাকে এক জাদুবস্তবতায় রূপ দেওয়া হয়েছে। আনোয়ার নিউ এলিফ্যান্ট রোডে বাটার দোকানের উল্টো দিক থেকে রাস্তা পার হতে গিয়ে ডাবলডেকার বাস এবং অন্যান্য গাড়ির মাঝখানে পড়ে যায়। মৃত্যুর এই চরম মুহূর্তে তার মস্তিষ্ক এক অদ্ভুত বিভ্রমের জন্ম দেয়। সে বাসের নিচে চাপা পড়ার বদলে নিজেকে আবিষ্কার করে বাটার দোকানের ভেতরে, যেখানে জুতার চামড়ার গন্ধে সে বুঁদ হয়ে থাকে এবং সেলসম্যানরা অদ্ভুত ভঙ্গিতে জুতা দেখাচ্ছে। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে মানুষের সাবকনসাস মাইন্ড বা অবচেতন মন কীভাবে বাস্তবতাকে অস্বীকার করে একটি ভ্রম তৈরি করে, তা এই গল্পে অসামান্য দক্ষতায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
পরাবাস্তবতা ও ম্যাজিক রিয়েলিজম
ওয়াসি আহমেদের গল্পে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ম্যাজিক রিয়েলিজম বা ফ্রানৎস্ কাফকার পরাবাস্তবতার একটি দেশীয় রূপ লক্ষ করা যায়। তিনি বাস্তবতার খোলসের ভেতর এমন কিছু ঢুকিয়ে দেন, যা যৌক্তিক মনে না হলেও মনস্তাত্ত্বিকভাবে চরম সত্য।
‘ছোঁয়া’ গল্পটি ফ্রানৎস্ কাফকার বিখ্যাত ‘দ্য মেটামরফোসিস’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে গ্রেগর সামসা ঘুম থেকে উঠে নিজেকে একটি বিশাল পোকায় রূপান্তরিত হতে দেখেছিল। এই গল্পে রানু নামের গৃহবধূ কার্নিশে একটি বেড়ালকে দেখতে দেখতে হঠাৎ নিজেই বেড়ালে রূপান্তরিত হয়ে যায়। তার হাতগুলো বেঁটে হয়ে থাবায় পরিণত হয়, শরীরে গজিয়ে ওঠে কালো লোম। এই রূপান্তরের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা কী? সংসারের একঘেয়েমি, নিজের অস্তিত্বহীনতা, নাকি একধরনের অবদমিত ইচ্ছা? সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার ঘটে যখন তার চার বছরের মেয়ে লোপা একটি বেগুনি রঙের প্রজাপতির ছবি এঁকে নিয়ে আসে এবং বেড়ালরূপী রানুকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করে। অবুঝ শিশুর কাছে মায়ের বাহ্যিক রূপান্তরটি কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। এই গল্পটি মাতৃত্ব, পরিচয় সংকট এবং পারিবারিক গণ্ডির মধ্যে এক নারীর আবদ্ধ জীবনের এক পরাবাস্তব প্রতিচ্ছবি।
ওয়াসি আহমেদ চরিত্রের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণে ফ্রয়েডীয় এবং ইয়ুংগীয় তত্ত্বের যেন এক সাহিত্যিক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। সাবকনসাস এবং আনকনসাস মাইন্ড কীভাবে দৈনন্দিন জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা তাঁর গল্পগুলোর ছত্রে ছত্রে বিদ্যমান। তিনি ঘটনার চেয়ে ঘটনার প্রতি চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়াকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
‘ছয় মিটার দূরত্ব’ গল্পটি অস্তিত্ববাদের এক অনন্য উদাহরণ। রাজন নামের এক ব্যক্তি ২০-২১ তলা ভবন থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করতে চায়। বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, সে মাটিতে আছড়ে পড়ার কথা। কিন্তু মাটি থেকে ঠিক ছয় মিটার ওপরে সে শূন্যে ভাসমান অবস্থায় আটকে যায়। এই ভাসমান অবস্থাতেই তার পকেটে থাকা মোবাইল ফোনটি বাজতে শুরু করে। আত্মহত্যা করতে যাওয়া একজন মানুষের মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তের এই ‘সাসপেনশন’ বা ঝুলে থাকার বিষয়টি অত্যন্ত দার্শনিক। জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানের এই ‘ছয় মিটার দূরত্ব’ আসলে কী? এটি কি মানুষের বেঁচে থাকার শেষ আকুতি, নাকি আধুনিক প্রযুক্তির (মোবাইল ফোনের রিংটোন) জালে আটকা পড়া মানুষের করুণ পরিণতি? মৃত্যুর মতো চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও প্রাত্যহিক জীবনের অনুষঙ্গগুলো কীভাবে মানুষকে তাড়া করে, লেখক তা এখানে অত্যন্ত নৈর্ব্যক্তিকভাবে তুলে ধরেছেন।
‘হত্যাকাণ্ড যেভাবে ঘটার কথা সেভাবেই’ গল্পে স্বপ্ন ও বাস্তবের সীমানা সম্পূর্ণ মুছে যায়। সাইফুল নামের চরিত্রটি স্বপ্নে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ফেলে এবং সকালে ঘুম থেকে উঠে তার মনে হতে থাকে যে সে সত্যিই কোনো অপরাধ করেছে। স্বপ্নের এই রেশ তার দাম্পত্য জীবনে এবং প্রাত্যহিক কাজকর্মে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। মানুষের অবচেতন মনে যে কত ধরনের অপরাধবোধ, আদিম প্রবৃত্তি এবং হিংস্রতা লুকিয়ে থাকে, তা স্বপ্নের মাধ্যমে কীভাবে বাস্তবে হানা দেয়, এই গল্পটি তারই এক মনস্তাত্ত্বিক দলিল।
নস্টালজিয়া, শিকড়ের টান ও শৈশবের মিথ
ওয়াসি আহমেদ শুধু নাগরিক জীবনের রুক্ষতাই আঁকেননি, তাঁর কলমে উঠে এসেছে শিকড়ের প্রতি টান, দেশভাগের যন্ত্রণা এবং শৈশবের হারানো দিনের স্মৃতি।
‘মধ্যদিনের গান’ গল্পে আমরা পাই মাশুক আলীকে, যে অবৈধভাবে বর্ডার পার হয়ে বাংলাদেশে আসে। তার এই আসার পেছনে কোনো মহৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই, কোনো বিশাল স্বার্থও নেই। তার আসার উদ্দেশ্য অত্যন্ত নগণ্য কিন্তু আবেগময়—এক প্লেট হাঁসের ডিমের তরকারি দিয়ে ভাত খাওয়া এবং নিজের ফেলে আসা জন্মভূমির মাটির গন্ধ নেওয়া। দেশভাগ মানুষের ভৌগোলিক মানচিত্র বদলে দিলেও মানুষের ইন্দ্রিয় এবং স্মৃতির মানচিত্র যে বদলাতে পারে না, মাশুক আলীর এই সামান্য ইচ্ছার মাধ্যমে লেখক সেই অসামান্য সত্যটিই তুলে ধরেছেন। এটি মানুষের শিকড় সন্ধানের এক করুণ ও মর্মস্পর্শী আখ্যান।
অন্যদিকে ‘স্মৃতিস্তম্ভ কিংবা এলেমানের লেজ’ গল্পে উঠে এসেছে ছোট শহরের শৈশবের মিথ বা কিংবদন্তি। এলেমান নামের এক ভবঘুরে, যাকে নিয়ে কিশোরদের মনে হাজারো কৌতূহল। তার নাকি একটি লেজ আছে, যা সে প্যান্টের ভেতর লুকিয়ে রাখে! কিশোরদের এই কল্পনাবিলাস, দিঘির জলে এলেমানের পয়সা ছোড়া এবং সেটাকে কেন্দ্র করে কিশোরদের অ্যাডভেঞ্চার—সব মিলিয়ে গল্পটি এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া তৈরি করে। ছোট শহরের এই সহজ-সরল জীবন এবং মিথগুলো কীভাবে ধীরে ধীরে আমাদের মন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, গল্পটি সেই আক্ষেপেরই এক শৈল্পিক প্রকাশ।
নির্বাচিত গল্প
ওয়াসি আহমেদ
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৪
প্রকাশক: কথাপ্রকাশ
প্রচ্ছদ: মোস্তাফিজ কারিগর
পৃষ্ঠা: ৩০২; মূল্য: ৬০০ টাকা
ওয়াসি আহমেদের সাহিত্যের একটি বড় শক্তি হলো তাঁর ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি। যেহেতু তাঁর লেখালেখির শুরু কবিতা দিয়ে, তাই তাঁর গদ্যে একধরনের অন্তর্নিহিত কাব্যিকতা ও পরিমিতিবোধ রয়েছে। তিনি অপ্রয়োজনীয় শব্দ ব্যবহার করেন না। তাঁর বাক্যগঠন খুব আঁটসাঁট, কিন্তু অর্থবহ।
উদাহরণস্বরূপ, ‘ডলফিন গলির কুকুরবাহিনী’ গল্পে তিনি লিখেছেন:‘স্ট্রিটলাইটের নিচে চোরাগোপ্তা কুয়াশা, দরজা আটকানো বাড়িঘরে জোড়া-জোড়া কি নিঃসঙ্গ বালিশে মাথারা ডুবুডুবু, অমনি শুরু হতো।’ ‘চোরাগোপ্তা কুয়াশা’ বা ‘নিঃসঙ্গ বালিশে মাথারা ডুবুডুবু’—শব্দের এই অসামান্য বুনন পাঠককে সরাসরি দৃশ্যটির ভেতরে নিয়ে যায়।
আবার ‘ছয় মিটার দূরত্ব’ গল্পে মৃত্যুর মতো সিরিয়াস বিষয় নিয়েও একধরনের ডার্ক হিউমার বা ব্ল্যাক কমেডির ব্যবহার দেখা যায়, ‘লাইফ এন্ডস পিসফুলি সিক্স মিটারস বিফোর ইমপ্যাক্ট উইথ দ্য গ্রাউন্ড।’ এখানে বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঙ্গে পরাবাস্তবতার মিশ্রণ ঘটিয়ে লেখক এক নতুন ডাইমেনশন তৈরি করেছেন।
ওয়াসি আহমেদ চরিত্রের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণে ফ্রয়েডীয় এবং ইয়ুংগীয় তত্ত্বের যেন এক সাহিত্যিক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। মানুষের সাবকনসাস এবং আনকনসাস মাইন্ড কীভাবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা তাঁর গল্পগুলোর ছত্রে ছত্রে বিদ্যমান। তিনি ঘটনাকে প্রাধান্য দেওয়ার চেয়ে ঘটনার প্রতি চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়াকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
আশির ও নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা, দ্রুত নগরায়ণের কারণে সৃষ্ট বিচ্ছিন্নতাবোধ, বেকারত্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়—এ সবই ওয়াসি আহমেদের গল্পগুলোর চালিকা শক্তি। তাঁর চরিত্রগুলো বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির। তারা কেউই কোনো মহৎ বীর বা নায়ক নয়; প্রত্যেকেই জীবনের জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া সাধারণ মানুষ। তপু, আনোয়ার, রানু, রাজীব, জামিল, মাশুক আলী—তারা সবাই আমাদের সমাজের চেনা মুখ। কিন্তু লেখক এই সাধারণ জীবনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অসাধারণত্ব, ট্র্যাজেডি এবং অ্যাবসার্ডিটি বা অর্থহীনতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন।
‘লেখাকে মানুষের বানানো শিল্প হিসেবেই টিকে থাকতে হয়’—ভূমিকার এই কথার ওপর সুবিচার করে ওয়াসি আহমেদ প্রমাণ করেছেন, জীবনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং তাকে শিল্পের আদলে গড়ে তোলাই একজন সত্যিকারের লেখকের কাজ। তাঁর গল্পগুলোয় জাদুবাস্তবতা, পরাবাস্তবতা, মনঃসমীক্ষণ এবং নিরেট সামাজিক বাস্তবতার যে অপূর্ব রসায়ন ঘটেছে, তা বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে তাঁকে এক স্বতন্ত্র আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
যাঁরা প্রথাগত গল্পের বাইরে গিয়ে একটু ভিন্ন স্বাদের, মনস্তাত্ত্বিকভাবে উদ্দীপক এবং দার্শনিক গভীরতাসম্পন্ন সাহিত্য পড়তে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য ওয়াসি আহমেদের নির্বাচিত গল্প একটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ। এই গ্রন্থের প্রতিটি গল্পই যেন মানবমনের গহিনে আলো ফেলার এক একটি শক্তিশালী সার্চলাইট।