ইতিহাসের শিল্পিত রূপ

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

শিক্ষাবিদ, অ্যাকটিভিস্ট, গবেষক, গল্পকার, ভাষাতাত্ত্বিক—এমন বহু পরিচয় সত্ত্বেও মুনীর চৌধুরী (১৯২৫-১৯৭১) সম্পর্কে প্রথমত এবং প্রধানত যা বলা যায়, তিনি একজন নাট্যকার, বাংলাদেশের নাট্যকার। সম্প্রতি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে নির্বাচিত নাটক: মুনীর চৌধুরী শীর্ষক সংকলনগ্রন্থ; সম্পাদনা করেছেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার। বইটি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর জন্মশতবর্ষে (২০২৫)। ছোট–বড় মিলিয়ে আটটি নাটক এখানে সংকলিত হয়েছে—মানুষপলাশী ব্যারাককবররক্তাক্ত প্রান্তরদণ্ডকারণ্যমর্মান্তিকজমা খরচ ও ইজা এবং মুখরা রমণী বশীকরণ। নাটকগুলোর রচনা ও প্রকাশকাল ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৯—মুনীর চৌধুরীর সৃষ্টিশীলতার স্বর্ণসময়ে।

বাংলাদেশের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে মুনীর চৌধুরী নিঃসন্দেহে একজন পূর্ণকালীন সক্রিয় ব্যক্তিত্ব। ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকবদল এবং প্রায় প্রতিটি বাঁকে তাঁর যুক্ততা ও সংলগ্নতাকে মুনীর চৌধুরীর সৃষ্টিশীল সত্তার মজবুত পটভূমি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সামন্ত-আভিজাত্য পরিশ্রুত আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়-ফেরত মুনীর চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই যুক্ত হন প্রগতি লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘে (১৯৪৩)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ঢাকায় অবস্থানরত কিছু মার্কিন সৈনিকের সঙ্গেও তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে (১৯৪৫), যাঁরা রাজনৈতিকভাবে ছিলেন ফ্যাসিবাদবিরোধী। ১৯৪৬ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তিনি প্রত্যক্ষভাবে কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপর প্রত্যক্ষ রাজনীতির ইতি। কিন্তু সদ্যপ্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক গতিধারার সমান্তরালেই বিকশিত হতে থাকে তাঁর সৃষ্টিশীল সত্তা। তিনি দেখেছেন ১৯৪৬-এর কলকাতার হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গার প্রভাবে ঢাকায় দাঙ্গার টেনশন। দাঙ্গা প্রতিরোধে তিনি নিজেও ছিলেন একজন মাঠের কর্মী। সেই প্রেক্ষাপটে তিনি লিখলেন মানুষ নাটিকা। হিন্দু বা মুসলমান পরিচয়ের চেয়েও মানবিক পরিচয়টি যেখানে মুখ্য। সাতচল্লিশ-পরবর্তী পাকিস্তান রাষ্ট্রভুক্ত প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকায় সরকারি কর্মচারীদের আবাসন–সংকট নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের ঢঙে লেখা নাটিকা পলাশী ব্যারাক। হাসি-ঠাট্টার ছলে এখানে প্রকাশিত হয়েছে পাকিস্তান রাষ্ট্র নিয়ে সাধারণ মানুষের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা।

সামন্ত-আভিজাত্য পরিশ্রুত আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়-ফেরত মুনীর চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই যুক্ত হন প্রগতি লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘে (১৯৪৩)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ঢাকায় অবস্থানরত কিছু মার্কিন সৈনিকের সঙ্গেও তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে (১৯৪৫), যাঁরা রাজনৈতিকভাবে ছিলেন ফ্যাসিবাদবিরোধী।

নির্বাচিত নাটক : মুনীর চৌধুরী
সংকলন ও সম্পাদনা: রামেন্দু মজুমদার
প্রকাশক: বাংলা একাডেমি
প্রথম প্রকাশ: জুন ২০২৫
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
পৃষ্ঠা: ২৭০; মূল্য: ৫৬০ টাকা

বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে মুনীর চৌধুরীর কবর নাটক এক অর্থে তাঁর আইকনিক সৃষ্টি। ১৯৫৩ সালের ১৭ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী অবস্থায় তিনি এই নাটক লেখেন, যা কারাগারেই ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে মঞ্চস্থ হয়। পুলিশ ইন্সপেক্টর হাফিজ, নামহীন পাকিস্তানি নেতা, মুর্দা ফকির, গার্ড এবং কয়েকটি ছায়ামূর্তির সহযোগে মুনীর চৌধুরী যে একাঙ্কিকা লিখলেন এবং সব গোপনীয়তা রক্ষা করে যে সফলভাবে মঞ্চস্থ করালেন, তাতে কবর কেবল নাট্যসাহিত্য বা শিল্পের বিষয় হয়ে থাকে না, পরিণত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের অনিবার্য অনুষঙ্গে। এবং এটিকে কেবল ভাষা আন্দোলনের সাহিত্য হিসেবে সীমায়িত করা যায় না; বরং নিপীড়ক রাষ্ট্র ও শোষিত জনতার সম্পর্কের সমীকরণ হিসেবেও পাঠ করা যায়।

রক্তাক্ত প্রান্তর মুনীর চৌধুরীর লেখা প্রথম পূর্ণাঙ্গ মৌলিক নাটক। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের (১৭৬১) দুই শ বছর উদ্‌যাপনের অংশ হিসেবে নাটকটি লেখা হয়েছিল। এমন সময়ে নাটকটি লেখা হচ্ছে যখন আইয়ুবি শাসন চলমান, স্বাভাবিক রাজনীতি নিষিদ্ধ, রবীন্দ্রজন্মশবর্ষ উদ্‌যাপনে সরকারি বাধা এবং বাংলা ভাষা বিশেষত বর্ণমালার বিষয়ে সরকারি উপেক্ষা দৃশ্যমান। এর মধ্যেই মুনীর চৌধুরী আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বে এমএ ডিগ্রি নিয়ে এসেছেন (১৯৫৮), সরকারি আহ্বানে করাচিতে যাচ্ছেন, পাকিস্তান লেখক সঙ্ঘের কেন্দ্রীয় কমিটিতে মনোনীত হচ্ছেন (১৯৫৯); আবার একই সঙ্গে পূর্ববঙ্গ ভাষা কমিটির রিপোর্টের সমালোচনা করে প্রবন্ধ লিখছেন (১৯৫৯), সরকারের বিরাগভাজনও হচ্ছেন। এমনি চাপা উত্তেজনার সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি থেকেই প্রকাশিত হচ্ছে রক্তাক্ত প্রান্তর (১৯৬২), যেখানে স্বজাতির কাছে অবমূল্যায়িত মুসলমান সেনাপতি ইব্রাহিম কার্দি মারাঠাদের হয়ে যুদ্ধ করে এবং জীবন দিয়ে জবান রক্ষা করে। অন্য যুদ্ধশিবিরে থাকা জোহরার সঙ্গে ঘটে তার মর্মগত রক্তক্ষরণ ও ট্র্যাজেডি। এই নাটকে যুদ্ধবিরোধী ও আধুনিক জীবনচেতনার কথা নাট্যকারসহ অনেক সমালোচক বলেছেন। কিন্তু সমকালীন বাংলা সাহিত্যে পাকিস্তানায়নের প্রভাব—মুসলমান ঐতিহ্যের নবমূল্যায়নচেষ্টার সঙ্গে মিলিয়েও এই নাটক পড়া যায়। মুনীর চৌধুরীর কর্মতৎপরতায় পাকিস্তানের সংহতি রক্ষা এবং বাংলা সাহিত্যচর্চার মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা যায় না। এক অর্থে এই নাটক সমকালীন ইতিহাসেরও একটি পাঠে পরিণত হয়।

কমিউনিস্ট আদর্শ, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, পাশ্চাত্য শিল্প-অভিজ্ঞান, সমকালীন শাসনপদ্ধতিতে ব্যক্তির দায়বদ্ধতা—সব মিলিয়ে মুনীর চৌধুরীর যে জীবনদর্শন ও সাহিত্যবোধ অবয়ব লাভ করে, এরই ধারাবাহিকতায় ষাটের দশকে তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের শক্তিশালী শামিয়ানার নিচে।

রামায়ণের মতো পৌরাণিক অনুষঙ্গকে কীভাবে নাটকীয় চমৎকারিত্বে সমকালীন আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সংশ্লেষিত করা যায়, দণ্ডকারণ্য তার একটি সফল দৃষ্টান্ত। ষাটের দশকের আর্থরাজনীতি এখানেও রূপকের আশ্রয়ে উপস্থিত থেকেছে। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সম্পর্ক ও সম্পর্কের টানাপোড়েন, আধুনিক জীবনবোধ, সমকালীন সামাজিক অসংগতি দণ্ডকারণ্য–এর দ্বিসাময়িক নাট্যবিন্যাসে শিল্পরূপ লাভ করেছে। মর্মান্তিক নাটকটিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে লেখা—মিউজিক্যাল কৌতুক নাটক। এ ছাড়া জমা খরচ ও ইজা এবং মুখরা রমণী বশীকরণ অনুবাদ-নাটক দুটিও প্রহসন বা কৌতুক নাটকের মধ্যে পড়বে।

নাট্যকার হিসেবে মুনীর চৌধুরী দৃশ্যত উদার মানবতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত। কিন্তু তাঁর শিল্পচেতনার ভেতরে ফল্গুধারার মতো বয়ে চলে তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ। তিনি একসময় কমিউনিস্ট ছিলেন; অথচ তাঁর নাটক রাজনৈতিক আদর্শের স্লোগান হয়ে ওঠেনি। তিনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টি ও চিন্তার পরিসরকে বিস্তৃত করেছেন। কমিউনিস্ট আদর্শ, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, পাশ্চাত্য শিল্প-অভিজ্ঞান, সমকালীন শাসনপদ্ধতিতে ব্যক্তির দায়বদ্ধতা—সব মিলিয়ে মুনীর চৌধুরীর যে জীবনদর্শন ও সাহিত্যবোধ অবয়ব লাভ করে, এরই ধারাবাহিকতায় ষাটের দশকে তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের শক্তিশালী শামিয়ানার নিচে। কিন্তু তাঁর নাটক নিছক জাতীয়তাবাদ বা মানবতাবাদ উৎসারিত নয়। পাকিস্তান পর্বে বাংলাদেশের ইতিহাস যেভাবে অম্লমধুর গতিতে এগিয়েছে, সেখানে একজন সৃষ্টিশীল লেখক কোন করণকৌশলের গুণে তাঁর সৃষ্টিকে শিল্পসফল করে তোলেন, মুনীর চৌধুরীর নির্বাচিত নাটক তার একটা পাঠ হতে পারে। নাটকগুলো ওই সময়েও ছিল মঞ্চসফল। এই নাটকের সব কটি ইতিহাসকে আশ্রয় করে লেখা হয়নি। কিন্তু প্রতিটি নাটকই পাকিস্তান-পর্বের বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। মুনীর চৌধুরী পাকিস্তান-আদর্শের পরিধির মধ্যে থেকেও সফলভাবে বাংলাদেশের নাট্যপথের শক্তিশালী অভিমুখ নির্দেশ করেছেন। বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে মুনীর চৌধুরী যেমন অনিবার্যভাবে গৃহীত হয়েছেন, তাঁর লেখা নাটকও তেমনিভাবে বিবেচিত হয় ইতিহাসান্বিত শিল্পসৃষ্টি হিসেবে।