একটি রহস্যময় অভিযোগ

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাত মাস আগে পাস করে বেরিয়ে যাওয়া একজন শিক্ষার্থী তার ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ করেছেন। অধ্যাপক শাহজাহানের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ এনেছেন তাঁরই প্রাক্তন শিক্ষার্থী দেবযানী সাহা। তিনি মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন। এখন অভিযোগ করেছেন, প্রথম হওয়ার ঘটনায় অধ্যাপক শাহজাহানের হাত ছিল আর যা একপর্যায়ে যৌন হেনস্তা পর্যন্ত গড়িয়েছিল।

অধ্যাপক শাহজাহান বিবাহিত। তাঁর স্ত্রী তাসলিমা। তাঁদের কোনো সন্তান নেই। পরিপাটি সাজানো সংসার। স্ত্রী তাসলিমা অধ্যাপক শাহজাহানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ বিশ্বাস করেননি। তিনি ব্যক্তিগতভাবে দেবযানীর সঙ্গে পরিচিত। তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল পারিবারিক। বাসায়ও যাওয়া-আসা ছিল দেবযানীর।

যৌন হেনস্তাবিষয়ক বিশেষ কমিটির কাছে অভিযোগ গিয়েছে, ফলে তদন্ত হবে। গল্পটা খুব সাদামাটা। স্ত্রী মানসিক সাহস জোগাচ্ছেন স্বামীকে। যেহেতু তাঁর স্বামীর উপাচার্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তখন তিনি যে শিক্ষকরাজনীতির রোষানলে পড়েছেন, তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে।

অধ্যাপক শাহজাহানের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্তার অভিযোগ এনেছেন তাঁরই প্রাক্তন শিক্ষার্থী দেবযানী সাহা। তিনি মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন। এখন অভিযোগ করেছেন, প্রথম হওয়ার ঘটনায় অধ্যাপক শাহজাহানের হাত ছিল।

অধ্যাপকের পক্ষে কতক শিক্ষকও জুটে যান। আবার তাঁর বিরোধী শিক্ষকেরাও শিক্ষার্থীদের মাঠে নামিয়ে দেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে অপসারণের আন্দোলনে। অধ্যাপকের পক্ষের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও হাত গুটিয়ে বসে থাকেন না। অধ্যাপক শাহজাহান সরকারি দলের সমর্থক। অশান্ত হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়।

অভিযুক্ত
বিশ্বজিৎ চৌধুরী

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৪
পৃষ্ঠা: ১২৮
মূল্য: ৩৪০ ৳

বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন

প্রশ্ন হলো, কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন এ অভিযোগ করেননি দেবযানী। মাস্টার্সে তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন। যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এ ঘটনায় তিনি সুবিধাপ্রাপ্ত। কেন তিনি সেই অন্যায় সুবিধা নিলেন? আর তিনি যদি তখন অন্যায় সুবিধা নিয়েই থাকেন, তাহলে এখন তাঁর মাস্টার্স পরীক্ষার রেজাল্ট বাতিল হয়ে যাবে। এমন ঝুঁকি জেনেও কেন অভিযোগ তুলছেন দেবযানী সাহা!

এ রকমই খটকার ভেতর দিয়ে এগোতে-এগোতে ‘অভিযুক্ত’ উপন্যাসের কাহিনি পৌঁছে যায় ক্লাইমেক্সে। আরও উত্তেজনাকর রূপ নেয় যখন বিশ্ববিদ্যালয় যৌন হেনস্তাবিষয়ক বিশেষ কমিটি অধ্যাপক শাহজাহান ও দেবযানী সাহাকে সালিসের জন্য সশরীর উপস্থিত হতে বলে।

ঔপন্যাসিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী সম্পর্কগুলো গেঁথেছেন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। সম্পর্কের বাস্তবতা কোথাও টোল খায় না। যেন ভরাট নিপুণ সূচিকার্য। স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক, বড় ভাই, ভাইপো নিলয়, ভাইঝি শমী, শ্বশুর, বিশ্ববিদ্যালয়ের কলিগ, মারকুটে ছাত্রনেতা শোয়েব কামরান, মেয়েদের হলের দাপুটে নেত্রী হোসনে আরা—প্রত্যেকে একেকটি জীবন্ত চরিত্র। প্রত্যেকে আমাদের চেনা।

উপন্যাসে আমরা একটু দূরের এক চরিত্রের দেখা পাই। তিনি প্রফেসর করিম। টরেন্টোতে থাকেন। সাত বছর পর দেশে এসেছেন। কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে অধ্যাপক শাহজাহানের সঙ্গে দেখা। তিনি প্রসঙ্গ টেনে এনে বলেন, ‘ইফ ইউ ডোন্ট টেক অফেন্স, কুড ইউ প্লিজ টেল মি, তার সঙ্গে অ্যাকজাক্টলি তোমার রিলেশনটা কী ছিল? আই মিন কনফ্লিক্টটা কোত্থেকে শুরু হলো?’

যখন সবকিছু মিটমাট হয়ে গেছে। স্থির হয়ে গেছে সত্য। তখন অধ্যাপক শাহজাহানের স্ত্রী তাসলিমা হঠাৎ আত্মহত্যা করেন। এই অস্বাভাবিক মৃত্যু পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেয় এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি।

পাঠক এখানে এসে ভাবতে থাকেন, সত্যি তো, দেবযানী সাহার সঙ্গে অধ্যাপক শাহজাহানের সম্পর্কের ধরন কেমন ছিল—তা কি শুধুই শিক্ষক-শিক্ষার্থীর, নাকি তারও অধিক? যখন তিনি দেবযানী সাহাসহ ১৪-১৫ জন ছাত্রছাত্রীর বহর নিয়ে খুলনা, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, নাটোর, বগুড়া অঞ্চলে শিক্ষাসফরে গিয়েছিলেন, যে শিক্ষাসফরের মুড ছিল পিকনিকের। আর দেবযানী সাহার প্রতি অধ্যাপক শাহজাহানের আগ্রহ বা পক্ষপাত গড়ে উঠেছিল। প্রশ্নের মুখে পড়েই নানা জবাব তৈরি হতে থাকে পাঠকের জন্য।

উপন্যাসটি শেষ হয়ে যেতে পারত যখন প্রয়োজনীয় সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে দেবযানী সাহার অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয় যৌন হেনস্তাবিষয়ক বিশেষ কমিটি খারিজ করে দেয়। কিন্তু ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা আওয়াজ তোলে, ‘ছাত্রী নিপীড়নের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া চলবে না। যৌন হয়রানির বিচার চাই।’

কিন্তু তখনো পাঠকের কাছে এমন কোনো দলিল নেই, যা দিয়ে অধ্যাপক শাহজাহানকে যৌন হেনস্তার অভিযোগে অভিযুক্ত করা যায়। ইতিমধ্যে দেবযানী সাহা নিজেই অনুপস্থিত থাকেন বিশ্ববিদ্যালয় যৌন হেনস্তাবিষয়ক বিশেষ কমিটির এক সভায়, যেখানে তার নিজ অভিযোগের সপক্ষে কথা বলার ছিল।

স্বামীর ওপর থেকে অভিযোগের খড়্গ নেমে যাওয়ায় অধ্যাপক শাহজাহানের স্ত্রী তাসলিমা প্রশান্তি বোধ করছেন। বড় ভাই, ভাবি, ভাইপো, ভাইঝি—সবাই মেনে নিয়েছে দেবযানী সাহার অভিযোগ ভিত্তিহীন। কারও প্ররোচনায় তিনি এ কাজ করেছিলেন।

যখন সবকিছু মিটমাট হয়ে গেছে। স্থির হয়ে গেছে সত্য। তখন অধ্যাপক শাহজাহানের স্ত্রী তাসলিমা হঠাৎ আত্মহত্যা করেন। এই অস্বাভাবিক মৃত্যু পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেয় এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি। তাসলিমার সুইসাইডের পর তাঁকে মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষ হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়োজন দেখা দেয়!

বলা হয়ে থাকে, ভালো উপন্যাসের দুটো দিক থাকে। একটা বিষয়বস্তুগত এবং অন্যটি প্রকাশভঙ্গিগত। ‘অভিযুক্ত’ উপন্যাসে এ দুয়েরই অসাধারণ সম্মিলন ঘটেছে। আর সত্যিই কী ঘটেছিল, তা জানতে পাঠককে যেতে হবে উপন্যাসের শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত।