দুটি নভেলা থেকে দুটি অধ্যায়
সমঝোতার বিকেল, কথাহীন সান্নিধ্য
আশানুর রহমানের উপন্যাস লেনিন এবং গল্পগ্রন্থ ভোর ও বারুদের গল্প পাঠকমহলে আলোচিত হয়েছে। মানুষের অন্তর্জগত, সম্পর্কের জটিলতা এবং সময়ের অস্থির বাস্তবতা তাঁর লেখার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। লেনিন উপন্যাসের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিয়েটিভ আর্টস অ্যাওয়ার্ডেও ভূষিত হয়েছেন।
এবারের বইমেলায় প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর দুটি নভেলা—প্রথম প্রেম ও ছায়ার আঙিনা—যা এক মলাটে সংকলিত হয়েছে। সম্পর্ক, নীরব আবেগ ও মানুষের অদৃশ্য টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে রচিত এই দুই নভেলার ছোট দুটি অধ্যায় আজ পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।
সমঝোতার বিকেল
ঢাকার দুপুরটা সেদিন ছিল অদ্ভুত শান্ত। কোনো ঝড় নেই, কোনো রোদ নেই। শুধু একধরনের নিঃশব্দ স্থিরতা, যেন শহরটাও বিশ্রাম নিচ্ছে নিজের ভেতর। আরমান তখন নিজ কক্ষের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নোট গোছাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় মুঠোফোনে মায়ার বার্তা এল, ‘স্যার, বিকেলে আমার সাথে এককাপ চা খাবেন? ক্লাসের পরে, লাইব্রেরির সিঁড়িতে। আমি আপনাকে একটা ছোটগল্প শোনাতে চাই। এটা আমার জীবনের গল্প নয়, কিন্তু আমার অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে জন্মেছে।’
বার্তাটি পড়ে আরমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার বুকের কোথাও যেন একটি পুরোনো দরজা নিঃশব্দে খুলে গেল। জানালা দিয়ে সে বাইরে তাকাল। ঢাকার আকাশে ফাল্গুনের হালকা রং। মেঘের ভেতর রোদ এমনভাবে ফিল্টার হয়ে পড়ছে যেন সময় নিজেই এক নরম ছায়া মেলে দিয়েছে।
সেদিন বিকেলে ক্লাস শেষে তারা দুজন দেখা করল বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির সিঁড়িতে। চারপাশের ছায়া ধীরে ধীরে দীর্ঘ হচ্ছে। দূর থেকে ভেসে আসছে পাখির ডাক। বাতাসে হালকা গন্ধ—পুরোনো বই, ধুলো আর বসন্তের শুষ্ক পাতা। সিঁড়ির নিচে এক বালক কাগজ কুড়োচ্ছে। তার নড়াচড়া থেকে উঠছে মৃদু শব্দ, যেন শহরের হৃৎস্পন্দন। দূরে একটি মেয়ে কারও সঙ্গে কথা বলছে। কাঁধে কারও হাত রাখা। স্নেহ নাকি ভালোবাসা, বোঝা মুশকিল। এমন সব দৃশ্য মায়া সব সময় খুব ভালো দেখতে পায়, যেখানে ছোট ছোট জীবনের ভেতর বড় সত্য লুকানো থাকে।
মায়া বলল, ‘স্যার,আমি একটা গল্প শোনাতে চাই আপনাকে। এটা আমার জীবনের গল্প নয়, কিন্তু আমার অভিজ্ঞতার ভেতর থেকেই জন্মেছে।’
আরমান মাথা নেড়ে বলল, ‘বলো।’
সূর্য ঢলে পড়ছে। আকাশে শালিকেরা ফিরে যাচ্ছে নিজেদের নীড়ে। আর বাতাসে জমে থাকা বৃষ্টির গন্ধ ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যাচ্ছে। তারা একসাথে হাঁটছে। কিন্তু হাত ধরছে না। কারণ, সমঝোতার নিজের একটা ভাষা আছে, যা স্পর্শে নয়, বোঝাপড়ায় টিকে থাকে।
মায়া একটু থেমে, যেন নিজের ভেতর কোনো দরজা খুলে, ধীরে বলতে শুরু করল, ‘একটা মেয়ে ছিল, যে এক অধ্যাপককে ভালোবাসত। অধ্যাপক লেখকও ছিলেন, তাই মেয়েটি বোধ হয় তাকে দ্বিগুণ ভালোবাসত। একদিন সে বুঝল, তার মা-ও ওই মানুষটিকে ভালোবাসেন। তখন সে ভেঙে পড়ল। না, দুঃখে নয়, উপলব্ধিতে। সে প্রথমবার বুঝল, ভালোবাসা কোনো একক ঘটনা নয়। এটা একটা প্রবাহ, যা কখনো দুজন মানুষকে ছুঁয়ে যায়, কখনো একক হৃদয়কে। পরে মেয়েটি ধীরে ধীরে শিখল, ভালোবাসা কারও সম্পত্তি নয়, কারও মুখোমুখি বসার পুরস্কারও নয়। ভালোবাসা একটুকরো আলো, যা পথের ধুলোয় পড়ে থাকে। কেউ তা দেখবে, কেউ পায়ে মাড়াবে, আবার কেউ সযত্ন তুলে নেবে হাতে। শেষে মেয়েটি লেখক হয়ে উঠল। তার উপন্যাসে এল বৃষ্টি, শহর, আকাশ কিন্তু মানুষগুলো আর অপরাধী রইল না। সবকিছু জানার পরও তারা পরস্পরকে শ্রদ্ধা করতে শিখল। আর এই শ্রদ্ধাই ছিল তাদের মুক্তি।’
থামল মায়া। একটা বাতাস এসে দুজনের মাঝখানে নীরবতা এনে দিল। সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে সোনালি থেকে ধূসর হয়ে উঠছে। আরমান দীর্ঘ সময় ধরে তাকিয়ে রইল মায়ার মুখের দিকে। যেন সে প্রতিটি শব্দের প্রতিধ্বনি শুনছে মায়ার চোখের গভীর থেকে। তারপর খুব নরম স্বরে বলল, ‘চমৎকার গল্প।’
মায়া মৃদু হাসল, ‘আপনি কি কখনো ভাবেননি, প্রথম প্রেম আসলে একটা অভিধান? যেখানে আমরা শব্দের অর্থ খুঁজতে যাই। কিন্তু শেষে দেখি, আমাদের অভিধানই বদলে গেছে।’
আরমানের চোখে মৃদু আলো, মুখে ক্লান্তি কিন্তু সন্তুষ্টির হাসি। সে জবাব দিল, ‘ভেবেছি। আর আজ ভাবছি, তুমি যে লেখক হয়ে উঠেছ, এই হয়ে ওঠাই আমার জীবনের যেকোনো লেখার চেয়ে বড়।’
সিঁড়ি থেকে উঠে তারা পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। কলাভবন পেরিয়ে, ভিসির বাংলো, তারপর ব্রিটিশ কাউন্সিলের পথ ধরে। সূর্য ঢলে পড়ছে। আকাশে শালিকেরা ফিরে যাচ্ছে নিজেদের নীড়ে। আর বাতাসে জমে থাকা বৃষ্টির গন্ধ ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যাচ্ছে। তারা একসাথে হাঁটছে। কিন্তু হাত ধরছে না। কারণ, সমঝোতার নিজের একটা ভাষা আছে, যা স্পর্শে নয়, বোঝাপড়ায় টিকে থাকে।
ঢাকা শহরকে কখনো এত সুন্দর লাগে না, যতটা লাগে, যখন কারও সঙ্গে সমঝোতায় পাশাপাশি হেঁটে যাওয়া যায়। সমঝোতা ভালোবাসার শেষ নয়। এটা তার এক উন্নত ও পরিণত রূপ। আর সেই সন্ধ্যায় যখন সূর্য ডুবছে নরম ধূসর আলোয়। মায়া হঠাৎ ভাবল, ভালোবাসা হয়তো চিরকাল থাকে না, কিন্তু যারা একে বুঝে নেয়, তাদের ভেতরে তার প্রতিধ্বনি থেকে যায় এক অনন্ত আর স্নিগ্ধ বৃষ্টির মতো।
[ নভেলা প্রথম প্রেম থেকে উদ্ধৃত]
কথাহীন সান্নিধ্য
সন্ধ্যার আলো তখন বাড়ির কাচের ভেতরে পড়ে নরম হয়ে এসেছে। দেয়ালে সোনালি রেশ, কার্নিশে পাতলা আভা, টেবিলের ওপর আলো-ছায়ার দাবা। ডাইনিং টেবিলে আধখানা আলো, আধখানা ছায়া। যেন দিন আর রাতের মধ্যে একটিমাত্র পাতলা দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে, যা একদিকে ঠেকালেই অন্যদিকে দুলে ওঠে। ঘড়ির কাঁটা এগোয়, কিন্তু সময় যেন একটু থেমে যায়। চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠতে উঠতে ক্ষণিক দুলে থেমে থাকে। অনন্যা জানালার ধারে বসে ছিল। বই খোলা, বুকমার্ক আধাআধি বেরোনো, কিন্তু চোখ তার পৃষ্ঠায় নয়। বাইরের রাস্তায় বৃষ্টির পরের হাওয়া ভেসে আসছে। মাটির গন্ধে সেই বাতাস ভেজা, ক্লান্ত অথচ কোমল ভেজা পাতার শ্বাস, স্যাঁতসেঁতে কংক্রিটের সুর।
অরিজিৎ অনেকক্ষণ ধরে ঘরের ভেতর পায়চারি করছিল। অতি পরিমিত পদক্ষেপে, যেন শব্দের উচ্চতা না বাড়ে। একবার ডাইনিং থেকে বসার ঘর, বসার ঘর থেকে করিডর, করিডর থেকে জানালার ধারে। তার হাঁটার ভেতর মাপজোখ ছিল, যেমন ব্লুপ্রিন্টে থাকে গ্রিড। তার ভেতরে কিছু কথা বহুদিন জমে আছে। কথাগুলো সেই জাতীয়, যেগুলো মানুষ সহজে বলে না। বলা মানেই স্থির জলে ঢেউ ওঠা। যে জল একবার কেঁপে উঠেছে, তা আর আগের মতো স্থির হয় না। শেষমেশ অরিজিৎ থামল। কাঁধ সামান্য নামানো, আঙুলের ডগা টেবিলের কিনারায়। স্বর নিচু, ক্লান্ত অথচ দৃঢ়, ‘তুমি জানো, ঘর বানানো সহজ কিন্তু তার ভেতরের বাতাস ঠিক রাখা সবচেয়ে কঠিন।’
অনন্যা মাথা তুলল। বহুদিন পর এই প্রথম তাদের চোখে চোখ পড়ল। যেন দৃষ্টিতে তর্ক নেই, হঠাৎ প্রশ্ন নেই। কেবল একটি দীর্ঘ নীরব উপস্থিতি। যেন দুজন মানুষ কোনো অস্পষ্ট স্মৃতি থেকে একসঙ্গে ফিরে এসেছে, আর সেই স্মৃতির দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। খুব ধীরে অরিজিৎ বলল, ‘আমি চিঠিটা পড়েছি।’ বাতাস তখন সত্যিই থেমে গেল। ফ্যান ঘুরছে, তবু শব্দ যেন মৃদুতর।
আমি চিঠিটা পড়েছি। এই তিনটি শব্দ অনন্যার দেহে ঢুকে গেল আঙুলের ছাপ ছাড়াই। যেন কেউ খুব নিঃশব্দে দরজা খুলে ঘরে ঢুকে পড়েছে। শব্দ নেই, কিন্তু উপস্থিতির ভার আছে। টেবিলের ওপর রাখা কাচের বাটি হালকা কেঁপে উঠল। হয়তো কেঁপে উঠল অনন্যার ভেতরে কোথাও এবং বাটির ছায়ায় তার প্রতিধ্বনি পড়ল।
ক্ষমা, ভুল, ভালোবাসা, মানবতা সব মিলেমিশে এক অচেনা গন্ধ হয়ে গলির বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। সে জানত, অরিজিৎ দোষ দেয়নি মানেই ক্ষমা করেনি। বরং এই অব্যক্ত ক্ষমাই হয়তো সবচেয়ে কঠিন বিচার। যেখানে শান্তি নেই, অথচ আয়না আছে।
অনন্যার বুকের মধ্যে একসঙ্গে অনেক কিছু নড়ে উঠল। লজ্জা নয়, শুধু ভয়ও নয়, বরং এক অদ্ভুত স্বস্তি। যে স্বস্তি আসে, যখন কেউ তোমার অপ্রকাশিত অংশটুকু দেখে ফেলে এবং তবু আলো নিভিয়ে দেয় না। অরিজিৎ থামল না। মেপে মেপে বলল, যেন প্রতিটি বাক্যের ডগায় স্কেল রাখা আছে, ‘কিন্তু আমি তোমাকে দোষ দিই না। আমি জানি, তোমার মধ্যে যা ঘটছে, তা অস্বাভাবিক নয়। মানুষের ভেতর এমন বাতাস ওঠে।’ বাক্যটা অনন্যার দিকে ছুড়ে দেওয়া হলো না। বরং তার নিজের ভেতর থেকে উঠে এল। যেমন কোনো স্থপতি নিজের নির্মাণভ্রান্তিকে প্রথম চিনে নেয়, তারপর ভাষা দিয়ে তাকে স্পর্শ করে। তার কণ্ঠে অভিযোগের বদলে ছিল এক গভীর বোধ। যে বোধে প্রেম নেই, তবু ভালোবাসার ছায়া লেগে থাকে পাতলা ধুলো হয়ে।
অনন্যা কিছু বলল না। বুকের মধ্যে শব্দ বেজে উঠল। ক্ষমা, ভুল, ভালোবাসা, মানবতা সব মিলেমিশে এক অচেনা গন্ধ হয়ে গলির বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। সে জানত, অরিজিৎ দোষ দেয়নি মানেই ক্ষমা করেনি। বরং এই অব্যক্ত ক্ষমাই হয়তো সবচেয়ে কঠিন বিচার। যেখানে শান্তি নেই, অথচ আয়না আছে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে মানুষকে নিজেকেই দেখতে হয়; সেখানেই সবচেয়ে বড় ক্লান্তি।
অরিজিৎ চেয়ারে বসল। দুই হাত টেবিলে, আঙুলের মধ্যিখানে শিরা স্পষ্ট। মুখে শান্ত ভাব, চোখে কাচের মতো স্বচ্ছ ক্লান্তি। সে বলল, ‘শুধু একটা প্রশ্ন, তুমি কী চাও?’
‘চাও’ শব্দটা ঘরের বাতাসে ঝুলে রইল। প্রায় দৃশ্যমান, যেন একটি অদৃশ্য আগুন যা আলোও দেয় আবার পোড়ায়ও। দূরের ফ্রিজে কম্প্রেসর চালু হলো, আবার থেমেও গেল। প্রশ্নের ভেতরে কোনো দয়া নেই। আছে বোঝাপড়া, বোঝার অসহায়তা। অনন্যা অনুভব করল, তার ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, পিঠ সোজা। সে চুপ রইল। না অস্বীকার, না স্বীকার। ‘চাওয়া’ শব্দটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। একবার উচ্চারণ করলে ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। চাওয়ার মধ্যে মানুষ তার আবরণ খুলে ফেলে। আর যখন মানুষ নগ্ন হয়ে দাঁড়ায়, তখন ভালোবাসা নয়, শুধু বিচারই তাকে ঘিরে ধরে। এই ঘরে বিচার সভা বসুক, এমনটা সে চায় না। তাই সে নীরব। তার নীরবতা অস্বীকার নয়, তার নীরবতা দাঁড়িয়ে থাকা। চেয়ারের পিঠে হেলান না দিয়ে, ভর না দিয়ে নিজের ওজন বহন করা।
অরিজিৎ তাকিয়ে রইল। দৃষ্টি স্থির, তবু নরম। সে ‘ফিরে এসো’ বলল না, ‘আর এগিয়ো না’ বলল না। কেবল অপেক্ষা করল। যেন সে জানে, কিছু উত্তর মুখে বলা যায় না। তারা কেবল সময়ের ভেতর পাক খায়, এরপর একসময় নিজে নিজেই ঝরে পড়ে। যেমন গাছের পাতায় নীরবে হলুদ জমে, একদিন হাওয়া লাগলে মাটিতে খসে পড়ে। অনন্যা কফির কাপ তুলল। ঠোঁটে আনল, স্বাদ পেল না। কাপ রেখে বলল, ‘বাইরের বাতাস বড্ড ভারী।’
অরিজিৎ হালকা হাসল, মুখের কোণে, খুব অল্প। বলল, ‘হয়তো কুয়াশা জমছে।’
দুজনই জানত, এটা আবহাওয়ার কোনো আলাপ নয়। এই কুয়াশা ঘরের ভেতরের, জানালার বাইরের নয়। ঘড়ির কাঁটা এক পাক ঘুরল। অরিজিৎ উঠে জানালাটা সামান্য খুলে দিলে বাইরের আলো একটু বেশি ঢুকে পড়ল ঘরে। সেই আলোয় অনন্যার মুখে দুটি ছায়া পড়ল। একটি বর্তমানের, আরেকটি অনুচ্চারিত ভবিষ্যতের। ছায়া দুটি একে অপরের ওপর পড়ে একধরনের নতুন রং তৈরি করল। যার কোনো নাম নেই, কিন্তু স্পর্শ আছে। অরিজিৎ নিঃশব্দে বুঝল, ভালোবাসা এখন তাদের মধ্যে কঠিন কোনো বস্তু নয়। বরং নরম এক বোধ মাঝের নীরব জায়গায় জন্ম নিচ্ছে, যার অভিধান নেই, তবু যা মানুষকে মানুষ রাখে।
একসময় অনন্যা বলল, খুব আস্তে, ‘আমি ক্লান্ত।’
অরিজিৎ জিজ্ঞেস করল না কিসে? কারণ সে জানে, ক্লান্তি কখনো একবচন নয়। তাতে স্মৃতি আছে, অনুশোচনা আছে, আধখোলা জানালা আছে। সে শুধু জিজ্ঞেস করল, ‘জল খাবে?’
একমাত্র বাক্য, যেটা যেকোনো বিচার সভাকে মুহূর্তে ছুটি দিয়ে দিতে পারে। অনন্যা মাথা নেড়েছিল। গ্লাসে জল ঢালার শব্দ পাতলা, নিরপেক্ষ। গ্লাসের ঠান্ডা তার তালু অল্প ছুঁয়ে গেল। তবু যেন ভেতরের অস্থিরতাকে একমুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিল।
রাত বাড়ল। টিভি চলল না, গান বাজল না। টেবিলের ওপরের নুনদানি অযত্নেই খোলা রইল, কেউ ঢাকল না। অরিজিৎ একবার দাঁড়িয়ে শোবার ঘরের দরজা পর্যন্ত গেল, আবার ফিরে এল। যেন কোনো সুরের ঠিক জায়গাটি সে খুঁজছে। অবশেষে বলল, ‘আমি নির্মাণ বুঝি, মেরামতও। যদি কখনো দরকার হয়...’ বাক্যটি সে শেষ করল না। শেষ করা মানেই তো ঠিকাদারি। মানুষের সম্পর্ক তো ঠিকাদারি নয়। অনন্যা শুধু মাথা ঝোঁকাল। চোখে আলোর লাইন, ভেতরে অন্ধকারের মাধুর্য। ‘আমিও মেরামত শিখছি,’ উচ্চারণ করল না সে, মনে মনে কেবল বলল।
ওই রাতে তারা একই বিছানায় শুয়ে ছিল। চাদর একই, বালিশ আলাদা। মাঝখানে এক বিস্তৃত ফাঁকা জায়গা, চোখে না পড়লেও স্পষ্ট। অরিজিৎ জানালার দিকে মুখ করে, অনন্যা ছাদের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ। ঘরের বাতাস ভারী, তবু শান্ত। যেন ঝড়ের পরের মাঠ, যেখানে ছড়ানো ডাল–পাতা আছে, কিন্তু বাতাস নেই। অনন্যা অনুভব করল, ভালোবাসা কখনো কখনো শেষ হয় না, শুধু রূপ বদলায়। আলো ধীরে ধীরে ছায়া হয়। আর ছায়াই একসময় আশ্রয় দেয় রোদ থেকে, বৃষ্টি থেকে আর তাড়াহুড়া থেকে।
অরিজিৎ হঠাৎ বলল, ‘আমি তোমাকে ফিরে পেতে চাই না।’ একটু থেমে ফের বলল, ‘আমি চাই, তুমি নিজের কাছে ফিরে যাও।’ বাক্যটি ঘরের মাঝখানে এসে থামল। কোনো আলিঙ্গন নয়, কোনো বিদায়ও নয়; কেবল একটি স্থির সেতু, যেটি দুদিক থেকে এগোলে তবেই মিলবে।
দুটি নভেলা: প্রথম প্রেম-ছায়ার আঙিনা
আশানুর রহমান
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৬
প্রচ্ছদ: নির্ঝর নৈঃশব্দ্য
পৃষ্ঠা: ১২০
মূল্য: ৩৫০ টাকা
দুজনের কারও ঘুম এল না। তবু চোখ বন্ধ হলো। চোখ বন্ধ করলে শব্দ বড় হয়। ফ্রিজের মৃদু গুঞ্জন, দূরের কুকুরের ডাক আর ভেতরের নিশ্বাসের ওঠানামা। সেই ওঠানামায় অনন্যা টের পেল, তার ভেতরের দরজাটা আজ প্রথমবার অনুচ্চারিতভাবে খোলা রইল। তালা নেই, শুধু দরজার পাত নরম হাওয়ায় নিজেই দুলছে। অরিজিৎও টের পেল, সে আজ প্রথমবার কোনো আদেশ দেয়নি, কোনো অনুরোধও নয়। কেবল জায়গা ছেড়ে দিয়েছে। মাঝখানের ওই খালি জায়গা, যেখানে কেউ চাইলে বসতে পারে, চাইলে কাঁদতে পারে, চাইলে কিছু না বলেও থাকতে পারে।
রাত আরও ঘন হয়ে এল। জানালার বাইরের আলো ছোট হলো। দূরের ফ্ল্যাটে বাতি নিভল একে একে। তবু তাদের ঘরের আলো জ্বলল কম ভোল্টেজে, উষ্ণ রঙে। সেই আলোয় অনন্যা নিজের হাত দেখল। আঙুলে কলমের কালি শুকনো, নখের পাশে সামান্য কাগজের আঁচড়। মনে পড়ল দুপুরে সে বোর্ডে লিখেছিল, ‘সমাজ মানুষকে বিচার করে, মন বোঝে না।’ সেই বাক্য এখন নিজের ঘরের দেয়ালে ফিরে এসেছে। নতুন অর্থে, নতুন আলোয়।
অরিজিৎ হঠাৎ বলল, ‘আমি তোমাকে ফিরে পেতে চাই না।’ একটু থেমে ফের বলল, ‘আমি চাই, তুমি নিজের কাছে ফিরে যাও।’ বাক্যটি ঘরের মাঝখানে এসে থামল। কোনো আলিঙ্গন নয়, কোনো বিদায়ও নয়; কেবল একটি স্থির সেতু, যেটি দুদিক থেকে এগোলে তবেই মিলবে।
অনন্যা চোখ বন্ধ করল। চোখের ভেতর ছোট্ট একটা ঢেউ উঠল, ভেঙেও পড়ল। তারপর এক নরম অন্ধকার বসে রইল। এই অন্ধকার আর শত্রু নয়, বন্ধু। অন্ধকারে মানুষ নিজের ভেতরের আলোর মান বুঝতে পারে। খুব বেশি হলে চোখে লাগে, খুব কম হলে ভয় হয়, ঠিক পরিমিত হলে নিশ্বাস সমান হয়। তারা দুজনই সেই পরিমিতির কাছে পৌঁছাচ্ছে ধীরে, দৃশ্যমান কোনো নাটক ছাড়াই।
খুব ভোরে হয়তো কেউ পাখির ডাক শুনবে, কেউ শুনবে না। তবু তারা দুজনই জানবে, রাতটা নতুন একটি স্থাপত্য এঁকে গেছে ঘরে। দরজা, জানালা, করিডর সব একই আছে, বদলেছে শুধু বাতাসের পথ। যে বাতাস এখন ঘরের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় আসা-যাওয়া করে। সে আর গোপনে ঢোকে না, খোলা জানালার স্বীকৃতি নিয়ে আসে, নরমভাবে।
সেই রাতের শেষে, যখন ঘুম অবশেষে চোখে লেগে আসছে, অনন্যা মনে মনে একটিমাত্র শব্দ বলল, ‘থাকা’। ফিরে আসা নয়, থামাও নয়, ‘থাকা’। এই থাকাই হয়তো তাদের নতুন চুক্তি অক্ষরহীন, অথচ বাধ্যবাধকতাসহ। যেখানে ভালোবাসা তার নতুন দেহ খুঁজে নেয়। নীরবতা, বোঝাপড়া আর সামান্য, খুব সামান্য আলো-ছায়া মেশানো শান্তির।
[নভেলা ছায়ার আঙিনা থেকে উদ্ধৃত]