১৯৭১ সালের যুদ্ধদিনে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সার্বক্ষণিক সহচর সাইফুল ইসলাম সম্পর্কে প্রথম জানতে পেরেছিলাম রাশেদ খান মেননের কাছ থেকে। ২০২৩ সালে ওয়ার্কার্স পার্টির তোপখানা রোডের কার্যালয়ে একটি সাক্ষাৎকারের সময় তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন সাইফুল ইসলাম মাওলানা ভাসানীর ১৯৭১ সালের ভারত–জীবনের এমন কিছু ঘটনা ও তথ্য জানেন, যা সম্ভবত আর কেউই জানেন না। বিশেষ করে সে সময় মাওলানা ভাসানী গৃহবন্দী ছিলেন কি না? মুজিবনগর সরকারের ভেতর কী কী টানাপোড়েন ছিল? চীনা নেতা মাও সে-তুংয়ের কাছে ভাসানী সাহায্য চেয়েছিলেন কি না? এমনকি মাওলানা ভাসানী কি সত্যিই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, নাকি সেটি কোনো কৌশল ছিল?—এমন প্রশ্নের উত্তর একমাত্র সাইফুল ইসলামই জানেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯৭১ সালের বাম রাজনীতির তরুণ তুর্কি রাশেদ খান মেনন ও হায়দার আকবর খান রনোদের প্রধান নেতা ছিলেন মাওলানা ভাসানী। যাঁরা কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি নামের একটি সংগঠনের অধীনে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। যদিও সে সময় সিংহভাগ বাম রাজনীতিবিদ মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রশ্নে ছিলেন বিভক্ত ও বিভ্রান্ত। কিছু ক্ষেত্রে হঠকারী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইফুল ইসলামের স্বাধীনতা ভারত ভাসানী গ্রন্থের কাভারের ছবি দেখেই প্রবল আগ্রহ বোধ করছিলাম। পরে প্রথমার নতুন এই বই আমাকে প্রায় এক সপ্তাহ আটকে রেখেছিল। একটা সুপাঠ্য ইতিহাস–আলেখ্য আমাকে নিয়ে গেছে ইতিহাসের সেসব অলিন্দে, যেখানে এর আগে কেউ আলো ফেলেলনি। বলা বাহুল্য যে ১৯৭১ সালে মাওলানা ভাসানী ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। কিন্তু সে সময় তাঁর দল ন্যাপ ছিল ছিন্নভিন্ন, অসংগঠিত ও দুর্বল। আবার রাজনৈতিক মতাদর্শে তিনি ছিলেন চীনের প্রতি অনুরক্ত। যে চীন আবার বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ভারতের বিরুদ্ধে। এই জটিল সমীকরণের নানা বিশ্লেষণ উঠে এসেছে বইটিতে। যে বিষয়টি মুখবন্ধতে তুলে ধরেছেন দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। অধ্যাপক চৌধুরী লিখেছেন, ‘এক অংশ (ন্যাপ) তাঁকে পরামর্শ দিয়েছে পারলে পাকিস্তানকে সমর্থন করতে, না পরলে চুপ করে থাকতে। চীনা দূতাবাস থেকেও তাঁকে নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।’ (পৃ. ১০)
সাইফুল ইসলাম মাওলানা ভাসানীর ১৯৭১ সালের ভারত–জীবনের এমন কিছু ঘটনা ও তথ্য জানেন, যা সম্ভবত আর কেউই জানেন না। বিশেষ করে সে সময় মাওলানা ভাসানী গৃহবন্দী ছিলেন কি না? মুজিবনগর সরকারের ভেতর কী কী টানাপোড়েন ছিল? চীনা নেতা মাও সে-তুংয়ের কাছে ভাসানী সাহায্য চেয়েছিলেন কি না?
স্বাধীনতা ভারত ভাসানী
সাইফুল ইসলাম
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশ: আগস্ট ২০২৪
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল
পৃষ্ঠা: ২৪৭
মূল্য: ৫৫০ ৳
যুদ্ধদিনে মাওলানা ভাসানী চীন-পাকিস্তান বলয়ের সেই নিরাপদ আশ্রয়ে যাননি। বরং অপারেশন সার্চলাইট শুরুর আধা ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তানি সেনারা টাঙ্গাইলে তাঁর বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। এরপর যমুনা নদীতে ভাসতে ভাসতে মাওলানা যখন আসাম সীমান্তে পৌঁছেছেন, তখন প্রথমে ভারত সরকার তাঁকে ঢুকতে দেয়নি। যদিও পরে তিনি আসামে প্রবেশ করেন। এরপর শুরু হয় মাওলানা ভাসানীর ১৯৭১ সালের ভারতপ্রবাস। যাকে মাওলানা নিজেই তুলনা করেছেন কুটুমবাড়িতে বেড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে। যদিও তাঁর লক্ষ্য ছিল আরও কার্যকরভাবে যুদ্ধে ভূমিকা রাখা। সেই ভূমিকা কেন রাখা সম্ভব হয়নি, কার কারণে সম্ভব হয়নি, সেসবের এক বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন সাইফুল ইসলাম। এ বিশ্লেষণ যুক্তিনির্ভর ও সময়োচিত।
যুদ্ধদিনে মাওলানা ভারতের আসাম, কোচবিহার, দেরাদুন ও কলকাতায় ছিলেন। কিছুদিন দিল্লির হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ভাসানী কিছুটা নিয়ন্ত্রিত ও কিছু ক্ষেত্রে মুক্ত ছিলেন। তবে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, অসুস্থ মাওলানার চিকিৎসার জন্য ইন্দিরা গান্ধী সরকার আন্তরিকতা দেখিয়েছিল।
১৯৭১ সালের যুদ্ধদিনে মওলানা ভাসানী ভারতে গৃহবন্দী ছিলেন কি না, তার একটি বিস্তারিত বর্ণনা আছে এ বইয়ে। যুদ্ধদিনে মাওলানা ভারতের আসাম, কোচবিহার, দেরাদুন ও কলকাতায় ছিলেন। কিছুদিন দিল্লির হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ভাসানী কিছুটা নিয়ন্ত্রিত ও কিছু ক্ষেত্রে মুক্ত ছিলেন। তবে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, অসুস্থ মাওলানার চিকিৎসার জন্য ইন্দিরা গান্ধী সরকার আন্তরিকতা দেখিয়েছিল। মাওলানার চিকিৎসায় জেনেভা থেকে ওষুধ এনেছিলেন—সেই প্রসঙ্গ তুল ধরতে ভোলেননি লেখক। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন ইন্দিরা গান্ধীর বাবা জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে মাওলানা ভাসানীর বন্ধুত্ব বা একধরনের যোগাযোগ ছিল। একাত্তরে ইন্দিরা গান্ধী সেই সম্পর্ককে সম্মান দেখিয়েছেন আন্তরিকতার সঙ্গে।
ছোট্ট এই পরিসরে বইটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। তবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একমুখী, এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইতিহাস ও বিশ্লেষণ পড়ে যাঁরা ক্লান্ত, তাঁদের জন্য বইটি হতে পারে বিশেষ সহায়। বলতে পারেন একপশলা মুক্ত হাওয়ার মতো। এ বইয়ে পাঠক মুক্তিযুদ্ধের এক ভিন্ন ও নির্মোহ বর্ণনা পাবেন। যার মাধ্যমে সেই সময়ের জটিল সব সমীকরণ বিশ্লেষণ সম্ভব। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে ভারত ও মুজিবনগর সরকারের নানা ঘটনা সম্পর্কে পাঠক নতুন করে চিন্তার সুযোগ পাবেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মঈদুল হাসানের মূলধারা ’৭১ একটি অনন্য গ্রন্থ। ধারণা করি, আধেয় ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সাইফুল ইসলামের স্বাধীনতা ভারত ভাসানী ভবিষ্যতে মূলধারা ’৭১–এর মতো পাঠকনন্দিত ও গ্রহণযোগ্য পুস্তক হিসেবে বিবেচিত হবে।