সিনেমায় নায়ক–নায়িকার হাতে ঠিক এই বইটাই কেন

ছবি: সংগৃহীত/ গ্রাফিকস: প্রথম আলো

সিনেমার পর্দায় আমরা যা দেখি, যেমন শোবার ঘর বা ড্রয়িংরুম, অফিস কিংবা কোনো রেস্তোরাঁ; সেখানে থাকা সোফা, টেবিল, বই, ফুলদানি, চশমা বা দেয়ালের শোপিস—এ সবকিছুই সিনেমার প্রপ। ‘প্রপ’ শব্দটি এসেছে ইংরেজি ‘প্রপার্টি’ থেকে। অর্থাৎ পর্দায় দৃশ্যমান প্রায় সব বস্তুই প্রপ। তবে এদের সবই সমান নয়। কিছু প্রপ থাকে পরিকল্পিত, যেগুলো শুধু দৃশ্য সাজায় না, বরং চরিত্রের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে কিংবা কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে সিনেমাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

নায়িকার হাতে থাকা বই (দিল চাহতা হ্যায়), একটি কয়েন (এ ম্যান কল্ড অটো) কিংবা জলসাঘর-এর ঝুলন্ত ঝাড়বাতি—এ ধরনের প্রপ অনেক সময় পুরো দৃশ্যের আবেগ ও অর্থ নির্ধারণ করে দেয়। দৃশ্যমান হলেও তারা কেবল পটভূমির অংশ নয়, গল্পের ভেতরে তাদের নিজস্ব ভূমিকা থাকে।

সব প্রপের মধ্যে বই একটু ব্যতিক্রমী। কারণ, বই শুধু দেখা যায় না, পড়াও যায়। শুধু সাজিয়ে রাখার বস্তু নয়, তার ভেতরেও ঢোকা যায়। চরিত্রের হাতে বই থাকলে দর্শক ধরে নেয়, সে চরিত্র ভাবতে পারে, একা থাকতে জানে, তার নিজস্ব চিন্তার একটি জগৎ আছে।

সিনেমায় কোন দৃশ্যে কী থাকবে, কোন বস্তুটি অর্থবোধ তৈরি করবে, তা গল্পের খাতিরেই ঠিক করা হয়। পরিচালকসহ পুরো টিমের বড় কাজ হলো কোন চরিত্রের আশপাশে কী থাকবে, কোন বস্তুটি তার স্বভাবের সঙ্গে মানানসই, আর কোনটি নীরবে গল্প বলে যেতে পারে, এসব ঠিক করা।

সব প্রপের মধ্যে বই একটু ব্যতিক্রমী। কারণ, বই শুধু দেখা যায় না, পড়াও যায়। শুধু সাজিয়ে রাখার বস্তু নয়, তার ভেতরেও ঢোকা যায়। চরিত্রের হাতে বই থাকলে দর্শক ধরে নেয়, সে চরিত্র ভাবতে পারে, একা থাকতে জানে, তার নিজস্ব চিন্তার একটি জগৎ আছে। তাই সিনেমায় বই নিছক উপকরণ হিসেবে আসে না; বেশির ভাগ সময় তা হয়ে ওঠে চরিত্রের কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অংশ। পরিচালক যখন নায়ক বা নায়িকার হাতে নির্দিষ্ট একটি বই তুলে দেন, তখন সেটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। বইটি কী ধরনের, কার লেখা, কোন ঘরানার এই সব নির্বাচনই চরিত্রের স্বভাব, পেশা, সামাজিক অবস্থান কিংবা সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।

স্টিভ মার্টিনের ‘দ্য অ্যাটর্নি’
ছবি: সংগৃহীত

ফলে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, নায়ক-নায়িকার হাতে ঠিক কোন বইটি থাকছে?

‘দিল চাহতা হ্যায়’ সিনেমায় শালিনীর (প্রীতি জিন্তা) হাতে স্টিভ মার্টিনের ‘দ্য অ্যাটর্নি’ বইটি দেখা যায়। প্রশ্ন জাগে, পরিচালক ফারহান আখতার কেন তাঁর নায়িকার হাতে ঠিক এই বইটিই তুলে দিলেন? এই বই গল্পের প্লটকে এগিয়ে নেয় না, কোনো ঘটনাও ঘটায় না। তবু এর উপস্থিতি অর্থবহ। এটি একধরনের প্রতীকী সংকেত, চরিত্রের কোড।

শালিনী উচ্চশিক্ষিত, শহুরে, বিশ্বনাগরিকও বটে। তার নিজস্ব এক জগৎ আছে। কথাবার্তায় নরম, কিন্তু সিদ্ধান্তে স্পষ্ট। তার প্রতি দুর্বল পুরুষদের তিনি নিজের রুচি দিয়েই সামলান। এই চরিত্রের হাতে আবেগঘন কোনো উপন্যাস নয়, বরং আইনবিষয়ক থ্রিলার থাকাটাই স্বাভাবিক। একটি বইয়ের মাধ্যমেই পরিচালক বুঝিয়ে দেন এই নারী শুধু কোমল অনুভূতির মানুষ নন, তিনি সামাজিক কাঠামো, যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক শৃঙ্খলাও বোঝেন।

‘গুড উইল হান্টিং’ সিনেমায় নায়কের (ম্যাট ডেমন) হাতে দেখা যায় ‘হেল্প ইয়োরসেলফ’ নামের একটি বই। যে মানুষটি দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন গণিত সমস্যার সমাধান করতে পারেন, তার হাতেই রয়েছে নিজেকে সামলানোর বই—এই বৈপরীত্যই চরিত্রের ভেতরের সংকটকে স্পষ্ট করে তোলে। কাহিনির প্রয়োজনেই এমন একটি বই তার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। উল্লেখযোগ্য যে ‘হেল্প ইয়োরসেলফ’ নামে বাস্তবে কোনো বই নেই এবং হেনরি লিপকিন নামে কোনো লেখকেরও অস্তিত্ব নেই। এটি নিছক ছবির জন্য তৈরি একটি প্রপ।

তার প্রতি দুর্বল পুরুষদের তিনি নিজের রুচি দিয়েই সামলান। এই চরিত্রের হাতে আবেগঘন কোনো উপন্যাস নয়, বরং আইনবিষয়ক থ্রিলার থাকাটাই স্বাভাবিক। একটি বইয়ের মাধ্যমেই পরিচালক বুঝিয়ে দেন এই নারী শুধু কোমল অনুভূতির মানুষ নন, তিনি সামাজিক কাঠামো, যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক শৃঙ্খলাও বোঝেন।

‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’ উপন্যাসটির প্রাথমিক নাম ছিল ‘ফার্স্ট ইম্প্রেশনস’। এই নামেই জেন অস্টেন প্রথম বইটি লিখেছিলেন। সিনেমার প্রথম দৃশ্যে এলিজাবেথের (কিরা নাইটলি) হাতে আমরা দেখি সেই ‘ফার্স্ট ইম্প্রেশনস’। এখানেও প্রশ্ন, পরিচালক কেন ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’ না দিয়ে প্রাথমিক নামের বইটিই নায়িকার হাতে তুলে দিলেন?

জেন অস্টেনের ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’
ছবি: সংগৃহীত

বৈশিষ্ট্যে এলিজাবেথ প্রথম দর্শনেই বিচারপ্রবণ। মানুষকে, সম্পর্ককে, এমনকি নিজেকেও তিনি বোঝেন ‘প্রথম ধারণা’র ফাঁদে পড়ে। সিনেমায় শেষ দৃশ্যের ঠিক আগপর্যন্ত গল্পটি এই ভুল–বোঝাবুঝির ওপরই এগিয়ে চলে। এখানে বইটি শুধু একটি দৃশ্যের অনুষঙ্গ নয়, এই প্রপই নীরবে সিনেমার মূল ভাবনাকে টেনে নিয়ে যায়।

বাংলা সিনেমাতেও বই প্রপ হিসেবে এমন নীরব ভাষায় কাজ করেছে। সত্যজিৎ রায়ের ‘চারুলতা’ ছবিতে চারুর (মাধবী মুখোপাধ্যায়) হাতে থাকা বই কেবল তার শিক্ষার পরিচয় দেয় না; তা তার নিঃসঙ্গতা, অবদমিত কৌতূহল এবং নিজের জগতের খোঁজকে দৃশ্যমান করে তোলে। সে বই পড়ে গল্প এগিয়ে নেওয়ার জন্য নয়, বরং নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য।

‘মিডনাইট ইন প্যারিস’-এ হেমিংওয়ে বা ফিটজেরাল্ডদের হাতে কোনো নির্দিষ্ট বই দেখা যায় না। কিন্তু তাদের কথোপকথনেই বোঝা যায়, ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’ কিংবা ‘দ্য গ্রেট গ্যাটসবি’ লেখা হচ্ছে এবং সেই বইগুলোর সাহিত্যিক দর্শনের ইঙ্গিতও সেখানে উপস্থিত থাকে।
মিডনাইট ইন প্যারিস (২০১১) চলচ্চিত্রে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে চরিত্রে কোরি স্টল
ছবি: সংগৃহীত

‘দ্য গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট হোটেল’ সিনেমার প্রোডাকশন ডিজাইনার অ্যাডাম স্টকহাউসেন এক সাক্ষাৎকারে সেট ও দৃশ্যসজ্জা নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, ছবির (দ্য গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট হোটেল) শুরুতেই দর্শক যখন হোটেলটির সামগ্রিক রূপ ও আবহকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে নেয়, তখন আর সেট, রং বা বস্তু আলাদা করে চোখে পড়ে না। দর্শকের মন সেগুলো ছেড়ে দিয়ে গল্পের ভেতরে ঢুকে যায়। অর্থাৎ দৃশ্যসজ্জা তখন কেবল পটভূমি হিসেবে থাকে না; সেটাই গল্প বলার ভাষায় পরিণত হয়। সেই ভাষার ভেতরেই কখনো একটি হোটেল হয়ে ওঠে চরিত্রের মানসিক জগৎ, আবার কোনো ছোট বস্তু বা বই নীরবে হয়ে ওঠে সেই চরিত্রের প্রতিচ্ছবি।

হাতে বই তুলে ধরে সরাসরি দেখানো ছাড়াও সিনেমায় এমন বহু উদাহরণ আছে, যেখানে সংলাপের ভেতর দিয়েই প্রপকে ছাড়িয়ে অর্থ তৈরি করা হয়। ‘মিডনাইট ইন প্যারিস’-এ হেমিংওয়ে বা ফিটজেরাল্ডদের হাতে কোনো নির্দিষ্ট বই দেখা যায় না। কিন্তু তাদের কথোপকথনেই বোঝা যায়, ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’ কিংবা ‘দ্য গ্রেট গ্যাটসবি’ লেখা হচ্ছে এবং সেই বইগুলোর সাহিত্যিক দর্শনের ইঙ্গিতও সেখানে উপস্থিত থাকে।

তাহলে কি ধরে নিতে হবে, যাঁদের সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ নেই বা এসব তথ্য জানা নেই, তাঁরা এমন সিনেমার রস আস্বাদন থেকে বঞ্চিত হবেন? উত্তর—‘না’। পরিচালক সিনেমা বানান সব ধরনের দর্শকের জন্য। গল্প, আবেগ ও সম্পর্কের স্তরে সিনেমা নিজেই সম্পূর্ণ। আর যাঁরা নির্দিষ্ট সাহিত্য বা প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানেন, তাঁদের জন্য এসব ইঙ্গিত হয়ে ওঠে বাড়তি আনন্দ। একধরনের অতিরিক্ত পাঠ।