আমাদের সৃজনশীল প্রকাশনার সম্পাদনার মূল উদ্দেশ্য নির্ভুল বই করা। কনটেন্টের ত্রুটি দূর করতেই আমরা গলদঘর্ম হই। ফলে সম্পাদনার আধেয়র অন্য দিকগুলোতে মনোসংযোগ কম ঘটে। যদিও শৈলী ও সৌকর্য সম্পাদনার পরিধির মধ্যে বিরাজমান, তবু প্রকাশনাকে নান্দনিকভাবে উপস্থাপনায় শৈলী ও সৌকর্যকে আলাদা করে গুরুত্ব দিতে হয়। মোটাদাগে সম্পাদনায় বানানশুদ্ধি, যতিচিহ্ন, ব্যাকরণগত দিক ইত্যাদি দেখা হয়। এই সীমার বাইরে ফন্ট বা হরফের আকার, মার্জিন, চিত্র, ইলাস্ট্রেশন, বর্ণাকৃতির সহজ পাঠ্যতা, লাইনের দৈর্ঘ্য ও লাইনের মাঝে ব্যবধান ইত্যাদির ওপর নান্দনিক প্রকাশনা নির্ভরশীল। এই কাজগুলো শৈলী ও সৌকর্যের আওতাধীন।
বাংলা প্রকাশনার কারিগরি ও শৈল্পিক যোগসূত্র সমন্বিতভাবে এগোতে পারেনি। ফলে শৈলীগত দিকে আমাদের মনোযোগ কম। বাংলা ভাষার চেয়ে জটিল ভাষাগুলো ডিজিটাল সামঞ্জস্যের মাধ্যমে অনেক উৎকর্ষ অর্জন করেছে। প্রকাশনার প্রযুক্তিগত সুবিধা অর্জনে আমরা স্বনির্ভর নই। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কালপর্বেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আমাদের বহুল ব্যবহৃত ইউনিকোড ফন্ট মুদ্রণশৈলীর জন্য পাঠকপ্রিয় নয়। অথচ প্রকাশনার শৈলী ও সৌকর্য নিশ্চিতে অগ্রাধিকার পায় সুস্পষ্ট ও সুন্দর হরফ। হরফের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে সুপাঠ্যতা।
বাংলা ভাষার চেয়ে জটিল ভাষাগুলো ডিজিটাল সামঞ্জস্যের মাধ্যমে অনেক উৎকর্ষ অর্জন করেছে। প্রকাশনার প্রযুক্তিগত সুবিধা অর্জনে আমরা স্বনির্ভর নই। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কালপর্বেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আমাদের বহুল ব্যবহৃত ইউনিকোড ফন্ট মুদ্রণশৈলীর জন্য পাঠকপ্রিয় নয়।
প্রকাশনাশৈলীর কিছু বিষয় সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত। সম্পাদনা ঠিকঠাক হলে শৈলী অনেকটা নিশ্চিত হয়। কিন্তু আমাদের সৃজনশীল বইয়ের সম্পাদনার নাকাল দশা। সুসম্পাদনার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি আমাদের প্রকাশনা খাতে। সম্পাদনার জন্য যেমন লোকবল নেই, একই সঙ্গে এ বিষয়ে মনোযোগের ঘাটতি রয়েছে। সুন্দর কাগজে ঝকমকে বই পাঠককে টানে, কিন্তু পাঠককে ‘আটক’ করতে বইয়ের কনটেন্ট লোকপ্রিয় হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিরোনাম, উপশিরোনাম, ক্রস রেফারেন্স, নোট, টীকা, অলংকরণে দৃষ্টি রেখে নির্ভুল বিন্যাসের বই আমরা চাই। পাঠকের পাঠমাত্রা বহুমুখী। পাঠক চায় বই কেবল একটি বিষয়কে উপস্থাপন না করে বইয়ের উপস্থাপনায় রুচির পরিচয়। এ কারণেই পরিপাটি মুদ্রণ গুরুত্ব পাচ্ছে।
উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর (১৮৬৩-১৯১৫) হাত ধরে বাংলাভাষী শিশুদের জন্য ১৯১৩ সালে প্রকাশিত সন্দেশ পত্রিকার বিষয়বস্তুকে কখনো কখনো ছাড়িয়ে গেছে মুদ্রণশৈলী। ছোটদের প্রকাশনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৭১-১৯৫১) বুড়ো আংলা। শিশুর মনকে লেখায় ও রেখায় বর্ণিল করে দিয়েছিল সেই বই। গত শতকের আশি-নব্বইয়ের দশকে ছোটদের বইয়ে হাশেম খানের জলরঙে আঁকা ছবি, কখনো লাইনার কলমের চিত্র ও রেখার মাধ্যমে অলংকরণ এখনো স্মৃতিপটে জ্বলজ্বলে করে। কাইয়ুম চৌধুরী সাধারণত পাণ্ডুলিপি পড়ে প্রচ্ছদ আঁকতেন। হ্যান্ডমেসিনের কালার সেপারেশনেও মনোরম প্রচ্ছদ তৈরি করতেন। বইয়ের প্রারম্ভিক অংশ (ফ্রন্ট মেটার) বা অভ্যন্তরীণ পৃষ্ঠা (ইনারপেজ) প্রচ্ছদের সঙ্গে কাগজে বিন্যাস করে দিতেন। বইয়ের উপশিরোনাম ও শিরোনাম নির্বাচন, হরফের বিন্যাস, মুদ্রণতথ্যের অবস্থান ও পরিসর, সূচিপত্রের সূচনাস্থান, অলংকরণের রীতি এবং শিরোনাম ও পাদটীকায় (হেডার-ফুটার) অন্তর্ভুক্ত তথ্য—এসব বিষয়ে তিনি মতামত দিতেন। গত শতাব্দীর চিত্রশিল্পীরা বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণে প্রারম্ভিক অংশ, বইয়ের বিষয়বস্তু বা বডি ম্যাটার ও শেষ ভাগ বা এন্ড ম্যাটার দেখে নিতেন।
পূর্ববর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের প্রকাশনার শৈল্পিক বয়ান বর্তমান শিল্পীদের কাজে অনুপস্থিত।
গত শতাব্দীর চিত্রশিল্পীরা বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণে প্রারম্ভিক অংশ, বইয়ের বিষয়বস্তু বা বডি ম্যাটার দেখে নিতেন। পূর্ববর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের প্রকাশনার শৈল্পিক বয়ান বর্তমান শিল্পীদের কাজে অনুপস্থিত। প্রযুক্তির সাহায্য নিশ্চিত করা গেলেও হাতের নৈপুণ্য প্রকাশনায় যে সৌন্দর্য সৃষ্টি করত, তা এখন আর নেই।
প্রযুক্তির সাহায্যে প্রকাশনাশৈলী নিশ্চিত করা গেলেও মানুষের হাতের নৈপুণ্য প্রকাশনায় যে সৌন্দর্য সৃষ্টি করত, তা এখন আর নেই। তুলিতে বা লাইনার কলমে যে অলংকরণ হয়, সেরূপ কম্পিউটার গ্রাফিকসে হয় না। কম্পিউটার গ্রাফিকস হয়তো অন্য ধরনের সৌন্দর্য নিশ্চিত করে। বই বাঁধাইয়ে বাঁধাই–শিল্পীর হাতের জাদুর আকর্ষণ কমেনি এখনো। সামান্য উপকরণ দিয়ে আমাদের বাঁধাই–শিল্পীদের মাউন্ট বাঁধাইয়ের আবেদন যথেষ্ট। তবে সার্বিক ক্যানভাসে আমাদের শৈলী নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির সর্বশেষ সুবিধার সহযোগও জরুরি। প্রযুক্তির নিত্যনতুন উপকরণ, যেমন প্রচ্ছদে লেমিনেশন পর্যায়ক্রমে ম্যাট ও স্পট লেমিনেশন চলে এসেছে। প্রকাশনার প্রতিটি পর্যায়ে এরূপ নতুনত্ব কাঙ্ক্ষিত।
প্রুফ সংশোধন, ক্রিয়াপদের ব্যবহারের সঠিকতা, বাক্যের গঠনকাঠামো ঠিক করা—এতটুকুতে থিতু হয়ে আছে সম্পাদনার জগৎ। বইয়ের কাঠামো নির্মাণ পর্যায়ের প্রতিটি পর্বে সৃজনচিন্তা আবশ্যক। আমরা সচেতন ও আন্তরিক হলে শৈলী ও সৌকর্যের জন্য প্রতিটি পর্যায়ে কম সময়ে অধিক ফলদায়ী সুবিধা পেতে পারি। বইয়ের পৃষ্ঠাসজ্জায় পাণ্ডুলিপি গ্রিড, কলাম গ্রিড, মডুলার গ্রিডের মতো নানা প্রকরণ ব্যবহার করে দ্রুত ও নান্দনিক পৃষ্ঠাসজ্জা সম্ভব।
শৈলীর বিষয়টি আমাদের মনোভুবনে কম গুরুত্ব নিয়ে হাজির হয়, কিন্তু শৈলীর নানা বিষয় যখন সঠিক যোজনা করে উপস্থাপিত হয়, তখন বইয়ের আঙ্গিক সৌন্দর্য উত্তুঙ্গে পৌঁছায়। লেখায় সময় লেখককে যেমন পাঠকতুষ্টির কথা মাথায় রাখতে হয়, একই সঙ্গে সম্পাদনার সময় বিবেচনা করতে হয়—শৈলী লেখার প্রবহমানতা ধরে রাখে। কিন্তু এখনো বিষয়টি অনেকটা উপেক্ষিত। আমাদের দেশের প্রকাশনায় সম্পাদনার জন্য কিছুটা গুরুত্ব থাকলেও শৈলী সম্পাদকের বিষয়টি একেবারেই অনুপস্থিত। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট তাদের ‘মাতৃভাষা পিডিয়া’ সিরিজ গ্রন্থমালার জন্য একজন শৈলী সম্পাদক নিযুক্ত করেছিলেন। স্বল্পমাত্রায় হলেও প্রকাশনায় শৈলীর বিষয়টিকে নতুন চশমা দিয়ে দেখা হচ্ছে—এটি ইতিবাচক। বাংলা একাডেমির রেফারেন্স–শৈলী এখন চূড়ান্ত পর্বের আগে অংশীজনদের মতামতের জন্য অপেক্ষাধীন। এই রেফারেন্স–শৈলী আগামী দিনে একটি ঐকতান প্রতিষ্ঠা করবে বলে আমরা আশাবাদী।
প্রুফ সংশোধন, ক্রিয়াপদের ব্যবহারের সঠিকতা, বাক্যের গঠনকাঠামো ঠিক করা—এতটুকুতে থিতু হয়ে আছে সম্পাদনার জগৎ। বইয়ের কাঠামো নির্মাণ পর্যায়ের প্রতিটি পর্বে সৃজনচিন্তা আবশ্যক। আমরা সচেতন ও আন্তরিক হলে শৈলী ও সৌকর্যের জন্য প্রতিটি পর্যায়ে কম সময়ে অধিক ফলদায়ী সুবিধা পেতে পারি।
মুদ্রণশৈলীর পরিভাষাগত অর্থ বর্ণের অলংকরণ হলেও বর্তমানে শৈলীর আওতায় বিবেচনা করা হয় বাছাই করা মুদ্রাক্ষরের দৃশ্যমানতা, মুদ্রাক্ষরের একে অপরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া এবং চিত্র ও রঙের সমন্বয়সাধন। স্ক্রিন অথবা কাগজে এসব উপাদানের সঠিক ব্যবহারে প্রকাশনার সৌষ্ঠব পাঠকপ্রিয় হয়। পাঠকের চাহিদার বিষয়গুলো শৈলীর মাধ্যমে অনেকটা নিশ্চিত করা যায়। যেমন দুই বাক্যের মধ্যে ব্যবধান বা লিডিং কতটুকু হবে, লেখার বিন্যাস এমন হওয়া চাই, যাতে লেখক সহজে প্রত্যাশিত বিষয় খুঁজে পেতে পারে।
মুদ্রণশৈলী পাঠকনির্দেশক হিসেবেও কাজ করে। তথ্যনির্ভর সূচিপত্র, গ্রন্থপঞ্জি ছাড়াও রানিং হেড (পৃষ্ঠাশিরোনাম), হেডার-ফুটার (ওপর-নিচ অংশের তথ্য) ইত্যাদির মাধ্যমে পঠনযোগ্যতা সহজ ও সাবলীল হয়। মুদ্রণশৈলীর বিভিন্ন প্রণালি ব্যবহারে পাঠকের বয়স ও প্রকাশনার ফরম্যাটের ওপর নজর দিতে হয়। বয়স ও রুচির ভিন্নতায় শৈলীর রকমফেরে নতুনত্ব প্রয়োজন। আবার মুদ্রিত প্রকাশনা ও অনলাইন প্রকাশনায় শৈলী ও সৌকর্য ভিন্নতার দাবি করে। ওয়েবসাইটে বিভিন্ন রকম মুদ্রাক্ষর ও আকার, লাইনের দৈর্ঘ্য ও স্পেসিং প্রিন্টের লেখার মতো থাকে না। বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টি আমলে রাখতে হয়। বাংলা হরফে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, যুক্তাক্ষর, কার, ফলা, যতিচিহ্ন, বিরামচিহ্নের বিশাল বহর নিয়ে শৈলীর পরিকাঠামো একটা কঠিন বিষয়। একই সঙ্গে যুক্তাক্ষরে মূল অক্ষরের আকৃতি বদলে পাঠপ্রবাহে ছেদ পড়ে বৈকি। সুখের খবর হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেক প্রযুক্তিবিদ এ নিয়ে কাজ করছেন। লিপিঘরের মতো ব্যক্তি উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানও ২২১টি বাংলা হরফ (ফন্ট) ব্যবহার করার জন্য উন্মুক্ত করেছে। আইসিটি মন্ত্রণালয় বাংলা লেখার জন্য ‘পূর্ণ’ নামের ফন্ট তৈরি করেছে। এর মধ্যে সব কটি বর্ণ বা গ্রিড আছে। এনসিটিবির ‘স্বচ্ছ’ নামের ফন্ট যুক্তাক্ষরে প্রতিটি বর্ণ নিজ নিজ আকৃতি বজায় রাখতে সক্ষম। এই বিষয়গুলো ছোট ছোট সুখবর। পথ পাড়ি দিতে হবে অনেক। প্রকাশনায় শৈলীর জন্য আশু প্রয়োজন পিডিএফ ও ছবিতে থাকা সব বাংলা লেখাকে সম্পাদনযোগ্য লেখায় রূপান্তর। রূপান্তরিত লেখা কম্পোজ করা লেখার অনুরূপ সম্পাদনযোগ্য টেক্সটে রূপান্তরের অবারিত সুবিধা নিশ্চিত প্রয়োজন। বর্তমানে এসব সুবিধা স্বল্প পরিসরে বলবৎ রয়েছে। বাংলা হরফ নানা কায়দায় ভাঙাচোরা করা যায়। যত ভাঙব ততই নানা রকমের গড়ন বেরিয়ে আসবে। তাই প্রকাশনায় শৈলীর উন্নয়নে আমাদের আন্তরিকতা ও গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি কাঙ্ক্ষিত।
মহান একুশের অর্জন বাংলা ভাষার সীমানা এখন ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে বদ্ধ নয়, এটি এখন বিশ্বময়। ভাষা ও প্রকাশনার উন্নয়ন একটা যৌথ প্রয়াস। চর্চা ও মমত্বের সঙ্গে দায়িত্বের বিষয়টিও সমধিক গুরুত্বের। প্রকাশনার উন্নয়নে শৈলী ও সৌকর্যে আলো ফেলা প্রয়োজন। তবে এ বিষয়ের উন্নয়নে এ অঞ্চলের মানুষের প্রকৃতি ও পাঠরুচির বিষয়কে বিবেচনায় এনে কর্মকৌশল জরুরি।