জহির রায়হান
অনুসন্ধান ও ভালোবাসা
প্রথমা প্রকাশন ২০২১ সালে মতিউর রহমান সম্পাদিত ‘জহির রায়হান: অনুসন্ধান ও ভালোবাসা’ শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করে। ভূমিকা পর্বে সম্পাদকের এ প্রবন্ধটি অন্তর্ভূক্ত করা হয়।
জহির রায়হান বাংলার সেই বিরল কথাশিল্পী, চলচ্চিত্রকার ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী, যিনি মানুষের মুক্তির প্রেরণায় তাঁর সৃজনশীল হাত এবং প্রবল পদাতিক সত্তা একই সঙ্গে সক্রিয় রেখেছেন। সাহিত্যজীবনের শুরুতেই ‘ওদের জানিয়ে দাও’ কবিতার মধ্য দিয়ে তিনি সাম্রাজ্যবাদী-উপনিবেশবাদী শক্তিকে জানাতে চেয়েছেন—তিনি তাদের বিরুদ্ধে, গণমানুষের পক্ষে কথা বলতে এসেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের স্বাধীনতা ও লেখকের স্বাধীনতায়ও। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযোগ তাঁর মানবিক সাহিত্যরুচিকে নির্মাণ করেছে; কিন্তু সংকীর্ণ পার্টি-লিটারেচার প্রণয়নে উত্সাহিত করেনি।
এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে জহির রায়হান অমর একুশের মানসসন্তান। ‘একুশের গল্প’, আরেক ফাল্গুন কিংবা একুশে ফেব্রুয়ারী উপন্যাস অথবা জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্র পরিচালনার মধ্য দিয়ে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে বেঁধেছেন অমর ধ্রুবপদে। ‘একুশের গল্প’ এবং আর কত দিন উপন্যাসের তপু তো আসলে জহির রায়হানই, যার অস্থি-কঙ্কাল তাঁর সন্তান অনল রায়হানের মতো আমরা সবাই খুঁজে বেড়াচ্ছি বাংলাদেশের মানচিত্রজুড়ে।
হাজার বছর ধরে উপন্যাসে তিনি যেমন গ্রামবাংলার খেটে খাওয়া, প্রান্তবর্তী মানুষের মুখ অঙ্কন করেছেন, তেমনি তৃষ্ণাসহ কিছু উপন্যাসে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিকতার আবহ।
বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্র আর ইংরেজি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা জহির রায়হান এ দেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের চিরস্মরণীয় নাম। ১৯৬১ সালে কখনো আসেনি দিয়ে তাঁর যে চলচ্চিত্র-যাত্রা, তা ক্রমশ ইতিহাস সৃষ্টি করে সোনার কাজল, কাঁচের দেয়াল, সংগম, বাহানা, বেহুলা, জ্বলতে সুরজকে নিচে, জীবন থেকে নেয়া, স্টপ জেনোসাইড, আ স্টেট ইজ বর্ন-এর মতো একগুচ্ছ সাড়াজাগানো, পুরস্কৃত এবং বাঁকবদলকারী চলচ্চিত্রকর্মের সূত্রে। একুশে ফেব্রুয়ারী এবং লেট দেয়ার বি লাইট নামে দুটো চলচ্চিত্রকাজ যদিও তিনি সমাপ্ত করতে পারেননি, তবু তাঁর অসমাপ্ত কর্মের অঙ্গীকার আজকের নবীন চলচ্চিত্রকর্মীরা ধারণ করে চলেছেন তাঁদের যাবতীয় দায়বদ্ধ চলচ্চিত্র-তত্পরতায়। ভাষাসংগ্রামী জহির রায়হান যেন অনিবার্যভাবেই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরে কলকাতায় অবস্থানকালে গঠিত ‘Bangladesh Liberation Council of Intelligentsia’-র সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন যেমন, ঠিক তেমনি স্বাধীনতার পর বুদ্ধিজীবী হত্যার স্বরূপ উন্মোচনে গঠন করেন ‘বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি’।
২
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর আর মুক্তিসংগ্রামী সাহিত্যশিল্পী জহির রায়হান হত্যাকাণ্ড প্রায় সমান বয়সের। ‘হত্যাকাণ্ড’ সচেতনভাবেই বলছি আমরা; কারণ, আমাদের গবেষণা ও অনুসন্ধানে ইতিমধ্যে এটি প্রমাণিত সত্য যে ‘অন্তর্ধান’ নয়, জহির রায়হান মুক্তিযুদ্ধের পর মিরপুরে অগ্রজ সাহিত্যিক-সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সারের অনুসন্ধান-যুদ্ধে অবাঙালি ঘাতকগোষ্ঠীর হাতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। বন্ধু সাংবাদিক-গবেষক জুলফিকার আলি মাণিক একাত্তর-উত্তর সময়েও পাকিস্তানি হানাদারদের দোসর-কবলিত যে মিরপুরকে বলেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন’। এই বইয়ের প্রথম পর্বের একগুচ্ছ লেখার মধ্য দিয়ে ঘৃণ্য ঘাতকের বিরুদ্ধে জহির রায়হানের আমৃত্যু সংগ্রামের সত্যটি পাঠকের অনুধাবনে আসবে।
আমাদের সংগৃহীত একগুচ্ছ স্মৃতিচারণা, মূল্যায়ন ও আলোচনায় যেমন বিভিন্ন প্রজন্মের লেখক-শিল্পী-চলচ্চিত্রকারদের জহির-স্মৃতি ও মূল্যায়ন উঠে এসেছে, তেমনি তাঁর পরিবারের সদস্যের লেখা ফুটিয়ে তুলেছে নিবিড় এক জহির রায়হানকে, যিনি নিজের পরিবার ছাপিয়ে গোটা মানবজাতিকে মনে করতেন তাঁর প্রিয় পরিবার।
জহির রায়হানের গল্প, প্রবন্ধ, চিঠি, আলাপন এবং আলোকচিত্রাবলির সংযোজনের মধ্য দিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে প্রিয় পাঠকের হাতে তুলে দিতে চেয়েছি প্রামাণ্য জহির রায়হানকে, যিনি সারা জীবন মানুষের মুক্তি আর স্বাধীনতার কথাই বাঙ্ময় করে গেছেন।
বইটি প্রামাণ্য করার জন্য সাংবাদিক জুলফিকার আলি মাণিকের মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন মিরপুর: জহির রায়হান অন্তর্ধান রহস্যভেদ (সুবর্ণ প্রকাশনী, ২০০২) বইয়ের সাহায্য নিয়েছি। নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন জহির রায়হানের চাচাতো ভাই শাহরিয়ার কবির, পুত্র অনল রায়হান এবং কবি পিয়াস মজিদ। তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
৩
ফেব্রুয়ারি এগিয়ে এলেই, সাহিত্য-সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে মানুষের মুক্তিসংগ্রামের কথা বললেই বড় বেশি মনে পড়ে লেখক ও সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সার, লেখক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান এবং গায়ক ও সংগীত পরিচালক আলতাফ মাহমুদের কথা। তাঁদের নানা সহযোগিতার কথা ভিড় করে মনের গভীরে। আসলে আমাদের মুক্তিসংগ্রামে এই তিন শহীদের জীবন ও তাঁদের সমস্ত কর্মকাণ্ডে মহান একুশে ফেব্রুয়ারির বড় বেশি উপস্থিতি আমরা দেখতে পাই।
জহির রায়হানের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ষাটের দশকের মধ্যভাগে, গণ-আন্দোলনের সেই তুমুল দিনগুলোতে। পরে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। কায়েতটুলীতে তাঁর পৈতৃক বাসভবনে, শ্যামলী বা দিলু রোডের বাসায় অথবা এফডিসি স্টুডিও বা ইংরেজি সাপ্তাহিক এক্সপ্রেস অফিসে তাঁর সঙ্গে বহুবার দেখা হয়েছে। পরামর্শ বা অর্থসাহায্য ছাড়াও নানাভাবে তিনি সাহায্য করেছেন আমাদের। তখন আমরা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। আবার গোপন কমিউনিস্ট আন্দোলনের কর্মী হিসেবেও কাজ করছি। আর জহির রায়হানও এই সংগঠন ও আন্দোলনগুলোর নেতৃস্থানীয় কর্মী ছিলেন। সে জন্যই তাঁর কাছে কোনো অনুরোধ নিয়ে গিয়ে না পেয়ে ফিরে এসেছি, এমন কোনো স্মৃতি নেই আমাদের।
জহির রায়হানের সঙ্গে শেষ সাক্ষাতের স্মৃতি এখনো জ্বলজ্বলে। মনে পড়ে, ১৯৭২ সালের জানুয়ারির কোনো এক সকালে পিজি হাসপাতালের সিঁড়িতে দেখা। আমি উঠছি, তিনি নামছেন। তিনি হাত তুলে বললেন, ‘কেমন আছেন, কথা আছে, আসবেন।’ আমি বললাম, আসব, কথা হবে। জহির ভাইয়ের সঙ্গে আর দেখা হলো না, কথাও হলো না।
তারপর থেকে কত দিন ভেবেছি, একটা দায় অনুভব করেছি জহির ভাইয়ের স্মৃতিতে কিছু একটা করার। দেরিতে হলেও এই বইয়ের মাধ্যমে জহির রায়হানকে স্মরণ করতে চেয়েছি, যিনি তাঁর জীবন ও সৃষ্টিতে বাংলার সংগ্রামী ঐতিহ্যকে স্মরণীয় করে রেখেছেন।
জহির রায়হানদের কখনোই মৃত্যু ঘটে না; ‘একুশের গল্প’-এর তপুর মতো জহির রায়হানরা ‘সময়ের প্রয়োজনে’, যুগে যুগে ফিরে ফিরে আসেন বাংলার লাখো-কোটি শহীদের বেশে।
১৫ জানুয়ারি ২০২১
জহির রায়হান: অনুসন্ধান ও ভালোবাসা
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশ: জানুয়ারি ২০২১
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল
পৃষ্ঠা: ১৯২
মূল্য: ৪০০ টাকা
